📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন 📄 হস্তান্তরের খরচ

📄 হস্তান্তরের খরচ


পণ্য যদি পরিমাপযোগ্য বস্তু হয় এবং তা পরিমাপ করে বিক্রি করাই শর্ত করা হয়, যদি পণ্য ওজনযোগ্য বস্তু হয় এবং তা ওজন করে বিক্রি করাই শর্ত করা হয়, যদি পণ্য হাত দিয়ে বা গজকাঠি দিয়ে মেপে বিক্রি করার যোগ্য বস্তু হয় এবং তা মেপে বিক্রি করার শর্ত করা হয়, যদি পণ্য গণনীয় হয় এবং তা গুণে গুণে বিক্রি করার শর্ত করা হয়, তাহলে যে লোক পরিমাপ করবে, ওজন করবে, কাঠি বা ফিতা দিয়ে মেপে দিবে বা গুণে দিবে তার খরচ বহন করবে বিক্রেতা।

আল্লামা দারদীর বলেন: যদি বিপরীত শর্ত করা হয় অথবা বিপরীত রীতি কোথাও প্রচলিত থাকে তাহলে এ খরচ বহন করবে ক্রেতা; নতুবা স্বাভাবিক নিয়ম হিসাবে এ খরচ বিক্রেতার। যেহেতু পণ্য বুঝিয়ে দেওয়া বিক্রেতার দায়িত্ব। পরিমাপ, ওজন, গণনা করা ইত্যাদি ব্যতীত তা সম্ভব নয়। অতএব, এ কাজগুলো সে করবে বা করাবে। যেহেতু পরিমাপ ও ওজন ইত্যাদির মাধ্যমে তার মালিকানাধীন বস্তু থেকে যা এখন আর তার মালিকানায় নেই তা পৃথক হবে, এ পৃথক করে দেখানোর দায়িত্বও তার এবং যেহেতু সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে ফলবাগানে সেচের দায়িত্বে থাকার পর ফল বিক্রয় করছে, তাই এসব হিসেবেই বিক্রেতার দায়িত্ব মেপে বা গনে পণ্য ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়া।

যদি হামান বা মূল্য হিসাবে যা দেওয়া হচ্ছে তা পরিমাপযোগ্য বস্তু হয়, ওজন করে বিক্রি করার উপযোগী হয়, দৈর্ঘ্য হিসাব করে বিক্রি উপযোগী বস্তু হয় বা গণনীয় বস্তু হয় তবে তা পরিমাপের, ওজনের, মেপে দেওয়ার বা গুণে বিক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব ক্রেতার। তাই ক্রেতা নিজে এ কাজটি করবে বা অপরকে দিয়ে করাবে, তার পারিশ্রমিক প্রদান ক্রেতার দায়িত্বে ন্যস্ত থাকবে। এভাবে পণ্য সংক্রান্ত খরচ বিক্রেতার এবং মূল্য সংক্রান্ত খরচ ক্রেতার, এ কথায় হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী সকল মাযহাবের সকল আলেম ও ফকীহ একমত।

যেহেতু ক্রেতার কর্তব্য ছামান বা মূল্য বিক্রেতার হাতে সমর্পণ করা এবং তার পরিমাপ বা পরিমাণ ইত্যাদি তার পূর্বে নির্ধারণ করা। তাই এ সংক্রান্ত ব্যয় তার কাঁধে ন্যস্ত হবে। এ কথার ওপর ভিত্তি করে মালেকী মাযহাবের আলেম সাভী এক ভিন্ন আলোচনার অবতারণা করেছেন। তিনি বলেন: যদি ক্রেতা নিজেই পণ্যের ওজন ও পরিমাপ ইত্যাদির কাজ সম্পন্ন করে তবে সে কি এর জন্যে বিক্রেতার নিকট পারিশ্রমিক দাবি করতে পারবে? এর জবাবে দুসূকী যা বলেছেন তা-ই প্রকাশ্য। তিনি বলেন, যদি ক্রেতার এটি পেশা হয়ে থাকে তবে সে তার পেশাগত দায়িত্ব হিসাবে পারিশ্রমিক নিতে পারে। এমনিভাবে যদি কেউ তার নিকট এ কাজের চাহিদা এবং সে হিসাবে পারিশ্রমিক দাবি করে তাহলে ক্রেতা অন্য কাউকে কাজটি না দিয়ে নিজেই সে কাজটি সম্পন্ন করতে পারে এবং সে লোক যত দাবি করেছিল ক্রেতাও এখন সে পরিমাণ দাবি করতে পারে।

ক্রেতা ও বিক্রেতা যে বৈঠকে বিক্রয় সম্পন্ন করছে সে বৈঠকে পণ্যটি উপস্থিত নেই, তা এখানে নিয়ে আসার খরচ বিক্রেতার। এমনিভাবে ছামান (মূল্য) হিসাবে যা দেওয়া হবে তা এখানে নেই, তা নিয়ে আসার খরচ ক্রেতার; শাফেয়ী আলেমগণ এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

স্থানান্তরযোগ্য পণ্য ক্রেতাকে বুঝিয়ে দিতে স্থানান্তর করা প্রয়োজন, তার খরচ কার দায়িত্বে, তা নিয়ে দুধরনের মত পাওয়া গেছে:

এক. এটি ক্রেতার দায়িত্বে। এটি শাফেয়ী আলেমদের অভিমত। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলও এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, বিক্রেতা পণ্যটি পুরোপুরি বুঝিয়ে দেওয়ার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই, বরং পুরোপুরিভাবে বুঝে পাওয়া ক্রেতার কর্তব্য। তাই সে এই খরচ বহন করবে। তারা বলেন, এই একই হিসাবে ছামানে এ জাতীয় খরচ হলে তা বহন করবে ক্রেতা।

দুই. এ সম্পর্কে দ্বিতীয় মতটি হচ্ছে যে এলাকায় বেচাকেনা হচ্ছে সে এলাকার প্রচলন ও নিয়মরীতি। এটি হানাফী মাযহাবের আলেমদের মত; সুস্পষ্টভাবে তা আলোচনা করা হয়েছে মাজাল্লা তুল আহকামিল আদলিয়্যা গ্রন্থের ২৯১ ধারায়। যদি পরিমাপযোগ্য বা ওজন করার বস্তু পরিমাপ, ওজন বা মাপা ইত্যাদি না করে অনুমানের ভিত্তিতে বিক্রি করা হয়, তাহলে এর জন্যে যা খরচ করতে হয় তা করবে ক্রেতা। যেমন, আঙ্গুর ফল বিক্রি করা হলো অনুমান করে, তাহলে গাছ থেকে আঙ্গুর পাড়া এবং তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা সবই ক্রেতার দায়িত্বে, তার খরচেই এ কাজগুলো সম্পন্ন হবে। এমনিভাবে গমের স্তূপ থেকে বিক্রি করা হলো অনুমান করে, তাহলে যেটুকু বিক্রি করা হলো তা পৃথক করা এবং স্থানান্তর করা ইত্যাদি ক্রেতা নিজ খরচে করবে। এসবই মাজাল্লা তুল আহকামিল আদলিয়্যা-এর ২৯০ ধারায় আলোচিত হয়েছে। এক্ষেত্রে কিয়াস ও যুক্তির দাবি হচ্ছে, ছামান যদি এমনিভাবে অনুমান করে দেওয়া হয় তাহলে তার সাথে সংশিষ্ট ব্যয় বহন করবে বিক্রেতা, যেমন পণ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যয় বহন করবে ক্রেতা।

স্বর্ণমুদ্রা বা রৌপ্যমুদ্রা দ্বারা মূল্য পরিশোধ করার ক্ষেত্রে সে সব মুদ্রা পরোখ ও পরীক্ষা করার কথা উঠে। এজন্যে মুদ্রা পরোখকারীকে তলব করা হয় অথবা তার নিকট মুদ্রা নিয়ে যাওয়া হয়। পরোখকারীর ব্যয়ভাতা কে বহন করবে তা নিয়ে বিভিন্ন মত প্রকাশিত হয়েছে:

এক. তার ব্যয়ভার বহন করবে বিক্রেতা। এটি শাফেয়ী আলেমদের মত। হানাফী মাযহাবের ইমাম মুহাম্মদ-এর পক্ষ থেকে ইবনে রুস্তম তা বর্ণনা করেছেন। কুদূরী গ্রন্থের গ্রন্থকারও তার লেখায় এটি উল্লেখ করেছেন। তাদের এ সম্পর্কে বক্তব্য হচ্ছে: মুদ্রা পরোখ করার প্রয়োজন হয় ক্রেতা বিক্রেতার নিকট বুঝিয়ে দেওয়ার পর, তখন এ মুদ্রা থাকে বিক্রেতার হাতে। মুদ্রাগুলো ভালো না মন্দ তা জানা, মন্দ হলে তা ফেরত দেওয়া ইত্যাকার কারণে মুদ্রাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান লাভ করা বিক্রেতার জন্যে জরুরি, তাই সে নিজ খরচে এ কাজটি করাবে।

দুই. মুদ্রা পরোখ করার খরচ বহন করবে ক্রেতা। ইবনে সামাআ. বলেছেন, এটিই ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর মত। সদরুশ শহীদও এ ফতোয়াই দিয়েছেন। তাদের যুক্তি হচ্ছে, ভালো মুদ্রা- যেগুলো নিয়ে কারো আপত্তি থাকবে না- এমন মুদ্রা হস্তান্তর করা ক্রেতার দায়িত্ব। যেহেতু ভালোমন্দ যাচাই হয় পরোখ করার দ্বারা, অতএব এ খরচ বহন করবে ক্রেতা। ক্রেতা নিজ দায়িত্বে এ কাজটি সম্পন্ন করবে। যেমন ছামান ওজনযোগ্য বস্তু হলে তা ওজন করানোর দায়িত্ব ও খরচ ক্রেতার দায়িত্বেই থাকে।

তিন. মুদ্রা পরোখ করার ব্যয়ভার ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির, যদি ঋণ পরিশোধের পূর্বে পরোখ করা হয়। যদি ঋণ পরিশোধ করার পর যাচাই করার কথা উঠে তবে এখন তার ব্যয়ভার বহন করবে ঋণদাতা। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির দায়িত্ব ঋণ পরিশোধ করা, তাই পরিশোধের পূর্বে মুদ্রাগুলো যাচাই ও পরোখ করে নেওয়া তার দায়িত্ব। তাই তখন পরোখ করা হলে সে খরচ ঋণী ব্যক্তির। যদি সে ঋণ পরিশোধ করে, এরপর তা যাচাই করার দায় ঋণদাতার, তাকে যথাযথ মুদ্রা দেওয়া হয়েছে কিনা তা সে এখন যাচাই করলে নিজ খরচে তা করাবে।

টিকাঃ
৮৯. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৫; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৪২৩; আল-জুমাল, খ. ৩, পৃ. ১৭৭
৯০. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ১০৮; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা ২৮৮ ও ২৮৯; মুনীর কাজী কৃত শারহুল মাজাল্লা, খ. ১, পৃ. ২৫৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৩; ইবনে কুদামা কৃত আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ২২০; দারদীর কৃত আশ-শারহুস সাগীর ও সাভী, খ. ৩, পৃ. ১৯৭; আশ-শারহুল কাবীর ও দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ১৩০
৯১. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ১০৮; সাভী, খ. ৩, পৃ. ১৯৭; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৩
৯২. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৩; ইবনে কুদামা কৃত আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ২২০; মুনীর কাজী কৃত শারহুল মাজাল্লা, খ. ১, পৃ. ২৫৪
৯৩. نقد (নন্দ) শব্দটির অর্থ যাচাই করা, পরোখ করা, সমীক্ষা, সমালোচনা। তাই ناقদ الثمن এর অর্থ: মুদ্রা যাচাইকারী।
৯৪. আল-হিদায়া ও ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ১০৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৩; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ১৪; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ৩৩০; আদ-দুররুল মুখতার ও রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৬০; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২৪৭-৩২৪৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px