📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 যা দ্বারা কবুল হয়ে থাকে

📄 যা দ্বারা কবুল হয়ে থাকে


কবুল কখনো হয় কথা দ্বারা, যেমন বিক্রেতার প্রস্তাব দানের পর ক্রেতা বলল, গ্রহণ করলাম বা অনুমোদন/পছন্দ করলাম। কখনো হয় কাজ দ্বারা, যেমন বায়'উত তা'আতী (الْبَيْعُ بالتعاطي)-এর ক্ষেত্রে, যেখানে ক্রেতা বিক্রেতার কথা ব্যতীত মূল্য ও পণ্য আদান-প্রদানে বিক্রি সম্পাদিত হয়।

কখনো নীরবতাকে কবুল বিবেচনা করা হয়। আদ-দুররুল মুখতার গ্রন্থে বিধৃত হয়েছে, কারো কাছে সম্পদ গচ্ছিত রাখার সময় তার স্পষ্টভাষ্যে কবুল করা; যেমন বলল, 'আমি কবুল করলাম', এটি যেমন ধর্তব্য হবে, তেমনি কবুল নির্দেশক কোনো কিছুর মাধ্যমে; যেমন: সম্পদ রাখার সময় সে নীরব থাকল। তাহলে এটিকেও কবুল বলে বিবেচনা করা হবে।

কখনো ইশারার মাধ্যমে কবুল হয়ে থাকে। যেমন বোবার বোধগম্য ইশারা ব্যক্তির কথার স্থলবর্তী। লেখার মাধ্যমেও কবুল হয়ে থাকে। তাই কবুল লেখার মাধ্যমে পণ্যে নিয়ন্ত্রণ সম্পাদিত হয়; যেহেতু এটি কবুল।

টিকাঃ
৪. দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৩; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ৩, পৃ. ১৪০-১৪১; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫০২; আল-মানছুর, খ. ২, পৃ. ৪০৫
৫. ইবনু আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৪৯৪; আল-ইখতিয়ার, খ. ৩ পৃ. ৯২
৬. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭; আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৫৬৬; দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৩
৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৫, পৃ. ১৩৮; দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৫

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 শরীয়তের বিধান

📄 শরীয়তের বিধান


কখনো কবুল করা ওয়াজিব হয়। যেমন অন্য কেউ যোগ্য না থাকার দরুন একজনের বিচারকার্যের জন্য নির্ধারিত হওয়া। তখন এই ব্যক্তির বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করা আবশ্যক। যদি সে গ্রহণে বিরত থাকে তাহলে সে অবাধ্যচারী হবে। শাসক তাকে এ পদ গ্রহণের জন্য বাধ্য করতে পারবেন।

কখনো কবুল করা মুস্তাহাব হয়। যেমন: হাদিয়া, হেবা ইত্যাদি কবুল করা। কেননা রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: লَوْ دُعِيتُ إِلَى ذِرَاعٍ أَوْ كُرَاعٍ لأَجَبْتُ ، وَلَوْ أَهْدِيَ إِلَيَّ ذِرَاعٌ أَوْ كُرَاعٌ لَقَبِلْتُ "যদি আমাকে পা অথবা খুরের দাওয়াত দেওয়া হয় আমি তাতে সাড়া দেব। যদি আমাকে পা অথবা খুর হাদিয়া দেওয়া হয় আমি তা গ্রহণ করব।” অন্য হাদীসে আছে: قَبِلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَدِيَّةَ النَّجَاشِيِّ وَتَصَرَّفَ فِيهَا وَهَادَاهُ أَيْضًا "নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজাশীর হাদিয়া গ্রহণ করেছেন। তা ব্যবহার করেছেন। এবং তাকেও হাদিয়া দিয়েছেন।”

কখনো কখনো কবুল করা হারাম। যেমন ঘুষ, বিশেষত অন্যায় রায় দেওয়ার জন্য বিচারককে যা দেওয়া হয় তা গ্রহণ করা। এর কারণ আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেছেন, لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়কে অভিশাপ দিয়েছেন।”

কখনো কবুল করা হয় মুবাহ। যেমন চুক্তির ক্ষেত্রে কবুল করা। শায়খ উলাইশ রহ. ওদীআত বা গচ্ছিত রাখার ক্ষেত্রে বলেছেন, কখনো তা কবুল করা ওয়াজিব, হারাম, মাকরূহ ও মুবাহ। হাশিয়া ইবনে আবেদীন তথা ফাতাওয়া শামীতেও অনুরূপ আলোচনা বিদ্যমান।

টিকাঃ
৮. মুগনিল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৩৭৩; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ২২১
৯. আল-ইখতিয়ার, খ. ৩, পৃ. ৪৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩৯৬
১০. আবু হুরায়রা রা.-এর সূত্রে বুখারী রহ, হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ফাতহুল বারী, খ. ৫, পৃ. ১৯৯
১১. বায়হাকী রহ. হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আল-জাওহারুন নাকী গ্রন্থে ইবনুত তুরকুমানী হাদীসটিকে যয়ীফ বলেছেন।
১২. আল-মুগনী, খ. ৯, পৃ. ৭৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৩৯২
১৩. আবদুল্লাহ ইবনু আমর রা.-এর বর্ণিত হাদীস, তিরমিযী রহ. উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ, খ. ৩, পৃ. ৬১৪
১৪. মিনাহুল জালীল, খ. ৩, পৃ. ৪৫২-৪৫৩; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৪৯৪

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 প্রস্তাব করার আগে প্রস্তাব গ্রহণ করা

📄 প্রস্তাব করার আগে প্রস্তাব গ্রহণ করা


অধিকাংশ ফকীহের মতে কবুল করা ঐ কাজ যা এমন ব্যক্তির পক্ষ হতে প্রকাশিত হয় যে বিক্রীত পণ্য বা ঋণের মালিকানা লাভ করে বা এমন ব্যক্তি যে পণ্য দ্বারা উপকৃত হয়। যেমন, ভাড়াটিয়া বা ঋণ গ্রহণকারী, অথবা যে নিজের জন্য কাজ আবশ্যক করে, যেমন মুদারাবার শ্রমিক বা যার নিকট গচ্ছিত রাখা হয় অথবা যে যৌনাঙ্গ ভোগ করার অধিকার রাখে যেমন স্বামী- এদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়। উল্লিখিত ক্ষেত্রগুলোতে কবুল প্রথমে হোক বা শেষে, কোনো পার্থক্য নেই। আর প্রস্তাব হলো বিক্রেতা, ভাড়াদাতা, স্ত্রীর অভিভাবক ইত্যাদি ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত কাজ। প্রস্তাব প্রদান শুরুতে হোক বা শেষে, বিধান অভিন্ন। সুতরাং উল্লিখিত সংজ্ঞা অনুযায়ী প্রস্তাব গ্রহণ বা কবুল প্রস্তাব প্রদানের আগেও হতে পারে, পরেও হতে পারে। উল্লিখিত সংজ্ঞা হলো গ্রহণকারী ও প্রস্তাবদাতা নির্দিষ্ট করার জন্য।

তবে বিয়ের ক্ষেত্রে হাম্বলীগণ মালেকী ও শাফেয়ীদের সাথে ভিন্নমত করেন। তাদের মতে, বিয়ের ক্ষেত্রে প্রস্তাব প্রদানের আগে প্রস্তাব গ্রহণ হতে পারে না। তারা বলেন, প্রস্তাব গ্রহণ তো হয়ে থাকে প্রস্তাব পেশের ভিত্তিতে। সুতরাং যদি প্রস্তাব গ্রহণ প্রস্তাব প্রদানের পূর্বে হয়, তাহলে প্রস্তাব গ্রহণ অর্থশূন্য হওয়ার কারণে তা ধর্তব্য হবে না। তবে বিক্রির বিষয় ভিন্ন। কেননা কোনো কথা না বলে একে অপরকে দেওয়ার মাধ্যমেও বিক্রি সম্পাদিত হয়। তা ছাড়া বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো শব্দ/কথা নির্ধারিতও নয়। বরং বিক্রির অর্থবোধক যে কোনো শব্দ দ্বারা বিক্রি সম্পাদিত হয়।

হানাফী ফকীহদের মতে, প্রথম পক্ষ চুক্তিতে যে বিষয়ের প্রস্তাব করে তাতে দ্বিতীয় পক্ষ অনুমোদনমূলক যা উল্লেখ করে তা হলো কবুল। তারা প্রথম প্রকাশিত বক্তব্যকে ঈজাব বা প্রস্তাবদান আর দ্বিতীয় প্রকাশিত বক্তব্যকে প্রস্তাব গ্রহণ হিসেবে বিবেচনা করেন। প্রস্তাব গ্রহণকারী বিক্রেতা হোক বা ক্রেতা, ভাড়া নেওয়া ব্যক্তি হোক বা ভাড়াদাতা, স্বামী হোক বা স্ত্রী অথবা স্ত্রীর অভিভাবক, উল্লিখিত সংজ্ঞা অভিন্ন।

ইবনুল হুমাম রহ. বলেন, ঈজাব হলো প্রথমে সংঘটিত সম্মতি প্রকাশক কাজকে সাব্যস্ত করা। এটি বিক্রেতার পক্ষ থেকে হতে পারে, যেমন সে বলল, আমি বিক্রি করছি। অথবা ক্রেতার পক্ষ থেকে। যেমন ক্রেতা প্রথম বলল: আমি তোমার নিকট থেকে এই বস্তু এক হাজার দীনার দ্বারা কিনলাম। আর কবুল হলো দ্বিতীয় কাজ। অন্যথায় উভয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত আচরণই হবে ঈজাব অর্থাৎ সাব্যস্ত করা। দ্বিতীয় সাব্যস্তকরণকে কবুল নাম দেওয়া হয়েছে প্রথম সাব্যস্তকরণ থেকে পৃথক করার জন্যে। তা ছাড়া দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রথম কাজের অনুমোদন ও গ্রহণ।

টিকাঃ
১৫. আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২২৯; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ২; মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ১১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ১৪০; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ৩৬৬-৩৫-৬৭ ও খ. ৬, পৃ. ২০৭; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৪০, খ. ৩, পৃ. ১২; আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ৫৩৪-৫৩৫
১৬. ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৭; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৪৫৬, প্রকাশনা, দারু ইহয়াইত তুরাহু

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 কবুল সংশ্লিষ্ট বিধানাবলি

📄 কবুল সংশ্লিষ্ট বিধানাবলি


কবুল কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, কখনো বান্দার পক্ষ থেকে। এর বিবরণ নিম্নে দেওয়া হলো:

প্রথম: মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কবুল করা:
আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কবুল দুটি অর্থে প্রয়োগ হয়।

প্রথম: ক্ষমা করা, গোপন করা ও মার্জনা করা। বান্দার তওবা কবুল করার ক্ষেত্রে শব্দটি এ অর্থে ব্যবহৃত হয়। সামনের আয়াতে কবুল শব্দ দ্বারা এই অর্থই নির্দেশিত : وَهُوة الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ “তিনি তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং পাপ মোচন করেন।”

দ্বিতীয়: আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কবুল করার অর্থ আমলের সওয়াব ও প্রতিদান দেওয়া। তবে এই অর্থের ক্ষেত্রে আমলটি সহীহ হওয়া ও জিম্মাদারী আদায়ের জন্য যথেষ্ট হওয়া এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কবুল করার মাঝে কি পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে, না নেই; তা নিয়ে আলেমদের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে।

কারাফী বলেন, এক্ষেত্রে একটি মূলনীতি রয়েছে। তা হলো, কবুল হওয়া, জিম্মা আদায়ে যথেষ্ট হওয়া এবং আমল সহীহ হওয়া ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। সুতরাং জিম্মা আদায়ে যথেষ্ট আমল, আর সেটিই সহীহ আমল, যার শর্তাদি ও আরকানসমূহ (সকল মৌলিক অংশ) পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান। সহীহ হওয়ার ক্ষেত্রে যাবতীয় প্রতিবন্ধক অনুপস্থিত। সকলের ঐকমত্যে এমন আমল করলে ব্যক্তি আমল আদায়ের জিম্মা বা দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়। এ আমলের আদায়কারী হয় অনুগত ও জিম্মামুক্ত। এটি আবশ্যকীয় ও ঐকমত্যপূর্ণ বিষয়।

আর আমলের বিনিময়ে সওয়াব লাভ করার বিষয়ে মুহাক্কিক আলেমদের মত, সওয়াব লাভ আবশ্যক নয়। কতক ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা আমলের জিম্মামুক্ত করেন: তবে সওয়াব দেন না। এটি আমল কবুল করার অর্থ। কয়েকটি বিষয় এই অর্থ নির্দেশ করে।

প্রথম বিষয়: দুই আদমপুত্রের ঘটনা সম্পর্কে আয়াত : إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ “অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকীদের কুরবানী কবুল করেন।”
দুভাই যখন কুরবানী করল, একজনের পক্ষ থেকে কুরবানী কবুল করা হলো, অপরজনের কুরবানী কবুল করা হয়নি। অথচ দ্বিতীয়জনের কুরবানী ছিল আদেশ অনুযায়ী। এর দ্বারা অনুমেয়, অপর ভাইয়ের তাকওয়া না থাকাকে কবুল না হওয়ার কারণ গণ্য করা হয়েছে। যদি তার আমল সত্তাগতভাবে ত্রুটিযুক্ত হতো তাহলে অপর ভাই তাকে বলত, আল্লাহ শুধু সঠিক আমল কবুল করেন। কেননা আমল কবুল না হওয়ার এটি ছিল নিকটবর্তী কারণ। সুতরাং ভাই যখন এই কারণ দর্শানো বাদ দিয়ে অন্য কারণ বলল, তখন প্রমাণিত হলো তার আমলটি সহীহ ও জিম্মা আদায়ে যথেষ্ট ছিল। তবে তাকওয়া না থাকার কারণে আমলটি কবুল হয়নি। সুতরাং বোঝা গেল, জিম্মা আদায়ে যথেষ্ট আমল কখনো কখনো কবুল হয় না, যদিও তা দ্বারা দায়মুক্ত হওয়া যায় এবং সত্তাগতভাবে তা সহীহ হয়।

দ্বিতীয় বিষয়: ইবরাহীম ও ইসমাঈল আ. সম্পর্কে কুরআনের বর্ণনা: وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ "স্মরণ করো, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কাবাঘরের দেয়াল তুলছিলেন, তারা বলছিলেন, হে আমাদের প্রতিপালক। আমাদের এই কাজ কবুল ও গ্রহণ করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাত।”

এভাবে তাদের উভয়ের আমল কবুল হওয়ার আবেদন প্রমাণ করে, সহীহ আমল হলেই তা কবুল হওয়া আবশ্যক নয়। অথচ তারা উভয়ে সহীহ আমলই করেছেন। আর তাই তারা উভয়ে নিজেদের আমলের জন্য কবুল হওয়ার দোয়া করেছেন।

তৃতীয় বিষয়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ হাদীস। তিনি বলেছেন: مَنْ أَحْسَنَ فِي الْإِسْلَامِ لَمْ يُوَاخَذْ بِمَا عَمِلَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ ، وَمَنْ أَسَاءَ فِي الْإِسْلَامِ أُوحِذَ بِالْأَوَّلِ وَالْآخِرِ "যে ইসলামে (মুসলিম অবস্থায়) উত্তম আমল করবে, জাহিলিয়্যাতে (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) কৃত আমলের কারণে তাকে পাকড়াও করা হবে না। আর যে মুসলিম হয়ে অন্যায় আমল করবে তাকে পূর্বাপর সমস্ত আমলের কারণে পাকড়াও করা হবে।”

উল্লিখিত হাদীসে প্রতিদান অর্থাৎ সওয়াব প্রদানের জন্য মুসলিম অবস্থায় উত্তমভাবে আমলের শর্ত করা হয়েছে। আর ইসলামে ইহসান (অর্থাৎ উত্তমভাবে আমল করা) হলো তাকওয়া।

চতুর্থ বিষয়: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর পশু যখন যবেহ করলেন, বললেন : اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنْ مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ "হে আল্লাহ! আপনি এটি মুহাম্মদ ও মুহাম্মদের পরিবারের পক্ষ থেকে কবুল করুন।" নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবুল করার দোয়া করেছেন। অথচ কুরবানী সংশ্লিষ্ট তাঁর আমল ছিল শরীয়া অনুযায়ী। তাহলে এই দোয়া প্রমাণ করে, জিম্মামুক্ত হওয়া এবং জিম্মা আদায়ে যথেষ্ট হওয়া থেকে কবুল হওয়া ভিন্ন আরেকটি বিষয়। অন্যথায় নবী স. কবুল হওয়ার দোয়া করতেন না। যেহেতু অর্জিত বিষয়ের অর্জন করার দোয়া জায়েয নেই।

পঞ্চম বিষয়: নেককার ও উত্তম ব্যক্তিগণ সর্বদা আল্লাহর কাছে আমল কবুল হওয়ার দোয়া করতে থাকেন। যদি এই দোয়া আমল সহীহ ও জিম্মা আদায় হওয়ার জন্য করা হতো, তাহলে আমল শুরু করার পূর্বে এই দোয়া করা উত্তম হতো। তখন আল্লাহ তাআলার কাছে সকল শর্ত ও আরকান সহজ করে দেওয়া এবং আমল সহীহ হওয়ার যাবতীয় প্রতিবন্ধক দূর হওয়ার দোয়া করতেন। আমল সম্পাদিত হওয়ার বিষয়টি দৃঢ় হওয়ার পর এই দোয়া করা উত্তম হতে পারে না।

উল্লিখিত কারণগুলো প্রমাণ করে, কবুল হওয়া হচ্ছে, কোনো জিম্মা আদায়ে যথেষ্ট হওয়া এবং আমল সহীহ হওয়া ভিন্ন অন্য একটি বিষয়। আর সেটি হলো সওয়াব লাভ করা।

দ্বিতীয়: এক ব্যক্তির কাজ অপর ব্যক্তির কবুল করা:
এক বান্দার কাজ অপর বান্দার কবুল করা ঐ কার্যক্রমে ঘটে যেগুলো তাদের মাঝেই পূর্ণ হয়। এই কার্যক্রমের কিছু এমন যেগুলো সম্পাদনের জন্য কবুল করা শর্ত। এগুলো এমন চুক্তি যেগুলো উভয় পক্ষের ইচ্ছায় পূর্ণ হয়। যেমন বিক্রি, ইজারা, আরিয়া, ওদীআত, ঋণ, সন্ধি, বিবাহ ইত্যাদি। এই সকল চুক্তি সম্পাদন হওয়া কবুল করার ওপর নির্ভরশীল। যেহেতু কবুল করা ঈজাব বা প্রস্তাবদানের পরিপূরক কাজ। আর প্রস্তাবদান ও প্রস্তাব গ্রহণ ছাড়া চুক্তি পূর্ণ ও সম্পাদিত হয় না। এর কারণ, এ দুটি বিষয় চুক্তির মূল কাঠামোকে রূপ দান করে।

কার্যক্রমের কিছু এমন রয়েছে, যেগুলোতে কবুল করা শর্ত হয় না। সেগুলো একজনের ইচ্ছায়ই সম্পাদিত হয়। এ জাতীয় একটি হচ্ছে: অনির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য ওয়াকফ করা। যেমন মসজিদের জন্য ওয়াক্ফ্ফ, দরিদ্র ও মিসকীনদের জন্য ওয়াকফ। অসীয়ত করার বিধানও অনুরূপ। এ জাতীয় কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে স্রেফ বিয়োজন জাতীয় কার্যক্রম: যেমন তালাক দেওয়া, গোলামকে মুক্ত করা, যদি উভয়টি বিনিময়শূন্য হয়ে থাকে। উল্লিখিত কার্যগুলোতে কবুল করা শর্ত নয়। এগুলো পূর্ণ হওয়ার জন্য শুধু ঈজাব বা প্রস্তাব পেশ যথেষ্ট।

এ কার্যক্রমে কিছু এমন রয়েছে, যেগুলোতে কবুল শর্ত হওয়ার বিষয়ে মত ভিন্নতা রয়েছে। যেমন দায়মুক্ত করা। এটি নিয়ে মতভিন্নতার ভিত্তি হলো, এতে কি হক বিয়োজন করা হয়, না মালিক বানানো হয়, তা নিয়ে মতভিন্নতা। কবুল করা সংক্রান্ত একটি আলোচনা রয়েছে যা চুক্তির ক্ষেত্র বহির্ভূত। যেমন সাক্ষীর সাক্ষ্য কবুল করা, অলীমার দাওয়াত কবুল করা ইত্যাদি। এগুলোর আলোচনা সামনে আসছে।

সাক্ষ্য গ্রহণ করা:
সাক্ষীর সাক্ষ্য কবুল করার অর্থ হলো: সাক্ষী যা সাক্ষ্য দেবে বিচারক তা সত্য বলে মেনে নেওয়া, যেন তার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রায়প্রদান সম্ভব হয়। কেননা সাক্ষ্য একটি শরয়ী দলিল যা সত্য বিষয় প্রকাশ করে এবং বিচারে সাক্ষ্য অনুযায়ী ফয়সালা করা আবশ্যক করা। কেননা সাক্ষ্যদানের শর্ত যখন পূর্ণ হয় তখন তা সত্য বিষয়কে প্রতিষ্ঠা করে। আর বিচারক সত্য অনুযায়ী ফয়সালা দেওয়ার জন্য আদিষ্ট।

সাক্ষ্য অনুযায়ী বিধান প্রয়োগের দিক বিবেচনা করে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ফকীহগণ বেশ কিছু শর্ত প্রণয়ন করেছেন। সেগুলো হয়তো সাক্ষ্যদাতার বিবেচনায়, যেমন তার প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক, ন্যায়নিষ্ঠ ও অপবাদমুক্ত হওয়া ইত্যাদি। আর কিছু শর্ত সাক্ষ্যদানের বিষয় সংক্রান্ত, যেমন বিষয়টি জানা থাকা। আর কিছু শর্ত সাক্ষ্যদাতার সংখ্যা সংক্রান্ত বিষয়ে।

দাওয়াত কবুল করা:
দাওয়াত দ্বারা এখানে দুটি বিষয় উদ্দেশ্য:

প্রথম বিষয়: আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনা, তাঁর কিতাবসমূহ ও রাসূলদের প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত। আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত কবুল করা অত্যাবশ্যক। যেহেতু এ আহ্বানকারী যেদিকে ডাকছেন সেদিক অভিমুখী হওয়া এবং তার ডাকা বিষয়ে তার অনুগমন করা মহাকল্যাণ, যা আল্লাহ তাআলা এই দাওয়াত গ্রহণকারীর জন্য তৈরি রেখেছেন। জাবের রা. এর সূত্রে ইমাম বুখারীর বর্ণিত হাদীসে রয়েছে:
জاءَتْ مَلَائِكَةٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ نَائِمٌ . . . ، إِلَى أَنْ قَالَ : فَقَالُوا : مَثَلُهُ كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى دَارًا جَعَلَ فِيهَا مَادُبَةً وَبَعَثَ دَاعِيًا ، فَمَنْ أَحَابَ الدَّاعِيَ دَخَلَ الدَّارَ وَأَكَلَ مِنَ الْمَأْدُبَةِ ، وَمَنْ لَّمْ يُحِبِّ الدَّاعِيَ لَمْ يَدْخُلِ الدَّارَ وَلَمْ يَأْكُلْ مِّنَ الْمَادُبَةِ ، فَأَوَّلُوا الرُّؤْيَا فَقَالُوا : الدَّارُ : الْجَنَّةُ ، وَالدَّاعِي : مُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَمَنْ أَطَاعَ مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ ، وَمَنْ عَصَى مُحَمَّدًا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَدْ عَصَى اللَّهَ
একদল ফেরেশতা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলো। তিনি তখন ঘুমন্ত। ... তিনি বলেন, তারা বললেন, তার উদাহরণ হলো ঐ ব্যক্তি, যে বাড়ি নির্মাণ করে বাড়িতে খাবারের আয়োজন করল। আর একজন আহ্বানকারী পাঠিয়ে দিল। সুতরাং যে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিল সে বাড়িতে প্রবেশ করল এবং খাবার থেকে খেল। আর যে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিল না সে বাড়িতে প্রবেশও করল না এবং খাবারও খেল না। এরপর তারা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করলেন। বললেন, বাড়ি হলো জান্নাত। আর আহ্বানকারী হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করবে সে আল্লাহর অনুগত হবে। আর যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্য হবে সে আল্লাহর অবাধ্য হবে।

দ্বিতীয় বিষয়: খাবারের দাওয়াত দেওয়া। এখানে কবুল দ্বারা উদ্দেশ্য দাওয়াত গ্রহণ করা এবং যে অনুষ্ঠানের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে সেখানে যাওয়া। যদি অনুষ্ঠানটি বিয়ের অলীমা হয়ে থাকে তাহলে অলীমার দাওয়াত কবুল করা ওয়াজিব। এ ছাড়া অন্য অনুষ্ঠান হলে, যেমন আকীকা, বাড়ি নির্মাণ উপলক্ষে খাওয়া ইত্যাদিতে ফকীহগণের মতভিন্নতা রয়েছে এ দাওয়াত কবুল করার বিষয়ে। এই দাওয়াত কবুল করা কি ওয়াজিব না মুস্তাহাব?

টিকাঃ
১৭. সুরা শুরা, আয়াত ২৫
১৮. সূরা মায়িদা, আয়াত ২৭
১৯. সুরা বাকারা, আয়াত ১২৭
২০. ইবনে মাসউদ রা.-এর সূত্রে বুখারী (ফাতহুল বারী, খ. ১২, পৃ. ২৬৫) এবং মুসলিম (খ. ১, পৃ. ১১) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
২১. আয়েশা রা.-এর সূত্রে ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (খ. ৩, পৃ. ১৫৫৭)
২২. আল-ফুরূক, কারাফী কৃত, খ. ২, পৃ. ৫১-৫৩
২০. আল-মানছুর, খ. ২, পৃ. ৩৯৭-৩৯৮; বাদায়েউস সানায়ে', খ. ২, পৃ. ২৯৯, খ. ৪, পৃ. ১৭৪, খ. ৫, পৃ. ৩৩, খ. ৬, পৃ. ২০ ও ৭৯; আল-হাত্তাব, খ. ৬, পৃ. ২২ ও ৫৪; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭৯; আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, সুয়ূতীকৃত, ৩০৩; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ৩, পৃ. ৫৪৩
২৩. জাবের রা. বর্ণিত এ হাদীস ইমাম বুখারী উল্লেখ করেছেন। ফাতহুল বারী, খ. ১৩, পৃ. ২৪৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00