📄 কবুল (الْقَبُولُ)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
কবুল (الْقَبُولُ) অর্থ সন্তোষমনে কোনো কিছু নেওয়া। তা قَبَلَ الشَّيْء قَبُولاً وَقُبُولاً থেকে গৃহীত। বলা হয় : قَبِلَ الْهَدَيَّةَ "সে উপঢৌকন গ্রহণ করল।" قُلْتُ الْخَبَرَ "আমি সংবাদ সত্যায়ন করলাম।" قَبِلْتُ الشَّيْء قَبُولاً "আমি বস্তুটি পছন্দ করলাম।" قَبِلَ الْعَمَلَ "সে কাজটি অনুমোদন করল।” ঈজাব অর্থ কোনো বিষয় অনুমোদন করা এবং তার দিকে মন ঝোঁকা। قَبِلَ الله الدُّعَاءَ "আল্লাহ দুআ কবুল করলেন।"
কবুল শব্দের আভিধানিক অর্থের বাইরে অন্য কিছু নয়। তবে ফকীহগণ কবুলকে বিক্রি, ইজারা ইত্যাদি চুক্তির ক্ষেত্রে অনুমোদন করা অর্থে, সাক্ষ্য জাতীয় ক্ষেত্রে বক্তব্য সত্যায়ন করা অর্থে এবং দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে সম্পদ বিক্রি, হেবা ও হাদিয়া গ্রহণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে নেওয়ার অর্থে গ্রহণ করেছেন।
টিকাঃ
১. লিসানুল আরব; আল-মিসবাহুল মুনীর; আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন; আল- মুজামুল ওয়াসীত; মূল শব্দ قَبْلَ - মাদা
২. আদ-দুররুল মুখতার ও হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৬-৭-১১-৩৭৬-৫০৮-৫০৯; আল-হাত্তাব, খ. ৬, পৃ. ১৫১; হাশিয়াতুল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ৮; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২. পৃ. ২; আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৫৬১
📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা
الإيجابُ (ঈজাব) : প্রস্তাব, আবশ্যকীকরণ (الإيجابُ )ঈজাব)-এর আভিধানিক অর্থ: আবশ্যক করা। বলা হয়, أَوْجَبَ الأَمْرَ عَلَى النَّاسِ إِيجَابًا “তিনি সকল লোকের জন্য বিষয়টি আবশ্যক করলেন।” আরো বলা হয়, أَرْحَبَ الْبَيْعَ "বিক্রি আবশ্যিক হয়েছে।”
পারিভাষিক অর্থসমূহের একটি হলো, ঈজাব ঐ শব্দ, এক চুক্তিকারী থেকে যা প্রকাশ পায়, যার মাধ্যমে ঐ চুক্তিকারী নিজের জন্য কোনো বিষয় আবশ্যক করে নেয়। এ অর্থে ঈজাব চুক্তির অর্ধাংশ আর প্রস্তাব গ্রহণ চুক্তি পূর্ণকারক অপর অংশ। হানাফী ফকীহদের মতে এর পরিচয় হলো, উভয় চুক্তিকারীর মধ্য থেকে প্রথম যে কথা প্রকাশিত হয় তা হলো ঈজাব। আর কবুল (গ্রহণ) হলো অপরের পক্ষ থেকে এরপর যা উল্লেখ করা হয়। সে শব্দ 'বিক্রি করলাম বা কিনলাম', যাই হোক না কেন।
টিকাঃ
৩. লিসানুল আরব; আল-মিসবাহুল মুনীর; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৬-৭-১১
📄 যা দ্বারা কবুল হয়ে থাকে
কবুল কখনো হয় কথা দ্বারা, যেমন বিক্রেতার প্রস্তাব দানের পর ক্রেতা বলল, গ্রহণ করলাম বা অনুমোদন/পছন্দ করলাম। কখনো হয় কাজ দ্বারা, যেমন বায়'উত তা'আতী (الْبَيْعُ بالتعاطي)-এর ক্ষেত্রে, যেখানে ক্রেতা বিক্রেতার কথা ব্যতীত মূল্য ও পণ্য আদান-প্রদানে বিক্রি সম্পাদিত হয়।
কখনো নীরবতাকে কবুল বিবেচনা করা হয়। আদ-দুররুল মুখতার গ্রন্থে বিধৃত হয়েছে, কারো কাছে সম্পদ গচ্ছিত রাখার সময় তার স্পষ্টভাষ্যে কবুল করা; যেমন বলল, 'আমি কবুল করলাম', এটি যেমন ধর্তব্য হবে, তেমনি কবুল নির্দেশক কোনো কিছুর মাধ্যমে; যেমন: সম্পদ রাখার সময় সে নীরব থাকল। তাহলে এটিকেও কবুল বলে বিবেচনা করা হবে।
কখনো ইশারার মাধ্যমে কবুল হয়ে থাকে। যেমন বোবার বোধগম্য ইশারা ব্যক্তির কথার স্থলবর্তী। লেখার মাধ্যমেও কবুল হয়ে থাকে। তাই কবুল লেখার মাধ্যমে পণ্যে নিয়ন্ত্রণ সম্পাদিত হয়; যেহেতু এটি কবুল।
টিকাঃ
৪. দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৩; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ৩, পৃ. ১৪০-১৪১; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫০২; আল-মানছুর, খ. ২, পৃ. ৪০৫
৫. ইবনু আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৪৯৪; আল-ইখতিয়ার, খ. ৩ পৃ. ৯২
৬. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭; আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৫৬৬; দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৩
৭. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৫, পৃ. ১৩৮; দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৫
📄 শরীয়তের বিধান
কখনো কবুল করা ওয়াজিব হয়। যেমন অন্য কেউ যোগ্য না থাকার দরুন একজনের বিচারকার্যের জন্য নির্ধারিত হওয়া। তখন এই ব্যক্তির বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করা আবশ্যক। যদি সে গ্রহণে বিরত থাকে তাহলে সে অবাধ্যচারী হবে। শাসক তাকে এ পদ গ্রহণের জন্য বাধ্য করতে পারবেন।
কখনো কবুল করা মুস্তাহাব হয়। যেমন: হাদিয়া, হেবা ইত্যাদি কবুল করা। কেননা রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: লَوْ دُعِيتُ إِلَى ذِرَاعٍ أَوْ كُرَاعٍ لأَجَبْتُ ، وَلَوْ أَهْدِيَ إِلَيَّ ذِرَاعٌ أَوْ كُرَاعٌ لَقَبِلْتُ "যদি আমাকে পা অথবা খুরের দাওয়াত দেওয়া হয় আমি তাতে সাড়া দেব। যদি আমাকে পা অথবা খুর হাদিয়া দেওয়া হয় আমি তা গ্রহণ করব।” অন্য হাদীসে আছে: قَبِلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَدِيَّةَ النَّجَاشِيِّ وَتَصَرَّفَ فِيهَا وَهَادَاهُ أَيْضًا "নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজাশীর হাদিয়া গ্রহণ করেছেন। তা ব্যবহার করেছেন। এবং তাকেও হাদিয়া দিয়েছেন।”
কখনো কখনো কবুল করা হারাম। যেমন ঘুষ, বিশেষত অন্যায় রায় দেওয়ার জন্য বিচারককে যা দেওয়া হয় তা গ্রহণ করা। এর কারণ আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেছেন, لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়কে অভিশাপ দিয়েছেন।”
কখনো কবুল করা হয় মুবাহ। যেমন চুক্তির ক্ষেত্রে কবুল করা। শায়খ উলাইশ রহ. ওদীআত বা গচ্ছিত রাখার ক্ষেত্রে বলেছেন, কখনো তা কবুল করা ওয়াজিব, হারাম, মাকরূহ ও মুবাহ। হাশিয়া ইবনে আবেদীন তথা ফাতাওয়া শামীতেও অনুরূপ আলোচনা বিদ্যমান।
টিকাঃ
৮. মুগনিল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৩৭৩; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ২২১
৯. আল-ইখতিয়ার, খ. ৩, পৃ. ৪৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩৯৬
১০. আবু হুরায়রা রা.-এর সূত্রে বুখারী রহ, হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ফাতহুল বারী, খ. ৫, পৃ. ১৯৯
১১. বায়হাকী রহ. হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আল-জাওহারুন নাকী গ্রন্থে ইবনুত তুরকুমানী হাদীসটিকে যয়ীফ বলেছেন।
১২. আল-মুগনী, খ. ৯, পৃ. ৭৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৩৯২
১৩. আবদুল্লাহ ইবনু আমর রা.-এর বর্ণিত হাদীস, তিরমিযী রহ. উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ, খ. ৩, পৃ. ৬১৪
১৪. মিনাহুল জালীল, খ. ৩, পৃ. ৪৫২-৪৫৩; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৪৯৪