📄 মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি
অধিকাংশ ফকীহ যারা মূল্য নির্ধারণ করা বৈধ বলেছেন তারা মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা বলেছেন, ইমাম তথা সরকারি কর্মকর্তার কর্তব্য হবে উক্ত (নির্দিষ্ট) পণ্যের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দকে একত্রিত করা, আর অন্যদের উপস্থিত করা তাদের সততার স্বীকৃতির জন্য। এভাবে অভিজ্ঞ, জ্ঞানী, বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করে তিনি মূল্য নির্ধারণ করবেন। তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন, তারা কিভাবে পণ্য ক্রয় করে এবং কিভাবে বিক্রি করতে চায়? এভাবে তাদের দাবির বিষয়টি নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করবেন আর দ্রব্যমূল্য জনগণের উপযোগী করার চেষ্টা করবেন যেন তারাও তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে।
আবুল ওয়ালিদ আল-বাজী বলেন, এর কারণ, এ পদ্ধতিতেই ক্রেতা-বিক্রেতার উপকৃত হওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি উদঘাটন করা সম্ভব হবে। তাতে বিক্রেতার জন্য এ পরিমাণ লাভের সুযোগ দিতে হবে যেটুকু হলে তারা তাদের অবস্থান বা পেশার অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারে। আবার জনগণের ক্ষতিসাধনের অভিযোগও আসবে না। আলেমদের কারো মতেই বৈধ হবে না, ব্যবসায়ীরা পণ্যটি কত মূল্যে ক্রয় করেছে সে দিকে না তাকিয়েই এমন আদেশ দেওয়া যে, তোমরা পণ্যটি এত টাকা মূল্যে বিক্রি করবে, তাতে তোমরা লাভবান হও বা ক্ষতিগ্রস্ত হও। অনুরূপভাবে তাদেরকে এমন কথা বলাও বৈধ হবে না যে, তোমরা যে মূল্যে ক্রয় করেছ সে মূল্যেই বিক্রি করতে হবে।
টিকাঃ
৩২. ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ২৫৬; আল-ইখতিয়ার, খ. ৪, পৃ. ১৬১; আল-হিদায়া, খ. ৪, পৃ. ৯৩; কাশফুল হাকায়েক, খ. ২, পৃ. ২৩৭; আল ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ২১৪; আল-মুনতাক্বা লিলবাজি, খ. ৫, পৃ. ১৮, আল-মাওয়াকু বিহামিশিল হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ৩৮০
৩৩. আল-মুনতাক্বা, খ. ৫, পৃ. ১৯,
৩৪. আত-তুরুকুল হুকমিয়্যা, পৃ. ২৫৫
📄 কোন্ ধরনের পণ্য মূল্য নির্ধারণের অন্তর্ভুক্ত হবে?
উল্লিখিত মূলনীতির আলোকে আরোপিত বিধান প্রয়োগে যেসব পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হবে সেগুলো নির্দিষ্টকরণে ফকীহগণ দ্বিমত করেছেন। শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহগণ তাদের সর্বাধিক প্রকাশ্য মত হিসাবে এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যা কাহাস্তানি আল-হানাফীর বক্তব্যও বটে যে, মানুষ ও পশু এ দুই জাতির খাদ্য এবং অন্য সকল বস্তু মূল্য নির্ধারণের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। শুধু মানুষের খোরাকি এবং গবাদি পশুর শুকনো খাবারে তা নির্দিষ্ট থাকবে না।
ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর বক্তব্য, ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে বিধিনিষেধ বৈধ। আর ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-এর মতে একচেটিয়া ব্যবসা ও মজুতদারি রোধে মূল্য নির্ধারণ বৈধ। এ উভয়ের ওপর ভিত্তি করে ইবনে আবিদীন মত প্রকাশ করেছেন, উপরিউক্ত দুই শ্রেণীর খাদ্যদ্রব্য ছাড়া অন্যান্য দ্রব্যও মূল্য নির্ধারণ বৈধ। যেমন- গোশত, ঘি ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে অপর একটি বক্তব্য হানাফীদের রয়েছে বলে আতাবি, হাসসাস প্রমুখ উল্লেখ করেছেন। তা হলো, শুধু মানুষ ও পশুর খাদ্যদ্রব্যে মূল্য নির্ধারণ বৈধ।
এক্ষেত্রে ইবনে তাইমিয়ার নিজস্ব অভিমত রয়েছে। তিনি মূল্য নির্ধারণ শুধু খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং এটাকে সর্বক্ষেত্রে বৈধ বলেছেন। এ বিষয়ে ইবনুল কাইয়িম ইবনে তাইমিয়ার পথ অবলম্বন করেছেন এবং যে কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণ বৈধ বলেছেন। যে পর্যন্ত যথাযথ পন্থায় ন্যায্যমূল্যে পণ্যের লেনদেন না হবে।
শায়খ তাকীউদ্দীন ব্যবসায়ীদেরকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিনিময় করতে বাধ্য করার বিষয়টিকে আবশ্যিক বলেন। তিনি বলেছেন, এতে কোনো দ্বিমত নেই। কারণ এর মধ্যে আল্লাহ তাআলার হক সংক্রান্ত সাধারণ কল্যাণের বিষয়টি নিহিত। আর জনকল্যাণের বিষয়টি ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিনিময় ব্যতীত পরিপূর্ণ হয় না। যেমন জিহাদের বিষয়টি, যার মধ্যে ব্যাপক জনস্বার্থ নিহিত। মাতালিবু উলিন নুহা গ্রন্থকার বলেন, এ বাধ্যকরণ বিষয়টি উত্তম বলে বিবেচিত হবে এমন সব পণ্যের ক্ষেত্রে যেগুলোর মূল্য সাধারণের জানা আছে এবং যেসব পণ্যে সাধারণত পার্থক্য হয় না। যেমন- ওজনকৃত পণ্য ইত্যাদি।
মালেকী মাযহাবের ফকীহগণের নিকটও অনুরূপ দুটি অভিমত রয়েছে:
প্রথম মত: মূল্যনির্ধারণ শুধুমাত্র পরিমাপযোগ্য ও ওজনযোগ্য পণ্যে কার্যকর হবে-তা খাদ্যদ্রব্য হোক বা অন্য কিছু। যা কিছু পরিমাপযোগ্য বা ওজনযোগ্য নয় সেগুলো সমজাত না হওয়ার কারণে মূল্যনির্ধারণ সম্ভব নয়। এ বক্তব্য ইবনে হাবীবের। আবুল ওয়ালিদ আল-বাজী বলেন, পরিমাপযোগ্য ও ওজনযোগ্য পণ্য যদি এক বরাবর হয় তবে এ বিধান কার্যকর হবে। পণ্য যদি সাদৃশ্যপূর্ণ না হয়ে ভিন্ন মানের হয়, তাহলে উন্নত পণ্যের মালিককে নিম্নমানের পণ্যের মূল্যে বিক্রি করার আদেশ দেওয়া যাবে না। কারণ, উন্নত পণ্যের একটি বাড়তি মূল্য রয়েছে। যেমন পণ্যের পরিমাণ বেশি হলে দাম বেশি হয়, পরিমাণ কম হলে দাম কম হয়।
দ্বিতীয় মত: শুধু খাদ্যদ্রব্যে মূল্য নির্ধারণ করা যাবে। এ বক্তব্য ইবনে আরাফার।
টিকাঃ
৩৫. ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ২৫৬-২৫৭; রওজাতুত তালিবীন, খ. ৩, পৃ. ৪১১; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ৩৮
৩৬. ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ২৫৭; আদ-দুরারুল মুনতাক্বা, খ. ২, পৃ. ৫৪৮
৩৭. আল-হিসবা ফিল ইসলাম, পৃ. ১৭; আত-তুরুকুল হুকমিয়্যা, পৃ. ২৪৫; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ১৬২
৩৮. আল-মুনতাকা লিলবাজি, খ. ৫, পৃ. ১৮-১৯; আত-তুরুকুল হুকমিয়্যা, পৃ. ২৫৭।
📄 কাদের জন্য পণ্যমূল্য নির্ধারণ করা হবে এবং কাদের জন্য করা হবে না?
বাজারের ব্যবসায়ীদের জন্য পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। আর যাদের জন্য পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা যাবে না তারা হলো:
প্রথম: আমদানিকারক:
হানাফী ও হাম্বলী সকল ফকীহ এবং মালেকী অধিকাংশ ফকীহ-এর অভিমত, যা শাফেয়ী ফকীহগণেরও এক বক্তব্য যে, আমদানিকারকের জন্যে পণ্যমূল্য নির্ধারণ করা যাবে না। তবে জনগণের সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে নির্ধারণ করা যাবে। তখন আমদানিকারককে তার ইচ্ছামাফিক মূল্যে বিক্রি করতে নিষেধ করা হবে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা., কাসিম ইবনে মুহাম্মদ এবং সালিম ইবনে আব্দুল্লাহ হতেও বর্ণিত আছে, আমদানিকারকের পণ্যে মূল্য নির্ধারণ করা বৈধ নয়। মালেকী ফকীহ ইবনে হাবীব বলেন, গম ও যব ব্যতীত অন্যান্য পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হবে। এ দুটি পণ্যের আমদানিকারক তার সুবিধামতো মূল্যে বিক্রি করতে পারবে। অনুরূপ মূল্য নির্ধারণ করা হবে না তেল, ঘি, গোশত, সবজি, তরকারি, ফল ইত্যাদি পণ্যে, যেগুলো ব্যবসায়ীরা আমদানিকারদের নিকট হতে ক্রয় করে থাকে। এখানেও আমদানিকারকের পণ্যে মূল্য নির্ধারণ করবে না, মূল্য নির্ধারণের চেষ্টাও করবে না। তবে ব্যবসায়ীরা যদি কোনো বিক্রিমূল্য স্থির করে নেয় তাহলে তাদেরকে বলা হবে, হয়তো নির্দিষ্ট মূল্যে বিক্রি করো, নয়তো বাজার থেকে বের হয়ে যাও।
দ্বিতীয়: মজুতদার:
হানাফী মাযহাবের অভিমত হলো, মজুতদারের জন্য মূল্য নির্ধারণ করা হবে না, বরং তাকে খাদ্যদ্রব্য বাজারে উন্মুক্তভাবে বিক্রি করার আদেশ দেওয়া হবে। সে তার পরিবারের জন্য স্বাচ্ছন্দে ব্যয়যোগ্য বার্ষিক খোরাকির অতিরিক্ত খাদ্য বিক্রি করে দেবে। কিন্তু তার পণ্যে মূল্য নির্ধারণ করা হবে না, সে ব্যবসায়ী হোক অথবা নিজের জন্য উৎপাদনকারী হোক। মুহাম্মদ ইবনুল হাসান বলেন, মজুতদারকে তার মজুতকৃত পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করা হবে, তবে তার পণ্যে মূল্য নির্ধারণ করা হবে না। বরং তাকে বলা হবে, অন্য সকলে যেভাবে বিক্রি করে তুমিও সেভাবে বিক্রি করো। এবং এতটুকু বর্ধিত মূল্যে বিক্রি করতে পারবে যা সাধারণের নিকট গ্রহণযোগ্য। এর চেয়ে বেশি মূল্যে বিক্রি করার সুযোগ তাকে দেওয়া যাবে না।
তৃতীয়: যারা দোকান বা আরতের বাইরে পণ্য বিক্রি করে:
আত-তায়সীর গ্রন্থকার বলেন: যারা দোকানঘর, বিপণিবিতানের বাইরে পণ্য বিক্রি করতে বিশিষ্টজন এবং সাধারণের নিকট প্রদর্শন করে, তাদের পণ্যে মূল্য নির্ধারণ করা হবে না। ফলবিক্রেতা, কসাই, সব ধরনের কারিগরি ও শিল্পের মালিক এবং যারা পণ্যবহনকারী, দালাল বা এজেন্ট প্রমুখের নিকট হতে পণ্য সংগ্রহ করে তাদের বেলায় পণ্যমূল্য নির্ধারণ করা হবে না। তবে প্রশাসকের জন্যে কর্তব্য হবে প্রতিটি পেশার মানুষের নিকট হতে একটি নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য জামানত গ্রহণ করা, তার শিল্প ও কারিগরি এবং দক্ষতা সম্পর্কে পূর্ণ অবগত থাকা এবং শিল্পের মধ্যে কোন্টা উন্নত আর কোন্টা অনুন্নত- সে সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া এবং ঐ শিল্পের কারিগর ও মানুষদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ সংরক্ষণ করা এবং যাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে তাদের ওপর তা প্রয়োগ করা। তবে তাদের মধ্যে প্রচলিত শিল্পে ও কারিগরিতে অভ্যাস আচরণ ও রীতি-নীতি ইত্যাদি থেকে তাদেরকে বের করা যাবে না।
অধিকাংশ ব্যবসায়ীর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং তাদের সাথে সাথে লাভবান হতে শাসক মূল্যহ্রাস বা বৃদ্ধির আদেশ দেবেন:
আল্লামা বাজী রহ. বলেন: যে মূল্য হ্রাস করে বাজারে সম্পৃক্ত থাকার জন্য শাসক ব্যবসায়ীদেরকে আদেশ দেবেন সে মূল্য হলো জনস্বার্থে সমর্থিত মূল্য বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সমর্থিত মূল্য। সুতরাং ব্যবসায়ীদের মধ্য হতে কেউ বা গুটিকয়েক ব্যবসায়ী যদি মূল্য হ্রাসের বিষয়ে পৃথক বা বিচ্ছিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তাহলে তিনি তাদেরকে সাধারণের মধ্যে প্রচলিত মূল্যের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে অথবা ব্যবসা ছেড়ে দিতে আদেশ দেবেন। পক্ষান্তরে যদি কেউ বা মুষ্টিমেয় কিছু লোক মূল্য বাড়িয়ে দেয়, তাহলে তাদের বর্ধিত মূল্যের সাথে সবাইকে সম্পৃক্ত থাকতে আদেশ দেওয়া হবে না, অন্যথায় বেচা-বিক্রি থেকে নিবৃত্ত থাকতেও বলা হবে না। এর কারণ, কেউ যদি বিচ্ছিন্নভাবে বর্ধিত মূল্যে কোনো পণ্য বিক্রি করে সেটাকে ঐক্যবদ্ধ বা সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মূল্য বলা যাবে না। আর এ মূল্যে বাজার বা পণ্য স্থিতি লাভ করবে এমনও নয়। বরং এ ক্ষেত্রে জনসাধারণ এবং অধিকাংশ মানুষের অবস্থা বিবেচনা করতে হবে।
টিকাঃ
৩৯. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ২১৪; আল-মুনতাক্বা, খ. ৫, পৃ. ১৭; আত-তুরুকুল হুকমিয়্যা, পৃ. ২৫৪; মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ৩৮০; আল-মি'য়ারুল মুগরিব, খ. ৫, পৃ. ৮৪
৪০. আল-মুনতাক্বা, খ. ৫, পৃ. ১৯
৪১. আয-যায়লাই, খ. ৬, পৃ. ২৮; আল-মুনতাক্বা লিলবাজি, খ. ৫, পৃ. ১৭
৪২. আল-ইখতিয়ার, খ. ৪, পৃ. ১৬১; আল-হিদায়া, খ. ৪, পৃ. ৯৩
৪৩. কিতাবুত তাইসীর ফি আহকামিত তাসয়ীর, পৃ. ৫৫-৫৬
৪৪. আল-মুনতাকা শারহুল মুওয়াত্তা, খ. ৫, পৃ. ১৭
📄 মূল্য নির্ধারণের বিরোধিতা
নির্ধারিত মূল্য অমান্য করে বেচা-বিক্রির বিধান:
হানাফী ও হাম্বলী ফকীহদের মত এবং শাফেয়ী মাযহাবের সর্বাধিক বিশুদ্ধ অভিমত হলো, কেউ যদি নির্ধারিত মূল্য অমান্য করে পণ্য বিক্রি করে তবে তা শুদ্ধ হবে। যেহেতু এ বিধি-নিষেধ কোনো ব্যক্তিকে তার মালিকানাধীন পণ্য নির্দিষ্ট মূল্যেই বিক্রি করতে আরোপিত হয়নি। আর যদি শাসক মূল্য নির্ধারণ করেন এবং বিক্রেতা আশঙ্কা করে যে, প্রশাসন কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যের কম মূল্যে বিক্রি করলে তাকে শাস্তি দেবে, তাহলে এ ক্ষেত্রে হানাফী ফকীহগণ স্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, শাসক কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যে পণ্য ক্রয় করা ক্রেতার জন্য বৈধ হবে না। কারণ, এটা এক ধরনের জবরদস্তি বলে গণ্য হবে। বরং বেচা-বিক্রি শুদ্ধ হতে এভাবে বলতে হবে, “তোমার পছন্দমতো মূল্যে আমার নিকট বিক্রি করো।”
নির্ধারিত মূল্য অমান্য করে সংঘটিত বেচা-বিক্রি শুদ্ধ হওয়ার বিষয়টি মালেকী মাযহাবের ফকীহদের পক্ষ হতেও পরোক্ষভাবে বিধৃত। যেহেতু তারা বলেন, কেউ যদি মূল্য বাড়িয়ে দেয় অথবা কমিয়ে দেয় তাহলে বাজারমূল্যের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য তাকে আদেশ করা হবে। যদি সে অস্বীকার করে তাহলে তাকে বাজার থেকে বের করে দেওয়া হবে। শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহগণের বিশুদ্ধ মতের বিপরীত মত হচ্ছে, বেচা-বিক্রি বাতিল হয়ে যাবে। তবে হাম্বলী ফকীহগণের মতে ক্রেতা যদি ঘোষিত মূল্য অমান্যকারী বিক্রেতাকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে তাহলে বিক্রি বাতিল হয়ে যাবে। কারণ, এক ধরনের স্বার্থ রক্ষা করতে সে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। দ্বিতীয়ত ভয়-ভীতি প্রদর্শন জবরদস্তি হিসেবে গণ্য।
অমান্যকারীর শাস্তি:
হানাফী, মালেকী ও শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহগণ স্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেছেন, প্রশাসন মূল্য নির্দেশনা দেওয়ার পর যে তা অমান্য করবে তাকে শাস্তি দেবে। কারণ, প্রশাসনের আদেশ অমান্য করার মাধ্যমে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করা হলো। ইমাম আবু হানিফাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, হিসাব রক্ষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি পণ্যমূল্য নির্ধারণ করে দেয়, আর কোনো কোনো ব্যবসায়ী সীমাতিক্রম করে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করে, তবে কি এ জন্য তাকে শান্তি দেওয়া হবে? তিনি উত্তর দিলেন, যদি কোনো ব্যবসায়ী স্বেচ্ছাচারিতা করে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করে তবে এ অপরাধে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।
শাস্তির পরিমাণ, শান্তির ধরন কী হবে, তা বিচারক বা তার প্রতিনিধি সাব্যস্ত করবেন। হয়তো আটক করা হবে বা বেত্রাঘাত করা হবে অথবা আর্থিক শাস্তি অথবা বাজার থেকে বহিষ্কার করা (ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করা) ইত্যাদি শাস্তি দেওয়া হবে। এসব শাস্তি প্রয়োগ করা হবে তখন, যখন মূল্য নির্ধারণ বৈধ হবে বা মূল্য নির্দিষ্ট থাকবে। আর যার মতে মূল্য নির্ধারণ বৈধ নয় বা যেসব পণ্যে মূল্য নির্ধারণ বৈধ নয় সেখানে নির্ধারিত মূল্যের বিরোধিতা করলে শাস্তি প্রয়োগ করা হবে না।
টিকাঃ
৪৫. ইবনে আবিদীন, খ. ২, পৃ. ২৬৫; আল-ইখতিয়ার, খ. ৪, পৃ. ১৬১; আল-ফাতওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ২১৪; আল-হিদায়া, খ. ৪, পৃ. ৯৩; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ৩৮; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৬২; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ৪৭৩; রওযাতুত তালিবীন, খ. ৩, পৃ. ৪১১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩৭
৪৬. আল-কাওয়ানীনুল ফিকহিয়্যা, পৃ. ২৬০
৪৭. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ৩৮; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৬২; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ১৮৭
৪৮. আল-ফাতাওয়া আল-আনকারাবিয়া, খ. ১, পৃ. ১৪৭; আল-কাওয়ানীনুল ফিকহিয়্যা, পৃ. ২৬০, আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ৩৮; রওযাতুত তালিবীন, খ. ৩, পৃ. ৪১১; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ১৮৬; হাশিয়াতুল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ৯৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩৮
৪৯. আল-কাওয়ানীনুল ফিকহিয়্যা, পৃ. ২৬০
৫০. মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৬২, কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ১৮৭