📄 কবুল সংশ্লিষ্ট বিধানাবলি
কবুল কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, কখনো বান্দার পক্ষ থেকে। এর বিবরণ নিম্নে দেওয়া হলো:
প্রথম: মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কবুল করা:
আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কবুল দুটি অর্থে প্রয়োগ হয়।
প্রথম: ক্ষমা করা, গোপন করা ও মার্জনা করা। বান্দার তওবা কবুল করার ক্ষেত্রে শব্দটি এ অর্থে ব্যবহৃত হয়। সামনের আয়াতে কবুল শব্দ দ্বারা এই অর্থই নির্দেশিত : وَهُوة الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ “তিনি তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং পাপ মোচন করেন।”
দ্বিতীয়: আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কবুল করার অর্থ আমলের সওয়াব ও প্রতিদান দেওয়া। তবে এই অর্থের ক্ষেত্রে আমলটি সহীহ হওয়া ও জিম্মাদারী আদায়ের জন্য যথেষ্ট হওয়া এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কবুল করার মাঝে কি পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে, না নেই; তা নিয়ে আলেমদের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে।
কারাফী বলেন, এক্ষেত্রে একটি মূলনীতি রয়েছে। তা হলো, কবুল হওয়া, জিম্মা আদায়ে যথেষ্ট হওয়া এবং আমল সহীহ হওয়া ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। সুতরাং জিম্মা আদায়ে যথেষ্ট আমল, আর সেটিই সহীহ আমল, যার শর্তাদি ও আরকানসমূহ (সকল মৌলিক অংশ) পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান। সহীহ হওয়ার ক্ষেত্রে যাবতীয় প্রতিবন্ধক অনুপস্থিত। সকলের ঐকমত্যে এমন আমল করলে ব্যক্তি আমল আদায়ের জিম্মা বা দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়। এ আমলের আদায়কারী হয় অনুগত ও জিম্মামুক্ত। এটি আবশ্যকীয় ও ঐকমত্যপূর্ণ বিষয়।
আর আমলের বিনিময়ে সওয়াব লাভ করার বিষয়ে মুহাক্কিক আলেমদের মত, সওয়াব লাভ আবশ্যক নয়। কতক ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা আমলের জিম্মামুক্ত করেন: তবে সওয়াব দেন না। এটি আমল কবুল করার অর্থ। কয়েকটি বিষয় এই অর্থ নির্দেশ করে।
প্রথম বিষয়: দুই আদমপুত্রের ঘটনা সম্পর্কে আয়াত : إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ “অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকীদের কুরবানী কবুল করেন।”
দুভাই যখন কুরবানী করল, একজনের পক্ষ থেকে কুরবানী কবুল করা হলো, অপরজনের কুরবানী কবুল করা হয়নি। অথচ দ্বিতীয়জনের কুরবানী ছিল আদেশ অনুযায়ী। এর দ্বারা অনুমেয়, অপর ভাইয়ের তাকওয়া না থাকাকে কবুল না হওয়ার কারণ গণ্য করা হয়েছে। যদি তার আমল সত্তাগতভাবে ত্রুটিযুক্ত হতো তাহলে অপর ভাই তাকে বলত, আল্লাহ শুধু সঠিক আমল কবুল করেন। কেননা আমল কবুল না হওয়ার এটি ছিল নিকটবর্তী কারণ। সুতরাং ভাই যখন এই কারণ দর্শানো বাদ দিয়ে অন্য কারণ বলল, তখন প্রমাণিত হলো তার আমলটি সহীহ ও জিম্মা আদায়ে যথেষ্ট ছিল। তবে তাকওয়া না থাকার কারণে আমলটি কবুল হয়নি। সুতরাং বোঝা গেল, জিম্মা আদায়ে যথেষ্ট আমল কখনো কখনো কবুল হয় না, যদিও তা দ্বারা দায়মুক্ত হওয়া যায় এবং সত্তাগতভাবে তা সহীহ হয়।
দ্বিতীয় বিষয়: ইবরাহীম ও ইসমাঈল আ. সম্পর্কে কুরআনের বর্ণনা: وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ "স্মরণ করো, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কাবাঘরের দেয়াল তুলছিলেন, তারা বলছিলেন, হে আমাদের প্রতিপালক। আমাদের এই কাজ কবুল ও গ্রহণ করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাত।”
এভাবে তাদের উভয়ের আমল কবুল হওয়ার আবেদন প্রমাণ করে, সহীহ আমল হলেই তা কবুল হওয়া আবশ্যক নয়। অথচ তারা উভয়ে সহীহ আমলই করেছেন। আর তাই তারা উভয়ে নিজেদের আমলের জন্য কবুল হওয়ার দোয়া করেছেন।
তৃতীয় বিষয়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ হাদীস। তিনি বলেছেন: مَنْ أَحْسَنَ فِي الْإِسْلَامِ لَمْ يُوَاخَذْ بِمَا عَمِلَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ ، وَمَنْ أَسَاءَ فِي الْإِسْلَامِ أُوحِذَ بِالْأَوَّلِ وَالْآخِرِ "যে ইসলামে (মুসলিম অবস্থায়) উত্তম আমল করবে, জাহিলিয়্যাতে (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) কৃত আমলের কারণে তাকে পাকড়াও করা হবে না। আর যে মুসলিম হয়ে অন্যায় আমল করবে তাকে পূর্বাপর সমস্ত আমলের কারণে পাকড়াও করা হবে।”
উল্লিখিত হাদীসে প্রতিদান অর্থাৎ সওয়াব প্রদানের জন্য মুসলিম অবস্থায় উত্তমভাবে আমলের শর্ত করা হয়েছে। আর ইসলামে ইহসান (অর্থাৎ উত্তমভাবে আমল করা) হলো তাকওয়া।
চতুর্থ বিষয়: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর পশু যখন যবেহ করলেন, বললেন : اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنْ مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ "হে আল্লাহ! আপনি এটি মুহাম্মদ ও মুহাম্মদের পরিবারের পক্ষ থেকে কবুল করুন।" নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবুল করার দোয়া করেছেন। অথচ কুরবানী সংশ্লিষ্ট তাঁর আমল ছিল শরীয়া অনুযায়ী। তাহলে এই দোয়া প্রমাণ করে, জিম্মামুক্ত হওয়া এবং জিম্মা আদায়ে যথেষ্ট হওয়া থেকে কবুল হওয়া ভিন্ন আরেকটি বিষয়। অন্যথায় নবী স. কবুল হওয়ার দোয়া করতেন না। যেহেতু অর্জিত বিষয়ের অর্জন করার দোয়া জায়েয নেই।
পঞ্চম বিষয়: নেককার ও উত্তম ব্যক্তিগণ সর্বদা আল্লাহর কাছে আমল কবুল হওয়ার দোয়া করতে থাকেন। যদি এই দোয়া আমল সহীহ ও জিম্মা আদায় হওয়ার জন্য করা হতো, তাহলে আমল শুরু করার পূর্বে এই দোয়া করা উত্তম হতো। তখন আল্লাহ তাআলার কাছে সকল শর্ত ও আরকান সহজ করে দেওয়া এবং আমল সহীহ হওয়ার যাবতীয় প্রতিবন্ধক দূর হওয়ার দোয়া করতেন। আমল সম্পাদিত হওয়ার বিষয়টি দৃঢ় হওয়ার পর এই দোয়া করা উত্তম হতে পারে না।
উল্লিখিত কারণগুলো প্রমাণ করে, কবুল হওয়া হচ্ছে, কোনো জিম্মা আদায়ে যথেষ্ট হওয়া এবং আমল সহীহ হওয়া ভিন্ন অন্য একটি বিষয়। আর সেটি হলো সওয়াব লাভ করা।
দ্বিতীয়: এক ব্যক্তির কাজ অপর ব্যক্তির কবুল করা:
এক বান্দার কাজ অপর বান্দার কবুল করা ঐ কার্যক্রমে ঘটে যেগুলো তাদের মাঝেই পূর্ণ হয়। এই কার্যক্রমের কিছু এমন যেগুলো সম্পাদনের জন্য কবুল করা শর্ত। এগুলো এমন চুক্তি যেগুলো উভয় পক্ষের ইচ্ছায় পূর্ণ হয়। যেমন বিক্রি, ইজারা, আরিয়া, ওদীআত, ঋণ, সন্ধি, বিবাহ ইত্যাদি। এই সকল চুক্তি সম্পাদন হওয়া কবুল করার ওপর নির্ভরশীল। যেহেতু কবুল করা ঈজাব বা প্রস্তাবদানের পরিপূরক কাজ। আর প্রস্তাবদান ও প্রস্তাব গ্রহণ ছাড়া চুক্তি পূর্ণ ও সম্পাদিত হয় না। এর কারণ, এ দুটি বিষয় চুক্তির মূল কাঠামোকে রূপ দান করে।
কার্যক্রমের কিছু এমন রয়েছে, যেগুলোতে কবুল করা শর্ত হয় না। সেগুলো একজনের ইচ্ছায়ই সম্পাদিত হয়। এ জাতীয় একটি হচ্ছে: অনির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য ওয়াকফ করা। যেমন মসজিদের জন্য ওয়াক্ফ্ফ, দরিদ্র ও মিসকীনদের জন্য ওয়াকফ। অসীয়ত করার বিধানও অনুরূপ। এ জাতীয় কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে স্রেফ বিয়োজন জাতীয় কার্যক্রম: যেমন তালাক দেওয়া, গোলামকে মুক্ত করা, যদি উভয়টি বিনিময়শূন্য হয়ে থাকে। উল্লিখিত কার্যগুলোতে কবুল করা শর্ত নয়। এগুলো পূর্ণ হওয়ার জন্য শুধু ঈজাব বা প্রস্তাব পেশ যথেষ্ট।
এ কার্যক্রমে কিছু এমন রয়েছে, যেগুলোতে কবুল শর্ত হওয়ার বিষয়ে মত ভিন্নতা রয়েছে। যেমন দায়মুক্ত করা। এটি নিয়ে মতভিন্নতার ভিত্তি হলো, এতে কি হক বিয়োজন করা হয়, না মালিক বানানো হয়, তা নিয়ে মতভিন্নতা। কবুল করা সংক্রান্ত একটি আলোচনা রয়েছে যা চুক্তির ক্ষেত্র বহির্ভূত। যেমন সাক্ষীর সাক্ষ্য কবুল করা, অলীমার দাওয়াত কবুল করা ইত্যাদি। এগুলোর আলোচনা সামনে আসছে।
সাক্ষ্য গ্রহণ করা:
সাক্ষীর সাক্ষ্য কবুল করার অর্থ হলো: সাক্ষী যা সাক্ষ্য দেবে বিচারক তা সত্য বলে মেনে নেওয়া, যেন তার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রায়প্রদান সম্ভব হয়। কেননা সাক্ষ্য একটি শরয়ী দলিল যা সত্য বিষয় প্রকাশ করে এবং বিচারে সাক্ষ্য অনুযায়ী ফয়সালা করা আবশ্যক করা। কেননা সাক্ষ্যদানের শর্ত যখন পূর্ণ হয় তখন তা সত্য বিষয়কে প্রতিষ্ঠা করে। আর বিচারক সত্য অনুযায়ী ফয়সালা দেওয়ার জন্য আদিষ্ট।
সাক্ষ্য অনুযায়ী বিধান প্রয়োগের দিক বিবেচনা করে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ফকীহগণ বেশ কিছু শর্ত প্রণয়ন করেছেন। সেগুলো হয়তো সাক্ষ্যদাতার বিবেচনায়, যেমন তার প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক, ন্যায়নিষ্ঠ ও অপবাদমুক্ত হওয়া ইত্যাদি। আর কিছু শর্ত সাক্ষ্যদানের বিষয় সংক্রান্ত, যেমন বিষয়টি জানা থাকা। আর কিছু শর্ত সাক্ষ্যদাতার সংখ্যা সংক্রান্ত বিষয়ে।
দাওয়াত কবুল করা:
দাওয়াত দ্বারা এখানে দুটি বিষয় উদ্দেশ্য:
প্রথম বিষয়: আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনা, তাঁর কিতাবসমূহ ও রাসূলদের প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত। আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত কবুল করা অত্যাবশ্যক। যেহেতু এ আহ্বানকারী যেদিকে ডাকছেন সেদিক অভিমুখী হওয়া এবং তার ডাকা বিষয়ে তার অনুগমন করা মহাকল্যাণ, যা আল্লাহ তাআলা এই দাওয়াত গ্রহণকারীর জন্য তৈরি রেখেছেন। জাবের রা. এর সূত্রে ইমাম বুখারীর বর্ণিত হাদীসে রয়েছে:
জاءَتْ مَلَائِكَةٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ نَائِمٌ . . . ، إِلَى أَنْ قَالَ : فَقَالُوا : مَثَلُهُ كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى دَارًا جَعَلَ فِيهَا مَادُبَةً وَبَعَثَ دَاعِيًا ، فَمَنْ أَحَابَ الدَّاعِيَ دَخَلَ الدَّارَ وَأَكَلَ مِنَ الْمَأْدُبَةِ ، وَمَنْ لَّمْ يُحِبِّ الدَّاعِيَ لَمْ يَدْخُلِ الدَّارَ وَلَمْ يَأْكُلْ مِّنَ الْمَادُبَةِ ، فَأَوَّلُوا الرُّؤْيَا فَقَالُوا : الدَّارُ : الْجَنَّةُ ، وَالدَّاعِي : مُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَمَنْ أَطَاعَ مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ ، وَمَنْ عَصَى مُحَمَّدًا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَدْ عَصَى اللَّهَ
একদল ফেরেশতা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলো। তিনি তখন ঘুমন্ত। ... তিনি বলেন, তারা বললেন, তার উদাহরণ হলো ঐ ব্যক্তি, যে বাড়ি নির্মাণ করে বাড়িতে খাবারের আয়োজন করল। আর একজন আহ্বানকারী পাঠিয়ে দিল। সুতরাং যে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিল সে বাড়িতে প্রবেশ করল এবং খাবার থেকে খেল। আর যে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিল না সে বাড়িতে প্রবেশও করল না এবং খাবারও খেল না। এরপর তারা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করলেন। বললেন, বাড়ি হলো জান্নাত। আর আহ্বানকারী হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করবে সে আল্লাহর অনুগত হবে। আর যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্য হবে সে আল্লাহর অবাধ্য হবে।
দ্বিতীয় বিষয়: খাবারের দাওয়াত দেওয়া। এখানে কবুল দ্বারা উদ্দেশ্য দাওয়াত গ্রহণ করা এবং যে অনুষ্ঠানের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে সেখানে যাওয়া। যদি অনুষ্ঠানটি বিয়ের অলীমা হয়ে থাকে তাহলে অলীমার দাওয়াত কবুল করা ওয়াজিব। এ ছাড়া অন্য অনুষ্ঠান হলে, যেমন আকীকা, বাড়ি নির্মাণ উপলক্ষে খাওয়া ইত্যাদিতে ফকীহগণের মতভিন্নতা রয়েছে এ দাওয়াত কবুল করার বিষয়ে। এই দাওয়াত কবুল করা কি ওয়াজিব না মুস্তাহাব?
টিকাঃ
১৭. সুরা শুরা, আয়াত ২৫
১৮. সূরা মায়িদা, আয়াত ২৭
১৯. সুরা বাকারা, আয়াত ১২৭
২০. ইবনে মাসউদ রা.-এর সূত্রে বুখারী (ফাতহুল বারী, খ. ১২, পৃ. ২৬৫) এবং মুসলিম (খ. ১, পৃ. ১১) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
২১. আয়েশা রা.-এর সূত্রে ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (খ. ৩, পৃ. ১৫৫৭)
২২. আল-ফুরূক, কারাফী কৃত, খ. ২, পৃ. ৫১-৫৩
২০. আল-মানছুর, খ. ২, পৃ. ৩৯৭-৩৯৮; বাদায়েউস সানায়ে', খ. ২, পৃ. ২৯৯, খ. ৪, পৃ. ১৭৪, খ. ৫, পৃ. ৩৩, খ. ৬, পৃ. ২০ ও ৭৯; আল-হাত্তাব, খ. ৬, পৃ. ২২ ও ৫৪; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭৯; আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, সুয়ূতীকৃত, ৩০৩; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ৩, পৃ. ৫৪৩
২৩. জাবের রা. বর্ণিত এ হাদীস ইমাম বুখারী উল্লেখ করেছেন। ফাতহুল বারী, খ. ১৩, পৃ. ২৪৯
📄 চুক্তিতে কবুল করার শর্তাবলি
চুক্তিতে কবুল করার বিভিন্ন শর্ত রয়েছে। যেমন:
ক. কবুল হবে ঈজাব অনুযায়ী:
এটি সকল চুক্তিতে শর্ত। উদাহরণত: বিক্রির ক্ষেত্রে বিক্রেতা যেভাবে প্রস্তাব করবে ক্রেতার সেভাবে কবুল করা শর্ত। যদি ক্রেতা এর অন্যথা করে, যেমন সে বিক্রেতার প্রস্তাবকৃত বিষয় ভিন্ন অন্য বিষয় কবুল করল, বা তার আংশিক বস্তু কবুল করল, তাহলে চুক্তি সম্পন্ন হবে না। সুতরাং বিক্রেতা যদি বলে, আমি তোমার কাছে দশ দিরহামে বিক্রি করলাম আর ক্রেতা বলল, আমি তা আট দিরহামে কবুল করলাম, তাহলে বিক্রি সম্পন্ন হবে না।
খ. ঈজাবের মজলিসে কবুল হওয়া:
হানাফী ফকীহরা এ শর্তকে ইত্তিহাদুল মাজলিস (اِتَّحَادُ الْمَجْلِس) বা 'মজলিস এক হওয়া শব্দে' ব্যক্ত করেন। এর দ্বারা উদ্দেশ্য, কবুল করার পূর্বে দুই চুক্তিকারীর আলাদা না হওয়া এবং যে কাজে মজলিস সংঘটিত হয়েছে সে কাজ ছাড়া অন্য কাজে প্রস্তাব দানকারী বা গ্রহণকারীর ব্যস্ত না হওয়া। এর কারণ, মজলিসের অবস্থা চুক্তির অবস্থার ন্যায়। সুতরাং উভয় পক্ষ যদি কবুল প্রকাশ করার পূর্বে আলাদা হয়ে যায়, অথবা সামাজিক প্রচলনে মজলিস শেষ বোঝায় এমন কোনো কাজে ব্যস্ত হয়, তাহলে চুক্তি সম্পন্ন হবে না। যেহেতু চুক্তি ভিন্ন অন্য কাজে ব্যস্ত হওয়া বা মজলিস ভেঙ্গে দেওয়া চুক্তিতে অনীহা প্রকাশ করে। এটি সকল আলেমের ঐকমত্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
ঈজাবের পর কবুলকে বিলম্বিত করায় কোনো সমস্যা নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত উভয়ে মজলিসে থাকে এবং প্রচলনে মজলিস ভেঙ্গে দেওয়া বোঝায় এমন কাজে ব্যস্ত না হয়। এটি হানাফীদের, মালেকীদের ও হাম্বলীদের মত। শাফেয়ীগণ বলেন, যে সকল চুক্তিতে কবুল করা শর্ত, সেগুলোতে প্রস্তাবদানের পরপর কবুল করবে। তবে সামান্য পরে হওয়া তাদের মতে সমস্যা নয়।
গ. কবুল বাধ্যতামূলক না হওয়া:
এক চুক্তিসম্পাদনকারীর তরফ থেকে ঈজাব করার পর চুক্তি সম্পাদনকারী অপর ব্যক্তির ইচ্ছাধিকার রয়েছে। ইচ্ছা হলে মজলিসে সে কবুল করবে। ইচ্ছা হলে ঈজাব প্রত্যাখ্যান করবে। এটিকে হানাফীগণ খিয়ারুল কবুল (خِيَارُ الْقَبُولِ) (গ্রহণের ইচ্ছাধিকার) শব্দে ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, যদি অপর পক্ষের জন্য খিয়ারুল কবুল সাব্যস্ত না হয় তাহলে তার অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিক্রির বিধান তার জন্য আবশ্যক হয়ে যাবে। খিয়ারুল কবুল মজলিস শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রলম্বিত হবে। সুতরাং যতক্ষণ মজলিস বহাল থাকবে ততক্ষণ দ্বিতীয় পক্ষের অধিকার থাকবে গ্রহণ করা বা প্রত্যাখ্যান করার, যদি না প্রস্তাবদাতা মজলিস শেষ হওয়ার পূর্বে তার প্রস্তাব ফিরিয়ে নেয়।
হানাফীদের সাথে এক্ষেত্রে শাফেয়ীগণ ও হাম্বলীগণ অভিন্নমত পোষণ করেন। কেননা তারা মজলিসের খিয়ার (خَيَارُ الْمَجْلِسِ) ও ইচ্ছাধিকার গ্রহণ করেন সে হাদীস অনুযায়ী আমলের ভিত্তিতে যা ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: إِذَا تَبَايَعَ الرَّجُلَانِ فَكُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا بِالْخِيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا "যখন দুজন লোক বেচাকেনা করে তখন তাদের উভয়ের ইচ্ছাধিকার থাকে, যতক্ষণ না তারা পৃথক হয়।”
মালেকীদের মতে যে প্রথম কথা বলবে তার বক্তব্য ফিরিয়ে নেওয়া জায়েয নেই, যদিও ফিরিয়ে নেওয়া অপর পক্ষের অনুমোদনের পূর্বে হয়। তবে একটি অবস্থা ভিন্ন। তা হচ্ছে, যদি প্রথম কথা বলা ব্যক্তি বর্তমান বা ভবিষ্যৎবাচক শব্দ (فعل مُضارع) দিয়ে কথা বলে, তারপর দাবি করে যে, এটা বলে সে বিক্রি করার উদ্দেশ্য করেনি; বরং এটা দ্বারা সে ওয়াদা বা দুষ্টুমি করেছে। তাহলে সে কসম করবে এবং তাকে (দাবিতে) সত্যায়ন করা হবে।
প্রস্তাবদানের পর যদি প্রস্তাবের মিলমত কবুল হয়ে থাকে, তাহলে এই কার্য আবশ্যক হবে। এই কার্য বাতিল করা জায়েয হবে না, যদি এটি আবশ্যক জাতীয় কার্যক্রম হয়। যেমন, বিক্রি ও ইজারা। এটি হানাফীদের ও মালেকীদের মত। শাফেয়ী ও হাম্বলীদের মতে, মজলিস শেষ হওয়া অথবা বিক্রি আবশ্যক করা ছাড়া পণ্যে অন্য কোনো কর্তৃত্ব আবশ্যক হয় না।
ইবনে কুদামা রহ. দলিল হিসেবে পেশ করেন ইবনে উমর রা.-এর বর্ণিত হাদীস, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: إِذَا تَبَايَعَ الرَّجُلَانِ فَكُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا بِالْخِيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا ، وَكَانَا جَمِيعًا ، أَوْ يُخَيَّرُ أَحَدُهُمَا الْآخَرَ ، فَإِنْ خَيْرَ أَحَدُهُمَا الْآخَرَ فَتَبَايَعًا عَلَى ذَلِكَ فَقَدْ وَجَبَ الْبَيْعُ ، وَإِنْ تَفَرَّقَا بَعْدَ أَنْ تَبَايَعًا وَلَمْ يَتْرُكْ أَحَدُهُمَا الْبَيْعَ فَقَدْ وَجَبَ الْبَيْعُ .
"যখন দুজন লোক বেচাকেনা করে তখন তারা উভয়ে ইচ্ছাধিকার পাবে, যতক্ষণ তারা আলাদা না হয় এবং উভয়ে একসাথে থাকে। অথবা একজন অপরজনকে ইচ্ছাধিকার দেয়। যদি একজন অপরজনকে ইচ্ছাধিকার দেয়, এর ভিত্তিতে বেচাকেনা করে, তাহলে বিক্রি আবশ্যক হবে। আর যদি বিক্রির পর তারা আলাদা হয়, একজনও বিক্রি না ছেড়ে দেয়, তাহলে বিক্রি আবশ্যক হবে।" এ বিষয়ের বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্য : খিয়ারুল মজলিস।
ঘ. কবুলকারী হস্তক্ষেপ করার যোগ্য হওয়া:
এর অর্থ হলো কবুলকারী প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন হওয়া। অর্থনৈতিক সকল লেনদেনে এটি শর্ত। সুতরাং শিশু বা পাগলের কবুল করা সহীহ হবে না। এক্ষেত্রে তাদের স্থলাভিষিক্ত হবে পিতা, অভিভাবক বা বিচারক। স্বেচ্ছাসেবা জাতীয় চুক্তি যেমন অসিয়ত ও হেবা ইত্যাদির ক্ষেত্রে শিশু ও পাগলের কবুল করা সহীহ হবে, যেহেতু এতে তাদের খুশি ও আনন্দ রয়েছে। এই কবুল করা অভিভাবক বা তত্ত্বাবধায়কের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হবে না। এটা সামগ্রিক বিধান।
টিকাঃ
২৪. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫; আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২৩০; হাশিয়াতুল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ১৪; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ১৪৬-১৪৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৬
২৫. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৫, পৃ. ১৩৭; আল-হিদায়া, খ. ৩, পৃ. ২১; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ১৯-২০, খ. ২, পৃ. ২৬৬; দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ৫; আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২৪০; আল-জুমাল, খ. ৩, পৃ. ১২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৬; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৪১
২৬. হাদীসটি বুখারী রহ. উদ্ধৃত করেছেন, ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৩৩৩; মুসলিম রহ. উদ্ধৃত করেছেন, খ. ৩, পৃ. ১১৬৩
২৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ১৩৪; আল-হিদায়া, খ. ৩, পৃ. ২১; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ২৯; আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২৪০; দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৪৩-৪৪; আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৫৬৩
২৮. ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ২০; আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২২৮; হাশিয়াতুল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ১০; আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৫৬৩
২৯. এ হাদীসটির মূল বিবৃত হয়েছে বুখারী (ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৩৩৩) ও মুসলিম (খ. ৩, পৃ. ১১৬৩) গ্রন্থে।