📄 চুক্তিতে কবুল করার শর্তাবলি
চুক্তিতে কবুল করার বিভিন্ন শর্ত রয়েছে। যেমন:
ক. কবুল হবে ঈজাব অনুযায়ী:
এটি সকল চুক্তিতে শর্ত। উদাহরণত: বিক্রির ক্ষেত্রে বিক্রেতা যেভাবে প্রস্তাব করবে ক্রেতার সেভাবে কবুল করা শর্ত। যদি ক্রেতা এর অন্যথা করে, যেমন সে বিক্রেতার প্রস্তাবকৃত বিষয় ভিন্ন অন্য বিষয় কবুল করল, বা তার আংশিক বস্তু কবুল করল, তাহলে চুক্তি সম্পন্ন হবে না। সুতরাং বিক্রেতা যদি বলে, আমি তোমার কাছে দশ দিরহামে বিক্রি করলাম আর ক্রেতা বলল, আমি তা আট দিরহামে কবুল করলাম, তাহলে বিক্রি সম্পন্ন হবে না।
খ. ঈজাবের মজলিসে কবুল হওয়া:
হানাফী ফকীহরা এ শর্তকে ইত্তিহাদুল মাজলিস (اِتَّحَادُ الْمَجْلِس) বা 'মজলিস এক হওয়া শব্দে' ব্যক্ত করেন। এর দ্বারা উদ্দেশ্য, কবুল করার পূর্বে দুই চুক্তিকারীর আলাদা না হওয়া এবং যে কাজে মজলিস সংঘটিত হয়েছে সে কাজ ছাড়া অন্য কাজে প্রস্তাব দানকারী বা গ্রহণকারীর ব্যস্ত না হওয়া। এর কারণ, মজলিসের অবস্থা চুক্তির অবস্থার ন্যায়। সুতরাং উভয় পক্ষ যদি কবুল প্রকাশ করার পূর্বে আলাদা হয়ে যায়, অথবা সামাজিক প্রচলনে মজলিস শেষ বোঝায় এমন কোনো কাজে ব্যস্ত হয়, তাহলে চুক্তি সম্পন্ন হবে না। যেহেতু চুক্তি ভিন্ন অন্য কাজে ব্যস্ত হওয়া বা মজলিস ভেঙ্গে দেওয়া চুক্তিতে অনীহা প্রকাশ করে। এটি সকল আলেমের ঐকমত্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
ঈজাবের পর কবুলকে বিলম্বিত করায় কোনো সমস্যা নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত উভয়ে মজলিসে থাকে এবং প্রচলনে মজলিস ভেঙ্গে দেওয়া বোঝায় এমন কাজে ব্যস্ত না হয়। এটি হানাফীদের, মালেকীদের ও হাম্বলীদের মত। শাফেয়ীগণ বলেন, যে সকল চুক্তিতে কবুল করা শর্ত, সেগুলোতে প্রস্তাবদানের পরপর কবুল করবে। তবে সামান্য পরে হওয়া তাদের মতে সমস্যা নয়।
গ. কবুল বাধ্যতামূলক না হওয়া:
এক চুক্তিসম্পাদনকারীর তরফ থেকে ঈজাব করার পর চুক্তি সম্পাদনকারী অপর ব্যক্তির ইচ্ছাধিকার রয়েছে। ইচ্ছা হলে মজলিসে সে কবুল করবে। ইচ্ছা হলে ঈজাব প্রত্যাখ্যান করবে। এটিকে হানাফীগণ খিয়ারুল কবুল (خِيَارُ الْقَبُولِ) (গ্রহণের ইচ্ছাধিকার) শব্দে ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, যদি অপর পক্ষের জন্য খিয়ারুল কবুল সাব্যস্ত না হয় তাহলে তার অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিক্রির বিধান তার জন্য আবশ্যক হয়ে যাবে। খিয়ারুল কবুল মজলিস শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রলম্বিত হবে। সুতরাং যতক্ষণ মজলিস বহাল থাকবে ততক্ষণ দ্বিতীয় পক্ষের অধিকার থাকবে গ্রহণ করা বা প্রত্যাখ্যান করার, যদি না প্রস্তাবদাতা মজলিস শেষ হওয়ার পূর্বে তার প্রস্তাব ফিরিয়ে নেয়।
হানাফীদের সাথে এক্ষেত্রে শাফেয়ীগণ ও হাম্বলীগণ অভিন্নমত পোষণ করেন। কেননা তারা মজলিসের খিয়ার (خَيَارُ الْمَجْلِسِ) ও ইচ্ছাধিকার গ্রহণ করেন সে হাদীস অনুযায়ী আমলের ভিত্তিতে যা ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: إِذَا تَبَايَعَ الرَّجُلَانِ فَكُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا بِالْخِيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا "যখন দুজন লোক বেচাকেনা করে তখন তাদের উভয়ের ইচ্ছাধিকার থাকে, যতক্ষণ না তারা পৃথক হয়।”
মালেকীদের মতে যে প্রথম কথা বলবে তার বক্তব্য ফিরিয়ে নেওয়া জায়েয নেই, যদিও ফিরিয়ে নেওয়া অপর পক্ষের অনুমোদনের পূর্বে হয়। তবে একটি অবস্থা ভিন্ন। তা হচ্ছে, যদি প্রথম কথা বলা ব্যক্তি বর্তমান বা ভবিষ্যৎবাচক শব্দ (فعل مُضارع) দিয়ে কথা বলে, তারপর দাবি করে যে, এটা বলে সে বিক্রি করার উদ্দেশ্য করেনি; বরং এটা দ্বারা সে ওয়াদা বা দুষ্টুমি করেছে। তাহলে সে কসম করবে এবং তাকে (দাবিতে) সত্যায়ন করা হবে।
প্রস্তাবদানের পর যদি প্রস্তাবের মিলমত কবুল হয়ে থাকে, তাহলে এই কার্য আবশ্যক হবে। এই কার্য বাতিল করা জায়েয হবে না, যদি এটি আবশ্যক জাতীয় কার্যক্রম হয়। যেমন, বিক্রি ও ইজারা। এটি হানাফীদের ও মালেকীদের মত। শাফেয়ী ও হাম্বলীদের মতে, মজলিস শেষ হওয়া অথবা বিক্রি আবশ্যক করা ছাড়া পণ্যে অন্য কোনো কর্তৃত্ব আবশ্যক হয় না।
ইবনে কুদামা রহ. দলিল হিসেবে পেশ করেন ইবনে উমর রা.-এর বর্ণিত হাদীস, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: إِذَا تَبَايَعَ الرَّجُلَانِ فَكُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا بِالْخِيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا ، وَكَانَا جَمِيعًا ، أَوْ يُخَيَّرُ أَحَدُهُمَا الْآخَرَ ، فَإِنْ خَيْرَ أَحَدُهُمَا الْآخَرَ فَتَبَايَعًا عَلَى ذَلِكَ فَقَدْ وَجَبَ الْبَيْعُ ، وَإِنْ تَفَرَّقَا بَعْدَ أَنْ تَبَايَعًا وَلَمْ يَتْرُكْ أَحَدُهُمَا الْبَيْعَ فَقَدْ وَجَبَ الْبَيْعُ .
"যখন দুজন লোক বেচাকেনা করে তখন তারা উভয়ে ইচ্ছাধিকার পাবে, যতক্ষণ তারা আলাদা না হয় এবং উভয়ে একসাথে থাকে। অথবা একজন অপরজনকে ইচ্ছাধিকার দেয়। যদি একজন অপরজনকে ইচ্ছাধিকার দেয়, এর ভিত্তিতে বেচাকেনা করে, তাহলে বিক্রি আবশ্যক হবে। আর যদি বিক্রির পর তারা আলাদা হয়, একজনও বিক্রি না ছেড়ে দেয়, তাহলে বিক্রি আবশ্যক হবে।" এ বিষয়ের বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্য : খিয়ারুল মজলিস।
ঘ. কবুলকারী হস্তক্ষেপ করার যোগ্য হওয়া:
এর অর্থ হলো কবুলকারী প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন হওয়া। অর্থনৈতিক সকল লেনদেনে এটি শর্ত। সুতরাং শিশু বা পাগলের কবুল করা সহীহ হবে না। এক্ষেত্রে তাদের স্থলাভিষিক্ত হবে পিতা, অভিভাবক বা বিচারক। স্বেচ্ছাসেবা জাতীয় চুক্তি যেমন অসিয়ত ও হেবা ইত্যাদির ক্ষেত্রে শিশু ও পাগলের কবুল করা সহীহ হবে, যেহেতু এতে তাদের খুশি ও আনন্দ রয়েছে। এই কবুল করা অভিভাবক বা তত্ত্বাবধায়কের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হবে না। এটা সামগ্রিক বিধান।
টিকাঃ
২৪. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫; আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২৩০; হাশিয়াতুল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ১৪; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ১৪৬-১৪৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৬
২৫. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৫, পৃ. ১৩৭; আল-হিদায়া, খ. ৩, পৃ. ২১; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ১৯-২০, খ. ২, পৃ. ২৬৬; দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ৫; আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২৪০; আল-জুমাল, খ. ৩, পৃ. ১২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৬; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৪১
২৬. হাদীসটি বুখারী রহ. উদ্ধৃত করেছেন, ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৩৩৩; মুসলিম রহ. উদ্ধৃত করেছেন, খ. ৩, পৃ. ১১৬৩
২৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ১৩৪; আল-হিদায়া, খ. ৩, পৃ. ২১; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ২৯; আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২৪০; দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৪৩-৪৪; আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৫৬৩
২৮. ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ২০; আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২২৮; হাশিয়াতুল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ১০; আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৫৬৩
২৯. এ হাদীসটির মূল বিবৃত হয়েছে বুখারী (ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৩৩৩) ও মুসলিম (খ. ৩, পৃ. ১১৬৩) গ্রন্থে।