📄 মূল্য নির্ধারণের বিরোধিতা
নির্ধারিত মূল্য অমান্য করে বেচা-বিক্রির বিধান:
হানাফী ও হাম্বলী ফকীহদের মত এবং শাফেয়ী মাযহাবের সর্বাধিক বিশুদ্ধ অভিমত হলো, কেউ যদি নির্ধারিত মূল্য অমান্য করে পণ্য বিক্রি করে তবে তা শুদ্ধ হবে। যেহেতু এ বিধি-নিষেধ কোনো ব্যক্তিকে তার মালিকানাধীন পণ্য নির্দিষ্ট মূল্যেই বিক্রি করতে আরোপিত হয়নি। আর যদি শাসক মূল্য নির্ধারণ করেন এবং বিক্রেতা আশঙ্কা করে যে, প্রশাসন কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যের কম মূল্যে বিক্রি করলে তাকে শাস্তি দেবে, তাহলে এ ক্ষেত্রে হানাফী ফকীহগণ স্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, শাসক কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যে পণ্য ক্রয় করা ক্রেতার জন্য বৈধ হবে না। কারণ, এটা এক ধরনের জবরদস্তি বলে গণ্য হবে। বরং বেচা-বিক্রি শুদ্ধ হতে এভাবে বলতে হবে, “তোমার পছন্দমতো মূল্যে আমার নিকট বিক্রি করো।”
নির্ধারিত মূল্য অমান্য করে সংঘটিত বেচা-বিক্রি শুদ্ধ হওয়ার বিষয়টি মালেকী মাযহাবের ফকীহদের পক্ষ হতেও পরোক্ষভাবে বিধৃত। যেহেতু তারা বলেন, কেউ যদি মূল্য বাড়িয়ে দেয় অথবা কমিয়ে দেয় তাহলে বাজারমূল্যের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য তাকে আদেশ করা হবে। যদি সে অস্বীকার করে তাহলে তাকে বাজার থেকে বের করে দেওয়া হবে। শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহগণের বিশুদ্ধ মতের বিপরীত মত হচ্ছে, বেচা-বিক্রি বাতিল হয়ে যাবে। তবে হাম্বলী ফকীহগণের মতে ক্রেতা যদি ঘোষিত মূল্য অমান্যকারী বিক্রেতাকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে তাহলে বিক্রি বাতিল হয়ে যাবে। কারণ, এক ধরনের স্বার্থ রক্ষা করতে সে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। দ্বিতীয়ত ভয়-ভীতি প্রদর্শন জবরদস্তি হিসেবে গণ্য।
অমান্যকারীর শাস্তি:
হানাফী, মালেকী ও শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহগণ স্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেছেন, প্রশাসন মূল্য নির্দেশনা দেওয়ার পর যে তা অমান্য করবে তাকে শাস্তি দেবে। কারণ, প্রশাসনের আদেশ অমান্য করার মাধ্যমে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করা হলো। ইমাম আবু হানিফাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, হিসাব রক্ষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি পণ্যমূল্য নির্ধারণ করে দেয়, আর কোনো কোনো ব্যবসায়ী সীমাতিক্রম করে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করে, তবে কি এ জন্য তাকে শান্তি দেওয়া হবে? তিনি উত্তর দিলেন, যদি কোনো ব্যবসায়ী স্বেচ্ছাচারিতা করে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করে তবে এ অপরাধে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।
শাস্তির পরিমাণ, শান্তির ধরন কী হবে, তা বিচারক বা তার প্রতিনিধি সাব্যস্ত করবেন। হয়তো আটক করা হবে বা বেত্রাঘাত করা হবে অথবা আর্থিক শাস্তি অথবা বাজার থেকে বহিষ্কার করা (ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করা) ইত্যাদি শাস্তি দেওয়া হবে। এসব শাস্তি প্রয়োগ করা হবে তখন, যখন মূল্য নির্ধারণ বৈধ হবে বা মূল্য নির্দিষ্ট থাকবে। আর যার মতে মূল্য নির্ধারণ বৈধ নয় বা যেসব পণ্যে মূল্য নির্ধারণ বৈধ নয় সেখানে নির্ধারিত মূল্যের বিরোধিতা করলে শাস্তি প্রয়োগ করা হবে না।
টিকাঃ
৪৫. ইবনে আবিদীন, খ. ২, পৃ. ২৬৫; আল-ইখতিয়ার, খ. ৪, পৃ. ১৬১; আল-ফাতওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ২১৪; আল-হিদায়া, খ. ৪, পৃ. ৯৩; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ৩৮; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৬২; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ৪৭৩; রওযাতুত তালিবীন, খ. ৩, পৃ. ৪১১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩৭
৪৬. আল-কাওয়ানীনুল ফিকহিয়্যা, পৃ. ২৬০
৪৭. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ৩৮; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৬২; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ১৮৭
৪৮. আল-ফাতাওয়া আল-আনকারাবিয়া, খ. ১, পৃ. ১৪৭; আল-কাওয়ানীনুল ফিকহিয়্যা, পৃ. ২৬০, আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ৩৮; রওযাতুত তালিবীন, খ. ৩, পৃ. ৪১১; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ১৮৬; হাশিয়াতুল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ৯৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩৮
৪৯. আল-কাওয়ানীনুল ফিকহিয়্যা, পৃ. ২৬০
৫০. মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৬২, কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ১৮৭