📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ক. স্থাবর সম্পদ কজা করার ধরন

📄 ক. স্থাবর সম্পদ কজা করার ধরন


সকল ফকীহ একমত যে, স্থাবর সম্পদে কজা করা হচ্ছে, বিক্রেতা তা হতে দখল সরিয়ে নিয়ে মালিকের জন্যে খালি করে দেবে এবং তাতে অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে দেবে। যদি ক্রেতার নিয়ন্ত্রণ আরোপে কেউ বাধা দেয়, তাকে অধিকার স্থাপন করতে না দেয়, তাহলে বিক্রেতা তার হাত সরিয়ে দিলেও তা কজা বলে গণ্য হবে না।

শাফেয়ী আলেমগণ এক্ষেত্রে শর্তারোপ করে বলেন, যদি জমিতে কোনো পরিমাপের বিবেচনা না করা হয় তাহলে কেবল একপক্ষ অপর পক্ষের জন্যে জমি অধিকারমুক্ত করে দেওয়াই কব্জা করার জন্যে যথেষ্ট হবে। কিন্তু যদি জমিতে পরিমাপ বিবেচ্য হয়, গজ হিসাবে মেপে যদি ক্রেতা তা কেনে, তাহলে তা মেপেই দিতে হবে, কেবল খালি করে দেওয়া যথেষ্ট হবে না।

হানাফী আলেমগণ এক্ষেত্রে শর্ত করেন, জমিটি নিকটে থাকতে হবে, তাহলে না মেপে কেবল খালি করে দেওয়াই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে। যদি জমিটি দূরে থাকে, তাহলে তাতে শুধু অধিকারমুক্ত করে দেওয়াই কব্জা বলে বিবেচিত হবে না। এটি ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদের মত। এটিই হানাফী মাযহাবে নির্ভরযোগ্য অভিমত। ইমাম আবু হানিফা এর বিপরীত মত পোষণ করেছেন। তাঁর নিকট জমিটি নিকটে বা দূরে থাকায় কোনো পার্থক্য হবে না। ইবনে আবেদন বলেন, এ মাসআলায় নিকটে বলার দ্বারা উদ্দেশ্য ক্রেতা যে শহরে বাস করে জমিটি সে শহরেই থাকা। হানাফী ফকীহগণ এ আলোচনাকালে সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যদি জমিটিতে প্রাচীর বা বেষ্টনী থাকে এবং তাতে তালা মারার ব্যবস্থা থাকে, সে জমিতে নিজের অধিকার ছেড়ে দেওয়ার সাথে সাথে তালার চাবি ক্রেতার হাতে তুলে দিতে হবে, যা দিয়ে সে অনায়াসে তালা খুলে জমিতে ঢুকতে পারবে, তখন তা কজা বলে গণ্য হবে।

হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ জমি কব্জা করার সাথে সাথে সে জমিতে থাকা গাছের ফল সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে বিক্রেতা সুযোগ করে দেওয়া এবং কোনো বাধা না দেওয়াকেও যুক্ত করেছেন। যেহেতু তার প্রয়োজন রয়েছে এবং সকলের মাঝে তার প্রচলন ও পরিচিতিও রয়েছে।

টিকাঃ
২১. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৬১; আলমাজাল্লা আল আদলিয়্যা, ধারা: ২৬৩; মুরাশিদুল হায়রান, ধারা: ৪৩৫; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৩, পৃ. ৫১৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭১; আল-মাজমুউ শারহুল মুহাযযাব, খ. ৯, পৃ. ২৭৬; মিনাহুল জলীল, খ. ২, পৃ. ৬৯৮; মাওয়াহিবুল জলীল, খ. ৪, পৃ. ৪৭৭; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২০২; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩৩; এবং খ. ৫, পৃ. ৩৯৬
২২. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৩; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৩, পৃ. ৫১৭
২৩. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৬১; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ১৬; আল-হামাভী আলাল আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, খ. ১, পৃ. ৩২৭; আল- মাজাল্লা আল আদলিয়‍্যা, ধারা ২৭০, ২৭১; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ৪৩৫ ও ৪৩৬।
২৪. শারহু মাআনিল আছার, খ. ৪, পৃ. ৩৬; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩৩; কাওয়ায়েদুল আহকাম, ইয ইবনে আব্দুস সালাম প্রণীত, খ. ২, পৃ. ৮১ ও ১৭২

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 খ. অস্থাবর সম্পদ কজা করার প্রকৃতি

📄 খ. অস্থাবর সম্পদ কজা করার প্রকৃতি


অস্থাবর সম্পদ কিভাবে কব্জা করা হবে, তা নিয়ে ফকীহদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশ ফকীহ অস্থাবর সম্পদে কব্জা করার ধরনে ভিন্ন ভিন্ন ভাগ করেছেন। কোনোটিতে প্রচলন রয়েছে হাত দিয়ে ধরা হবে, কোনোটিতে এ প্রচলন নেই। যেগুলোতে হাত দিয়ে ধরার প্রচলন নেই সেগুলো আবার দুই প্রকার: এক. কোনো বস্তুতে পরিমাপ ও পরিমাণ নির্ধারণ করা কব্জা করার ক্ষেত্রে ধর্তব্য হয় না, দুই, পরিমাণ নির্ধারণ ধর্তব্য হয়। এভাবে অস্থাবর সম্পদে কজা করার তিনটি অবস্থা হয়ে থাকে:

প্রথম অবস্থা: হাত দিয়ে ধরা
হাত দিয়ে ধরার মাধ্যমে কব্জা করার প্রচলন যে সকল জিনিসে সেগুলো হচ্ছে: টাকা-পয়সা, কাপড়চোপড়, অলঙ্কার ও মণিমুক্তা ইত্যাদি। শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের অধিকাংশ ফকীহের দৃষ্টিতে এসব বস্তু হাতে তুলে নেওয়ার দ্বারাই কব্জা করা সম্পন্ন হবে।

দ্বিতীয় অবস্থা: পরিমাণ নির্ধারণ ধর্তব্য নয়
এক্ষেত্রে ওজন করা, মেপে দেওয়া, গুনে দেওয়া বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে বিক্রীত পণ্য পরিমাণ করা কজার জন্য আবশ্যক নয়, ধর্তব্যও নয়। এসবে পরিমাপ নির্ধারণ অসম্ভব হতে পারে, অথবা সম্ভব হলেও সেটি বিবেচনা করা হয় না- এমনটি হতে পারে। যেমন, তৈজসপত্র, জীবজন্তু, আসবাবপত্র, অনুমান করে ফসলের স্তূপ বিক্রি করার ক্ষেত্রে এমনটা হয়ে থাকে। তবে এক্ষেত্রে শাফেয়ী ও হাম্বলী আলেমদের সাথে মালেকীগণ কজার ধরন নিয়ে ভিন্নতা প্রকাশ করেছেন:
মালেকী আলেমদের মত হচ্ছে, যে বস্তু কব্জা করার সমাজে যে নিয়ম প্রচলিত রয়েছে সে নিয়মই ধর্তব্য ও গৃহীত হবে। শাফেয়ী ও হাম্বলী আলেমদের মত হচ্ছে, বস্তুটিকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করার দ্বারা তার কব্জা করা প্রকাশিত হবে। তারা এর পক্ষে দলিল প্রদান করেন হাদীস দিয়ে এবং প্রচলনের উল্লেখ করে। হাদীসটি হচ্ছে: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেছেন, আমরা শহরের বাইরে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে দেখা করতাম। তখন তাদের কাছ থেকে পণ্য (খাদ্যদ্রব্য) সংগ্রহ করতাম অনুমানের উপর ভিত্তি করে। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এমন বেচাকেনা করতে নিষেধ করলেন; তবে পণ্য স্থানান্তর করা হলে তা হবে বৈধ। খাদ্যদ্রব্য কেনাবেচার সাথে অন্য বস্তু কেনাবেচার কিয়াস করা হবে। সামাজিক প্রচলনের আলোচনায় বলা হয়, এ জিনিসগুলো স্থানান্তর না করে কেবল হাতে ধারণ করাকে সমাজ কজা বলে মনে করে না। যেহেতু হাতের ছোট ছোট হাড় তা ধারণও করতে পারে না।

তৃতীয় অবস্থা: পরিমাপ নির্ধারণ ধর্তব্য
এক্ষেত্রে ওজন করা, মেপে দেওয়া, গুণে দেওয়া বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে বিক্রীত পণ্য পরিমাণ করা কজা করার জন্যে আবশ্যক হয়। যেমন গমের স্তূপ কিনা হলে তা মেপে নেওয়া, কোনো বস্তু (যেমন লবণ, চিনি ইত্যাদি) ওজন করে বুঝে নেওয়া, কাপড় গজ হিসাবে মেপে নেওয়া বা (শাড়ি লুঙ্গি-জাতীয় হলে) সংখ্যা গুণে নেওয়া। শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী ফকীহগণ এ অবস্থায় এ কথায় একমত যে, মেপে বা গুণে ইত্যাদি পন্থায় পণ্যের পরিমাণ নির্ধারিত করে পুরোপুরি বুঝে পাওয়াই এক্ষেত্রে কজা বলে ধর্তব্য হবে। শাফেয়ী আলেমগণ পরিমাপ ও পরিমাণ নির্ধারণের সাথে সাথে পণ্য স্থানান্তরও শর্ত হিসাবে উল্লেখ করেছেন। অধিকাংশ ফকীহ-পরিমাপযোগ্য অস্থাবর বস্তুতে পরিমাণ বা সংখ্যা নির্ধারণই তার পরিপূর্ণ কজা- এ কথার জন্যে যে দলিল প্রদান করেছেন তা হচ্ছে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণিত হাদীস: أَنَّهُ نَهَى عَنْ بَيْعِ الطَّعَامِ حَتَّى يَجْرِيَ فِيهِ الصَّاعَانِ ، صَاعُ الْبَائِعِ وَصَاعُ الْمُشْتَرِي "তিনি নিষেধ করেছেন খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করা থেকে যে পর্যন্ত না তাতে দুইটি সা' (আরব-দেশীয় মাপ) হয়। একটি সা' বিক্রেতার, একটি সা' ক্রেতার” (অর্থাৎ বিক্রেতার মেপে দেওয়া এবং ক্রেতার তা মেপে নেওয়া কর্তব্য।) অপর এক হাদীসে নবী স. বলেন: مَنِ ابْتَاعَ طَعَامًا فَلَا يَبِعْهُ حَتَّى يَكْتَالَهُ "যে খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করবে সে না মেপে তা বেচতে পারবে না।" এ দুটো হাদীসই এ কথা বোঝাচ্ছে, মেপে নেওয়া ছাড়া কজা প্রতিষ্ঠিত হবে না। যে সকল বস্তুতে পরিমাপ ও ওজনের মাধ্যমে পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় সেগুলোতে এ হাদীসগুলোই সরাসরি তা নির্ধারণ করছে। এ হাদীসের উপর কিয়াস করে গণনা করা ও গজ হিসাবে মেপে দেওয়া ইত্যাদিও নির্ধারণ করা হয়।

হানাফী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, অস্থাবর বস্তুতে কব্জা করা বাস্তবায়িত হবে হয়তো হাতে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে, অথবা ক্রেতাকে তা ব্যবহারের সুযোগ প্রদান করার মাধ্যমে। মাজাল্লা আল-আহকামুল আদলিয়্যাতে উল্লেখ করা হয়েছে, পণ্য বুঝিয়ে দেওয়া হয়তো ক্রেতার হাতে তা প্রদান করার মাধ্যমে অথবা ক্রেতার নিকটে তা রেখে দেওয়ার দ্বারা অথবা ক্রেতাকে তা দেখিয়ে তা কব্জা করার অনুমতি প্রদান করার মাধ্যমে হয়ে থাকে। ফাতাওয়া হিন্দিয়া (ফাতাওয়া আলমগীরীতে) বলা হয়েছে, কোনো লোক যদি কোনো ঘরে রাখা পরিমাপযোগ্য বস্তু পরিমাপ করে বিক্রি করে বা ওজনযোগ্য জিনিস ওজন করে বিক্রি করে, সে ক্রেতাকে যদি বলে, তোমাকে এ জিনিসটি পাওয়ার সুযোগ করে দিলাম এবং এ কথা বলার পর তার হাতে সে ঘরের চাবি তুলে দেয়, তাহলে ক্রেতার তা কজা করা হয়ে যাবে, ক্রেতা সে পণ্য পরিমাণ বা ওজন না করলেও। পণ্য ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, ক্রেতার তা পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া, ক্রেতা তা ইচ্ছা করলেই বাধাহীনভাবে কজা করতে পারে এমন ব্যবস্থা করা। মূল্য হস্তান্তরের বিষয়টিই এমনই।

হানাফী আলেমগণ, অস্থায়ী সম্পদে ক্রেতাকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ প্রদান করাই কজা করা, বলার পক্ষে দলিল প্রদান করে বলেন, ভাষায় অভিধানে কোনো বস্তু অর্পণ করার অর্থ হচ্ছে: কোনো বস্তু কারো একক অধিকারভুক্ত করা, তাতে কাউকে অংশীদার না রাখা। কারো নিয়ন্ত্রণে প্রদানের জন্যে হাত থেকে ছেড়ে দিলেই তা সম্ভব হয়। এভাবেও প্রমাণিত হয়, যার দায়িত্ব কিছু বুঝিয়ে দেওয়া তাকে তা বুঝিয়ে দিতেই হবে। তার কাছে যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে তা থেকে বের হওয়ার যখন একটাই পথ, তাকে সে পথেই যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিক্রেতার পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব তা হলো, ক্রেতাকে তা দখলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া, সকল প্রতিবন্ধক তা দূর করা। কিন্তু কারো হাতে তুলে দিয়ে কজা করানো অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব নয়। যেহেতু হাতে ছোট ছোট হাড়, তা দিয়ে কোনো কিছু কব্জা করা যে কজা করবে তার এখতিয়ারাধীন বিষয়। তাই কোনো কিছু কব্জা করার জন্যে যদি হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরা শর্ত ও জরুরি বিবেচনা করা হয়, তাহলে কব্জা করা, যা ওয়াজিব, তা কঠিন ও জটিল, বরং অসম্ভব হয়ে যাবে। অসম্ভব বা কঠিন কাজ শর্ত করা জায়েযও নয়। ইমাম আহমদ তাঁর এক মতে হানাফী আলেমদের মতের অনুরূপ বলেছেন, অস্থাবর সম্পদে কজা করার সুযোগ করে দেওয়াই কজা বলে গণ্য হবে। যেহেতু সুযোগ করে দিলেই তা ক্রেতা নিজ দখলে নিতে সক্ষম হয়। কব্জা করার দ্বারা উদ্দেশ্য এটিই থাকে। যেহেতু সুযোগ করে দিলেই সে উদ্দেশ্য পূরণ হয়, তাই এটিই কব্জা বলে ধর্তব্য হবে।

টিকাঃ
২৫. নবভী কৃত আল-মাজমু, খ. ৯, পৃ. ২৭৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭২; কারাফী রচিত আয-যাখীরা, খ. ১, পৃ. ১৫২; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩২; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২০২
২৬. শারহুল খিরাশী, খ. ৫, পৃ. ১৫৮; দারদীর রচিত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ১৪৫
২৭. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭২; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৩, পৃ. ৫১৫; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১১২ ও ৩৩২; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২০২
২৮. শারহু মাআনিল আছার, খ. ৪, পৃ. ৮; বুখারী, ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৩৪৭; মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১১৬১
২৯. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭২; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩২
৩০. আল-মাজমু শারহুল মুহাযযাব, খ. ৯, পৃ. ২৮২; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১১২
৩১. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৩; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৩, পৃ. ৫১৭; ফাতহুল আযীয, খ. ৮, পৃ. ৪৪৮; কাওয়ায়েদুল আহকাম, খ. ২, পৃ. ৮২ ও ১৭১; আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ১৪৪; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২০১ ও ২৭২
৩২. ইবনে মাজাহ, খ. ২, পৃ. ৭৫০; ইবনে হাজার আসকালানী তাঁর আল-তালখীস, খ. ৩, পৃ. ২৭
৩৩. মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১১৬০
৩৪. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৩; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১১১; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২০১
৩৫. লিসানুল হুক্কাম, ইবনে শাহনা কৃত, খ. ৩১১; আতাসী কৃত শারহুল মাজাল্লা, খ. ২, পৃ. ২০০; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়‍্যা, ধারা ২৭২, ২৭৪ ও ২৭৫
৩৬. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ২৭৪
৩৭. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ১৬

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 শরীয়তসম্মত হওয়া হিসাবে কজা করার প্রকারভেদ

📄 শরীয়তসম্মত হওয়া হিসাবে কজা করার প্রকারভেদ


ইয ইবনে আব্দুস সালাম ও কারাফী কব্জা করাকে শরীয়তসম্মত ও অনুমতিপ্রাপ্ত হওয়া বা না হওয়ার বিবেচনায় মানুষের অন্য সকল কাজের তুল্য গণ্য করে তাকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন:

প্রথম প্রকার: শরীয়তের পক্ষ থেকে কজা করার অনুমতি থাকলেও যার জিনিস তার পক্ষ থেকে অনুমতি মিলেনি। এটি আবার কতকভাগে বিভক্ত: এক. শাসক ও প্রশাসকের লুণ্ঠনকারীর নিকট থেকে লুট করে নেওয়া সম্পদ কজা করে নেওয়া। এমনিভাবে জনকল্যাণ খাতের সম্পদ, যাকাত এবং বায়তুল মালের (সরকারি কোষাগারের) বিভিন্ন অধিকার কব্জা করা। নিরুদ্দেশ এবং বন্দি লোকজনের সম্পদ, যারা নিজেদের সম্পদ সংরক্ষণে সক্ষম নয়। এমনিভাবে উন্মাদ বা অপ্রকৃতিস্থ অথবা হাবা হওয়ার দরুন যাদের সম্পদ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নেই তাদের পক্ষ থেকে প্রশাসকের কজা করা এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। দুই, ঝড়ো বাতাস কারো কাপড় উড়িয়ে নিয়ে কারো বাড়িতে ফেললে সে বাড়িওয়ালার সেই কাপড় কব্জা করা এবং তুলে নেওয়া। তিন. পথসম্বলহীন নিরুপায় মুসাফির পথপার্শ্বে থাকা খাদ্যশস্য বা গাছের ফল ইত্যাদি মালিকের অনুমতি ছাড়াই গ্রহণ করা, যা প্রয়োজন পরিমাণ; তা থেকে অধিক নয়। চার. কোনো লোক কারো কাছে তার পাওনা কোনো বস্তু কব্জা করা, যখন সে পাওনাদারের কোনো সমজাতীয় বস্তু তার হাতে আসে।

দ্বিতীয় প্রকার: যে ব্যক্তি অনুমতি দেওয়ার অধিকার রাখে তার অনুমতির উপর যে কজা সহীহ হওয়া নির্ভরশীল: যেমন, বিক্রেতার অনুমতি সাপেক্ষে ক্রেতার পণ্য কব্জা করা। যে পণ্যের দাম করা হচ্ছে তা হাতে নেওয়া। ফাসেদ বিক্রি বলে পণ্য কজায় নেওয়া। বন্ধক রাখা বস্তু কজা করা। হেবা ও দানের বস্তু গ্রহণ করা। আমানতের বস্তু গ্রহণ করা। ধার কর্জ করা বস্তু বুঝে নেওয়া ইত্যাদি।

তৃতীয় প্রকার: এমন কজা যা শরীয়তের পক্ষ থেকেও অনুমোদিত নয়, অনুমতি প্রদান করার অধিকারীও যার অনুমতি দেয় না: এ ধরনের কজা অবৈধ হওয়া কব্জাকারীর হয় তো জানা থাকে। যেমন, লুণ্ঠনকারীর লুণ্ঠন করা বা ছিনতাইকারীর ছিনিয়ে নেওয়া। এক্ষেত্রে লুণ্ঠনকারী ও ছিনতাইকারী গোনাহগার হয়, যা সে নিয়েছে তাতে তার কোনো অধিকার নেই, মূল মালিকের পক্ষ থেকে অনুমতিও নেই। তাই তার সে বস্তু ফিরিয়ে দেওয়া কর্তব্য। নয়তো তার ক্ষতিপূরণ প্রদান করা অপরিহার্য।
কখনো অবৈধ কজা সম্পর্কে কজাকারীর জানা থাকে না। যেমন, কেউ তার সম্পদ ভেবে কোনো কিছু কব্জা করলেও পরে জানতে পেরেছে, এটি আসলে তার সম্পদ নয়। কারাফী বলেন, এক্ষেত্রে এ কথা বলা হবে না যে, শরীয়ত তাকে কজা করার অনুমতি দিয়েছে। বরং বলা হবে, তার গোনাহ ঝেড়ে ফেলে তাকে মাফ করে দিয়েছে। এ আলোচনায় এ কথাই প্রকাশ্য, তার গোনাহ হবে না, কিন্তু তা তার জন্যে বৈধও হবে না। তাকে মূল বস্তু বা তার ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।

টিকাঃ
৪০. কাওয়ায়েদুল আহকাম ফী মাসালিহিল আনাম, খ. ২, পৃ. ৭১; কারাফী প্রণীত শারহু তানকীহিল ফুসূল, পৃ. ৪৫৫; কারাফী প্রণীত আয-যাখীরা, খ. ১, পৃ. ১৫২
৪১. শারহু তানকীহিল ফুসূল, পৃ. ৪৫৬

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 বিধানগত কজা করা (القبض الحكمي)

📄 বিধানগত কজা করা (القبض الحكمي)


বিধানগত কজা ফকীহদের নিকট বাস্তব কব্জা করার তুল্য ও স্থলবর্তী, যদিও তাতে বাস্তবিক কজা ও গ্রহণ হয় না। নানাবিধ প্রয়োজন ও আবশ্যকতাাই বিধানগত কজার অস্তিত্ব এবং তা নির্ধারণের চাহিদা প্রকাশ করে, তাতে বাস্তবিক কজাকরণের যাবতীয় বিধান কার্যকর হওয়া দাবি করে। এ ধরনের কজা সংঘটিত হয় মোট তিন অবস্থায়:

এক. অস্থাবর সম্পদ ক্রেতার দখলে নিতে সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে কজা করতে সহায়তা করা। এটি হানাফী মাযহাবের বক্তব্য। এ সময় যদি অপরপক্ষ-ক্রেতা- পণ্যটি সত্যিকারভাবে গ্রহণ না করে, তাহলে তা হবে বিধানগত কজা ও দখল। যেমন: কোনো বস্তু গুণে নেওয়াকে হানাফী ফকীহগণ বাস্তবিক কজা বলে অভিহিত করেন। সেক্ষেত্রে গোনাহর সুযোগ করে দেওয়াই বিধানগত কজা বলে গণ্য হবে। ফলে সত্যিকার কজা করা হলে যে সকল বিধান কার্যকর হয় এক্ষেত্রেও সে বিধানগুলো কার্যকর হবে।

দুই. যেখানে কজা করায় সহায়তা কার্যকর হয় এবং কজাকারী ও কজায় সহায়তাকারী উভয়ের অধিকার সে বস্তুতে বরাবর হয়, সেখানে কব্জাকারীর কজা ধর্তব্য হয় তার নিয়ত ও অভিপ্রায় হিসাবে। বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করে কারাফী বলেন, কজা করায় সহায়তার এটিও একটি রূপ : ঋণদাতার হাতে ঋণগ্রহীতার কিছু সম্পদ রয়েছে। এ অবস্থায় ঋণগ্রহীতা ঋণদাতাকে তার হাতে থাকা সে সম্পদ নিজের সম্পদ হিসাবে নিয়ে নিতে বলল। তাহলে এটি কেবল অনুমতি প্রদানের মাধ্যমে কজা করানো হলো। ফলে নিয়ত হিসাবে এটি হলো কজা করা, বাস্তবক্ষেত্রে যদিও কজা বা স্থানান্তর কিছুই হয়নি। যেমন পিতার কাছে থাকা সন্তানের কোনো বস্তু পিতা তার কাছ থেকে কিনে নেওয়ার পর তা কব্জা করলে তা কেবল নিয়ত হিসাবেই হবে, বাস্তবে কোনো কিছুই ঘটবে না।

তিন, ঋণদাতাকে বিধানগতভাবে কজাকারী বিবেচনা করা হবে- যদি ঋণদাতার দায়িত্বে ঋণী ব্যক্তির সে পরিমাণ সম্পদ অনাদায়ী থাকে। যেহেতু ঋণদাতার হাতে যে সম্পদ রয়েছে তার মধ্য থেকে ঋণ পরিমাণ সম্পদের হকদার ঋণগ্রহীতা, তাই সে ঋণদাতার নিকট থেকে তা কজা করবে নতুন কোনো চুক্তির মাধ্যমে অথবা ঋণ আদায়ের অন্য কোনো পন্থায়। তখন সে সম্পদটুকু ঋণীব্যক্তির পক্ষ থেকে বিধানগতভাবে কজাকৃত বলে ধরা হবে, যদিও তা নিজের কাছে রাখবে ঋণদাতা স্বয়ং।
এ ধরনের মাসআলা ফকীহদের নিকট রয়েছে প্রচুর। তন্মধ্যে কিছু এখানে আলোচনা করা হলো:

ক. সোনা-রুপার একটির বদলে অপরটি চাওয়া
ইবনে কুদামা বলেন, সোনা-রুপার একটির বদলে অপরটি চাওয়া জায়েয। এটি তাহলে অধিকাংশ আলেমের মতে সরফ বিক্রি [মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা বিক্রি] হবে যার একদিকে হবে নগদ সোনা বা রূপা, অপরদিকে দায়। আল-আবী মালেকী বলেন, সরফ বিক্রিতে লেনদেন নগদ হওয়া কাম্য। দায়িত্বে সরফ হলে তা বাস্তবিক সরফ থেকে আরো আগে সম্পন্ন হবে। কেননা যা দায়িত্বে সম্পন্ন সরফ তাতে থাকে কেবল ঈজাব (প্রস্তাব), কবুল এবং একপক্ষ থেকে কব্জা করা। অথচ বাস্তব সরফ যা তা তো সম্পন্ন হয় উভয়পক্ষের কজা করার মাধ্যমে। সেটিই যখন শরীয়তসম্মত তাহলে যা আরো শীঘ্র সম্পন্ন হবে তা তো জায়েয হবেই।
তারা তাদের এ বক্তব্যের দলিল হিসাবে উপস্থাপন করেন আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর বর্ণিত একটি হাদীস। তিনি বলেন, আমি বাকী এলাকায় উট বেচাকেনা করতাম। আমি দীনারের বিপরীতে উট বিক্রি করে, দীনারের পরিবর্তে দিরহাম নিতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন: لَا بَأْسَ أَنْ تَأْخُذَهَا بِسِعْرٍ يَوْمِهَا مَا لَمْ تَفْتَرِقَا وَبَيْنَكُمَا شَيْءٌ "সে দিনের বাজারদরে লেনদেন হলে কোনো সমস্যা নেই, যতক্ষণ না তোমরা কোনো লেনদেন বাকি রেখে বিচ্ছিন্ন না হও।” শাওকানী বলেন, এ হাদীস এ কথার দলিল যে, মূল্যে বদল করা জায়েয যা এখনো দায়িত্বে রয়েছে। আর আলোচনার ভঙ্গিতে এ কথাও প্রকাশ্য, দিরহাম দীনার কোনোটিই সামনে উপস্থিত রাখা হয় না। বরং উপস্থিত থাকে একটি যেটি আবশ্যক করা হয়নি। (যেমন উপস্থিত থাকে দিরহাম, অথচ চুক্তিতে তা আবশ্যক করা হয়নি।) ফলে বোঝা গেল, যা দায়িত্বে থাকে তা সামনে না থাকলেও উপস্থিত ধরে নেওয়া হয়।

খ. সমান্তরাল হওয়া (الْمُقَاصَّةُ)
যদি ঋণদাতার কাছে ঋণগ্রহীতার কোনো সম্পদ থাকে যা ঋণদাতার প্রদত্ত ঋণের সাথে শ্রেণী-বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি সকল দিক দিয়ে একই ধরনের, সেক্ষেত্রে ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার সে অর্থ নিজের কব্জায় নিয়ে নিলে ঋণগ্রহীতার সে ঋণ আদায়ের দায় আর থাকে না; ফলে একের অপরের নিকট থেকে পাওনা সংগ্রহ এবং তা কজা করার ঝামেলাও আর পোহাতে হয় না। যদি দুজনের ঋণ সমপরিমাণ হয়, তাহলে তো উভয়ের চাহিদা পুরোপুরি পূর্ণ হবে এবং উভয় ঋণ হিসাব থেকে বাদ পড়ে যাবে। যদি একটি কম অপরটি অধিক হয়, তাহলে অধিক থেকে অল্প পরিমাণটুকু কর্তন করা হবে। অবশিষ্টটুকু হিসাবে বাকি থাকবে। এভাবে যেটুকু কর্তন হবে ততটুকু উভয়ের সম্পদ হিসাবে পরিগণিত হবে, অবশিষ্টটুকু একজন অপরজনের নিকট ঋণ হিসাবে পাবে।

গ. উভয় পক্ষের ঋণকে সরফ বিক্রিতে স্থানান্তর
হানাফী ও মালেকী ফকীহবৃন্দ, শাফেয়ী মাযহাবের সুবকী এবং হাম্বলী মাযহাবের ইবনে তাইমিয়া বলেন, যদি একজন অপরজনের কাছে দীনার পাবে, দ্বিতীয়জন প্রথমজনের কাছে পাবে দিরহাম, এ অবস্থায় তারা যদি তাদের দায় অদল-বদল করে তবে তা সহীহ হবে। তাহলে বাস্তব কব্জা করা ব্যতীত বিধানগতভাবে তাদের উভয়ের কব্জা সম্পন্ন হবে। যদিও একই মজলিসে উভয় পণ্য কব্জা করা সরফ বিক্রিতে শর্ত, এ কথায় সকল আলেম একমত, তারপরও এটা সহীহ ও সঠিক হবে। কেননা বিধানগত কজা করাকে এখানে বাস্তব কজা গণ্য করা হয়েছে। এখানে বাস্তবে কোনো পক্ষই যদিও কব্জা করেনি, কিন্তু বিধানগত কজা করেছে উভয় পক্ষই। তাই তা সহীহ হবে। তারা বলেন, দায়িত্বে উপস্থিত থাকা উভয় পণ্য বাস্তব উপস্থিত থাকার তুল্য। তবে এক্ষেত্রে মালেকী ফকীহগণ শর্ত করেছেন, উভয় ঋণ মেয়াদ হিসাবে সমসাময়িক হতে হবে। তাহলে সমমেয়াদের দুটো ঋণকে তারা নগদের বিপরীতে নগদ-এর স্থলবর্তী গণ্য করবেন, হাদীসে যাকে আল-ইয়াদ বিল ইয়াদ (اليد باليد) 'হাতে হাতে' বলা হয়েছে।
ইবনে তাইমিয়া বলেন, এখানে প্রত্যেকেই অপরের যা দায় রয়েছে তা কিনে নিচ্ছে নিজের দায়ের পরিবর্তে। যেন নিজের যা দায় তা হচ্ছে মূল্য, অপরের দায় হচ্ছে পণ্য। যেমন উভয়ের কাছে উভয়ের আমানত রাখা আছে, একজন অপরজনের আমানত কিনে নিলে বাস্তবে কিছুই না ঘটলেও অভ্যন্তরীণ অনেক রদবদল ঘটে। আমানতগুলো নিজস্ব সম্পদে পরিগণিত হয়। শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহগণ তাতে বিরোধিতা করেছেন। তারা বলেন, সরফ বিক্রিতে উভয় পক্ষের পণ্য মজলিসে উপস্থিত করা শর্ত। সেক্ষেত্রে একপক্ষের পণ্যও হাজির করা হবে না, উভয় দিকেই পণ্য হবে কেবল দায়িত্বে থাকা অর্থ, তা জায়েয হবে কী করে? এটি হবে বাকিতে বাকি মাল বিক্রি, যা জায়েয নয়।

ঘ. সালাম বিক্রির বিক্রেতার থাকা ঋণকে সালাম বিক্রির পুঁজি বানানো
হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের সকল ফকীহের অভিমত হচ্ছে, সালাম বিক্রিতে যে চাষী ফসল উৎপন্ন হলে ফসল প্রদান করবে, তার কাঁধে থাকা বকেয়া ঋণটাকেই সালাম বিক্রির পুঁজি নির্ধারণ করা যথাযথ ও বৈধ নয়। তাতে বাকিতে বাকি মাল বিক্রি হবে, যা হাদীসে নিষিদ্ধ হয়েছে।
ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়িম বলেন, যদি কোনো একজন অপরজনের কাছে কিছু দীনার পায়, সে যদি তা সালাম বিক্রির পুঁজি নির্ধারণ করে সে দীনারগুলো চাষীকে দিতে বলে, তাহলে সকল ফকীহের দৃষ্টিতে তা সহীহ হয়। অথচ এখানে দীনারগুলো বাস্তবিক কজা করা হয়নি, চাষীও তা এখনও কজা করেনি, তথাপি বিধানগত কজা পাওয়ার প্রেক্ষিতে সহীহ বলা হচ্ছে। এখানেও তা-ই হচ্ছে। সালাম বিক্রির পুঁজিদাতার চাষীর কাছে যে ঋণ রয়েছে তা-ই সে মূল্য হিসাবে ধার্য করছে। যেন চাষীর কাছ থেকে সে তা ঋণ পরিশোধ হিসাবে গ্রহণ করে তা আবার চাষীকে ফসলের মূল্য হিসাবে দিচ্ছে। ফলে বাস্তবের তুলনায় বিধানগত কজা হচ্ছে আরো আগে। তাই এখানে শরীয়তের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা আর থাকেনি।
ইবনুল কাইয়িম বলেছেন, যদি সালাম বিক্রি হিসাবে চাষী কাউকে এক কুর (আরব দেশীয় পরিমাণ) গম দেয় দশ দিরহাম মূল্য ধার্য করে, যা এখনও ক্রেতার দায়িত্বে রয়েছে। তাহলে চাষী ঐ লোকের কাছে ঋণ পাবে, অপরদিকে তার কাছে ক্রেতার পাওনা রয়েছে। তাহলে এভাবে তার এখানে যত পাওনা হবে ক্রেতার কাছে তার ঋণ তত হ্রাস পাবে। তিনি এরপর বলেন, এভাবে লেনদেন অবৈধ ও নাজায়েজ, এ মর্মে ইজমা ও ঐকমত্য হওয়ার দাবি করা হয়েছে, অথচ তা ঠিক নয়। আমাদের উস্তাদ (ইবনে তাইমিয়া) বলেছেন, এ ধরনের কোনো মাসআলার ইজমা হয়নি। তার এ কথাই সঠিক।

টিকাঃ
৪২. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২৪৪; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ২৬৩ ও ৪৬২; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৬১; দুরারুল হুককাম, খ. ২, পৃ. ২১৭
৪৩. শারহু তানকীহিল ফুসুল, পৃ. ৪৫৬; ইয ইবনে আব্দুস সালাম কৃত কাওয়ায়েদুল আহকাম, খ. ২, পৃ. ৭২
৪৪. শারহু তানকীহিল ফুসুল কারাফী কৃত, পৃ. ৪৫৬
৪৫. বস্তু, তার বৈশিষ্ট্য এবং আদায়ের সময় সবকিছু একই ধরনের।
৪৬. ইবনে কুদামা কৃত আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৫৪
৪৭. শারহু আল-আবী আলা সহীহ মুসলিম, খ. ৪, পৃ. ২৬৪
৪৮. আবু দাউদ, খ. ৩, পৃ. ৬৫১; আত-তালখীসুল হাবীর, খ. ৩, পৃ. ২৫
৪৯. নায়লুল আওতার, খ. ৫, পৃ. ১৫৭
৫০. মুরশিদুল হায়রান, ধারা : ২২২-২২৬, ২৩০-২৩১
৫১. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ২৩৯; যুরকানী আলা খলীল, খ. ৫, পৃ. ২৩১; মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ৩১০; আল-ইখতিয়ারাতুল ফিকহিয়্যা, পৃ. ১২৮; তবাকাতুশ শাফেঈয়্যা লিবনিস সুবকী, খ. ১০, পৃ. ২৩১; শারহু আল-আবী আলা মুসলিম, খ. ৪, পৃ. ২৬৪
৫২. আল-উম, খ. ৩, পৃ. ৩৩; তাকমিলা আল-মাজমুউ লিস সুবকী, খ. ১০, পৃ. ১০৭; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২০০; আল-মুবদি, খ. ৪, পৃ. ১৫৬; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৫৩; ইবনে তাইমিয়্যা রচিত নাজারিয়‍্যাতুল আকদ, পৃ. ২৩৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00