📄 কজা যথাযথ হওয়ার শর্তাবলি
কজা যথাযথ ও শরীয়তসম্মত হওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত রয়েছে। প্রথম শর্তটি: কজাকারী কজা করার উপযুক্ত হওয়া।
সকল ফকীহ এ কথায় একমত, কব্জা যথাযথ হওয়ার জন্যে শর্ত হচ্ছে, তা কজা করার উপযুক্ত ব্যক্তির হাতে সংঘটিত হতে হবে। তবে কাকে উপযুক্ত বিবেচনা করা হবে, তা নিয়ে ফকীহদের মতপার্থক্যে তিনটি বক্তব্য উঠে এসেছে:
এক. শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহদের মত হচ্ছে, কজা করবে এমন লোক যার যে কোনো চুক্তি করার যোগ্যতা রয়েছে। তারা একথা বলে বুঝিয়েছেন প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি, যার কোনো কাজে শরীয়তের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়নি।
দুই. হানাফী মাযহাবের ফকীহদের এ সম্পর্কে বক্তব্য হচ্ছে, কজা করার জন্যে মৌখিক লেনদেন ও চুক্তি করতে সক্ষমতা থাকাই যথেষ্ট। পূর্ণ উপযুক্ততা আবশ্যক নয়। তাই কব্জাকারী স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া কব্জা সঠিক হওয়ার জন্যে শর্ত ও আবশ্যক হবে। তাই উন্মাদ যেমন কব্জা করলে তা যথার্থ হবে না, যে ছোট শিশু এখনও কিছু বুঝে না তার কজা করাও হবে তেমনই অযথার্থ। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার বিষয়টিতে যা লক্ষণীয় তা হচ্ছে, কোনো কোনো লেনদেনে তা শর্ত হলেও কোনো কোনোটিতে তা শর্ত নয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক হলেও যে ভালো-মন্দ, লাভ-ক্ষতি বুঝতে পারে তার লেনদেন গ্রহণযোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে তা তিন প্রকার:
প্রথম প্রকার: কিছু কাজ রয়েছে যেগুলো শুধুই লাভজনক। যেমন শিশুকে কিছু হেবা ও উপহার দেওয়া হলো, কেউ তাকে কিছু দান করল, তাকে কিছু দেওয়ার ওসিয়ত করল। এ ধরনের কাজে গ্রহীতা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া জরুরি নয়। কেবল লেনদেনটি বুঝতে সক্ষম এমন বয়সী হলেই তার কব্জা করা ইসতিহসান বা সূক্ষ্ম যুক্তির আলোকে সঠিক ও যথাযথ হবে।
দ্বিতীয় প্রকার: কিছু কাজ রয়েছে যেগুলো কব্জাকারীর জন্যে শুধুই ক্ষতিকর। যেমন তার পক্ষ থেকে দান করা, কারো জানের বা মালের জিম্মাদারি নেওয়া। এ সকল ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়সী হলেই কেবল তার এ ধরনের চুক্তিতে সম্মতি জ্ঞাপনের বৈধতা রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক না হয়ে এ ধরনের চুক্তিতে সম্মতি জানালে তা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।
তৃতীয় প্রকার: এমন কাজ যা লাভ বয়ে আনতে পারে, ক্ষতির কারণও হতে পারে। যেমন কোনো কিছু কেনা বা বেচা, ভাড়া দেওয়া বা নেওয়া, বিয়ে করা ইত্যাদি। এ ধরনের কাজ অপ্রাপ্তবয়স্ক কেউ করলে তা তার অভিভাবকের অনুমতি-নির্ভর হবে। যদি সে অনুমতি ও অনুমোদন করে তবে তা বাস্তবায়িত ও কার্যকর হবে; অনুমতি না দিলে বাতিল হয়ে যাবে।
তিন. মালেকী মাযহাবের ফকীহগণ এ সম্পর্কে বলেন, কজা যথার্থ হওয়ার জন্যে লেনদেন করতে সক্ষমতা বা তা বুঝতে পারা কোনো শর্ত নয়। বরং মানবীয় গুণাবলি থাকাই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে। তাই ছোট শিশু বা যার লেনদেনে বারণ রয়েছে তার কব্জা করাও যথাযথ হবে এবং তা পূর্ণ কজা বলে গণ্য হবে।
দ্বিতীয় শর্ত: কজা হতে হবে এমন লোকের পক্ষ হতে যার কর্তৃত্ব করার যোগ্যতা রয়েছে
কজা দু ধরনের: এক. মূল ব্যক্তি হিসেবে কজা করা এবং দুই. কারো পক্ষ থেকে কজা করা। মূল ব্যক্তি যখন কজা করে, ফকীহদের সকলে এ কথায় একমত সে নিজেই নিজের জন্যে কজা করে। তাই কজা করার যোগ্যতা রয়েছে এমন যে কেউ এ কজা করার অধিকারী হতে পারে। যখন অপরের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসাবে কজা করে তার এ অধিকার ও যোগ্যতা অর্জিত হয় দুভাবে: এক. মূল ব্যক্তি তাকে এ ক্ষমতা প্রদান করে এবং দুই. শরীয়তের পক্ষ থেকে এ অধিকার প্রদত্ত হয়।
প্রথম অবস্থা: মূল ব্যক্তি বা মালিকের পক্ষ থেকে কব্জা করার অধিকার প্রদান সকল ফকীহ এ কথায় একমত, মালিকের পক্ষ থেকে কাউকে প্রতিনিধি নির্ধারণ করলে তার কজা করার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। কেননা, মালিক হিসাবে কোনো কিছুতে যে ব্যক্তি যে কোনো কর্তৃত্ব প্রকাশ করতে পারে, সে তাতে কাউকে প্রতিনিধিও নির্ধারণ করতে পারে। কব্জা করা এমন কাজ যা প্রতিনিধি দ্বারাও বাস্তবায়িত হতে পারে। তাই প্রতিনিধির কব্জা করা এবং মূল ব্যক্তির কজা করার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই, উভয়টি একই পর্যায়ের। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় মূল ব্যক্তি এবং তার প্রতিনিধি উভয়ে কজা করার উপযুক্ত হতে হবে।
হানাফী আলেমগণ বলেন, কব্জা করার জন্যে যাকে প্রতিনিধি নির্ধারণ করা হয়েছে সে আবার অন্য কাউকে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে, যদি মূল ব্যক্তির প্রতিনিধি নির্ধারণটি হয় ব্যাপকতার ভিত্তিতে। মূল ব্যক্তি তাকে প্রতিনিধি নিয়োগের সময় বলে, যা ইচ্ছা করো বা তুমি আমার পক্ষ থেকে যা-ই করতে চাও করতে পার ইত্যাদি। কিন্তু প্রতিনিধি নির্ধারণটি যদি হয় সীমিত আকারে, তাই উকিল নির্ধারণকালে উপরিউক্ত ধরনের কোনো কথা না বলা হয়, তাহলে এ প্রতিনিধি অপর কাউকে কব্জা করার প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবে না। যদি এ অবস্থায় সে তা করে, কাউকে প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব দেয়, তবে ঐ তৃতীয় লোকটির কজা করার অধিকার অর্জিত হবে না। যেহেতু কাউকে যখন প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়, তাকে যে ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রদান করা হয় সে ক্ষেত্রেই শুধু সে কাজ করতে পারে; তার অধিক ক্ষমতা সে প্রয়োগ করতে পারে না।
শাফেয়ী ফকীহগণ বলেন, মূল ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোনো পণ্য কেনা এবং তা কজা করা যথাযথ, কিন্তু নিজের পক্ষ থেকে তা কজা করা যথার্থ নয়। যেহেতু নিজের প্রাপ্য কজা করার ক্ষেত্রে তার অন্য কারো পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হওয়া যথাযথ নয়।
উপরিউক্ত বক্তব্য হাম্বলী ফকীহগণ আরো স্পষ্ট করে বলেছেন। তারা বলেন, কোনো লোক কারোর কাছ থেকে খাদ্যদ্রব্য ঋণ করার পর সে ঋণদাতাকে কিছু টাকা দিয়ে বলল, এই টাকায় তুমি আমার জন্যে সে পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য কিনো যে পরিমাণ তুমি আমার কাছে পাও, তা আমার পক্ষ থেকে তুমি কব্জা করো, এরপর তোমার সম্পদ হিসাবে তা কব্জা করো। যদি সে তার কথা অনুযায়ী কাজ করে তবে উভয়ের পক্ষ থেকে এ কব্জা করা সহীহ ও সঠিক হবে। কেননা ঋণগ্রহীতা তাকে তার পক্ষ থেকে কেনার এবং তা কব্জা করার প্রতিনিধি নিয়োগ করেছে। এরপর তার নিকট থেকে তা পুরোপুরি বুঝে নিতে বলেছে। ফলে বিষয়টি হয়েছে এমন, ঋণদাতার নিকট ঋণীব্যক্তির কিছু সম্পদ আমানত হিসাবে গচ্ছিত রয়েছে-যা ঋণ হিসাবে প্রদত্ত বস্তুর সমগোত্রীয়;-এ অবস্থায় ঋণীব্যক্তি ঋণদাতাকে সে গচ্ছিত সম্পদটি ঋণের বিনিময় হিসাবে নিয়ে নেওয়ার অনুমতি প্রদান করলে তা ঋণদাতার নিয়ে নেওয়া জায়েয হবে।
আলোচনার এ পর্যায়ে ফকীহগণ তিনটি মাসআলার বিধান পর্যালোচনা করেছেন:
প্রথম মাসআলা: যাকে পণ্য বিক্রিতে প্রতিনিধি নির্ধারণ করা হবে সে মূল্য কজা করার এবং পণ্য কব্জা করানোর অধিকার লাভ করবে:
যাকে পণ্য বিক্রিতে প্রতিনিধি নির্ধারণ করা হবে সে ক্রেতার নিকট থেকে মূল্য কজা করা এবং ক্রেতাকে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার অধিকার লাভ করার বিষয়টিতে ফকীহগণ চারটি মত বর্ণনা করেছেন। সেগুলো হচ্ছে:
এক. হানাফী ফকীহদের মত যাকে বিক্রির জন্যে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে তার ক্রেতার নিকট থেকে মূল্য বুঝে নেওয়া এবং ক্রেতাকে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার অধিকার থাকবে। এর কারণ, তাকে প্রতিনিধি নিয়োগ করাই তাকে প্রকারান্তরে এ সকল দায়িত্ব প্রদান করা বোঝায়।
দুই. মালেকী ফকীহদের মত: যাকে বিক্রির দায়িত্ব দিয়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে সে ক্রেতার নিকট থেকে মূল্য বুঝে নেওয়া এবং ক্রেতাকে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার অধিকার লাভ করবে, যদি বিক্রয়-প্রতিনিধি এ কাজগুলো না করার প্রচলন কোথাও না থেকে থাকে।
তিন. শাফেয়ী ফকীহদের মত তাদের নিকট সর্বাধিক সঠিক মতটি হচ্ছে, যদি পণ্য কব্জা করা লেনদেন সঠিক হওয়ার জন্যে শর্ত হয়, যেমন সালাম বা সরফ বিক্রি, তাহলে বিক্রয় প্রতিনিধি মূল্য কব্জা করা এবং পণ্য কজা করানো উভয়টির অধিকার পাবে। কিন্তু যদি পণ্য কব্জা করা বিক্রি সহীহ হওয়ার জন্যে শর্ত না হয়, যেমন সাধারণ বিক্রি, তাহলে সেখানে ক্রেতা নগদমূল্য প্রদান করলে বিক্রয় প্রতিনিধি তা কব্জা করবে এবং তারপর পণ্য বুঝিয়ে দিবে, যদি মূল ব্যক্তি তাতে আপত্তি না করে। প্রতিনিধি এ সব করতে পারবে, যেহেতু এগুলো হচ্ছে বেচাকেনার চাহিদা ও দাবি। তাই মূল ব্যক্তি বিক্রির অনুমতি দেওয়াতেই প্রকারান্তরে এ সব কিছুরই অনুমতি দেওয়া সাব্যস্ত হবে। যদি মূল ব্যক্তি প্রতিনিধিকে নগদ মূল্য গ্রহণে বা ক্রেতাকে পণ্য বুঝিয়ে দিতে নিষেধ করে অথবা মূল্য পরে প্রদানের কথা হয়, তাহলে প্রতিনিধি এসব কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকবে।
চার, হাম্বলী ফকীহদের মত বিক্রয় প্রতিনিধি ক্রেতাকে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার অধিকার লাভ করবে, যেহেতু বিক্রয়ের জন্যে প্রতিনিধি নির্ধারিত হলে তার চাহিদাই হচ্ছে ক্রেতাকে সে পণ্য বুঝিয়ে দিবে, তাহলেই তার দ্বারা বিক্রয় পূর্ণ হবে। কিন্তু প্রতিনিধি মূল্য কজা করার অধিকারী হবে না। যেহেতু কখনো এমন লোককে বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয় আর্থিক লেনদেনে যে বিশ্বস্ত নয়।
ইবনুল কাইয়িম এ বিধানের ব্যতিক্রম-রূপ আলোচনা করেছেন। তা হলো, বিক্রয়-প্রতিনিধি পণ্যের মূল্য কব্জা করতে পারবে যখন কোথাও বিক্রয়-প্রতিনিধির মূল্যগ্রহণের নিয়ম প্রচলিত থাকে। তিনি তার গ্রন্থে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে বলেছেন, যদি কেউ কোনো অনুপস্থিত বা উপস্থিত ব্যক্তিকে কোনো পণ্য বিক্রি করার দায়িত্ব প্রদান করে এবং সেখানে প্রতিনিধিরই মূল্য হাতে নেওয়ার নিয়ম প্রচলিত থাকে তাহলে সে এ অধিকার লাভ করবে।
দ্বিতীয় মাসআলা: কারো পক্ষ থেকে বিতর্কের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রাপ্য কব্জা করার অধিকার লাভ করে:
ফকীহগণ এ মাসআলায় মতপার্থক্য করেছেন, বিতর্কের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রাপ্য বস্তু কব্জা করার অধিকার লাভ করবে কি-না, তাতে তারা পরস্পর বিপরীত দুটি মত ব্যক্ত করেছেন।
এক. শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহবৃন্দ, হানাফী মাযহাবের ফকীহ যুফার-এর এটি মত, যা হানাফী মাযহাবে ফতোয়া হিসাবে গৃহীত হয়েছে এবং মাজাল্লা আল-আহকামুল আদলিয়্যাতেও তা উদ্ধৃত হয়েছে: বিতর্কের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রাপ্য বস্তু কব্জা করার প্রতিনিধি হবে না। তার এই অধিকারই প্রতিষ্ঠিত হবে না। যেহেতু তাকে বিতর্কের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে কেবল প্রাপ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্যে, তার নিকট এটুকুই কাম্য। প্রাপ্য অধিকার আদায় করে দেওয়ার জন্যে যাকে পছন্দ করা হয়, হতে পারে কব্জা করার জন্যে সে ততটা বিশ্বাসভাজন নাও হতে পারে। তাই বিতর্কের জন্যে তার প্রতি নির্ভরতা থাকলেও সম্পদের ক্ষেত্রে তার প্রতি নির্ভরতা থাকবে না।
তা ছাড়া প্রাপ্য প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রয়োজনীয় বিতর্কের অনুমতি প্রদান তা কজা করার অনুমতি বোঝায় না, না ভাষা ও বক্তব্যে তার অনুমতি বোঝায়, না সামাজিক প্রচলনে। যেহেতু অধিকার প্রতিষ্ঠা তা কজা করাকে অন্তর্ভুক্ত করে না। কব্জা করা এ বিতর্কের আনুষঙ্গিক বিষয়ও নয়, বিতর্কের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়ও নয়। কিন্তু বিক্রির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিষয়টি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা পণ্য ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়া এবং ক্রেতার নিকট থেকে মূল্য বুঝে নেওয়া প্রতিনিধিত্বের দাবি ও চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে মূল ব্যক্তি প্রতিনিধিকে তার যাবতীয় ক্রিয়া ও কর্মেরই প্রতিনিধিত্ব প্রদান করে।
দুই. আবু হানিফা এবং তাঁর দুই অনুসারী আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ-এর মত। বিতর্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বিতর্কের মাধ্যমে অধিকার ও প্রাপ্য প্রতিষ্ঠা করার পর তা কজা করে বুঝে নেওয়ার অধিকার লাভ করবে। যেহেতু তাকে সম্পদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিতর্কের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তাকে তাই কজা করার ক্ষেত্রে বিশ্বাসও করা হয়েছে। যেহেতু কজা করা ব্যতীত সম্পদে অধিকার নিয়ে বিতর্ক শেষ হয় না। তাই এক্ষেত্রে তাকে বিতর্কের অনুমতি প্রকারান্তরে তা কজা করারই অনুমতি বোঝায়।
তৃতীয় মাসআলা: ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি বন্ধক রাখা বস্তু কব্জা করতে পারবে:
যখন বন্ধকদাতা ও বন্ধকগ্রহীতা একমত হবে, বন্ধক রাখা বস্তুটি কোনো ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তির হাতে থাকবে, তখন সে ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তিটি তা কব্জা করতে পারবে কি-না, এ কথায় ফকীহদের বিপরীত দুটো মত রয়েছে:
এক. হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহদের এক বিশাল দলের অভিমত হচ্ছে, ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি সে বস্তুটি কব্জা করতে পারবে। তার কজা করা বন্ধকগ্রহীতার কজা-তুল্য বিবেচিত হবে। তাতে কোনোই পার্থক্য করা হবে না। এর কারণ, বন্ধকদাতা ও বন্ধকগ্রহীতার কারো প্রতি কারো আস্থা না থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তির প্রয়োজন দেখা দিবে। ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি তা কব্জা করার অধিকারী হবে বলেই সে তা সংরক্ষণেরও দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে। হাসান বসরী, শা'বী, আমর ইবনে দিনার, সুফিয়ান ছাওরী, ইসহাক, আবু ছাওর ও আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক এ কথাই বলেছেন। তা ছাড়া ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি মূল প্রাপ্যের অধিকারী ব্যক্তির প্রতিনিধি ও স্থলবর্তী, তাই তার কব্জা করা সকল লেনদেনে প্রতিনিধির কজা করার তুল্য; তাই তা যথাযথ ও সঠিক হবে।
ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তির কব্জা করা যে মূল ব্যক্তির কজা তুল্য, এবং সে-ই কব্জা করার দায়িত্বপ্রাপ্ত তা নিচের এ আলোচনায় আরো সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠে। তা হলো, বন্ধকগ্রহীতার অধিকার রয়েছে সে যখনই ইচ্ছা করবে বন্ধকের চুক্তি ভেঙ্গে ফেলতে পারবে। ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তির হাত থেকে তা বন্ধকদাতার হাতে ফিরিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু বন্ধকদাতা ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তির অধিকার বাতিল করতে পারবে না। এভাবে একথাই সাব্যস্ত হয়, ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি বন্ধকদাতার নয়, বন্ধকগ্রহীতার প্রতিনিধি ও স্থলবর্তী।
দুই. ইবনে শুবরুমা, আওযায়ী, ইবনে আবী লায়লা, কাতাদা, হাকাম ও হারেছ উকালী বলেন, ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি বন্ধকের বস্তুটি কজা করতে পারবে না। যদি কব্জা করেও তবু তা গৃহীত হবে না। কুরতুবী বলেন, তথাপি তারা তা নিছক আল্লাহর বিধান হিসাবে পালনীয় বলে গণ্য করেন।
দ্বিতীয় অবস্থা: শরীয়তপ্রবর্তকের পক্ষ থেকে স্থলবর্তীকে কব্জা করার ক্ষমতা প্রদান:
শরীয়তপ্রবর্তকের পক্ষ থেকে একের স্থলবর্তী হিসাবে অপরকে কব্জা করার অধিকার প্রদান করার ক্ষেত্র নিম্নরূপ: শরীয়তের পক্ষ থেকে যাদের কোনো লেনদেন করার অধিকার নেই, তারা বারণকৃত অবস্থায় রয়েছে, তারা যদি কোনো কিছুর অধিকারী ও উপযুক্ত হয়, তারা যেহেতু লেনদেন করতে পারে না, তাই কোনো বস্তু কজা করতেও পারে না। এমন পরিস্থিতিতে শরীয়তপ্রবর্তকই তার প্রাপ্য কজা করার জন্যে বিকল্প ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, অন্যকে তার পক্ষ থেকে কজা করার অধিকার প্রদান করেছেন। এ সময় একের পক্ষ থেকে অন্যের কব্জা করা আল্লাহরই পক্ষ থেকে ক্ষমতা প্রদান, এ কথায় সকল ফকীহ একমত।
ইমাম শাফেয়ী ও বায়হাকী উসমান রা.-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, উসমান রা.-এর মত ছিল, যদি শিশু নাবালেগ হয়, তবে তার পক্ষ থেকে শিশুর পিতা লেনদেন ও কজা করতে পারবে।
হানাফী ফিকহের আলেমগণ বলেন, এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত সে ব্যক্তির অধিকার যে নাবালেগ শিশুর অভিভাবক, যে তার লালনপালন করে। শিশুকে কোনো কিছু দান বা উপহার দেওয়া হলে তার পক্ষ থেকে সে তা কজা করতে পারবে, দাতা সে নিজে হোক বা অপর কেউ। উপহারদাতা নিকটাত্মীয় হোক বা না হোক।
ইবনে জুযাই বলেন, শরীয়তের পক্ষ থেকে যার লেনদেন করার অনুমতি নেই তার পক্ষ থেকে অসী তার প্রাপ্য বস্তু কব্জা করতে পারবে। ছেলে স্বাধীন হলেও সে যদি ছোট ও অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়, তাহলে তাকে পিতা ব্যতীত অন্য কেউ দিরহাম দীনার দিলে তা ছেলের পক্ষ থেকে পিতা কব্জা করবে। মূলত অন্য যে কেউ যা-ই দিক তা পিতা অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ করতে পারবে।
উপরিউক্ত অবস্থায় সাথে যুক্ত হবে আরো যে সকল মাসআলা সেগুলো হচ্ছে: যে কেউ কুড়ানো সম্পদ কব্জা করতে পারে। কুড়িয়ে কোনো শিশু পেলে, তার জন্যে কেউ কিছু প্রদান করলে শিশুটিকে যে দেখাশোনা করছে সে তা কজা করবে। ঝড়ো বাতাস কারো কোনো কাপড় উড়িয়ে কারো বাড়িতে ফেললে সে বাড়ির লোক তা হাতে তুলে নিতে পারবে। যেসব অপরাধী অনুপস্থিত বা বন্দি হয়ে আছে, তাদের পক্ষ থেকে বিচারক তাদের প্রাপ্যবস্তু কজা করতে পারবে। যেহেতু অপরাধী বা বন্দি তার সম্পদ সংরক্ষণে সক্ষম নয়, এর বিপরীতে তাদের সম্পদ বিচারকের সংরক্ষণ করা সম্ভব।
যদি কেউ কারো কাছে কোনো বস্তু আমানত রাখার পর, যার কাছে আমানত রেখেছে সে মারা যায়, যে আমানত রেখেছিল সেও মারা যায়, তার উত্তরাধিকারীরা কেউ এখানে উপস্থিত না থাকে, তাহলে বিচারক তাদের পক্ষ থেকে গচ্ছিত সে বস্তুটি বুঝে নেবে, তার এই অধিকার রয়েছে। জনকল্যাণ খাতের সমুদয় অর্থ এবং যাকাত; কুরবানী ইত্যাদির অধিকারী গরীব দুস্থ জনগণের পক্ষ থেকে প্রশাসক সে সব কব্জা করার অধিকার রাখে। কেউ পথ চলতে খাদ্যের অভাবে মরণদশার উপক্রম হলে, পথপার্শ্বে থাকা গাছপালা ইত্যাদি থেকে চাহিদা পরিমাণ খাদ্য সংগ্রহ করার অধিকার রাখে, যদিও এর মালিক কে, তা তার জানা না থাকে, আর তাই তার মালিকের নিকট অনুমতি চাওয়া ও পাওয়ার কোনো সুযোগ না থাকে।
অপরের পক্ষ থেকে কজা করার অধিকার প্রদত্ত হওয়ার বিভিন্ন রূপ আলোচনা করা হচ্ছে:
মহর কব্জা করার অধিকার:
চার মাযহাবের ফকীহগণ এ কথায় একমত, কনে যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়, তাহলে তার পক্ষ থেকে মহর কব্জা করার অধিকার লাভ করবে সে যে তার সম্পদে হিতাকাঙ্ক্ষী। এক্ষেত্রে কনের ইতোপূর্বে বিবাহ হোক বা এটি তার প্রথম বিয়ে হোক, বিধানে কোনো তারতম্য হবে না। যখনই কনের অভিভাবক সে মহর কজা করবে তা থেকে বর দায়মুক্ত হয়ে যাবে। কনে তার স্বামীর কাছে দ্বিতীয় বার আর মহর দাবি করতে পারবে না, বালেগ হওয়ার পরও। বরং তখন সে তার পক্ষ থেকে যে মহর কব্জা করেছিল, তার নিকট থেকে সে মহর হস্তগত করবে। যেহেতু শরীয়ত যাকে মহর কব্জা করার অধিকার দিয়েছে স্বামী তার হাতেই মহরের পূর্ণ অর্থ সমর্পণ করেছে। অতএব, তার মহর প্রদান যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তার দ্বারা সে দায়মুক্ত হয়েছে। যখনই কোনো লোক তার দায় থেকে মুক্ত হয়, তাকে আবার সে দায়ে আবদ্ধ হতে হয় না, যেহেতু যা দায় থেকে চলে যায় তা আবার ঘুরে আসে না।
যদি বর বিবাহকালে কনে হয় পূর্ণবয়সী, তাহলে হয়তো এটিই তার প্রথম বিবাহ, সে ছিল এর পূর্বে কুমারী, অথবা এটি তার প্রথম বিবাহ নয়, বরং পূর্বে তার বিবাহ হয়েছিল। যদি প্রাপ্তবয়স্ক কনের এটি প্রথম বিবাহ না হয়ে থাকে, তাহলে সকল ফকীহ একমত, কনে নিজেই মহর হস্তগত করতে পারবে, সে দায়িত্ব তাকে অন্যের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে না। এর কারণ, এ অবস্থায় শরীয়ত কনেকেই তার সম্পদ হস্তগত করার অধিকার প্রদান করেছে। তাই সে ইচ্ছা করলে নিজেই সে অধিকার বাস্তবায়ন করতে পারে, ইচ্ছা করলে যাকে খুশি মহর হস্তগত করার দায়িত্বও সে প্রদান করতে পারে। তবে তার পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দায়িত্ব প্রদান ব্যতীত কেউ মহর কজা করতে পারবে না।
কনে বিবাহকালে প্রাপ্তবয়স্কা হলেও ইতোপূর্বে যদি তার আর বিয়ে না হয়ে থাকে, সে এ যাবৎ থাকে কুমারী, তবে তার বৈবাহিক জীবনের অভিজ্ঞতা না থাকায় তার বিধান নিয়ে ফকীহগণ মতপার্থক্য করেছেন। তারা এক্ষেত্রে দুটো মত বর্ণনা করেছেন :
এক. শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী ফকীহদের মত: কনের পক্ষ থেকে অন্য কেউ মহর কব্জা করবে না, বরং সে নিজেই তা কজা করবে। অথবা সে যাকে দায়িত্ব দিবে সে-ই কেবল তা কজা করতে পারবে। এর কারণ, সে এখন বয়সী হওয়ায় স্বাভাবিক পরিপূর্ণ জ্ঞানবুদ্ধির অধিকারিণী। তাই তার সম্পদে সে-ই কর্তৃত্বের অধিকারিণী হবে। আর তাই সে ছাড়া অন্য কারো হস্তগত করার অধিকার নেই, না তার মহর, না অন্য কিছু। যেমন- তার কোনো পণ্য বিক্রির মূল্য বা বাড়ি ভাড়ার অর্থ, সে নিজেই হস্তগত করবে বা সে কাউকে অনুমতি দিলে সে হস্তগত করতে পারবে।
দুই. হানাফী ফকীহদের মত: কনের পক্ষ থেকে তার অভিভাবক মহর কব্জা করতে পারবে, যদি কনের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নিষেধ বা আপত্তি প্রকাশিত না হয়। কনে সুস্পষ্ট নিষেধ করলে অভিভাবকের কব্জা করার অধিকার থাকবে না। এ অবস্থায় বর অভিভাবকের হাতে মহর প্রদান করলে সে দায়মুক্ত হবে না। পূর্বে কুমারী থাকার ও না থাকার প্রেক্ষিতে মহর কব্জা করার বিধানে এই পার্থক্যের কারণ হচ্ছে, পূর্বে অবিবাহিত কনে মহর কব্জা করার ক্ষেত্রে লজ্জাবোধ করতে পারে, তাই এক্ষেত্রে অভিভাবক তার স্থলবর্তী হবে। কিন্তু পূর্বে বিবাহিতা নারী এর ব্যতিক্রম। সে মহর হস্তগত করতে কোনো সংকোচ বোধ করবে না। তা ছাড়া, সামাজিক প্রচলন অভিভাবককে বিবাহের মহর গ্রহণের অনুমতি প্রদান করেছে। পূর্বে বিবাহিতা নারী তার ব্যতিক্রম, তার ক্ষেত্রে অভিভাবক মহর হস্তগত করার প্রচলন নেই। সামাজিক প্রচলনে অনুমতি মৌখিক অনুমতির তুল্য কার্যকর হয়।
ধারের বস্তু ফিরিয়ে দেওয়ার সময় যে ধার দিয়েছে তার পরিবারের লোকদের কব্জা করার অধিকার:
এ কথায় ফকীহদের মাঝে কোনো বিরোধ নেই, যে লোক ধার নেবে সে যা ধার নিয়েছে তা ফেরত দেওয়ার মাধ্যমে তার দায়িত্ব শেষ হবে। সে তা মালিককে বা তার প্রতিনিধিকে বুঝিয়ে দেয় এবং সে তা কব্জা করে তাহলে তার সমতুল্য বস্তু ক্ষতিপূরণ হিসাবে ফেরত দেওয়া থেকে সে দায়মুক্ত হবে। যে ধার নিয়েছে সে যদি যে ধার দিয়েছে তার হাতে জিনিসটি না দিয়ে তার পরিবারের কারো কাছে তা ফেরত দেয়; যেমন স্ত্রী বা সন্তান, তাহলে যে ধার নিয়েছে সে দায়মুক্ত হবে কি-না, তা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এক্ষেত্রে ফকীহদের দুটো মত হয়েছে:
এক. শাফেয়ী ফকীহদের মত: যে ধার দিয়েছে তার স্ত্রী বা সন্তানের কাছে ধার নেওয়া বস্তু ফেরত দিলে যে ধার নিয়েছিল সে দায়মুক্ত হবে না। তাই স্ত্রী বা সন্তানের কাছে বস্তুটি ধ্বংস হয়ে গেলে তারা তা কজা করার পর, যে ধার দিয়েছে তার এখতিয়ার: হয়তো যে ধার নিয়েছে তার কাছ থেকে সে বদলা ও ক্ষতিপূরণ নিবে অথবা স্ত্রী-সন্তানের নিকট থেকে জরিমানা আদায় করবে। যদি যে ধার নিয়েছে তার কাছ থেকে সে ক্ষতিপূরণ নেয় তবে ক্ষতিপূরণদাতা স্ত্রী-সন্তানের নিকট তা ফেরত দাবি করবে। কিন্তু যদি যে ধার দিয়েছে সে তার স্ত্রী-সন্তানের নিকট থেকে ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করে, তবে যে ধার নিয়েছিল তার নিকট তারা এ ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে না।
দুই. হাম্বলী ফকীহদের মত: যে ধার নিয়েছে সে যদি যে ধার দিয়েছে তার পরিবারের এমন কোনো সদস্যের কাছে ধারের বস্তুটি ফেরত দেয় যার কব্জা করা সে এলাকায় মূল ব্যক্তির কজা বলে গণ্য হয় না, তাহলে যে ধার নিয়েছিল সে দায়িত্ব থেকে মুক্ত হবে না। এর কারণ সে তা মূল মালিকের নিকট ফেরত দেয়নি বা যার কজা মূল মালিকের কজা বলে গণ্য এমন কোনো স্থলবর্তী ব্যক্তির কাছেও সে তা ফেরত দেয়নি। তাই তার এ ফেরত দেওয়াটা হবে কোনো তৃতীয় ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার তুল্য। তাই সে এ দায় থেকে মুক্ত হবে না। কিন্তু যদি যে ধার দিয়েছে তার পরিবারের এমন সদস্যের হাতে সে তা তুলে দেয় যার কজা সামাজিক প্রচলনে মূল ব্যক্তির কজা বলে গণ্য হয়, তাহলে তার হাতে ধারের বস্তু তুলে দেওয়া তার ফেরত দেওয়া বলে গণ্য হবে। যেমন যে ধার দিয়েছে তার স্ত্রী, যে স্বামীর সম্পদে কর্তৃত্ব প্রদর্শনের ক্ষমতা রাখে, এমনিভাবে ম্যানেজার বা মূল কর্মচারী, তাদের হাতে দিলে তা মূল ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দেওয়া বলেই গণ্য হবে। ফলে যে ধার নিয়েছিল তার দায়মুক্তি ঘটবে এবং ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন উঠবে না। এর কারণ সামাজিকভাবে যা প্রচলিত তাতে অনুমতি মৌখিক অনুমতি তুল্য, যেন স্ত্রী ও ম্যানেজারকে মৌখিক অনুমতি দেওয়া হয়েছে ধার নেওয়া জিনিস ফেরত নেওয়ার, তাই তারা ফেরত নিয়েছে।
তৃতীয় শর্ত: অনুমতি প্রদান
কজা যথার্থ ও সঠিক হওয়ার জন্যে অনুমতি থাকা শর্ত, এক্ষেত্রে ফকীহদের তিনটি মত হয়েছে:
প্রথম মত: হানাফী ও শাফেয়ী ফকীহদের মত: হানাফী ও শাফেয়ী ফকীহগণ কজা করার ক্ষেত্রটিতে দুটো ভাগ প্রত্যক্ষ করেন। ফলে দুভাগের বিধান দুধরনের হওয়ার বিবেচনা করেন।
এক. যার পণ্য কব্জা করা হবে তার সে পণ্য আটকে রাখার অধিকার রয়েছে। যেমন বন্ধক রাখা বস্তু এখনও বন্ধকদাতার হাতে রয়েছে, হেবা বা অনুদানের বস্তু এখনও অনুদানদাতার হাতে রয়েছে। বিক্রীত পণ্য নগদমূল্যে বিক্রি করার পর এখনও মূল্য পরিশোধ করা হয়নি, তাই পণ্যটি এখনও বিক্রেতার হাতেই রয়েছে।
দুই. যার পণ্য তার আটকে রাখার অধিকার নেই। যেমন, ক্রেতা নগদ মূল্য পরিশোধ করার পর এখনও পণ্য বিক্রেতার হাতে রয়েছে অথবা ক্রেতা এখনও মূল্য পরিশোধ করে নাই, তবে বিক্রি সম্পন্ন হয়েছে বাকি মূল্যে।
ফকীহগণ বলেন, প্রথম অবস্থায় যেখানে একজন কজা করাতে অপরজন বাধা দিতে পারে, সেখানে যার আটকে রাখার অধিকার রয়েছে তার অনুমতি পাওয়া গেলে কব্জা করা যথার্থ হবে। তাই এক্ষেত্রে অনুমতি শর্ত বলে বিবেচিত হবে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে শর্ত বলে গণ্য হবে না। তাই ফকীহগণ অপরপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কব্জা করা যথাযথ ও সঠিক হওয়ার মত ব্যক্ত করেছেন।
দ্বিতীয় মত: মালেকী ফকীহদের মত: তারা বলেন, বন্ধক রাখা বস্তু বন্ধকগ্রহীতা কজা করার জন্যে অনুমতি শর্ত, অন্য সকল উপহার অনুদানে তা শর্ত নয়। যেমন, উপহার, দান, ওয়াক্ফ ইত্যাদি। যেহেতু বন্ধক রাখা বস্তুতে বন্ধকদাতার মালিকানা অটুট রয়েছে, তাই তার অনুমতি থাকা শর্ত বিবেচনা করা হয়েছে। এর বিপরীতে অন্য দান ও অনুদানে দাতার মালিকানা আর বহাল থাকে না। তাই তার অনুমতি পাওয়ার উপর কব্জা নির্ভরশীল হবে না।
তৃতীয় মত: হাম্বলী ফকীহদের মত: তারা বলেন, বন্ধক রাখা বস্তুর ন্যায় অন্য দান-অনুদানেও প্রথম পক্ষের অনুমতি থাকা শর্ত। তাই বন্ধকদাতার অনুমতি ছাড়া বন্ধকগ্রহীতা বন্ধকের বস্তুটি কজা করলে তা যেমন অনুচিত ও সীমালঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে, তেমনি দান-অনুদানের বস্তু যে দান বা অনুদান করছে তার অনুমতি ছাড়া কব্জা করা সীমালঙ্ঘন বলে সাব্যস্ত হবে। সেক্ষেত্রে কজা করা ত্রুটিপূর্ণ বলে তা বাতিল হয়ে যাবে, তাই তার ভিত্তিতে যে বিধানগুলো কার্যকর হওয়ার সেগুলো কার্যকর হবে।
অনুমতির প্রকার:
ফকীহদের দৃষ্টিতে অনুমতি হচ্ছে দুপ্রকার: এক. প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট এবং দুই. ইশারা-ইঙ্গিতে যা অপ্রকাশ্য। সুস্পষ্ট: যেমন, কাউকে বলা হলো: কব্জা করো, আমি তোমাকে অনুমতি দিচ্ছি, আমি তাতে রাজি আছি; এ ধরনের আরো সকল বাক্য। ইশারা ইঙ্গিতে অনুমতি যেমন অনুদানদাতার উপস্থিতিতে অনুদানের বস্তুটি কেউ হাতে নিলে অনুদানদাতা তাকে নিষেধ না করে চুপ করে থাকা। এমনিভাবে ক্রেতা বিক্রীত পণ্যটি কব্জা করছে দেখেও বিক্রেতা চুপ থাকা। বন্ধকগ্রহীতা বন্ধকদাতার সামনেই বন্ধক রাখা বস্তুটি কজা করে নিলে বন্ধকদাতা তাতে কোনো আপত্তি না করা ইত্যাদি।
অনুমতি প্রত্যাহার:
যেখানে কজাকরণ যথাযথ হওয়ার জন্যে অনুমতি লাভ করা শর্ত, সেখানে শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহগণ বলেন, যার অনুমতি পাওয়া শর্ত তার অনুমতি প্রত্যাহারের সুযোগও রয়েছে। তবে সেটা হতে হবে কজা করে ফেলার আগেই। যদি কজা করার পূর্বে অনুমতি প্রত্যাহার করে তবে পূর্বের অনুমতি বাতিল বলে গণ্য হবে। যদি কব্জা করার পর অনুমতি প্রত্যাহারের কথা জানায় তবে তার এ প্রত্যাহার কার্যকর হবে না।
কব্জা করার পর্যন্ত অনুমতি প্রদানের যোগ্যতা বহাল থাকা শাফেয়ী ফকীহগণ বলেছেন, কব্জা করার পূর্বে যদি কজার অনুমতিদাতা পাগল হয়ে যায়, বেহুঁশ হয়ে যায় বা শরীয়তের নিষেধাজ্ঞা আরোপের আওতায় পড়ার দরুন যাবতীয় লেনদেন থেকে তাকে বারণ করা হয়, তবে তার পূর্বপ্রদত্ত অনুমতি বাতিল হয়ে যাবে। হাম্বলী ফকীহগণ তাদের সাথে এতটুকুতে ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন, যদি অনুমতিদাতা বা যাকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে কব্জা করার পূর্বে সে মারা যায়, তাহলে কজা করার অনুমতি বাতিল হয়ে যাবে।
চতুর্থ শর্ত: কজাকৃত বস্তুতে অন্য কারো অধিকার সম্পৃক্ত থাকবে না
যে জিনিস কজা করা হবে তাতে অন্য কারো অধিকার সম্পৃক্ত না থাকার বিষয়ে ফকীহগণ সামান্য মতবিরোধ করেছেন। তারা এ সম্পর্কে তিনটি মত ব্যক্ত করেছেন:
প্রথম মত: হানাফী ও শাফেয়ী ফকীহদের মত: তারা বলেন, যে বস্তুটি কজা করা হবে তা হতে কজা করার সময় কারো কোনো অধিকার বা দখল অবশিষ্ট থাকবে না। তাই যদি বাড়ি বিক্রি করা হয়, তাতে যদি বিক্রেতার আসবাবপত্র রয়ে যায় সেগুলো সরিয়ে বাড়ি খালি করে দিতে হবে। বাড়িতে আসবাবপত্র থাকা অবস্থায় ক্রেতা বাড়ি কজা করলে তার এ কজা যথাযথ হবে না। খালি করার পর তা কজা করতে হবে।
দ্বিতীয় মত: মালেকী ফকীহদের মত: তারা বলেন, কজা করা যথাযথ হওয়ার জন্যে তাতে অন্য কারো কর্তৃত্ব বা দখল না থাকা শর্ত নয়। তবে বাড়ি-ঘর এর ব্যতিক্রম। বাড়ি-ঘর কব্জা করার পূর্বে তাতে অন্য কারো আসবাবপত্র থাকলে তা সরিয়ে বাড়ি খালি করে দিতে হবে, নতুবা কব্জা যথাযথ হবে না।
তৃতীয় মত: হাম্বলী ফকীহদের মত: তারা বলেন, ব্যতিক্রমহীনভাবে যে- কোনো পণ্য কব্জা করার ক্ষেত্রে, তা অন্যের দখল বা অধিকারমুক্ত হওয়া জরুরি নয়। এমনকি বাড়ি-ঘরও তা থেকে ব্যতিক্রম নয়। বরং যদি বিক্রেতা ক্রেতাকে বিক্রীত বাড়ি কজা করতে এবং নিজ দখলে নিতে সুযোগ করে দেয়, তাহলে তা কজা করার সময় তাতে বিক্রেতার জিনিসপত্র থাকা কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি করবে না, ক্রেতা যথারীতি এ অবস্থাতেই তা কজা করতে পারবে।
পঞ্চম শর্ত: কজাকৃত বস্তুটি হবে স্বতন্ত্র ও পৃথক
হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ এ শর্ত আরোপ করেছেন। তারা বলেন, যে বস্তুটি কব্জা করা হবে তা হবে স্বতন্ত্র ও পৃথক, তাতে অন্যের অধিকার বা মালিকানা থাকবে না। যদি তাতে অন্যের মালিকানা বা দাবি অংশগতভাবে সম্পৃক্ত ও সংযুক্ত থাকে তবে তাতে কজাই যথার্থ হবে না।
এ শর্তের আলোকে তারা বলেন, যদি কেউ জমি বন্ধক রাখে বা জমি দান করে, জমিতে থাকা ঘর-বাড়ি ব্যতীত অথবা জমিতে থাকা ফসল বা গাছপালা ব্যতীত অথবা ফসল বা গাছপালা বন্ধক রাখে বা অনুদান হিসাবে দেয়, তাতে জমি বাদ রাখে অথবা গাছ ফল ব্যতীত বা ফল গাছ ব্যতীত বন্ধক রাখে বা দান করে, তাহলে কজা করার পরও তা সঠিক হবে না। যা বাদ রাখা হয়েছে তা সহ বুঝিয়ে দিলেও এবং অপরপক্ষ তা বুঝে নিলেও কজা যথার্থ হবে না। এর কারণ, যা বন্ধক রাখা হয়েছে বা যা দান করা হয়েছে তার সাথে যা বন্ধক বা দান করা হয়নি তা অংশ হিসাবে সংযুক্ত ও সম্পৃক্ত হয়ে আছে। এভাবে সংযুক্ত হয়ে থাকা কজা সহীহ ও সঠিক হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক।
ষষ্ঠ শর্ত: কজাকৃত বস্তুতে মালিকানা বিস্তৃত অংশে ছড়ানো থাকবে না
যে বস্তুটি কজা করা হচ্ছে তাতে কজাকারীর মালিকানা হচ্ছে আংশিক, যা পুরো বস্তুটিতে বিস্তৃত- এমন না হওয়া শর্ত, এ কথাতে ফকীহদের দুটো মত হয়েছে:
প্রথম: মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহদের মত: তারা বলেন, যদি কোনো বস্তুতে কারো আংশিক মালিকানা বিস্তৃত থাকে (যেমন জমির এক তৃতীয়াংশ একজনের, অপরজনের দুই তৃতীয়াংশ), তাহলে এ অবস্থাতে তার সেই অংশ কজা করা যথার্থ হবে। অংশের এরূপ বিস্তৃতি কজা যথাযথ হওয়ার পরিপন্থী নয়। তারা এর কারণ হিসাবে বলেন, যদি বিস্তৃত অংশে কজা করা ধর্তব্য না হয় এবং তা কব্জা বলে গণ্য না হয়, যেহেতু তাতে যে ক-জন অংশীদার তাদের কারোরই নিজ নিজ অংশে নিজ ইচ্ছামাফিক কিছু করার ক্ষমতা ও সুযোগ নাই, তাহলে তাতে যে ক-জন অংশীদার তাদের কারোরই কজা সঠিক হবে না; ফলে তাদের কেউই কব্জাকারী বলে গণ্য হবে না। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে বস্তুটির মালিক থাকলেও কারোর অধিকার থাকবে না। ফলে বস্তুটি সকলের অধিকারমুক্ত হয়ে থাকবে। এটি শরীয়তের দৃষ্টিতেও যথার্থ নয়, বাস্তব জগৎ হিসেবেও নয়।
শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহগণ বলেন, বিস্তৃত অংশ কজা করতে বস্তুটির পুরোটাই কব্জা করতে হবে। সবটা কজা করার পর যেটুকু তার মালিকানাধীন নয় তা অপর অংশীদারদের পক্ষ থেকে হবে তার হাতে আমানত। তারা বলেন, যদি বস্তুটি স্থানান্তরযোগ্য না হয় (যেমন জমি) তা কেবল অন্যের দখলমুক্ত করে দিলেই তাতে কজা সাব্যস্ত হয়, তাহলে তাতে পুরোটা কজা করার সময় অন্য অংশীদারদের অনুমতি নেওয়া শর্ত নয়। কিন্তু যদি বস্তুটি স্থানান্তরযোগ্য হয়, তাহলে তা কব্জা করার সময় অন্য শরীকের অনুমতি নেওয়া শর্ত।
মালেকী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, যে জিনিসটিতে একাধিক ব্যক্তি অংশীদার এবং জিনিসটিতে তাদের অংশ বিস্তৃত, প্রত্যেক শরীক তাতে হাত রাখার দ্বারা তা কব্জা করা হবে। কোনো অংশ হস্তান্তর করা হলে তাতে প্রথম ব্যক্তির পরিবর্তে এখন যে অংশীদার হয়েছে সে অন্যদের সাথে তাতে হাত রাখবে, তাহলেই তার কব্জা সম্পন্ন হবে।
দ্বিতীয়: হানাফী ফকীহদের মত: তারা বলেন, কজা যথার্থ হওয়ার জন্যে শর্ত হচ্ছে যা কজা করা হবে তা বস্তুর বিস্তৃত কোনো অংশ হবে না। এর কারণ, কব্জা করার অর্থই হচ্ছে তাতে কব্জাকারীর দখল থাকবে এবং তা তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ও অধিকারে থাকবে। কোনো বস্তুর বিস্তৃত অংশে মালিকানা থাকলে তাতে কজা করার এই অর্থ ও মর্ম কখনোই বাস্তবায়িত হবে না, এমনকি তা ধারণাও করা যায় না।
টিকাঃ
৫৫. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১২৮; নবভী রচিত আল-মাজমুউ, খ. ৯, পৃ. ১৫৭; কাশশাফুল কিনা', খ. ৪, পৃ. ২৫৪; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩২৯
৫৬. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ১২৬
৫৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১২৬ ও ১৪১; জামেউ আহকামিস সিগার, খ. ৪, পৃ. ১০৪; কাশফুল আসরার আলা উসুলিল বাষদাভী, খ. ৪, পৃ. ১৩৭২; আতাসী কৃত শারহুল মাজাল্লা, খ. ৩, পৃ. ৩৬৪ ও ৫৩০
৫৮. উসূলুল বাযদাবী কাশফুল আসরার সহ, খ. ৪, পৃ. ১৩৭৫; আতাসী কৃত শারহুল মাজাল্লা, খ. ৩, পৃ. ৫৩০; মাজাল্লা আল-আহকামুল আদলিয়্যা, ধারা: ৯৬৭
৫৯. প্রাগুক্ত
৬০. আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ১, পৃ. ২০১
৬১. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১২৬; আল-উম, খ. ৩, পৃ. ১২৪ ও ৪৮২; আল কাওয়ানীন আল-ফিকহিয়্যা, পৃ. ৩৯৯; শারহু মিয়ারা আলাত তুহফা, খ. ২, পৃ. ১৪৩; কাওয়ায়েদুল আহকাম, খ. ২, পৃ. ১৫৯
৬২. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ১৫২ এবং খ. ৬, পৃ. ১২৬ ও ১৪১; আতাসী কৃত শারহুল মাজাল্লা, খ. ৩, পৃ. ১৩৫ এবং খ. ৪, পৃ. ৪১৩; দারদীর প্রণীত আশ শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ৩৭৭ ও ২৪৪; আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ২৩৩; শারহু তানকীহিল ফুসুল, কারাফী প্রণীত, পৃ. ৪৫৫; ইবনে জুযাই প্রণীত আত-তাসহীল, খ. ১, পৃ. ৯৭; আল-হাইয়ান কৃত তাফসীরুল বাহরিল মুহীত, খ. ২, পৃ. ৩৫৫
৬৩. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ২৫
৬৪. আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩০৯
৬৫. শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২২৩; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৯৫-২৯৬
৬৬. মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ৯৪৯ ও ৯৫০; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১৫০৩
৬৭. দারদীর প্রণীত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ৩৮১; শারহু মিয়ারা আলা তুহফা ইবনে আসেম, খ. ১, পৃ. ১৩৮; আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ১, পৃ. ২১৩
৬৮. রওজাতুত তালেবীন, খ. ৪, পৃ. ৩০৭ ও ৩০৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২২৫; রাফেয়ী প্রণীত ফাতহুল আযীয, খ. ১১, পৃ. ৩২-৩৫
৬৯. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৪০০; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৯২
৭০. ই'লামুল মুওয়াক্বিয়ীন, খ. ২, পৃ. ৩৯৩
৭১. আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৫৮; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৪০২; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৯১; বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ২৫; রদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ৫২৯; আতাসী কৃত শারহুল মাজাল্লা, খ. ৪, পৃ. ৫১৫
৭২. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ২৫; রদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ৫২৯
৭৩. আদ-দুররুল মুখতার, খ. ৬, পৃ. ৫০২; মাজাল্লা আল-আহকামুল আদলিয়্যা, ধারা ৭০৫
৭৪. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ১৩৭ ও ১৪১; রদ্দুল মুহতার, খ. ৬, পৃ. ৫০৩; আতাসী কৃত শারহুল মাজাল্লা, খ. ৩, পৃ. ১৯৮; আল-উম, খ. ৩, পৃ. ১৬৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৩৩; হাশিয়া আদাভী আলা কেফায়াতুত তালেবির রাব্বানী, খ. ২, পৃ. ২১৬; আত-তাসহীল, খ. ১, পৃ. ৯৭; তাফসীরুল কুরতুবী, পৃ. ১২১৮; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৫১; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৮৩
৭৫. তাফসীরুল কুরতুবী, পৃ. ১২১৮; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ১৩৭; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৫১; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ২৩০; আল-ইশরাফ আলা মাসায়িলিল খিলাফ, খ. ২, পৃ. ৫
৭৬. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ১৫২ এবং খ. ৬, পৃ. ১২৬; আল-উম, খ. ৩, পৃ. ১২৪ ও ২৮৪; কাওয়ায়িদুল আহকাম, খ. ২, পৃ. ৮০; দারদীর প্রণীত আশ শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ১০৭; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৬০১
৭৭. আল-উম, খ. ৩, পৃ. ২৮৪; সুনানু বায়হাকী, খ. ৬, পৃ. ১৭০
৭৮. মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ৮৪
৭৯. আল-কাওয়ানীনুল ফিকহিয়্যা, পৃ. ৩৭৪
৮০. কাওয়ায়েদুল আহকাম, খ. ২, পৃ. ৭১; শারহু তানকীহিল ফুসুল, পৃ. ৪৫৫; কারাফী প্রণীত আয-যাখীরা, খ. ১, পৃ. ১৫২
৮১. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ২, পৃ. ২৪০; রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ১৬১; আল-মুহাযযাব, খ. ২, পৃ. ৫৮; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৭, পৃ. ৩৩০; দারদীর রচিত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ২, পৃ. ৩২৮; কাশশাফুল কিনা, খ. ৫, পৃ. ১০৯ ও ১১৬; আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ৭৩৫
৮২. আল-উম, খ. ৫, পৃ. ৬৫; নবভী কৃত রওজাতুত তালেবীন, খ. ৭, পৃ. ৩৩০; দারদীর-এর আশ-শারহুল কাবীর, খ. ২, পৃ. ৩২৮; আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ৭৩৫
৮৩. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ১৬১; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ২, পৃ. ২৪০; আল-হামাজী আলাল আশবাহ ওয়ান নাষায়ের, খ. ২, পৃ. ৩১৯; মাজমাউয যামানাত, পৃ. ৩৪০
৮৪. রওজাতুত তালেবীন, খ. ৪, পৃ. ৪৪৬; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ৩২৯
৮৫. কাশশাফুল কিনা', খ. ৪, পৃ. ৮০-৮১; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ২২৪
৮৬. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১২৩ এবং খ. ৬, পৃ. ১৩৮; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৬২; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৩, পৃ. ৫১৭ ও খ. ৫, পৃ. ৩৭৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৩ ও ৪০০
৮৭. আল-মুনতাকা, বাজী রচিত, খ. ৬, পৃ. ১০০; ফাতহুল আলী আল-মালিক, খ. ২, পৃ. ২৪৩; আশ-শারহুল কাবীর; খ. ৪, পৃ. ১০১
৮৮. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৭২ এবং খ. ৪, পৃ. ২৫৩; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩২
৮১. আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, ইবনে নুজাইম কৃত, পৃ. ১৫৪; লিসানুল হুক্কাম, ইবনে শাহনা কৃত, পৃ. ৩২১; কাশশাফুল কিনা', খ. ৪, পৃ. ২৫৩; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩২
৯০. রওজাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ৩৭৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৪০১; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩১৩; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩২; কাশশাফুল কিনা', খ. ৪, পৃ. ২৫৩
৯১ আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩১৩
৯২. রওজাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ৩৭৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৪, পৃ. ২৫৩
৮০. আল-ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ১৭; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৬২ এবং খ. ৫, পৃ. ৬৯০; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ১২৫ ও ১৪০; মাজমাউয যামানাত, পৃ. ২১৯ ও ২৩৮; ফাতহুল আযীয, খ. ৮, পৃ. ৪৪২; আল-মাজমুউ শারহুল মুহাযযাব, খ. ৯, পৃ. ২৭৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ७২
৯৪. আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ১৪৫; মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ৬৮৯।
৯৫. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩৩; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২০২
৯৬. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ১২৫ ও ১৪০; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ১৭১
৯৭. রদ্দুল মুহতার, খ. ৬, পৃ. ৪৭৯
৯৮. আল-উম, খ. ৩, পৃ. ১২৫ ও ১৬৯; ফাতহুল আযীয, খ. ৮, পৃ. ৪৫৯; শারহুত তাওয়াদ্দী আলা তুহফাতি ইবনে আসেম, খ. ১, পৃ. ১৭৮ এবং খ. ২, পৃ. ২৩৪; আল-বাহজী শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ২৩৫; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩৩, এবং খ. ৫, পৃ. ৩৯৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৪, পৃ. ২৫৭
৯৯. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৪০০; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২০২, এবং খ. ৪, পৃ. ২৫৭
১০০ শারহু মিয়ারা আলা তুহফা ইবনে আসেম, খ. ২, পৃ. ১৪৬
📄 কজা করার স্থলবর্তী
কব্জা করার স্থলবর্তী যে বস্তুটি চুক্তির পর কব্জা করার উপযোগী হবে তাতে দু অবস্থা। চুক্তি করার আগেই হয়তো তা সে লোকের হাতে রয়েছে যে তা কজা করবে অথবা তার হাতে নেই, চুক্তির অপরপক্ষের হাতে রয়েছে।
প্রথম অবস্থা: চুক্তির পর কজা করলে যা চুক্তির একপক্ষের হাতে আসবে, চুক্তির পূর্বেই তা যদি তার হাতে থাকে, যেমন- কোনো কিছু কেউ বিক্রি করল বা দান করল বা বন্ধক রাখল ছিনতাইকারীর নিকট বা যে ধার নিয়েছে তার নিকট বা যার কাছে আমানত রাখা আছে তার নিকট বা যে ভাড়া নিয়েছে তার নিকট, তাহলে পূর্ব থেকে বিদ্যমান কজাই কি চুক্তির কজার স্থলবর্তী হবে, না-কি হবে না? তা নিয়ে ফকীহগণ মতবিরোধ করে তিনটি মত বর্ণনা করেছেন।
প্রথম মত: মালেকী ও হাম্বলী ফকীহদের মত: পূর্ববর্তী কজাই চুক্তির ফলশ্রুতিতে কজা করার স্থলবর্তী হবে শর্তহীনভাবে। অর্থাৎ পূর্ববর্তী দখল আমানতের দখল হোক বা ক্ষতিপূরণ ও জরিমানার দখল হোক, এখন যে কজা করার উপযোগী হয়েছে তা আমানতের কব্জা হোক বা ক্ষতিপূরণের কজা হোক; এখানে অনুমতিরও শর্ত নেই, পূর্ববর্তী কজার পর দীর্ঘসময় অতিবাহিত হওয়াও শর্ত নয়।
সকল ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী দখলই চুক্তির প্রেক্ষিতে কজা করার স্থলবর্তী বলে গণ্য হবে। কেননা অব্যাহত কজাই সত্যিকার কজা, যেহেতু তাতে কজাকারীর যে কোনো কাজ করার সুযোগ ও অধিকার ছিল, সে অবস্থাতেই কব্জা করার উপযোগী চুক্তি সম্পাদন হয়েছে, ফলে তার সে সুযোগ ও অধিকার অব্যাহত থেকেছে। এক্ষেত্রে এ মর্মে কোনো দলিল নেই যে, চুক্তির পরই কব্জা বাস্তবায়িত হতে হবে, এর পূর্বের কজা গণ্য হবে না।
দ্বিতীয় মত: হানাফী ফকীহদের মত এক্ষেত্রে মূলনীতি হচ্ছে, যদি চুক্তি করার সময় চুক্তিবদ্ধ বস্তুটি কজায় থাকে তাহলে পূর্বের কজা এবং চুক্তির পর প্রাপ্য কজা উভয়টি একই পর্যায়ের হলে, পূর্ববর্তী কব্জা এবং চুক্তি-পরবর্তী কজাটির একটি অপরটির স্থলবর্তী হবে। যেমন উভয়টি আমানতের কজা বা উভয়টি ক্ষতিপূরণের কজা হলো। এর কারণ উভয়টি এক বরাবর হলেই একটি অপরটির স্থলবর্তী হওয়া অধিক বাস্তবায়িত হয়। তখন একটি অপরটির চাহিদা পূরণ করে। এখানে চাহিদা হচ্ছে, কজা বাস্তবায়িত হওয়া যা পূর্বের কজা দ্বারাই অর্জিত হয়েছে।
তৃতীয় মত: এটি শাফেয়ী ফকীহদের মত: প্রথম কজাই দ্বিতীয় কজার স্থলবর্তী হবে, প্রথম কজাটি ক্ষতিপূরণের কজা হোক বা আমানতের কব্জা হোক, এমনিভাবে চুক্তির পরবর্তী কজাটি আমানতের কজা হোক বা ক্ষতিপূরণের কজা হোক। তবে দ্বিতীয় কজাটি প্রথম কজার স্থলবর্তী হওয়া সঠিক হতে দুটো বিষয় শর্ত হিসাবে জরুরি:
এক. যদি বস্তুটিতে চুক্তির অপরপক্ষের আটকে রাখার অধিকার থাকে তাহলে তার অনুমতি নিতে হবে।
দুই. এতটুকু সময় অতিবাহিত হওয়া যতটুকুতে কব্জা করা বাস্তবায়িত হতে পারে।
দ্বিতীয় অবস্থা: বস্তুটি যদি মালিকের হাতে থাকে। যেমন বিক্রীত পণ্য রয়েছে বিক্রেতার হাতে, দানের বস্তু রয়েছে এখনও দাতার হাতে, সেক্ষেত্রে ফকীহগণ বিক্রীত পণ্য বিক্রেতার হাতে থাকা এবং দানের বস্তু দাতার হাতে থাকার মাঝে কোনো কাজ কজা করার স্থলবর্তী হওয়ার প্রশ্নে পার্থক্য করেছেন। বিস্তারিত আলোচনা নিম্নে: বিক্রীত পণ্য বিক্রেতার হাতে থাকা অবস্থায় কোনো কাজ কজার স্থলবর্তী হওয়ার প্রশ্নে ফকীহদের তিনটি মত হয়েছে।
এক. হানাফী ফকীহদের মত: বিক্রেতার হাতে এখনও পণ্য রয়ে গেছে, এ অবস্থায় তা ক্রেতা কজা করার স্থলবর্তী হবে ক্রেতার সে পণ্য ধ্বংস করা বা তাকে ত্রুটিপূর্ণ করে ফেলা বা তার আকার আকৃতিতে পরিবর্তন ঘটানো বা তা ব্যবহার করার মাধ্যমে তাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। যেহেতু কজা করাই হয় তাতে অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং যে কোনো কাজ করার ক্ষমতালাভের জন্যে। বস্তু ধ্বংস করা, তা খুঁতযুক্ত করে ফেলা, আকার আকৃতি পাল্টে ফেলা বা তা ব্যবহার করাই হচ্ছে বস্তুতে প্রকৃত অধিকার ও দখলের বহিঃপ্রকাশ।
দুই. শাফেয়ী ফকীহদের মত: ক্রেতা যদি পণ্যটি বিক্রেতার কাছ থেকে কজা করার পূর্বে তা ধ্বংস করে ফেলে, যা বাহ্যিক ও প্রকাশ্যভাবে হতে পারে বা শরীয়তের দৃষ্টিতে ধ্বংস হতে পারে, তাহলে তার এ ধ্বংস করাই কব্জা বলে ধর্তব্য হবে, যদি সে জানে যে সে পণ্যটি ধ্বংস করেছে।
তিন. হাম্বলী ফকীহদের মত: বিক্রেতার হাতে থাকা অবস্থায় ক্রেতা যদি পণ্যবস্তুটি ধ্বংস করে দেয় তাহলে এটি ক্রেতার কজা গণ্য করা হবে। তাই ক্রেতার মূল্য পরিশোধের বিধান বহাল থাকবে। যেহেতু এটি এখন তার সম্পদ, সে নিজেই তা ধ্বংস করেছে। তার এই ধ্বংস করা ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছায় হোক। ক্রেতার সম্পদ হিসাবে ক্রেতা তার মূল্য পরিশোধ করবে যদি পূর্বে না দিয়ে থাকে।
টিকাঃ
১০৪. শারহু মিয়ারা আলাত তুহফা, খ. ১, পৃ. ১১১; মাজদুদ্দীন ইবনে তাইমিয়া রচিত আল-মুহাররার, খ. ১, পৃ. ৩৭৪; ইবনে তাইমিয়া কৃত নাযারিয়্যাতুল আকদ, পৃ. ২৩৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৪৯ ও ২৭৩; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩৪
১০৫. মাজমাউয যামানাত, পৃ. ২১৭; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২৪৮ এবং খ. ৬, পৃ. ১২৬; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ২২
১০৬. আল-মাজমুউ শারহুল মুহাযযাব, খ. ৯, পৃ. ২৮১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১২৮; ফাতহুল আযীয, খ. ১০, পৃ. ৬৫-৭১
১০৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২৪৬; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৬১
১০৮. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৬৬; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৩, পৃ. ৪৯৯ এবং খ. ৭, পৃ. ২৫১
১০৯. শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৯১; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৩১; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১২৪
১১০. রওজাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ৩৭৭
📄 বিভিন্ন চুক্তি ও লেনদেনে কজা করার শর্তারোপ এবং তার প্রতিক্রিয়া
চুক্তিতে কব্জা করার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, কজাকৃত বিষয়টির দায়দায়িত্ব অন্যের নিকট থেকে কব্জাকারীর দায়িত্বে এসে পড়ে। ফলে সে এখন তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সে যা কজা করে তার বদল ও বিনিময় প্রদান তার জন্যে আবশ্যক হয়ে যায়। বিস্তারিত বিবরণ নিম্নে প্রদত্ত হলো:
প্রথম প্রতিক্রিয়া: দায়দায়িত্ব কব্জাকারীর দায়িত্বে চলে আসা
যে কজা করবে কজাকৃত বস্তুর দায়দায়িত্ব তার কাঁধে চলে আসবে, এ কথায় দায়দায়িত্ব বলে বোঝানো হয়েছে, বস্তুটি ধ্বংস হয়ে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা তাতে কোনো খুঁত সৃষ্টি হলে তার ক্ষতিপূরণ বা অন্য সম্ভাব্য পরিণতি বহন করা। যে সকল চুক্তিতে এ ধরনের দায়ভার গ্রহণের বিষয় রয়েছে সেগুলো হচ্ছে: ক্রয়-বিক্রয়, ইজারা বা ভাড়া, জিনিস ধার নেওয়া, বন্ধক রাখা, যে বিবাহে মহর নির্দিষ্ট বস্তু।
📄 যে সকল চুক্তিতে মালিকানা পরিবর্তনের জন্যে কজা করা শর্ত
যে সকল চুক্তিতে মালিকানা পরিবর্তনে কব্জা করা সামগ্রিকভাবে/ কোনো না কোনো ভাবে শর্ত সেগুলো মোট পাঁচ প্রকার:
এক. হিবা বা দান-অনুদান (الهبة)
যা হিবা বা অনুদান হিসাবে দেওয়া হচ্ছে তা গ্রহীতা কজা করা সে বস্তুটির মালিকানা পরিবর্তনে শর্ত কি-না, এ বিষয়ে ফকীহদের দুটো মত রয়েছে:
এক. হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহদের অভিমত: যাকে দেওয়া হবে সে কজা করা দানকৃত বস্তুর মালিকানা পরিবর্তনে শর্ত। সে তা কব্জা না করা পর্যন্ত তার মালিকানায় পরিবর্তন ঘটবে না।
দুই. মালেকী মাযহাবের ফকীহগণ ও ইবনে আবী লায়লার অভিমত: যাকে দান করা হবে, বস্তুটির মালিকানায় পরিবর্তন হয়ে তার মালিকানায় চলে যেতে কজা করা শর্ত নয়। বরং দান-অনুদান ইত্যাদির চুক্তিই মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্যে যথেষ্ট।
দুই. ওয়াকফ (الْوَقْف)
ওয়াকফ পরিপূর্ণ হওয়ার জন্যে ওয়াকফকৃত সম্পদ কব্জা করা জরুরি ও শর্ত কি-না, তা নিয়ে ফকীহগণ মতবিরোধ করেছেন।
শাফেয়ী ফকীহদের অভিমত, হাম্বলী ফকীহদের গৃহীত যথাযথ মত এবং আবু ইউসুফের মত হচ্ছে, ওয়াকফ যদি যথা নিয়মে করা হয়, তাহলে তা থেকে ওয়াকফকারীর মালিকানা বিলীন হয়ে যায়, তাতে অপরপক্ষের কব্জা করা শর্ত নয়।
মালেকী ফকীহদের মত, ইমাম আহমদ-এর অন্যতম অভিমত এবং ইমাম মুহাম্মদ ও ইবনে আবী লায়লার মত হচ্ছে, ওয়াকফকারীর মালিকানা দূর এবং ওয়াকফ পূর্ণ হওয়ার জন্যে যে কোনো এক ধরনের কজা পাওয়া জরুরি।
আবু হানিফা রহ.-এর মত হচ্ছে, ওয়াকফকৃত বস্তুটিতে ওয়াকফকারীর মালিকানা যথারীতি বহাল থাকবে। তবে যদি ১. বিচারক ওয়াকফ হিসাবে মালিকানা না থাকার ফয়সালা প্রদান করেন বা ২. ওয়াকফকারী তার মৃত্যু পর্যন্ত তার মালিকানা থাকার শর্ত করে তাহলে তার মৃত্যুর পর-এ দু অবস্থায় ওয়াকফকারীর মালিকানা দূর হয়ে যাবে।
তিন, ঋণ বা কর্জ : (الْقَرْضِ)
কর্হদাতার ঋণ হিসাবে প্রদত্ত সম্পদে কর্জগ্রহীতার মালিকানা প্রতিষ্ঠাকালে তা কজা করা জরুরি ও শর্ত কি-না, তা নিয়ে ফকীহদের তিনটি মত তৈরি হয়েছে:
এক. আবু হানীফা ও মুহাম্মদের অভিমত, শাফেয়ীদের সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত, হাম্বলীদেরও মত এটিই যে, কর্জগ্রহীতা কর্জদাতার কর্জ হিসাবে প্রদত্ত সম্পদ কজা করলেই সে তার মালিক হতে পারবে।
দুই. মালেকী মাযহাবের ফকীহদের মত : ঋণগ্রহীতা ঋণদাতার যে পরিমাণ সম্পদ ঋণ হিসাবে নিবে, ঋণগ্রহণের চুক্তির দ্বারাই সে সেটুকুর পূর্ণ মালিকানা লাভ করবে। সে তা কজা না করলেও তা তার সম্পদে গণ্য হবে।
তিন. ইমাম আবু ইউসুফের অভিমত যা শাফেয়ীদের একটি মত। তা হলো, ঋণগ্রহীতা ঋণের সম্পদে তাসাররুফ (التّصَرُّف) করার দ্বারাই তার মালিক হয়ে যাবে।
চার. বস্তু ধার নেওয়া (الْعَارِيَّة)
শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহদের মত হলো, যে লোক কোনো বস্তু ধার নেবে সে ওই বস্তু কব্জা করুক বা না করুক, কোনো ভাবে বস্তুর উপকার তার মালিকানায় আসবে না। হানাফী মাযহাবের ফকীহদের মত হচ্ছে, এখানে কব্জা করা শর্ত। কজা করলে ধার নেওয়া বস্তুর উপকার যে ধার নিয়েছে তার মালিকানায় চলে আসবে।
পাঁচ: ফাসেদ বিনিময় ও চুক্তিসমূহ (الْمُعَاوَضَاتُ الْفَاسِدَةُ)
শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী- এ তিন মাযহাবের ফকীহবৃন্দ অভিমত ব্যক্ত করেছেন, ফাসেদ বা ত্রুটিপূর্ণ চুক্তি বাতিলতুল্য; তাই তা মোটে সংঘটিতই হবে না। হানাফী ফকীহগণ এ বিষয়ে যা বলেছেন তা হলো, যদি দ্বিতীয় পক্ষ পণ্যটি কজা করে তাহলে পণ্যের মালিকানা প্রথম পক্ষের নিকট থেকে দ্বিতীয় পক্ষে চলে আসবে।
টিকাঃ
১১২. তাকমিলা রদ্দুল মুহতার, খ. ৮, পৃ. ৪২৪ ও ৪৭০; আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, ইবনে নুজাইম রচিত, পৃ. ৩৫৩; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ৮০, ৮২ ও ৮৩; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ৩৭৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৪০০; আল-উম, খ. ৩, পৃ. ২৭৪; আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, সুয়ূতী রচিত, পৃ. ৩১৯; মাজদুদ্দীন ইবনে তাইমিয়া রচিত আল-মুহাররার, খ. ১, পৃ. ৩৭৪; আল-কাওয়ায়েদ, ইবনু রজব কৃত, পৃ. ৭১
১১৩. সূরা মায়েদা, আয়াত ১
১১৪. আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ১০১
১১৫. মুসতাদরাকে হাকেম, খ. ২, পৃ. ১৮৮
১১৬. মুওয়াত্তা ইমাম মালেক, আয়েশা রা.-এর হাদীস।
১১৭. বায়হাকীর সুনানে কুবরা, উমর রা.-এর হাদীস।
১১৮. বায়হাকী তাঁর সুনানে কুবরায় উল্লেখ করেছেন।
১১৯. কাশফুল আসরার আলা উসূলে বাযদাভী, আব্দুল আযীয বুখারী প্রণীত, খ. ২, পৃ. ৬৯।
১২০. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩৮৩; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৬০০; আল-কাফী, খ. ২, পৃ. ৪৫৫; আল-ইখতিয়ার, খ. ৩, পৃ. ৪১; আল-মাবসুত, খ. ১২, পৃ. ৩৫
১২১. আল-কাওয়ানীনুল ফিকহিয়্যা, পৃ. ৩৬৪; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৬০০; আল-কাফী, খ. ২, পৃ. ৪৫৫; আ- ইখতিয়ার, খ. ৩, পৃ. ৪১; হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৩, পৃ. ৩৬৪; আল-মাবসূত, খ. ১২, পৃ. ৩৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ৩৮৩
১২২. হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৩, পৃ. ৩৫৭; আল-হিদায়া ফাতহুল কাদীরসহ, খ. ৫, পৃ. ৪১৮, ৪৪৭-৪৪৮
১২০ রদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ১৬৪; আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, ইবনে নুজাইম রচিত, হাশিয়া হামাভী সহ, খ. ২, পৃ. ২০৪; ফাতহুল আযীয, খ. ৯, পৃ. ৩৯১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১২০; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩১০; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৫৭; আল-মুহাররার, খ. ১, পৃ. ৩৩৪; মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ১, পৃ. ৩৯৭
১২৪. আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ২২৬; আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ২৮৮
১২৫. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩৯৬; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৪, পৃ. ৩৫; ফাতহুল আযীয, খ. ৯, পৃ. ৩৯২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১২০; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩১০; সুয়ূতীর আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩২০
১২৬ রদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ১৬৪; আতাসী প্রণীত শারহুল মাজাল্লা, খ. ২, পৃ. ৪৪০
১২৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ২১৪ এবং খ. ৭, পৃ. ৩৯৬; লিসানুল হুক্কাম, পৃ. ৮৭; আতাসী রচিত শারহুল মাজাল্লা, খ. ১, পৃ. ১৩৮ এবং খ. ৩, পৃ. ৩০৯; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ১১৯; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ২২৭
১২৮. এর দ্বারা সে সকল চুক্তি বোঝানো হয়েছে যেগুলো বিভিন্ন অধিকার সৃষ্টি করে এবং চুক্তির উভয় পক্ষকে সম্পদসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা স্বীকার করতে বাধ্য করে। যেমন: বেচাকেনা, ভাড়া, সালাম বিক্রি ইত্যাদি।
১২৯. রদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ৪৯ ও ৯৯; মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ৩৮০; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ২২৯; আল-মাজমুউ, খ. ৯, পৃ. ৩৭৭