📄 দুই. যখন মিছলী জিনিসের সদৃশ ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয়
দুই. যখন মিছলী জিনিসের সদৃশ ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয়
যে সকল স্থানে বস্তুর কীমাত ধার্য করা আবশ্যক এটি হচ্ছে তার দ্বিতীয় স্থান। যখন মিছলী জিনিসের মিছল বা সদৃশ ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয় তখন বাধ্য হয়ে বস্তুটির কীমাত ফেরত দেওয়া আবশ্যক হয়। যেমন বিক্রি ফাসেদ হওয়ার দরুন পণ্যটি ফেরত দিতে হবে। কিন্তু তা ধ্বংস হয়ে গেছে এবং সে জিনিসটি এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। যেমন লিচু, তার মৌসুম শেষ হওয়ায় এখন আর তা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না, পাওয়া সম্ভবও নয়। এমনিভাবে লুট করে নেওয়ার পর সে লুট করা সম্পদ বিনষ্ট হয়ে গেছে, বাজারে তার আমদানি হচ্ছে না বা তার উৎপাদন হচ্ছে না। এ অবস্থাগুলোতে মূলবস্তুটি মিছলী হলেও এখন তার মূল্যই পরিশোধ করতে হবে।
শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহগণ মিছলী বস্তুর সদৃশ না পাওয়ার অবস্থাগুলো আলোচনা করেছেন। হয়তো বর্তমানে তার উৎপাদন হয় না, অথবা উৎপাদন হলেও তা নিকটে কোথাও পাওয়া যায় না, তা এমন দূরে পাওয়া যায় যেখানে সহজে যাওয়া যায় না অথবা নিকটে পাওয়া গেলেও স্বাভাবিক দাম থেকে তা অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এ সকল অবস্থাতেও জিনিসটি পাওয়া যাচ্ছে না বলে ধর্তব্য হবে এবং তার মূল্য প্রদান করাই সাব্যস্ত হবে।
এক্ষেত্রে শাফেয়ী আলেমগণ বলেন, বিক্রি ফাসেদ হওয়ার ক্ষেত্রে পণ্যটি এবং লুট করার বেলায় লুট করা বস্তুটি ধ্বংস হয়ে গেলে, বস্তুটি ক্রেতা বা লুটেরা ব্যক্তি তার কজায় নেওয়ার পর থেকে, তার সদৃশ বস্তু ফেরত দেওয়া যেদিন অসম্ভব হয়ে যায় সেদিন পর্যন্ত সময়ের মাঝে মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে সর্বোচ্চ যা হবে তা জরিমানা হিসেবে আদায় করতে হবে।
হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের এ সম্পর্কে মত হচ্ছে, যেদিন এর সদৃশ বস্তু ফেরত দেওয়া অসম্ভব হয়ে গেছে জিনিসটি এখন আর না পাওয়া যাওয়ার দরুন, সেদিন বস্তুটির যে দাম উঠেছে সে দাম হিসাব করে আদায় করতে হবে। যেহেতু জিনিসটি পাওয়া যাওয়া পর্যন্ত তার সদৃশ বস্তু দেওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু যেদিন থেকে তা আর পাওয়া যাচ্ছে না সেদিন তার দায়িত্বে মূল্যপ্রদান নিপতিত হয়েছে। সুতরাং সেদিনকার মূল্য হিসাব করা হবে।
হানাফী মাযহাবের তিন ইমাম এ বিষয়ে তিন মত ব্যক্ত করেছেন। ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেন, যেদিন মামলার রায় হবে সেদিন বস্তুটির যে দাম রয়েছে তা দিতে হবে। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন, যেদিন এ মালটি লুট বা ছিনতাই করা হয়েছিল সেদিনের মূল্য এবং ইমাম মুহাম্মদ রহ. বলেন, যেদিন থেকে জিনিসটির সদৃশ বস্তু আর পাওয়া যাচ্ছে না, সেদিনের মূল্য প্রদান করতে হবে।
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ ফাসেদ বিক্রির পণ্য মিছলী হওয়া সত্ত্বেও সদৃশ বস্তু না পাওয়ার অবস্থা এবং লুট করার পর তার সদৃশ বস্তু না পাওয়ার অবস্থা-এ দুটোতে বিধানের ক্ষেত্রে পার্থক্য করেন। তারা বলেন, ফাসেদ বিক্রির ক্ষেত্রে যদি মিছলী পণ্যটি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে তার মূল্য প্রদান করে জরিমানা আদায় করতে হবে নিম্নবর্ণিত অবস্থাদিতে:
১. যদি তা এখন আর পাওয়া যায় না, তার উৎপাদন বন্ধ। ২. জিনিসটি বিক্রি করা হয়েছিল অনুমান করে, বিক্রি করার পরও তার সঠিক ওজন বা পরিমাপ জানা যায়নি। ৩. পরিমাপ-পাত্র দিয়ে মেপে বা ওজন করে বা গুণে গুণে জিনিসটি বিক্রয় করা হয়েছিল, কিন্তু এখন ফেরত দেওয়ার ফয়সালাকালে সে হিসাব মনে নেই। ৪. সঠিক পরিমাপ, ওজন বা সংখ্যা মনে আছে, কিন্তু আজ ফয়সালার দিনে তা পাওয়া যাচ্ছে না বা পাওয়া দুঃসাধ্য বা অসাধ্য। এ সকল অবস্থায় যেদিন ফিরিয়ে দেওয়ার ফয়সালা হবে সেদিনের মূল্য হিসাব করে ফেরত দেওয়া হবে।
তারা বলেন, কিন্তু যদি দ্রব্যটি লুণ্ঠিত বা ছিনতাইকৃত হয়ে থাকে, তা যদি মিছলী হয়, তাহলে তা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যার জিনিস সে ধৈর্যধারণ করবে তার পরবর্তী উৎপাদনের সময় পর্যন্ত। যখন উৎপাদন শুরু হবে সে লুণ্ঠনকারীর নিকট থেকে সদৃশ বস্তু গ্রহণ করবে।
টিকাঃ
২২. আল-মানছুর ফিল কাওয়ায়েদ, খ. ২, পৃ. ৩২৮ ও ৩৩৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৮২; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ৪১৯
২৩. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ১২৫ ও ৪২৫ এবং খ. ৫, পৃ. ১১৬; আল-ইখতিয়ার, খ. ৩, পৃ. ৫৯
২৪. হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৭১-৭২; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১৪৮
📄 তিন : যখন বিক্রীত পণ্যের মূল্য নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে মতান্তর হয়
তিন: যখন বিক্রীত পণ্যের মূল্য নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে মতান্তর হয়
যে সকল ক্ষেত্রে বস্তুর কীমাত ধার্য করা আবশ্যক, এটি হচ্ছে তার তৃতীয় স্থান। যখন ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে পণ্যের মূল্য নিয়ে মতান্তর হয়, বিক্রেতা বলে, আমি এতো টাকায় বিক্রি করেছি, ক্রেতা বলে, আমি এতো টাকা করে কিনেছি, তাদের কারো পক্ষে দলিল প্রমাণ থাকলে বা সাক্ষী থাকলে তার পক্ষে ফয়সালা হবে। কিন্তু যদি তাদের কারোরই কোনো দলিল প্রমাণ না থাকে, বিক্রি বহাল রাখতে তারা উভয়ে সম্মত না থাকলে প্রত্যেকে নিজ নিজ দাবির পক্ষে এবং অন্যের দাবির বিপক্ষে শপথ করবে। ফলে সে বিক্রি ভেঙ্গে যাবে।
বিক্রি ভেঙ্গে যাওয়ার প্রেক্ষিতে বিক্রেতা মূল্য ফেরত দেবে, ক্রেতা বিক্রীত পণ্যটি ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু যদি তা ইতিমধ্যে ধ্বংস বা বিনষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তার জরিমানা বা বদল কিভাবে প্রদান করা হবে তা নিয়ে ফকীহগণ মতান্তর করেছেন।
হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের মত, এটি শাফেয়ী মাযহাবের নবভী রহ.-এর মত, তিনি হাভী নামক গ্রন্থে এ মতটির সত্যায়ন করেছেন। এটি মুহাযযাব গ্রন্থের গ্রন্থকারেরও মত, তাওযীহ এবং আরো কতক গ্রন্থ অনুসারে এটি মালেকী মাযহাবের আলেমদের একটি মত, ক্রেতা এ অবস্থায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া পণ্যের কীমাত প্রদান করবে, মূল বস্তুটি মিছলী হোক বা কীমী, বিধান এরূপই থাকবে। শাফেয়ী মাযহাবের আলেমদের যেটি প্রসিদ্ধ মত, খতীব শারবীনী যা উল্লেখ করেছেন। মালেকী মাযহাবের এটিও একটি মত, বিক্রীত পণ্যটি মিছলী হলে ক্রেতা তার মিছল বা সদৃশ বস্তু প্রদান করবে, যদি কীমী হয় তাহলে কীমাত প্রদান করবে।
টিকাঃ
২৫. মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ৭৪৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৯৭; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩০১; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৮৫
📄 যে সব ক্ষেত্রে কীমাত ও সদৃশ বস্তু উভয়টি আদায় করতে হয়
যে সব ক্ষেত্রে কীমাত ও সদৃশ বস্তু উভয়টি আদায় করতে হয়
জরিমানা আদায়ের ক্ষেত্রে কতক স্থান এমনও রয়েছে, যেখানে একই সাথে সদৃশ বস্তু প্রদান করা এবং তার মূল্য পরিশোধ করা উভয় ধরনের বিধান কার্যকর হয়।
এমনটা হয়, যদি যে সকল প্রাণী মানুষ সচরাচর শিকার করে সে সবের কোনটি কারো মালিকানাধীন হয়, কোনো ইহরামবাঁধা লোক তা হত্যা করে অথবা ইহরামবিহীন ব্যক্তি তা হারাম শরীফের ভিতরে গিয়ে মেরে ফেলে, তাহলে তার একই সাথে মালিকের ক্ষতিসাধন এবং আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করার যৌথ অপরাধ করা হবে। ফলে তার শাস্তির বিধানও হবে দুদিক থেকে। সে মালিককে সে জন্তুটির কীমাত পরিশোধ করবে এবং সদৃশ বস্তুও প্রদান করবে আল্লাহর বিধান অমান্য করার প্রেক্ষিতে।
এ মাসআলাটি অপর এক মাসআলার সদৃশ। তা হলো, শিকারজাতীয় প্রাণী কারো মালিকানাধীন, এর মালিক ইহরামে না থাকা অবস্থায় তার নিকট থেকে অপর একজন ধার নিল। এরপর সে প্রাণীটি এ লোকের নিকট মারা গেল। এ অবস্থায় যে ধার নিয়েছে তার মূল্য ও সদৃশ প্রাণী প্রদান এ উভয় ধরনের শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ সম্পর্কে দলিল হচ্ছে মহান আল্লাহর নির্দেশ : فَجَزَاء মِّثْلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ “তার বদলা হচ্ছে সে যা হত্যা করেছে তার অনুরূপ গৃহপালিত জন্তু।”
এতো হচ্ছে, যদি গৃহপালিত জন্তুর মধ্যে শিকার প্রাণীর অনুরূপ প্রাণী পাওয়া যায় তার বিধান। কিন্তু যদি গৃহপালিত প্রাণীর মধ্যে তার অনুরূপ কোনো প্রাণী না পাওয়া যায়, যেমন কারো মালিকানাধীন চড়ুই পাখি, তা শিকার বা হত্যা করলে দুটি কীমাত প্রদান আবশ্যক হবে। এক. মালিকের ক্ষতিপূরণ এবং দুই. আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন।
টিকাঃ
২৬. সূরা মায়েদা, আয়াত ৯৫
২৭. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ২, পৃ. ২০৩; আল-মানছুর, খ. ২, পৃ. ৩৩৩; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ৪১ ও ৪৩; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ১, পৃ. ১৯৯