📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা
الإيجابُ (ঈজাব) : প্রস্তাব, আবশ্যকীকরণ (الإيجابُ )ঈজাব)-এর আভিধানিক অর্থ: আবশ্যক করা। বলা হয়, أَوْجَبَ الأَمْرَ عَلَى النَّاسِ إِيجَابًا “তিনি সকল লোকের জন্য বিষয়টি আবশ্যক করলেন।” আরো বলা হয়, أَرْحَبَ الْبَيْعَ "বিক্রি আবশ্যিক হয়েছে।”
পারিভাষিক অর্থসমূহের একটি হলো, ঈজাব ঐ শব্দ, এক চুক্তিকারী থেকে যা প্রকাশ পায়, যার মাধ্যমে ঐ চুক্তিকারী নিজের জন্য কোনো বিষয় আবশ্যক করে নেয়। এ অর্থে ঈজাব চুক্তির অর্ধাংশ আর প্রস্তাব গ্রহণ চুক্তি পূর্ণকারক অপর অংশ। হানাফী ফকীহদের মতে এর পরিচয় হলো, উভয় চুক্তিকারীর মধ্য থেকে প্রথম যে কথা প্রকাশিত হয় তা হলো ঈজাব। আর কবুল (গ্রহণ) হলো অপরের পক্ষ থেকে এরপর যা উল্লেখ করা হয়। সে শব্দ 'বিক্রি করলাম বা কিনলাম', যাই হোক না কেন।
টিকাঃ
৩. লিসানুল আরব; আল-মিসবাহুল মুনীর; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৬-৭-১১
📄 যা দ্বারা কবুল হয়ে থাকে
কবুল কখনো হয় কথা দ্বারা, যেমন বিক্রেতার প্রস্তাব দানের পর ক্রেতা বলল, গ্রহণ করলাম বা অনুমোদন/পছন্দ করলাম। কখনো হয় কাজ দ্বারা, যেমন বায়'উত তা'আতী (الْبَيْعُ بالتعاطي)-এর ক্ষেত্রে, যেখানে ক্রেতা বিক্রেতার কথা ব্যতীত মূল্য ও পণ্য আদান-প্রদানে বিক্রি সম্পাদিত হয়।
কখনো নীরবতাকে কবুল বিবেচনা করা হয়। আদ-দুররুল মুখতার গ্রন্থে বিধৃত হয়েছে, কারো কাছে সম্পদ গচ্ছিত রাখার সময় তার স্পষ্টভাষ্যে কবুল করা; যেমন বলল, 'আমি কবুল করলাম', এটি যেমন ধর্তব্য হবে, তেমনি কবুল নির্দেশক কোনো কিছুর মাধ্যমে; যেমন: সম্পদ রাখার সময় সে নীরব থাকল। তাহলে এটিকেও কবুল বলে বিবেচনা করা হবে।
কখনো ইশারার মাধ্যমে কবুল হয়ে থাকে। যেমন বোবার বোধগম্য ইশারা ব্যক্তির কথার স্থলবর্তী। লেখার মাধ্যমেও কবুল হয়ে থাকে। তাই কবুল লেখার মাধ্যমে পণ্যে নিয়ন্ত্রণ সম্পাদিত হয়; যেহেতু এটি কবুল।
টিকাঃ
৪. দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৩; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ৩, পৃ. ১৪০-১৪১; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫০২; আল-মানছুর, খ. ২, পৃ. ৪০৫
৫. ইবনু আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৪৯৪; আল-ইখতিয়ার, খ. ৩ পৃ. ৯২
৬. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭; আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৫৬৬; দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৩
৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৫, পৃ. ১৩৮; দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৫
📄 শরীয়তের বিধান
কখনো কবুল করা ওয়াজিব হয়। যেমন অন্য কেউ যোগ্য না থাকার দরুন একজনের বিচারকার্যের জন্য নির্ধারিত হওয়া। তখন এই ব্যক্তির বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করা আবশ্যক। যদি সে গ্রহণে বিরত থাকে তাহলে সে অবাধ্যচারী হবে। শাসক তাকে এ পদ গ্রহণের জন্য বাধ্য করতে পারবেন।
কখনো কবুল করা মুস্তাহাব হয়। যেমন: হাদিয়া, হেবা ইত্যাদি কবুল করা। কেননা রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: লَوْ دُعِيتُ إِلَى ذِرَاعٍ أَوْ كُرَاعٍ لأَجَبْتُ ، وَلَوْ أَهْدِيَ إِلَيَّ ذِرَاعٌ أَوْ كُرَاعٌ لَقَبِلْتُ "যদি আমাকে পা অথবা খুরের দাওয়াত দেওয়া হয় আমি তাতে সাড়া দেব। যদি আমাকে পা অথবা খুর হাদিয়া দেওয়া হয় আমি তা গ্রহণ করব।” অন্য হাদীসে আছে: قَبِلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَدِيَّةَ النَّجَاشِيِّ وَتَصَرَّفَ فِيهَا وَهَادَاهُ أَيْضًا "নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজাশীর হাদিয়া গ্রহণ করেছেন। তা ব্যবহার করেছেন। এবং তাকেও হাদিয়া দিয়েছেন।”
কখনো কখনো কবুল করা হারাম। যেমন ঘুষ, বিশেষত অন্যায় রায় দেওয়ার জন্য বিচারককে যা দেওয়া হয় তা গ্রহণ করা। এর কারণ আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেছেন, لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়কে অভিশাপ দিয়েছেন।”
কখনো কবুল করা হয় মুবাহ। যেমন চুক্তির ক্ষেত্রে কবুল করা। শায়খ উলাইশ রহ. ওদীআত বা গচ্ছিত রাখার ক্ষেত্রে বলেছেন, কখনো তা কবুল করা ওয়াজিব, হারাম, মাকরূহ ও মুবাহ। হাশিয়া ইবনে আবেদীন তথা ফাতাওয়া শামীতেও অনুরূপ আলোচনা বিদ্যমান।
টিকাঃ
৮. মুগনিল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৩৭৩; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ২২১
৯. আল-ইখতিয়ার, খ. ৩, পৃ. ৪৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩৯৬
১০. আবু হুরায়রা রা.-এর সূত্রে বুখারী রহ, হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ফাতহুল বারী, খ. ৫, পৃ. ১৯৯
১১. বায়হাকী রহ. হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আল-জাওহারুন নাকী গ্রন্থে ইবনুত তুরকুমানী হাদীসটিকে যয়ীফ বলেছেন।
১২. আল-মুগনী, খ. ৯, পৃ. ৭৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৩৯২
১৩. আবদুল্লাহ ইবনু আমর রা.-এর বর্ণিত হাদীস, তিরমিযী রহ. উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ, খ. ৩, পৃ. ৬১৪
১৪. মিনাহুল জালীল, খ. ৩, পৃ. ৪৫২-৪৫৩; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৪৯৪
📄 প্রস্তাব করার আগে প্রস্তাব গ্রহণ করা
অধিকাংশ ফকীহের মতে কবুল করা ঐ কাজ যা এমন ব্যক্তির পক্ষ হতে প্রকাশিত হয় যে বিক্রীত পণ্য বা ঋণের মালিকানা লাভ করে বা এমন ব্যক্তি যে পণ্য দ্বারা উপকৃত হয়। যেমন, ভাড়াটিয়া বা ঋণ গ্রহণকারী, অথবা যে নিজের জন্য কাজ আবশ্যক করে, যেমন মুদারাবার শ্রমিক বা যার নিকট গচ্ছিত রাখা হয় অথবা যে যৌনাঙ্গ ভোগ করার অধিকার রাখে যেমন স্বামী- এদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়। উল্লিখিত ক্ষেত্রগুলোতে কবুল প্রথমে হোক বা শেষে, কোনো পার্থক্য নেই। আর প্রস্তাব হলো বিক্রেতা, ভাড়াদাতা, স্ত্রীর অভিভাবক ইত্যাদি ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত কাজ। প্রস্তাব প্রদান শুরুতে হোক বা শেষে, বিধান অভিন্ন। সুতরাং উল্লিখিত সংজ্ঞা অনুযায়ী প্রস্তাব গ্রহণ বা কবুল প্রস্তাব প্রদানের আগেও হতে পারে, পরেও হতে পারে। উল্লিখিত সংজ্ঞা হলো গ্রহণকারী ও প্রস্তাবদাতা নির্দিষ্ট করার জন্য।
তবে বিয়ের ক্ষেত্রে হাম্বলীগণ মালেকী ও শাফেয়ীদের সাথে ভিন্নমত করেন। তাদের মতে, বিয়ের ক্ষেত্রে প্রস্তাব প্রদানের আগে প্রস্তাব গ্রহণ হতে পারে না। তারা বলেন, প্রস্তাব গ্রহণ তো হয়ে থাকে প্রস্তাব পেশের ভিত্তিতে। সুতরাং যদি প্রস্তাব গ্রহণ প্রস্তাব প্রদানের পূর্বে হয়, তাহলে প্রস্তাব গ্রহণ অর্থশূন্য হওয়ার কারণে তা ধর্তব্য হবে না। তবে বিক্রির বিষয় ভিন্ন। কেননা কোনো কথা না বলে একে অপরকে দেওয়ার মাধ্যমেও বিক্রি সম্পাদিত হয়। তা ছাড়া বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো শব্দ/কথা নির্ধারিতও নয়। বরং বিক্রির অর্থবোধক যে কোনো শব্দ দ্বারা বিক্রি সম্পাদিত হয়।
হানাফী ফকীহদের মতে, প্রথম পক্ষ চুক্তিতে যে বিষয়ের প্রস্তাব করে তাতে দ্বিতীয় পক্ষ অনুমোদনমূলক যা উল্লেখ করে তা হলো কবুল। তারা প্রথম প্রকাশিত বক্তব্যকে ঈজাব বা প্রস্তাবদান আর দ্বিতীয় প্রকাশিত বক্তব্যকে প্রস্তাব গ্রহণ হিসেবে বিবেচনা করেন। প্রস্তাব গ্রহণকারী বিক্রেতা হোক বা ক্রেতা, ভাড়া নেওয়া ব্যক্তি হোক বা ভাড়াদাতা, স্বামী হোক বা স্ত্রী অথবা স্ত্রীর অভিভাবক, উল্লিখিত সংজ্ঞা অভিন্ন।
ইবনুল হুমাম রহ. বলেন, ঈজাব হলো প্রথমে সংঘটিত সম্মতি প্রকাশক কাজকে সাব্যস্ত করা। এটি বিক্রেতার পক্ষ থেকে হতে পারে, যেমন সে বলল, আমি বিক্রি করছি। অথবা ক্রেতার পক্ষ থেকে। যেমন ক্রেতা প্রথম বলল: আমি তোমার নিকট থেকে এই বস্তু এক হাজার দীনার দ্বারা কিনলাম। আর কবুল হলো দ্বিতীয় কাজ। অন্যথায় উভয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত আচরণই হবে ঈজাব অর্থাৎ সাব্যস্ত করা। দ্বিতীয় সাব্যস্তকরণকে কবুল নাম দেওয়া হয়েছে প্রথম সাব্যস্তকরণ থেকে পৃথক করার জন্যে। তা ছাড়া দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রথম কাজের অনুমোদন ও গ্রহণ।
টিকাঃ
১৫. আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২২৯; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ২; মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ১১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ১৪০; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ৩৬৬-৩৫-৬৭ ও খ. ৬, পৃ. ২০৭; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৪০, খ. ৩, পৃ. ১২; আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ৫৩৪-৫৩৫
১৬. ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৭; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৪৫৬, প্রকাশনা, দারু ইহয়াইত তুরাহু