📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা
ক. এ। (আন-নকদ) : নগদ গ্রহণ, হস্তগত করা
ফকীহগণ নকদ শব্দটি ব্যবহার করেন যে অর্থে তা হচ্ছে, কোনো প্রদেয় বস্তু নগদ টাকা-পয়সা হলে তা কজা ও হস্তগত করতে দেওয়া, হস্তান্তর করা। আল-মিসবাহুল মুনীর গ্রন্থে বলা হয়েছে : نَقَدْتُ الرَّجُلِ الدَّرَاهِمَ "আমি লোকটিকে দিরহাম দিলে সে তা কজা করল" (মূল শাব্দিক অর্থ: আমি দিরহাম গ্রহণের সুযোগ দিলাম।) বলা হয়: انتَقَدَهُ "সে তা কজা করল, নিয়ন্ত্রণে নিল"। কাজী ইয়ায বলেন: নকদ (النَّقْدُ) শব্দটি দায়ন (الدَّيْنُ) (ঋণ) ও কর্ম (القَرْضُ) (কর্জ)-এর বিপরীত নগদ মুদ্রা বোঝায়। মূলত নকদ হচ্ছে মুদ্রা যাচাই করা, উত্তম মুদ্রা বাছাই করে পৃথক করা এবং অর্থদাতা ও তা গ্রহণকারীর পক্ষ থেকে জাল মুদ্রা পৃথক করে তা সরিয়ে ফেলা। যেহেতু এ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে একের নিকট থেকে অপরকে মুদ্রা হস্তগত করার সুযোগ দেওয়া হয়, তাই এ অর্থে নকদ শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে। ইবনে জুযাইয়ের বর্ণনামতে বায়উন নাব্দ (بيع النقد) হচ্ছে যে বিক্রিতে পণ্য ও তার মূল্য নগদ হস্তান্তর হয়। তাই যেখানে নদ হবে সেখানে কর্য (কজা) হবে, কিন্তু যেখানে কর্য হবে সেখানেই নদ হবে না।
খ. الْحَيَازة (আল-হিয়াযাহ): সংরক্ষণ/হেফাজত করা
ভাষাবিদগণ বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের জন্যে যা-কিছু সংরক্ষণ করে তার এ সংরক্ষণ হচ্ছে হিয়াযাহ্। তাই বলা হয় : حَازَهُ حَوْزًا وَحَيَازَةً "সে সংরক্ষণ/হেফাজত করল/অধিকারে নিল।"
হিয়াযাহ্-এর পারিভাষিক অর্থ: এ শব্দটি মালেকী মাযহাবেই অধিক ব্যবহৃত হয়। মালেকী মাযহাবের আলেমগণ শব্দটি তাদের লেখা গ্রন্থাদিতে দুটো অর্থে ব্যবহার করেছেন; তন্মধ্যে একটি অপরটির তুলনায় ব্যাপক।
এক. যে অর্থটি ব্যাপক তা হচ্ছে, কোনো বস্তুতে অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। সকল ফকীহের দৃষ্টিতে এটিই কর্য-এর অর্থ। সে হিসাবে উভয় শব্দ সমার্থক। কায়রাওয়ানী বলেন, হেবা (দান) সাদকা বা দখলদারিত্ব কোনো কিছুই হিয়াযাহ (সংরক্ষণ) ব্যতীত পূর্ণ হয় না। এর অর্থ, সম্পদ কব্জা করা ও হস্তগত করা ব্যতীত হেবা ও সাদকা ইত্যাদি পূর্ণ হয় না। তাসাউওলী বলেন: হাওয ও হিয়াযাহ হচ্ছে দখলযোগ্য বস্তুতে হাত রাখা, নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। হাসান ইবনে রাহ্হাল বলেন, হাওয ও কর্য হচ্ছে সমার্থক।
দুই. হিয়াযাহ শব্দের যে অর্থটি সীমিত আবুল হাসান মালেকী তার সংজ্ঞা বর্ণনা করে বলেন, হিয়াযাহ হচ্ছে অধিকারভুক্ত বস্তুতে হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ, যেমন কোনো বস্তুর মালিক তার মালিকানাধীন বস্তুতে হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন-ভবন নির্মাণ, গাছ লাগানো, নির্মাণ ভেঙ্গে ফেলা ইত্যাদি। হাত্তাব বলেন, হিয়াযাহ তিন ধাপে বিন্যস্ত: প্রথম: যা সর্বাপেক্ষা ক্ষীণ তা হচ্ছে, কোথাও বসবাস করা, ক্ষেতে ফসল উৎপাদন করা ইত্যাদি। দ্বিতীয়: যা মধ্যম মানের তা হচ্ছে, ভবন নির্মাণ বা ভেঙ্গে ফেলা, গাছ লাগানো, বাড়ি ভাড়া দেওয়া ইত্যাদি। তৃতীয়: বিক্রি বা দান কিংবা হেবা বা উপহার ইত্যাদির মাধ্যমে সম্পদ হাতছাড়া করা, ক্রীতদাস-দাসী মুক্ত করা বা চুক্তির বিনিময়ে মুক্তি বা মৃত্যু পরবর্তী মুক্তিদান ইত্যাদির মাধ্যমে মালিকানা থেকে বিদায় করা, এমনি আরো যে সকল কাজ মানুষ মালিকানাধীন বস্তুতে করে থাকে। আলোচনায় দেখা গেল, ব্যাপক অর্থ গ্রহণ করা হলে হিয়াযাহ্ ও কব্য হবে সমার্থক।
গ. اليد (আল-ইয়াদ): হস্তগত করা, দখলে নেওয়া, আয়ত্ত করা
শব্দটির মূল অর্থ: হাত। কিন্তু ফকীহগণ শব্দটি ব্যবহার করেন এ সকল অর্থে : অধিকার ও দখল এবং সেই প্রেক্ষিতে কোনো বস্তু ব্যবহার করা, উপকৃত হওয়া। যেমন, ফকীহগণ বলেন : الْبَيِّنَةُ عَلَى الْخَارِجِ "উৎপন্ন দ্রব্যে যার দখল রয়েছে তার দলিল-প্রমাণ যার দখলে নেই তার তুলনায় অগ্রগণ্য।” তারা এ মূলনীতি বর্ণনায় শব্দ এনেছেন যুল ইয়াদ (ذو ايد) যার দ্বারা উদ্দেশ্য: যার দখলে রয়েছে, যে উপকার লাভে সক্ষম। মুদাউওয়ানা গ্রন্থে বলা হয়েছে, আমি ইমাম মালেককে বললাম, আচ্ছা বলুন তো, যদি কোনো পণ্য আমার হাতে থাকে, তখন অন্য কোনো লোক দাবি করে, বস্তুটি তার। সে তার দাবির পক্ষে দলিলও উপস্থাপন করে। এটিকে আমিও দাবি করি এবং তা আমার হাতে রয়েছে। এ অবস্থায় আমি কি দলিলও প্রদান করব? ইমাম মালেক বললেন, যদি দুপক্ষের দলিল বরাবর হয় তাহলে জিনিসটি যার হাতে রয়েছে তার। ইয়াদ ও কর্য এ দু শব্দে সম্পর্ক হচ্ছে, ইয়াদ (অধিকার) কর্য (নিয়ন্ত্রণে) থাকা বোঝায়।
টিকাঃ
১০. আল-মিসবাহুল মুনীর, আস-সিহাহ, বালী রচিত আল-মাতলা, পৃ.২৩৪; কাজী ইয়ায রচিত মাশারেকুল আনওয়ার, খ. ২, পৃ. ২৩; আল-কামুসুল মুহীত, লিসানুল আরব, আল-মাতলা, পৃ. ২৬৫
১১. মুজামু মাকাঈসিল লুগাহ, লিসানুল আরব
১২. আল-কাওয়ানীন আল-ফিকহিয়্যা, পৃ. ২৫৪
১৩. জাওহারী কৃত আস-সিহাহ, কাফাভী কৃত আল-কুলিয়্যাত, খ. ২, পৃ. ১৮৭
১৪. রিসালা, তাহকীক মুহাম্মদ আবুল আজফান, পৃ. ২২৮; তাওয়াদা আলা তুহফা ইবনে আসেম, খ. ১, পৃ. ১৬৮
১৫. শারহুত তাসাউওলী আলাত তুহফা, খ. ১, পৃ. ১৬৮
১৬. হাশিয়া হাসান ইবনে রিহাল, আলা শারহি তুহফা ইবনে আসেম, খ. ১, পৃ. ১০৯; আল-কাওয়ানীন আল-ফিকহিয়্যা, পৃ. ৩২৮
১৭. কিফায়াতুত তালিব আর রাব্বানী শারহু রিসালা ইবনে আবি যায়দ কিরওয়ানী, খ. ২, পৃ. ৩৪০
১৮. মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৬, পৃ. ২২২
১৯. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১৭৫৯; জামেউল ফুসূলাইন, খ. ১, পৃ. ১০৭
২০. আল-মুদাউওয়ানা, খ. ১৩, পৃ. ৩৭
📄 কব্য-এর সাথে সম্পর্কিত বিধান
কব্য-এর সাথে সম্পর্কিত বিধান এবং এর প্রয়োগ পদ্ধতি নিয়ে ফকীহগণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
📄 কব্য করার নানা ধরন
বস্তু নানা ধরনের হওয়ার প্রেক্ষিতে তার কব্জা করাও হয় নানা ধরনের; এদিকে লক্ষ্য করলে কজাকৃত বস্তু হচ্ছে দু প্রকার: এক. স্থাবর সম্পদ [ইকার/عِقَار] এবং দুই. অস্থাবর সম্পদ [মানকূল /منقول]।
📄 ক. স্থাবর সম্পদ কজা করার ধরন
সকল ফকীহ একমত যে, স্থাবর সম্পদে কজা করা হচ্ছে, বিক্রেতা তা হতে দখল সরিয়ে নিয়ে মালিকের জন্যে খালি করে দেবে এবং তাতে অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে দেবে। যদি ক্রেতার নিয়ন্ত্রণ আরোপে কেউ বাধা দেয়, তাকে অধিকার স্থাপন করতে না দেয়, তাহলে বিক্রেতা তার হাত সরিয়ে দিলেও তা কজা বলে গণ্য হবে না।
শাফেয়ী আলেমগণ এক্ষেত্রে শর্তারোপ করে বলেন, যদি জমিতে কোনো পরিমাপের বিবেচনা না করা হয় তাহলে কেবল একপক্ষ অপর পক্ষের জন্যে জমি অধিকারমুক্ত করে দেওয়াই কব্জা করার জন্যে যথেষ্ট হবে। কিন্তু যদি জমিতে পরিমাপ বিবেচ্য হয়, গজ হিসাবে মেপে যদি ক্রেতা তা কেনে, তাহলে তা মেপেই দিতে হবে, কেবল খালি করে দেওয়া যথেষ্ট হবে না।
হানাফী আলেমগণ এক্ষেত্রে শর্ত করেন, জমিটি নিকটে থাকতে হবে, তাহলে না মেপে কেবল খালি করে দেওয়াই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে। যদি জমিটি দূরে থাকে, তাহলে তাতে শুধু অধিকারমুক্ত করে দেওয়াই কব্জা বলে বিবেচিত হবে না। এটি ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদের মত। এটিই হানাফী মাযহাবে নির্ভরযোগ্য অভিমত। ইমাম আবু হানিফা এর বিপরীত মত পোষণ করেছেন। তাঁর নিকট জমিটি নিকটে বা দূরে থাকায় কোনো পার্থক্য হবে না। ইবনে আবেদন বলেন, এ মাসআলায় নিকটে বলার দ্বারা উদ্দেশ্য ক্রেতা যে শহরে বাস করে জমিটি সে শহরেই থাকা। হানাফী ফকীহগণ এ আলোচনাকালে সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যদি জমিটিতে প্রাচীর বা বেষ্টনী থাকে এবং তাতে তালা মারার ব্যবস্থা থাকে, সে জমিতে নিজের অধিকার ছেড়ে দেওয়ার সাথে সাথে তালার চাবি ক্রেতার হাতে তুলে দিতে হবে, যা দিয়ে সে অনায়াসে তালা খুলে জমিতে ঢুকতে পারবে, তখন তা কজা বলে গণ্য হবে।
হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ জমি কব্জা করার সাথে সাথে সে জমিতে থাকা গাছের ফল সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে বিক্রেতা সুযোগ করে দেওয়া এবং কোনো বাধা না দেওয়াকেও যুক্ত করেছেন। যেহেতু তার প্রয়োজন রয়েছে এবং সকলের মাঝে তার প্রচলন ও পরিচিতিও রয়েছে।
টিকাঃ
২১. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৬১; আলমাজাল্লা আল আদলিয়্যা, ধারা: ২৬৩; মুরাশিদুল হায়রান, ধারা: ৪৩৫; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৩, পৃ. ৫১৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭১; আল-মাজমুউ শারহুল মুহাযযাব, খ. ৯, পৃ. ২৭৬; মিনাহুল জলীল, খ. ২, পৃ. ৬৯৮; মাওয়াহিবুল জলীল, খ. ৪, পৃ. ৪৭৭; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২০২; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩৩; এবং খ. ৫, পৃ. ৩৯৬
২২. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৩; রওজাতুত তালেবীন, খ. ৩, পৃ. ৫১৭
২৩. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৬১; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ১৬; আল-হামাভী আলাল আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, খ. ১, পৃ. ৩২৭; আল- মাজাল্লা আল আদলিয়্যা, ধারা ২৭০, ২৭১; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ৪৩৫ ও ৪৩৬।
২৪. শারহু মাআনিল আছার, খ. ৪, পৃ. ৩৬; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩৩; কাওয়ায়েদুল আহকাম, ইয ইবনে আব্দুস সালাম প্রণীত, খ. ২, পৃ. ৮১ ও ১৭২