📄 ইসতিদানাহ বা ঋণগ্রহণের শরয়ী বিধান
ইসতিদানার মূল বিধান হলো তা মুবাহ ও বৈধ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “হে মুমিনগণ! যখন তোমরা একে অন্যের সাথে নির্ধারিত মেয়াদে ঋণের আদান-প্রদান করো তখন তা লিখে রাখো।”⁴
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণ গ্রহণ করতেন। বস্তু বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে ঋণগ্রহণের বিধানে পরিবর্তন হয়। যেমন ঋণগ্রহীতার অসচ্ছলতার সময় তা মুস্তাহাব; আর একেবারে নিরূপায় ব্যক্তির জন্য ঋণগ্রহণ আবশ্যক। এবং ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করার বা ঋণ অস্বীকারের ইচ্ছা আছে যার তার জন্য হারাম। ঋণ পরিশোধে অক্ষম, তবে নিরূপায় নয় এবং ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করার ইচ্ছাও করে না এমন ব্যক্তির জন্য ঋণগ্রহণ মাকরূহ।
টিকাঃ
৪. সূরা বাকারা, আয়াত ২৮২
৫. হাশিয়াতুশ শিরবিনী, আলাত তুহফা, খ. ৫, পৃ. ৩৭; হাশিয়া দুসূকী আলাশ শারহিল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ২২৩; প্রকাশ, দারুল ফিকর, বৈরুত
৬. তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৩৮; আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩১৫; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ১০, পৃ. ৪৯৮০; ২য় মুদ্রণ
৭. মাওয়াহিবুল জলীল, খ. ১, পৃ. ৩৪৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ১,পৃ. ১৮৭; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ১, পৃ. ৩৩৯; প্রকাশ, আল-মাকতাবুল ইসলামী; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৩, পৃ. ৩৪৬; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৫, পৃ. ৩০৭; আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, ইবনু নুজাইমকৃত, পৃ. ৩৫৮, মুদ্রণ: দারুল হেলাল বৈরুত
📄 ইসতিদানার সংঘটিত হওয়ার শব্দ
ব্যক্তির দায়িত্বে আবশ্যক হওয়া প্রকাশ করে এমন প্রত্যেক শব্দ দ্বারা ইসতিদানা সম্পাদিত হয়। তা কর্জ হোক বা সালাম অথবা মেয়াদে পরিশোধযোগ্য বিক্রেত পণ্যের মূল্য হোক। ফকীহগণ এ সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা করেছেন আগত শিরোনামগুলোতে : عقد, قَرْض এবং দায়ন।
📄 ঋণগ্রহণের কারণসমূহ
প্রথম: আল্লাহর বিভিন্ন হকের জন্য ঋণগ্রহণ
সম্পদসংশ্লিষ্ট আল্লাহ তাআলার বিভিন্ন হক; যেমন- যাকাত। আদায়ে সক্ষম সচ্ছল ব্যক্তি ছাড়া কারো ওপর যাকাত আবশ্যক হয় না। প্রতিটি আর্থিক ইবাদতে সচ্ছলতার বিবেচনা করা হয়। সুতরাং সর্বসম্মতিক্রমে ঋণ গ্রহণে তাকে বাধ্য করা যাবে না, যেন যাকাত বা এ জাতীয় কোনোটি আদায় তার জন্য আবশ্যক হয়ে পড়ে। যে ইবাদত ফরজ হওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা সক্ষমতার শর্ত করেছেন; যেমন হজ। যদি ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধের আশা না রাখে, তাহলে মালেকীদের মতে উল্লিখিত শ্রেণীর লোকদের আর্থিক ইবাদতের জন্য ঋণগ্রহণ করা মাকরূহ বা হারাম; আর হানাফীদের মতে অনুত্তম। পক্ষান্তরে ঋণগ্রহীতা যদি ঋণশোধের আশা রাখে, তাহলে এ জাতীয় ইবাদতের জন্য ঋণগ্রহণ মালেকী ও শাফেয়ী ফকীহদের মতে ওয়াজিব এবং হানাফীদের মতে উত্তম। আল-মুগনী কিতাব হতে হাম্বলীদের মত যা প্রতিভাত হয় তা হলো, ঋণগ্রহণের মাধ্যমে হজ আদায় করা সম্ভব হলেও ঋণগ্রহণ করা তার জন্য আবশ্যক নয়। তবে নিজের বা অন্যের ক্ষতির আশঙ্কা না হলে এক্ষেত্রে প্রয়োজনে ঋণগ্রহণ করা মুস্তাহাব।
সচ্ছল অবস্থায় কারো ওপর আল্লাহর আর্থিক কোনো হক আবশ্যক হয়, এরপর ওই হক আদায়ের পূর্বে সে দরিদ্র হয়ে যায়, তাহলে কি সে হক আদায়ের জন্য তাকে ঋণগ্রহণে বাধ্য করা হবে? এক্ষেত্রে হানাফী ফকীহগণ দুটি অবস্থার পৃথক পৃথক বিধানের কথা বলেছেন। যদি এই ব্যক্তির কাছে সম্পদ না থাকায় সে ঋণ করতে চায়, আর তার প্রবল ধারণা হয় যে, ঋণ নিয়ে সে যাকাত আদায় করতে পারবে এবং ঋণ আদায়ের চেষ্টা করে সে ঋণ আদায়ে সক্ষম হবে, তাহলে তার জন্য ঋণ নেওয়া অধিক উত্তম। পক্ষান্তরে যদি তার প্রবল ধারণা হয়, ঋণ গ্রহণ করলে পরবর্তী সময়ে ঋণ পরিশোধে সে সক্ষম হবে না, তাহলে তার জন্য উত্তম হলো ঋণ না করা। হাম্বলী মাযহাবের মত হলো, কারো ওপর যাকাত আবশ্যক হওয়ার পর সম্পদ নষ্ট হলে/খোয়া গেলে, যদি তার পক্ষে যাকাত আদায় করা সম্ভব হয় যাকাত আদায় করবে। অন্যথায় সচ্ছল হওয়া এবং নিজের বা অপরের ক্ষতি-কষ্ট ছাড়া যাকাত আদায়ে সক্ষম হওয়া পর্যন্ত তাকে অবকাশ দেওয়া হবে।
দ্বিতীয়: বান্দাদের হক আদায়ের জন্য ঋণগ্রহণ
ক. প্রাণের হক রক্ষায় ঋণগ্রহণ: নিরূপায় ব্যক্তির নিজ প্রাণ রক্ষার্থে ঋণগ্রহণ করা আবশ্যক। কারণ, প্রাণরক্ষা সম্পদ রক্ষার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহগণ স্পষ্টভাবে এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ঋণ পরিশোধের আশা থাকলে যে-কোনো প্রয়োজন পূরণের জন্য ঋণগ্রহণ জায়েয; যদিও ঋণগ্রহণ না করে ধৈর্য ধরা উত্তম। যদি ঋণ পরিশোধের আশা না থাকে তাহলে ঋণ নেওয়া হারাম এবং ধৈর্য ধরা ওয়াজিব।
খ. অন্যের হক আদায়ের জন্য ঋণগ্রহণ
প্রথম: ঋণ পরিশোধের জন্য ঋণগ্রহণ: অসচ্ছল ব্যক্তিকে পাওনাদারদের ঋণ পরিশোধের জন্য ঋণগ্রহণ করতে বাধ্য করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেছেন : “যদি ঋণগ্রহীতা অসচ্ছল হয় তাহলে সচ্ছলতা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দেওয়া উচিত।”
দ্বিতীয়: স্ত্রীকে খোরপোষ প্রদানের জন্য ঋণগ্রহণ: ফকীহদের ঐকমত্যে স্ত্রীকে খোরপোষ দেওয়া ওয়াজিব, স্বামী সচ্ছল হোক বা অসচ্ছল। যদি স্বামী সচ্ছল হয়েও খোরপোষ দিতে অস্বীকার করে, তবে বলপ্রয়োগ করে হলেও স্বামীর সম্পদ থেকে খোরপোষ দেওয়া হবে। পক্ষান্তরে যদি স্বামী অসচ্ছল হয়, তাহলে হানাফী ফকীহদের মতে, বিচারক স্ত্রীর খোরপোষের পরিমাণ নির্ধারণ করবেন এবং স্বামীর নাম বলে স্ত্রীকে ঋণগ্রহণ করতে আদেশ করবেন।
তৃতীয়: সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়স্বজনের খরচের জন্য ঋণগ্রহণ করা: অসচ্ছল, উপার্জনে অক্ষম ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের খরচ দেওয়া মৌলিকভাবে পিতার ওপর আবশ্যক। সচ্ছল পিতা খরচ প্রদানে অসম্মত হলে খরচ প্রদানে তাকে বাধ্য করা হবে; আর সন্তানদেরকে পিতার নাম দিয়ে ঋণগ্রহণ করার আদেশ করা হবে। শাফেয়ী ফকীহদের মতে, বিচারকের অনুমতিক্রমে সন্তানদের ঋণ গ্রহণের অধিকার রয়েছে।
সম্পদ পূর্ণ হালাল বানানোর জন্য ঋণগ্রহণ: হালাল সম্পদ দ্বারা হজ করা মুস্তাহাব। যদি কারো কাছে হজ পরিমাণ সম্পদ হালাল না থাকে, কিছু সম্পদ সন্দেহযুক্ত হয়; আর সে পূর্ণ হালাল সম্পদ দিয়ে হজ করতে চায়, তবে ফাতাওয়ায়ে কাজীখানে বিবৃত হয়েছে, হজের জন্য সে ঋণ করবে। আর এ ঋণ নিজ সম্পদ থেকে শোধ করবে।
টিকাঃ
৮. ইবনে আবিদীন, খ. ২, পৃ. ১১৪ ও ১৪১; আল-হাত্তাব, খ. ২, পৃ. ৫০৫; আল-উম্ম, খ. ২, পৃ. ১১৬; আদ-দুসুকী, খ. ২, পৃ. ৭
৯. আল-মুগনী ও আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ১৭০
১০. ফাতাওয়া কাযীখান, খ. ১, পৃ. ২৫৬; ইবনে আবিদীন, খ. ২, পৃ. ১৪০
১১. আশ-শারহুল কাবীর ও আল-মুগনী, খ. ২, পৃ. ৪৬৫
১২. মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ৫৪৫; আশ-শিরওয়ানী, খ. ৫, পৃ. ৩৭
১৩. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৫, পৃ. ৩৬৬
১৪. হাশিয়া শিরওয়ানী আলাত তুহফা, খ. ৫, পৃ. ৩৭
১৫. আদ-দুসূকী, আলাশ শারহিল কাবীর, খ. ১, পৃ. ৪৯৭; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৪৪৮
১৬. সূরা বাকারা, আয়াত ২৮০
১৭. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৯০; হাশিয়া আদ-দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২৭০; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৪৪৮
১৮. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৭, পৃ. ২০৩; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ২, পৃ. ৬৮৬; মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ২০২; আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২০৫; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ৩, পৃ. ২৫২ ও ২৫৭; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৫, পৃ. ৬৪৬ ও ৬৪৯
১৯. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ২, পৃ. ৬৭৩, ৬৭৭ ও ৬৮৬; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৩, পৃ. ৫৪; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৫১; ফাতহুল কাদীর, খ. ৩, পৃ. ৩২৫; আল-হিদায়া ও ফাতহুল কাদীর, খ. ৩, পৃ. ৩৪৬
২০. মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ১৯৩; হাশিয়া আদ-দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২৭৪
২১. আল-ইকনা, খ. ৪, পৃ. ১৪৪; হাশিয়া কালয়ূবী, খ. ৪, পৃ. ৮৫; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৮, পৃ. ৩৪৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৪৪৮
২২. শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ৩, পৃ. ২৫৭
২৩. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ১, পৃ. ২২০
📄 ঋণগ্রহণ বৈধ হওয়ার শর্তসমূহ
প্রথম শর্ত: ঋণদাতা কোনো উপকার গ্রহণ না করা
ঋণদানের প্রেক্ষিতে ঋণদাতার উপকার গ্রহণ হয় তো চুক্তিতে কৃত শর্ত অনুসারে হবে অথবা শর্ত ছাড়া। যদি চুক্তিতে কৃত শর্তের ভিত্তিতে হয় তাহলে সবার মতে এই উপকার গ্রহণ হারাম। আলী রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “প্রতিটি এমন ঋণ যা উপকার বহন করে তা সুদ।” ফকীহদের সর্বসম্মত মতানুসারে ঋণ পরিশোধের সময় দাতাকে অতিরিক্ত প্রদানের শর্তারোপ মূল চুক্তিটিই বাতিল করে দেয়। তবে ঋণদাতা যদি ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে এমন কোনো সুবিধা ভোগ করে যা চুক্তিতে শর্ত করা হয়নি, তবে তা হানাফী, শাফেয়ী মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের সকল ফকীহর মতে বৈধ।
দ্বিতীয় শর্ত: অন্য চুক্তি যোগ না হওয়া
ইসতিদানা চুক্তি সহীহ হওয়ার জন্য শর্ত হলো, এই চুক্তির সাথে অন্য চুক্তি যুক্ত না হওয়া। অন্য চুক্তি মূল ইসতিদানা চুক্তিতে যোগ করা হোক অথবা অন্য চুক্তির বিষয়ে উভয়পক্ষ ইসতিদানা চুক্তির পর একমত হোক, বিধান অভিন্ন। যেমন কর্জগ্রহীতা তার বাড়ি কর্জদাতার কাছে ভাড়া দেবে, অথবা কর্জগ্রহীতা করযদাতার বাড়ি ভাড়া নেবে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণ ও বিক্রি একসাথে করতে নিষেধ করেছেন।
টিকাঃ
২৪. হারিছ ইবনু আবী উসামা তার মুসনাদ গ্রন্থে আলী রা.-এর সূত্রে উল্লেখ করেছেন।
২৫. ফাতহুল কাদীর, খ. ৪, পৃ. ৪৫২; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৪২
২৬. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩২১; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৪৭; আসহালুল মাদারিক, খ. ২, পৃ. ২১৮; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ২৯৫
২৭. জাবের বিন আবদুল্লাহ রা.-এর সূত্রে ইমাম মুসলিম হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।
২৮. হাদীসে যে শব্দ এসেছে তা বোঝায় এমন উট, যা সপ্তম বছরে পদার্পণ করেছে।
২৯. আবু রাফি রা.-এর সূত্রে ইমাম মুসলিম হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।
৩০. হাশিয়া আদ-দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২২৪; আসহালুল মাদারিক, খ. ২, পৃ. ৩১৮; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩২০; আল-মুহাল্লা, খ. ৮, পৃ. ৮৬; আল-আসার, মুহাম্মদ বিন হাসান, পৃ. ১৩২
৩১. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩২০
৩২. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩২০; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৪৭; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ৩৯