📄 দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া : হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা লাভ
সকল ফকীহ এ কথায় একমত, চুক্তিবদ্ধ নির্দিষ্ট বস্তু দ্বিতীয় পক্ষ কজা করার পর তা নিয়ন্ত্রণ করা এবং তাতে হস্তক্ষেপ করার পূর্ণ অধিকার লাভ করবে। কিন্তু কজা করার পূর্বেই তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে কি-না? তা নিয়ে তাদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে।
প্রথম মাসআলা : কেনা জিনিস কব্জা করার পূর্বেই বিক্রি করা :
কেনা জিনিস কব্জা করার পূর্বেই বিক্রি করার মাসআলায় ফকীহগণ মতপার্থক্য করে ছয়টি মত ব্যক্ত করেছেন :
১. কেনার পর কব্জা করার পূর্বে ক্রেতা তা বিক্রি করা জায়েয হবে না। এটি শাফেয়ী মাযহাবের অধিকাংশ ফকীহ, কতক হাম্বলী ফকীহ এবং ইমাম মুহাম্মদের মত।
২. হানাফী মাযহাবের মতে স্থাবর সম্পদ বা জমি কজা না করলেও বিক্রি করা জায়েয। তবে অস্থাবর সম্পদ কজা করা ছাড়া বিক্রি করা যাবে না।
৩. মালেকী মাযহাবের মতে খাদ্যদ্রব্য ব্যতীত অন্য যে কোনো বস্তু কজা করার পূর্বেই বিক্রি করা জায়েয।
দ্বিতীয় মাসআলা : কেনা ছাড়া অন্য কোনো পন্থায় মালিকানায় আসা পণ্য কজা করার আগে বিক্রি করা:
হানাফী ফকীহদের মতে, যে সকল বদল ও বিনিময় মানুষ মালিক হয় এমন চুক্তির মাধ্যমে যা কজা করার আগে সে বদল ধ্বংস হয়ে গেলে ভেঙ্গে যায়, সে সকল বদল কজা করার আগে বিক্রি করা জায়েয নয়। মালেকী ফকীহদের মতে, যদি সম্পদের মালিকানা অর্জিত হয় এমন চুক্তির মাধ্যমে যা বদল ও বিনিময়যুক্ত, তাতে যদি ধোঁকা ও প্রতারণার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সেখানে কজা করার আগে তা বেচা জায়েয হবে না।
তৃতীয় মাসআলা: কেনা পণ্যে কব্জা করার আগে বিক্রি বাদে অন্য হস্তক্ষেপ করা:
হানাফী ফকীহদের মতে, কব্জা করার আগেই পণ্যে ক্রেতার নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করা জায়েয। যেমন হিবা করা, সাদকা করা, ঋণ প্রদান করা ইত্যাদি। তবে ইজারা বা ভাড়া দেওয়া জায়েয হবে না। শাফেয়ী ফকীহদের মতে, কব্জা করার পূর্বে পণ্যে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ এবং কোনো ধরনের কাজ করা জায়েয নয়।
টিকাঃ
১৮৪. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৬৮; আল-মাজমুউ শারহুল মুহাযযাব, খ. ৯, পৃ. ২৬৪; তরহুত তাছরীব, খ. ৬, পৃ. ১১৪; ইহকামুল আহকাম, খ. ৪, পৃ. ৮০; মাআলিমুস সুনান, খ. ৩, পৃ. ১৩৫; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১১৩; বাদায়েউল ফাওয়ায়েদ, খ. ৩, পৃ. ২৫০; রদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ১৪৭; আতাসী প্রণীত শারহুল মাজাল্লা, খ. ২, পৃ. ১৭৩
১৮৫. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ১৮০; আদ-দুররুল মুখতার, খ. ৫, পৃ. ১৪৭
১৮৬. আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ১৫১; আল-বাজী প্রণীত আল-মুনতাকা, খ. ৪, পৃ. ২৭৯-২৮০ ও ২৮৩; কিফায়াতুত তালিব আর রাব্বানী, খ. ২, পৃ. ১১৮
১৮৭. হাশিয়া আদাভী, খ. ২, পৃ. ১১৮
১৮৮. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৯৭; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১০৭; আল-মুহাররার, খ. ১, পৃ. ৩২২
১৮৯. ইহকামুল আহকাম, খ. ৪, পৃ. ৮১; শারহু নবাভী আলা সহীহ মুসলিম, খ. ১০, পৃ. ১৭০; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১১৩
১৮০. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১১৩; তরহুত তাছরীব, খ. ৬, পৃ. ১১৪
১৯১. আল-বাজী প্রণীত আল-মুনতাকা, খ. ৪, পৃ. ২৮০; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১২১
১৯২. আল-মাজমুউ, খ. ৯, পৃ. ২৬৫; রওজাতুত তালিবীন, খ. ৩, পৃ. ৫০৮; তরহুত তাহরীব, খ. ৬, পৃ. ১১৬
১৯৩. শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৮৯; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১১৪; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৩৩
📄 তৃতীয় প্রতিক্রিয়া : বদল ও বিনিময় প্রদান আবশ্যক হওয়া
যাবতীয় লেনদেনে দুই বিনিময়ের একটি গ্রহণ করার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, তার বিপরীত বিনিময়টি প্রদান অত্যাবশ্যক হওয়া। যে প্রথম বিনিময়টা গ্রহণ করবে যথাসম্ভব শীঘ্র সে তার বিপরীতে বস্তুটি তাকে প্রদান করবে।
প্রথমত : ক্রয়বিক্রয়ে (فِي الْبَيع):
সকল ফকীহ একমত, বিক্রিচুক্তির উভয়পক্ষ যখন নিজ নিজ বদল ও বিনিময় গ্রহণ করবে, অপর পক্ষকে যথাশীঘ্র সম্ভব বদল ও বিনিময় প্রদান করবে, এক্ষেত্রে দেরি না করে তাড়াতাড়ি প্রদান করা ওয়াজিব। ব্যতিক্রম হচ্ছে সরফ বিক্রি এবং সুদী সামগ্রীর একটিকে অপরটির বিপরীতে বিক্রি করা। তাতে এক দিকের বিনিময় গ্রহণকারী তার পক্ষ থেকে বিনিময় দিতে দেরি করার অনুমতি ও সুযোগ নেই।
দ্বিতীয়ত: ইজারা ও ভাড়াতে:
যখন একপক্ষ ইজারার বস্তুটি কব্জা করবে, তার বিনিময় প্রদান করা তার দায়িত্বে আবশ্যক হয়ে যাবে। যদি না তারা উভয়পক্ষ একপক্ষের বদল প্রদানে বিলম্ব হওয়ায় সম্মত থাকে।
তৃতীয়ত: মহরের ক্ষেত্রে:
ফকীহবৃন্দ সকলে একমত, যদি স্বামী তার স্ত্রীকে মহরের শীঘ্রপ্রদেয় অংশ প্রদান করে, তাহলে তার স্ত্রীর কর্তব্য, মিলিত হওয়ার ও সহবাস করার প্রস্তাব রক্ষা করা। স্বামীকে মিলনের সুযোগ প্রদান তখন ওয়াজিব হয়ে যায়।
টিকাঃ
১৯৯. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৫, পৃ. ২১৫; রদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ২৫৮; আহকামুল কুরআন, খ. ১, পৃ. ৫৫৪; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৩, পৃ. ৩৭৯; আল-উম, খ. ৩, পৃ. ২৬; ফাতহুল আলী আল-মালিক, খ. ২, পৃ. ১১০; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২১৭; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৫১; মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ১, পৃ. ৩৮০
২০০. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ২০৪; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৪০৬
📄 দোনদারের হস্তক্ষেপ
নিজ দায়ে আবশ্যক দেনায় দেনাদারের হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র দুটি বিষয়ে সীমিত- হাওয়ালা ও সাফতাজা (হুন্ডি)।
প্রথম ক্ষেত্র: হাওয়ালা। দ্রষ্টব্য: حَوَالَةُ
দ্বিতীয় ক্ষেত্র: হুন্ডি। দ্রষ্টব্য: سَفْتَجَة
📄 মুদ্রার বিভিন্ন পরিবর্তনে ঋণের অবস্থা
ফকীহগণ মুদ্রায় পরিবর্তন হলে ঋণে থাকা মুদ্রার বিধান কী হবে তা বর্ণনা করেছেন। যদি দায়িত্বে আবশ্যক ঋণ হয় সত্তাগতভাবে মুদ্রা, (যেমন সোনা-রুপা) অথবা সৃষ্টিগত মুদ্রা না হলেও পারিভাষিকভাবে তা মুদ্রা হিসেবে সাব্যস্ত হয়, অর্থাৎ সোনা রুপা না হয়ে অন্য কিছুর মুদ্রা হলেও সেটার ব্যবহার সৃষ্টিগত মুদ্রার ন্যায় হয়। যেমন বর্তমান প্রচলিত বিভিন্ন পয়সা ও নোট। তাহলে পরিবর্তনকালে মুদ্রার বিধানে পার্থক্য হবে।
মুদ্রার পরিবর্তন, যদি ঋণ সৃষ্টিগত মুদ্রা হয়:
দায়ে সাব্যস্ত ঋণ যদি হয় সোনা বা রুপার তৈরি নির্ধারিত ছাঁচের নির্দিষ্ট মুদ্রা, এরপর পরিশোধের সময় তার মূল্য বেড়ে যায় বা কমে যায়, তাহলেও ঋণগ্রহীতার সে মুদ্রা ছাড়া অন্য কিছু পরিশোধ করা আবশ্যক নয়। মূল্যের এই পরিবর্তনের কোনো প্রভাব ঋণে পড়বে না।
এমনকি যদি এই মুদ্রার উৎপাদক সংস্থা এর মূল্য বৃদ্ধি বা হ্রাস করে, তবুও দেনাদারের জন্যে চুক্তিকৃত বস্তুর বাইরে অন্য কিছু দেওয়া আবশ্যক হবে না।
যদি এই পয়সা একেবারেই নাই হয়ে যায়, বাজারশূন্য হয় বা অনুপস্থিত হয়, দেনাদারের অঞ্চলে, সে ক্ষেত্রে এর বাজারমূল্য আবশ্যক হবে, নতুন ও বহুল প্রচলিত মুদ্রা দ্বারা। আর যদি লোকদের কাছে এ মুদ্রা কম পাওয়া যায় বা পাওয়া কষ্টকর হয়, তাহলে এ ছাড়া অন্য কিছু প্রদান আবশ্যক হবে না।
টিকাঃ
১৪৭. তাম্বীর রুকুদ, আলা মাসাইলিল উকূদ, ইবনে আবিদীন কৃত, খ. ২, পৃ. ১৪
১৪৮. মিনাহুল জালীল, উলাইশ কৃত, খ. ২, পৃ. ৫৩৪; ক্বাত'উল মুজাদালা ইনদা তাগয়ীরিল মুআমালা, সুয়ূতী কৃত, খ. ১, পৃ. ৯৭
১৪৯. তাম্বীহুর রুকুদ, খ. ২, পৃ. ৬৬
১৫০. হাশিয়াতুর রাহুনী, খ. ৫, পৃ. ১১৮; মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ৫৩৪; হাশিয়াতুল মাদানী, খ. ৫, পৃ. ১১৮
১৫১. আল-উম, খ. ৩, পৃ. ৩৩
১৫২. হাশিয়াতুর রাহুনী, খ. ২, পৃ. ১১৯
১৫৩. মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ৫৩৫
১৫৪. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ৩৯৭
১৫৫. তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২৫৫
১৫৬. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৩০১; আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৫৮; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২২৬; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৬৫; আল-মুবদি', খ. ৪, পৃ. ২০৭; আল মুহাররার, খ. ১, পৃ. ৩৩৫