📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 কব্‌য (الْقَبْضُ)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ

📄 কব্‌য (الْقَبْضُ)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ


কর্য (الْقَبْض) শব্দটি বব ধরব-এর মাসদার বা শব্দমূল। এর এক অর্থ: পুরো হাতের তালু দিয়ে কোনো কিছু ধরা। এ অর্থে বলা হয় : قَبْضُ السَّيْفِ وَغَيْرِه "তরবারি বা অন্য কিছু ধরা।” এ কথাটি এভাবেও বলা হয়: قَبَضَ الْيَدَ عَلَى الشَّيْءِ । আরো যে সকল অর্থে কব্য-এর ব্যবহার রয়েছে সেগুলো হচ্ছে: গ্রহণ করা, কজা করা, দখল করা। যেমন বলা হয়: قَبَضَ الْمَالِ "সে সম্পদ গ্রহণ করেছে, কজা বা দখল করেছে।” কর্য শব্দের অপর একটি অর্থ হচ্ছে: الْإِنْسَاكُ عَنِ الشَّيْء "বিরত থাকা, নিবৃত্ত থাকা।” বলা হয় : قَبَضَ يَدَهُ عَنِ الشَّيْء "সে দান থেকে বিরত থেকেছে। তাই দান ও ব্যয় ইত্যাদি থেকে হাত গুটিয়ে রাখাকেও কর্য বলা হয়।

কোনো কিছু কব্জা করা বা দখল করার ক্ষেত্রে কর্য শব্দটি ব্যবহৃত হয়, যদিও সেখানে হাতের তালু দিয়ে তা ধরা হয় না। যেমন : قَبَضْتُ الدَّارَ وَالْأَرْضَ مِنْ فُلَانٍ "আমি জমিটি বা বাড়িটি অমুকের নিকট থেকে আমার কব্জায় এনেছি।" বলা হয় : مَذَا الشَّيْءُ فِي قَبْضَةِ فُلَانٍ "এই জিনিসটি তার দখলে রয়েছে, তার মালিকানায় ও অধিকারে রয়েছে।” কখনো কর্য শব্দটা মৃত্যু বোঝায়। বলা হয় : قُبِضَ فُلَانٌ "অমুকের মৃত্যু হয়েছে।” সে অর্থেই মৃত ব্যক্তিকে মাকবৃষ (مقبوض) বলা হয়।

ইয ইবনে আব্দুস সালাম বলেন, মহান আল্লাহ বলেছেন: وَاللَّهُ يَقْبِضُ وَيَبْسُطُ "আল্লাহ তাআলাই (জীবিকা) সংকুচিত ও সম্প্রসারিত করেন।” অপর এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন : ثُمَّ قَبَضْنَاهُ إِلَيْنَا قَبْضًا يَسِيرًا "এরপর আমি তাকে (সূর্যকে) আমার দিকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে আনি।” এ সকল ক্ষেত্রে কব্য বোঝাচ্ছে অস্তিত্বহীন ও বিলোপ করা। কেননা, কোনো জায়গা থেকে যখন কোনো জিনিস কজা করা হয়, সে জায়গাটি তা থেকে খালি ও মুক্ত হয়, যেমন বস্তুটি অস্তিত্বহীন হলেও জায়গাটি খালি হয়ে যায়।

পারিভাষিক অর্থ: কোনো বস্তু দখল ও অধিকার করা, তাতে নিজ নিয়ন্ত্রণ স্থাপনে সক্ষম হওয়া। তা হাত দিয়ে ধরা সম্ভব হোক বা না হোক। কাসানী বলেন, কর্য হচ্ছে কোনো বস্তু হতে যাবতীয় বাধা সরে গিয়ে তাতে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ করে দেওয়া। বাধা বাস্তবিক, স্বভাবগত ও প্রচলিত যে ধরনেরই হোক না কেন। ইয ইবনে আব্দুস সালাম বলেন, লোকেরা বলে : قَبَضْتُ الدَّارَ وَالْأَرْضَ وَالْعَبْدَ وَالْبَعِيرَ "আমি বাড়ি, জমি, দাস ও উট কজা করেছি।" এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের দখলে নিয়ে আসা এবং তাতে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা লাভ করা।

টিকাঃ
১. জাওহারী কৃত আস-সিহাহ; রাগেব ইস্পাহানী কৃত আল-মুফরাদাত; ফিরোযাবাদী কৃত বাসায়েরু যাবিত তামীয, খ. ৪, পৃ. ২৮৮; আল-মিসবাহুল মুনীর, মুজামু মাকাঈসিল লুগাহ, মাতরুযী কৃত আল-মুগরিব।
২. সূরা বাকারা, আয়াত ২৪৫
৩. সূরা ফুরকান, আয়াত ৪৬
৪. ইয ইবনে আব্দুস সালাম কৃত আল-ইশারা ইলাল ঈজায ফী বাযি আনওয়াইল মাজায, পৃ. ১০৬
৫. ইবনে জুযাই কৃত আল-কাওয়ানীন আল-ফিকহিয়‍্যা, পৃ. ৩২৮; আল-বাহজাহ, খ. ১, পৃ. ১৬৮; মিয়ারা আলাল আসিমিয়‍্যা, খ. ২, পৃ. ১৪৪; হুদূদু ইবনে আরাফা এবং রাসসা কর্তৃক রচিত তার শরাহ, পৃ. ৪১৫
৮. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ১৪৮
৯. ইয ইবনে আব্দুস সালাম কৃত আল-ইশারা ইলাহ ঈজায, পৃ. ১০৬

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা

📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা


ক. এ। (আন-নকদ) : নগদ গ্রহণ, হস্তগত করা
ফকীহগণ নকদ শব্দটি ব্যবহার করেন যে অর্থে তা হচ্ছে, কোনো প্রদেয় বস্তু নগদ টাকা-পয়সা হলে তা কজা ও হস্তগত করতে দেওয়া, হস্তান্তর করা। আল-মিসবাহুল মুনীর গ্রন্থে বলা হয়েছে : نَقَدْتُ الرَّجُلِ الدَّرَاهِمَ "আমি লোকটিকে দিরহাম দিলে সে তা কজা করল" (মূল শাব্দিক অর্থ: আমি দিরহাম গ্রহণের সুযোগ দিলাম।) বলা হয়: انتَقَدَهُ "সে তা কজা করল, নিয়ন্ত্রণে নিল"। কাজী ইয়ায বলেন: নকদ (النَّقْدُ) শব্দটি দায়ন (الدَّيْنُ) (ঋণ) ও কর্ম (القَرْضُ) (কর্জ)-এর বিপরীত নগদ মুদ্রা বোঝায়। মূলত নকদ হচ্ছে মুদ্রা যাচাই করা, উত্তম মুদ্রা বাছাই করে পৃথক করা এবং অর্থদাতা ও তা গ্রহণকারীর পক্ষ থেকে জাল মুদ্রা পৃথক করে তা সরিয়ে ফেলা। যেহেতু এ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে একের নিকট থেকে অপরকে মুদ্রা হস্তগত করার সুযোগ দেওয়া হয়, তাই এ অর্থে নকদ শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে। ইবনে জুযাইয়ের বর্ণনামতে বায়উন নাব্‌দ (بيع النقد) হচ্ছে যে বিক্রিতে পণ্য ও তার মূল্য নগদ হস্তান্তর হয়। তাই যেখানে নদ হবে সেখানে কর্য (কজা) হবে, কিন্তু যেখানে কর্য হবে সেখানেই নদ হবে না।

খ. الْحَيَازة (আল-হিয়াযাহ): সংরক্ষণ/হেফাজত করা
ভাষাবিদগণ বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের জন্যে যা-কিছু সংরক্ষণ করে তার এ সংরক্ষণ হচ্ছে হিয়াযাহ্। তাই বলা হয় : حَازَهُ حَوْزًا وَحَيَازَةً "সে সংরক্ষণ/হেফাজত করল/অধিকারে নিল।"
হিয়াযাহ্-এর পারিভাষিক অর্থ: এ শব্দটি মালেকী মাযহাবেই অধিক ব্যবহৃত হয়। মালেকী মাযহাবের আলেমগণ শব্দটি তাদের লেখা গ্রন্থাদিতে দুটো অর্থে ব্যবহার করেছেন; তন্মধ্যে একটি অপরটির তুলনায় ব্যাপক।
এক. যে অর্থটি ব্যাপক তা হচ্ছে, কোনো বস্তুতে অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। সকল ফকীহের দৃষ্টিতে এটিই কর্য-এর অর্থ। সে হিসাবে উভয় শব্দ সমার্থক। কায়রাওয়ানী বলেন, হেবা (দান) সাদকা বা দখলদারিত্ব কোনো কিছুই হিয়াযাহ (সংরক্ষণ) ব্যতীত পূর্ণ হয় না। এর অর্থ, সম্পদ কব্জা করা ও হস্তগত করা ব্যতীত হেবা ও সাদকা ইত্যাদি পূর্ণ হয় না। তাসাউওলী বলেন: হাওয ও হিয়াযাহ হচ্ছে দখলযোগ্য বস্তুতে হাত রাখা, নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। হাসান ইবনে রাহ্হাল বলেন, হাওয ও কর্য হচ্ছে সমার্থক।
দুই. হিয়াযাহ শব্দের যে অর্থটি সীমিত আবুল হাসান মালেকী তার সংজ্ঞা বর্ণনা করে বলেন, হিয়াযাহ হচ্ছে অধিকারভুক্ত বস্তুতে হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ, যেমন কোনো বস্তুর মালিক তার মালিকানাধীন বস্তুতে হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন-ভবন নির্মাণ, গাছ লাগানো, নির্মাণ ভেঙ্গে ফেলা ইত্যাদি। হাত্তাব বলেন, হিয়াযাহ তিন ধাপে বিন্যস্ত: প্রথম: যা সর্বাপেক্ষা ক্ষীণ তা হচ্ছে, কোথাও বসবাস করা, ক্ষেতে ফসল উৎপাদন করা ইত্যাদি। দ্বিতীয়: যা মধ্যম মানের তা হচ্ছে, ভবন নির্মাণ বা ভেঙ্গে ফেলা, গাছ লাগানো, বাড়ি ভাড়া দেওয়া ইত্যাদি। তৃতীয়: বিক্রি বা দান কিংবা হেবা বা উপহার ইত্যাদির মাধ্যমে সম্পদ হাতছাড়া করা, ক্রীতদাস-দাসী মুক্ত করা বা চুক্তির বিনিময়ে মুক্তি বা মৃত্যু পরবর্তী মুক্তিদান ইত্যাদির মাধ্যমে মালিকানা থেকে বিদায় করা, এমনি আরো যে সকল কাজ মানুষ মালিকানাধীন বস্তুতে করে থাকে। আলোচনায় দেখা গেল, ব্যাপক অর্থ গ্রহণ করা হলে হিয়াযাহ্ ও কব্য হবে সমার্থক।

গ. اليد (আল-ইয়াদ): হস্তগত করা, দখলে নেওয়া, আয়ত্ত করা
শব্দটির মূল অর্থ: হাত। কিন্তু ফকীহগণ শব্দটি ব্যবহার করেন এ সকল অর্থে : অধিকার ও দখল এবং সেই প্রেক্ষিতে কোনো বস্তু ব্যবহার করা, উপকৃত হওয়া। যেমন, ফকীহগণ বলেন : الْبَيِّنَةُ عَلَى الْخَارِجِ "উৎপন্ন দ্রব্যে যার দখল রয়েছে তার দলিল-প্রমাণ যার দখলে নেই তার তুলনায় অগ্রগণ্য।” তারা এ মূলনীতি বর্ণনায় শব্দ এনেছেন যুল ইয়াদ (ذو ايد) যার দ্বারা উদ্দেশ্য: যার দখলে রয়েছে, যে উপকার লাভে সক্ষম। মুদাউওয়ানা গ্রন্থে বলা হয়েছে, আমি ইমাম মালেককে বললাম, আচ্ছা বলুন তো, যদি কোনো পণ্য আমার হাতে থাকে, তখন অন্য কোনো লোক দাবি করে, বস্তুটি তার। সে তার দাবির পক্ষে দলিলও উপস্থাপন করে। এটিকে আমিও দাবি করি এবং তা আমার হাতে রয়েছে। এ অবস্থায় আমি কি দলিলও প্রদান করব? ইমাম মালেক বললেন, যদি দুপক্ষের দলিল বরাবর হয় তাহলে জিনিসটি যার হাতে রয়েছে তার। ইয়াদ ও কর্য এ দু শব্দে সম্পর্ক হচ্ছে, ইয়াদ (অধিকার) কর্য (নিয়ন্ত্রণে) থাকা বোঝায়।

টিকাঃ
১০. আল-মিসবাহুল মুনীর, আস-সিহাহ, বালী রচিত আল-মাতলা, পৃ.২৩৪; কাজী ইয়ায রচিত মাশারেকুল আনওয়ার, খ. ২, পৃ. ২৩; আল-কামুসুল মুহীত, লিসানুল আরব, আল-মাতলা, পৃ. ২৬৫
১১. মুজামু মাকাঈসিল লুগাহ, লিসানুল আরব
১২. আল-কাওয়ানীন আল-ফিকহিয়‍্যা, পৃ. ২৫৪
১৩. জাওহারী কৃত আস-সিহাহ, কাফাভী কৃত আল-কুলিয়‍্যাত, খ. ২, পৃ. ১৮৭
১৪. রিসালা, তাহকীক মুহাম্মদ আবুল আজফান, পৃ. ২২৮; তাওয়াদা আলা তুহফা ইবনে আসেম, খ. ১, পৃ. ১৬৮
১৫. শারহুত তাসাউওলী আলাত তুহফা, খ. ১, পৃ. ১৬৮
১৬. হাশিয়া হাসান ইবনে রিহাল, আলা শারহি তুহফা ইবনে আসেম, খ. ১, পৃ. ১০৯; আল-কাওয়ানীন আল-ফিকহিয়‍্যা, পৃ. ৩২৮
১৭. কিফায়াতুত তালিব আর রাব্বানী শারহু রিসালা ইবনে আবি যায়দ কিরওয়ানী, খ. ২, পৃ. ৩৪০
১৮. মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৬, পৃ. ২২২
১৯. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১৭৫৯; জামেউল ফুসূলাইন, খ. ১, পৃ. ১০৭
২০. আল-মুদাউওয়ানা, খ. ১৩, পৃ. ৩৭

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 কব্‌য-এর সাথে সম্পর্কিত বিধান

📄 কব্‌য-এর সাথে সম্পর্কিত বিধান


কব্‌য-এর সাথে সম্পর্কিত বিধান এবং এর প্রয়োগ পদ্ধতি নিয়ে ফকীহগণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 কব্‌য করার নানা ধরন

📄 কব্‌য করার নানা ধরন


বস্তু নানা ধরনের হওয়ার প্রেক্ষিতে তার কব্জা করাও হয় নানা ধরনের; এদিকে লক্ষ্য করলে কজাকৃত বস্তু হচ্ছে দু প্রকার: এক. স্থাবর সম্পদ [ইকার/عِقَار] এবং দুই. অস্থাবর সম্পদ [মানকূল /منقول]।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00