📄 মূল্যে বিক্রেতার কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ
হানাফী মাযহাবের আলেমদের মতে, কব্জা করার পূর্বেই মূল্যে বিক্রেতার কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রকাশ করা বৈধ। যার দেনা তার পক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রদান করা হলে, দেনা কোনো কিছুর এওয়াজে (বিনিময়ে) হতে পারে (যেমন পণ্যের মূল্য) বা এওয়াজবিহীন হতে পারে (যেমন সাধারণ ঋণ), তাহলে যে পাওনাদার তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জিত হবে। যেহেতু ছামান নির্ধারণ করলেও নির্ধারিত হয় না, তাই তাতে ছামান ধ্বংস হয়ে বিক্রি ভেঙ্গে যাওয়ার প্রবঞ্চনাপূর্ণ পরিস্থিতি কখনো সৃষ্টি হয় না। ছামান যেহেতু দায়িত্বে অর্পিত হয়, তাই তাতেই কব্জা করা বাস্তবিক পক্ষে সংঘটিত হয় না। বরং যেটি ছামান হিসাবে নির্ধারণ করা হয় তা ভিন্ন অন্যটি গ্রহণ করলে সেটিই কার্যত নির্ধারিত হয়। তাই এটি নির্ধারিত না হয়ে দায়িত্বে ন্যস্ত থাকাই হলো স্বাভাবিক অবস্থা।
উল্লিখিত অংশের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে ইবনে আবিদীন-এর আলোচনায়। তিনি বলেন : ছামান (মূল্য) দু প্রকার : এক. ছামান কখনো বিক্রয়কালে উপস্থিত থাকে। ক্রেতা বলল : এই এক ইরদাব (চব্বিশ সা' বরাবর এক পরিমাপ) গমের বদলে আমি এ ঘোড়াটি কিনেছি অথবা দিরহাম উপস্থিত রেখে বলল, কিনলাম এ দিরহামগুলোর দ্বারা। তাহলে বিক্রেতা ক্রেতার নিকট থেকে তা বুঝে নেওয়ার এবং কজা করার পূর্বেই তা দান করা বা কারো ঋণ পরিশোধ ইত্যাদি করতে পারে।
দুই. কখনো মূল্য উপস্থিত থাকে না, থাকে কেবল ক্রেতার দায়িত্বে। ক্রেতা বলে, এক ইরদাব গমের বিপরীতে বা দশ দিরহাম মূল্যে এ ঘোড়াটি কিনলাম। এক্ষেত্রে এক ইরদাব গম বা দশ দিরহাম উপস্থিত করে বিক্রেতাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি, কেবল ক্রেতার দায়িত্বে তা রয়ে গেছে। এ অবস্থায় শুধুই ক্রেতার পক্ষ থেকে সেই মূল্যের মালিক করে দেওয়ার প্রেক্ষিতে তাতে বিক্রেতার নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব কার্যকর হবে। অর্থাৎ বিক্রেতার নিকট কেউ দশ দিরহাম পাবে, বিক্রেতা এই ক্রেতার নিকট থেকে তা তাকে নিয়ে নিতে বলবে। এভাবে সে তা কাউকে দান করতে পারবে। সে এমনটা করতে পারবে এ-কারণে যে, এটি হচ্ছে ঋণের মালিক বানানো, বিক্রেতার নিকট ক্রেতা এখন ঋণী। ঋণের মালিক তার পাওনায় এধরনের কর্তৃত্ব প্রকাশ করতে পারে, যদি ঋণগ্রস্ত নিজে তাকে এ কর্তৃত্ব প্রকাশের ক্ষমতা প্রদান করে। শাফেয়ীদের নির্ভরযোগ্য মতের বিপরীত এরূপ একটি মত রয়েছে।
ইবনে নুজাইম বলেন : যে ঋণদাতা তার পক্ষ থেকে কাউকে ঋণে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রদান করা যথাযথ নয়। মূল্য পরিশোধ করা বাকী থাকলে তাও এ ঋণের বিধানের অন্তর্ভুক্ত। তবে তিনটি ক্ষেত্র এর ব্যতিক্রম: এক. ঋণদাতা কাউকে সে ঋণ আদায়ের দায়িত্ব প্রদান করেছে। দুই, হাওয়ালা অর্থাৎ কাউকে ঋণের দাবিদার বানানো এবং তিন, অসিয়ত। এ তিন অবস্থায় একজনের ঋণে অপরজনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
শাফেয়ী মাযহাবের আলেমদের মতে, মূল্য হিসাবে যা উপস্থিত বা নির্ধারিত, তাতে বিক্রেতা কজা করার পূর্বে নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রদর্শন করতে পারবে না। তবে যা নির্ধারিত হয়নি, কেবল ক্রেতার দায়িত্বে রয়েছে, তাতে শাফেয়ী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মত হচ্ছে, কজা করার পূর্বেই বিক্রেতা তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
মালেকী মাযহাবের আলেমদের মত, বিক্রেতা তার পণ্যের মূল্য কজা করার পূর্বেই তাতে কর্তৃত্ব প্রদর্শন করতে পারবে। কেবল খাদ্যদ্রব্য এর ব্যতিক্রম। তারা বলেন, যদি পণ্যের মূল্য হিসাবে খাদ্যদ্রব্য প্রদান করার ফয়সালা হয় তবে তা কব্জা করা ব্যতীত বিক্রেতা তাতে কোনো ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রকাশ করতে পারবে না।
হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের মতে, ছামান বা মূল্য হিসাবে যদি কোনো বস্তু নির্ধারিত হয়, সে বস্তুটি পরিমাপ পাত্র দিয়ে মাপার বস্তু বা ওজন করে লেনদেনের যোগ্য বা হাত দিয়ে মাপার বস্তু বা গণনা করার বস্তু হবে, যদি এ মর্মে ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে পারস্পরিক চুক্তি হয়ে থাকে, তাহলে পরিমাপ পাত্র দিয়ে মেপে বা ওজন করে বা হাত দিয়ে মেপে বা গুণে গুণে মূল্য বুঝে না নেওয়া পর্যন্ত বিক্রেতা তাতে কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। যদি তাদের মধ্যে চুক্তি হয়, মূল্য হিসাবে প্রদত্ত বস্তুটি পরিমাপ পাত্র দিয়ে মাপার যোগ্য কোনো বস্তু হবে না অথবা যোগ্য হলেও না মেপে অনুমান করে দেওয়া হবে, তাহলে বিক্রেতা তা বুঝে পাওয়ার আগেই তাতে মালিকানা প্রকাশ করতে পারবে।
যদি মূল্য উপস্থিত না থেকে কেবল দায়িত্বে থেকে যায়, তাহলে কব্জা করার পূর্বে যার ঋণ সে সেটি বিক্রি করা বা দান করা ইত্যাদি যে কোনো কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা প্রকাশ করতে পারবে, যার ঋণ নয় সে তাতে কোনো ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারবে না।
টিকাঃ
৭৩. তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ৮২-৮৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৬৯; আল-হিদায়া, আল-ইনায়া ও ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৬৯; আল-বাহরুর রায়েক; খ: ৬, পৃ.১২৯; আদ-দুররুল মুখতার ও রাদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ১৫২; আল-ইখতিয়ার, পৃ. ১৮১; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২২৬
৭৪. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৬৯; আল-মাজমু, খ. ৯, পৃ. ২৬৩.
৭৫. আল-হাততাব, খ. ৪, পৃ. ৪৮২; দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৩২৯; আল-ফুরূক, খ. ৩, পৃ. ২৭৯-২৮০
৭৬. শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৮৯
📄 ছামান (মূল্য) বিক্রেতাকে বুঝিয়ে দেওয়া
হানাফী আলেমদের মত: যদি বস্তুর বদলে বস্তু, এমনিভাবে মুদ্রার বদলে মুদ্রা, স্বর্ণরৌপ্যের বিপরীতে স্বর্ণরোপ্য বিক্রি করা হয়, তাহলে উভয়টি একই সময়ে হস্তান্তর করে বুঝিয়ে দিতে হবে, যেহেতু বস্তুর বদলে বস্তু হওয়ার বেলায় উভয়টি নির্ধারিত হওয়ার ক্ষেত্রে এক বরাবর। তেমনি মুদ্রার বদলে মুদ্রার বেলায় নির্ধারিত না হওয়ার ক্ষেত্রে উভয়টি এক বরাবর। তা ছাড়া যে সকল লেনদেনে পারস্পরিক বিনিময় হয়, সে সবে উভয় পক্ষে একই প্রকার আচরণ স্বাভাবিক ভাবে কাম্য হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে একই সময়ে উভয়টি হস্তান্তর হলেই সমতা ও সমআচরণ প্রকাশিত হবে।
মালেকী মাযহাবের আলেমগণও অনেকটা এমন কথাই বলেছেন। তারা বলেন, যে বিষয় নিয়ে চুক্তি হয় তা হয়তো ছামান (মূল্য জাতীয়) বা মুছমান (পণ্য জাতীয়) বস্তু। দিরহাম ও দীনার হচ্ছে ছামান শ্রেণীভুক্ত, অন্য যা কিছু তা মুছমান শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। বিক্রি যদি দীনারের বিপরীতে দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) বা দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) হয়, অথবা দিরহামের বিপরীতে দিরহাম বা দীনার, উভয় পক্ষই নিজ নিজ প্রাপ্য বুঝে নিতে অগ্রসর হয়, সেক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতার একের পূর্বে অপরের হস্তান্তর করে বুঝিয়ে দেওয়া জরুরি নয়। এমনিভাবে যদি কোন বস্তুর বদলে বস্তু বিক্রি করা হয়, উভয়ে নিজ নিজ সম্পদ বুঝে নিতে তৎপর হয় তাহলে একের অপরের পূর্বে তা বুঝিয়ে দেওয়া জরুরি নয়। তবে দীনার ও দিরহামে সংঘটিত বিক্রি হচ্ছে সরফ বিক্রি, তাই তাতে বৈঠকেই কজা করা জরুরি, অন্য বিক্রিতে তা জরুরি নয়। তাই তৎক্ষণাৎ বুঝিয়ে না দিলেও অন্য বিক্রি বহাল থাকবে, কিন্তু 'সরফ' বিক্রিতে তখনই বুঝিয়ে না দিলে বিক্রি বাতিল হয়ে যাবে।
শাফেয়ী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, ছামান (মূল্য) যদি নির্ধারিত থাকে- তা অর্থ সম্পদ হোক বা কোনো বস্তু- তাহলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কে বাধ্য করা হবে অপরকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে; এটিই তাদের প্রকাশ্য মাযহাব ও মত। তারা বলেন, এক্ষেত্রে পণ্য ও মূল্য উভয়টি সমমানের, যেহেতু উভয়টি নির্ধারিত। উভয়টি দ্বারা ঋণ আদায় করা সম্ভব। এবং উভয়েরই অপরের নিকট প্রাপ্য হস্তান্তর করা আবশ্যিক। তাই প্রয়োজনে বিচারক তাদের উভয়কে পণ্য ও মূল্য তার নিকট অথবা কোনো ন্যায়নিষ্ঠ লোকের নিকট উপস্থিত করতে বা অন্য কোনো ন্যায়নিষ্ঠ লোকের নিকট উপস্থিত করতে বাধ্য করবেন। এরপর তিনি বা ন্যায়নিষ্ঠ লোক যার যা প্রাপ্য তাকে বুঝিয়ে দিবেন। কাকে দিয়ে দেওয়া শুরু করবেন তা তার ইচ্ছা। তাদের প্রকাশ্য মতের বিপরীত মত হচ্ছে, বিচারক তাদেরকে এ জন্যে কোনো কিছুতে বাধ্য করবেন না।
যদি ছামান নির্ধারিত না থেকে দায়িত্বে ন্যস্ত থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে চারটি মত রয়েছে, তন্মধ্যে যেটি অগ্রগণ্য তা হচ্ছে বিচারক বিক্রেতাকে তার পণ্য বুঝিয়ে দিতে বাধ্য করবে, মূল্যের জন্যে তাকে পণ্য বুঝিয়ে দিতে বিলম্ব করতে দিবে না। হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের মতও প্রায় অনুরূপ। তারা বলেন: ছামান যদি অর্থ সম্পদ বা কোনো বস্তু হয়, পণ্যটাও হয় ছামানের সমগোত্রীয়, তাহলে ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে একজন ন্যায়নিষ্ঠ লোককে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তিনি উভয়ের নিকট থেকে পণ্য ও মূল্য নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অপরকে তা বুঝিয়ে দিবেন। যেহেতু এক্ষেত্রে ক্রেতার যেমন পণ্যটি বুঝে পাওয়ার অধিকার রয়েছে, বিক্রেতারও তেমনি মূল্যটা বুঝে পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এভাবে দুজনেরই সমান অধিকার, তাই ফয়সালা একইরূপ হবে।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এ সম্পর্কে যা বলেছেন তার মর্ম হচ্ছে, বিক্রেতাকে তার পণ্য বুঝিয়ে দিতে প্রথমে চাপ দেওয়া হবে। পণ্য যদি উপস্থিত ও বর্তমান থাকে এবং মূল্য থাকে দায়িত্বে, সেক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে কে প্রথমে তার হাতে থাকা বস্তু অপরকে বুঝিয়ে দিবে, তা নিয়ে ফকীহগণ মতানৈত্য করেছেন ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে।
প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি: ক্রেতা প্রথমে তার মূল্য পরিশোধ করবে। এটি অধিকাংশ ফকীহের মত। হানাফী ও মালেকী মাযহাবের সকলের মত এবং শাফেয়ী আলেমদের অন্যতম মত এটি। তারা বলেন: মূল্য যদি নগদ প্রদেয় হয় তাহলে বিক্রেতা যে পর্যন্ত পণ্যের মূল্য বুঝে না পায় সে তার পণ্য হস্তান্তর না করে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে দিতে পারে, এটি তার অধিকার। এর বিপরীতে পণ্য বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত ক্রেতার মূল্য আটকে রাখার অধিকার নেই। ছামান অর্থসম্পদ এবং তা নির্ধারিত হলেও হানাফী আলেমগণ এ কথাই বলেন, যেহেতু তা নির্ধারণ করলেও নির্ধারিত হয় না, তাই ছামান নির্ধারিত অর্থ হলেই তা পণ্যের বরাবর হবে না।
এ দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে দলিল: এক. রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : الدِّينُ مَقْضَى "ঋণ আদায় করতে হবে।" এ হাদীসে নবী স. ঋণ আদায়ে তাগিদ প্রদান করেছেন, তা যে কোনো ধরনের ঋণ হোক। দায়িত্বে থাকা ছামানও ঋণের অন্তর্ভুক্ত। তাই হাদীসের নির্দেশ এখানেও বলবৎ হবে। যদি পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার পর মূল্য প্রদান করে তাহলে এ হাদীস অনুযায়ী আমল করা হবে না। তাই ঋণ পরিশোধ করতে হবে আগে।
দুই. তারা যুক্তিভিত্তিক দলিলও প্রদান করেছেন। তা হলো, বিক্রয়চুক্তির স্বাভাবিক চাহিদা হচ্ছে, বিক্রেতা ও ক্রেতার প্রাপ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বরাবর হবে। এ পর্যায়ে দেখা যায়, ক্রেতার প্রাপ্য নির্দিষ্ট হয়ে আছে, কিন্তু বিক্রেতার প্রাপ্য নির্দিষ্ট করা হয়নি। তাই ক্রেতা প্রথমে মূল্য পরিশোধ করবে তাতে বিক্রেতার প্রাপ্য নির্দিষ্ট হয়ে যাবে। ক্রেতার পণ্য নির্দিষ্ট করার জন্যে কজা করা জরুরি নয়, কিন্তু বিক্রেতার মূল্য নির্দিষ্ট করে নিতে কজা করা আবশ্যক। তাই বিক্রেতা প্রথমে তার প্রাপ্য কব্জা করবে।
সমাধানের রূপটি হবে: প্রথমে বিক্রেতাকে বলা হবে, তুমি পণ্য উপস্থিত করো, যেন পণ্য মজুদ থাকা নিশ্চিত ভাবে জানা যায়। বিক্রেতা পণ্য উপস্থিত করার পর ক্রেতাকে বলা হবে, এখন তুমি প্রথমে মূল্য বুঝিয়ে দাও।
প্রথমেই ক্রেতা তার মূল্য পরিশোধ করবে, এ মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে হানাফী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি কেউ এ শর্ত করে বিক্রি করে যে, মূল্য পরিশোধের পূর্বে সে পণ্য বুঝিয়ে দিবে, তাহলে বিক্রি ফাসেদ হয়ে যাবে। কারণ এটি এমন শর্ত বিক্রয়চুক্তি যার চাহিদা প্রকাশ করে না। এ ধরনের শর্ত করা হলে বিক্রি ফাসেদ হয়ে যায়। মুহাম্মদ রহ. বলেন: এভাবে বিক্রি করা সঠিক ও বৈধ হবে না, যেহেতু সে শর্ত করেছে মূল্য পরিশোধের পূর্বে সে পণ্য বুঝিয়ে দিবে, কিন্তু কবে সে তা করবে তা কিছুই জানায়নি। এভাবে সময় অনির্দিষ্ট থাকায় বিক্রি যথাযথ হবে না। অতএব, বিক্রেতা যদি এ কথা বলার পর পণ্য উপস্থিতির নির্দিষ্ট সময় বলে দেয় তাহলে এ বিক্রি বৈধ হবে।
যদি বিক্রেতা তার পণ্য উপস্থিত না করে তবে বিক্রেতা যে পর্যন্ত তা উপস্থিত না করবে ক্রেতা সে পর্যন্তই মূল্য পরিশোধ করা থেকে বিরত থাকতে পারবে। ক্রেতাকে প্রথমে মূল্য পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল পণ্যের ও মূল্যের উপস্থিতিতে বরাবর হওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এখন যেহেতু পণ্য উপস্থিত নেই, তাই মূল্য আগে পরিশোধ করলে সমতা সৃষ্টি হবে না, বরং বিক্রেতার অধিকার হবে অগ্রবর্তী, ক্রেতার অধিকার হবে পশ্চাৎবর্তী। এ অবস্থায় মূল্য আগে দিয়ে দিলে তা বিক্রেতার হাতে আসার পর হবে ইশারার দ্বারা নির্দিষ্ট বস্তু, অথচ তখনো পণ্য উপস্থিত না করায় তা ইশারায় নির্দিষ্ট হয়নি। এভাবেও সমতা লঙ্ঘিত হয়। সে সাথে এমনও তো হতে পারে, পণ্যটি ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে ক্রেতার জন্যে মূল্য প্রদানের বাধকতাও আর থাকেনি। তাই পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার পর ব্যতীত মূল্য বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে না। পণ্য সে এলাকায় সে নগরীতে থাকুক বা অন্য নগরীতে সেখান থেকে আনা ব্যয়সাধ্য হোক তবুও প্রথমে পণ্য উপস্থিত করতে হবে।
যদি বিক্রেতার সাথে ক্রেতার সাক্ষাৎ হয় এমন জায়গায়, পণ্যটি যেখানে নেই। তাহলে ক্রেতা পণ্যটি উপস্থিত করে বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি করবে। হয়তো বিক্রেতা পণ্যটি এখানে আনতে সক্ষম নয়, এ অবস্থায় ক্রেতা, বিক্রেতার পক্ষ থেকে কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির জিম্মাদারী গ্রহণ অথবা কাউকে প্রতিনিধি করে সে পণ্য আনতে সে এলাকায় পাঠানোর দাবি করবে। পণ্য এলে সে তা গ্রহণ করবে।
যেহেতু পণ্য উপস্থিতির জন্যে বিক্রেতার ওপর এতটাই চাপ দেওয়া যাবে, তাই বিক্রেতাও তার পণ্যের মূল্য না পাওয়া পর্যন্ত তা আটকে রাখতে পারবে। এক দিরহাম বাকী থাকা পর্যন্তই সে তা আটকাতে পারবে। অবশ্য ছামান যদি নগদ না হয়ে বাকী হয় তবে তো তা পরেই দিবে, তার বিপরীতে পণ্য আটকানো যাবে না। যেহেতু পণ্য আটকানোর অধিকার কোনো খণ্ডিত অধিকার নয়, তাই আংশিক মূল্য অনাদায়ী হলেও আটকানো হবে পূর্ণরূপেই। কিন্তু যদি মূল্য বিলম্বে পরিশোধযোগ্য হিসাবে তার সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, তাহলে বিক্রেতা আর তার পণ্য আটকে রাখতে পারেনা। যেহেতু এভাবে সময় নির্ধারণ পণ্য আটকানোর অধিকার বাতিল করে দেয়।
যদি মূল্যের এক অংশ নগদ এবং এক অংশ বাকী থাকার ফয়সালাতে বিক্রয় সম্পন্ন হয়, তাহলে নগদ পরিমাণটুকু পুরোপুরি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিক্রেতা পণ্য আটকে রাখতে পারবে, এরপর আর আটকাতে পারবে না। যদি বিক্রেতা মূল্যের এক অংশ ছেড়ে দেয় তাহলে সে অংশটুকু যেন সে পেয়ে গেছে। সে হিসাবে অবশিষ্ট মূল্য না পাওয়া পর্যন্ত সে পণ্য আটকাতে পারবে।
যদি ক্রেতার নিকট থেকে মূল্য আদায়ের জন্যে বিক্রেতা কোন ব্যক্তিকে জিম্মাদার হিসাবে গ্রহণ করে অথবা ক্রেতা বিক্রেতার নিকট মূল্য পূর্ণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত কোন কিছু বন্ধক রাখে তারপরও বিক্রেতা তার পণ্য আটকে রাখতে পারে। যেহেতু জিম্মাদার থাকা বা বন্ধক রাখা মূল্য পরিশোধে প্রমাণপত্র তুল্য, এগুলো নির্ভরতা প্রদান করে। কিন্তু মূল্য পূর্ণরূপে না পাওয়া পর্যন্ত পণ্য আটকে রাখার যে অধিকার, জিম্মাদারী বা বন্ধক রাখা তা বাতিল করতে পারে না।
টিকাঃ
৭৭. আল-ইখতিয়ার, খ. ২, পৃ. ৮; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৪৪; যায়লাঈ, খ. ৪, পৃ. ১৪; আল-বিনায়া, খ. ৬, পৃ. ২৫৫; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২৩৪
৭৮. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১০; আল-হাততাব, খ. ৪, পৃ. ৩০৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৪; কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ২১৮; আশ-শারহুল কাবীর ও আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১১৩।
৭৯. আল-হিদায়া, খ. ৫, পৃ. ১০৮; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২৩৩; মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ৩০৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৮৪; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৪২০; ইবনে কুদামা কৃত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ১১৩
৮০. তিরমিযী, খ. ৩, পৃ. ৫৫৬, প্রকাশক: হালাবী। ইমাম তিরমিযী হাদীসটি হাসান বলে মত প্রকাশ করেছেন। হাদীসের বর্ণনাকারী সাহাবী হচ্ছেন আবু উমামা রা.।
৮১. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২৬০
৮২. তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ১৪; আল-ইখতিয়ার, খ. ১, পৃ. ১৮০; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২৩৩ ও ৩২৬০; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ৩৩১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৪; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৪২০
৮৩. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২৩৩-৩২৩৪ ও ৩২৬১-৩২৬২; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ১০৮; তাবয়ীনুল হাকায়িক-এ শালাবী কৃত টীকা, খ. ৪, পৃ. ১৪
৮৪. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ১০৮-১০৯; শালাবী কৃত টীকা, খ. ৪, পৃ. ১৪
৮৫. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৪; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৪২০; আর-রাওয ও আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ৮৯; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২৬০; ইবনে কুদামা কৃত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ১৩ ও ১১৩
৮৬. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৪; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৪২০; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২৬০; ইবেন কুদামা কৃত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ১১৩
৮৭. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৪; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৪২০
📄 মূল্য পরিশোধের দায়িত্ব অন্য কারো উপর অর্পিত হলে
মূল্য পরিশোধের দায়িত্ব অন্য কারো উপর অর্পিত হলে পণ্য আটকে রাখার অধিকার কি বাতিল হয়? ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন, মূল্যপ্রদান বা মূল্য আদায়ের দায়িত্ব অপর কাউকে দিলে পণ্য আটকে রাখার অধিকার বাতিল হবে। ক্রেতা বিক্রেতাকে জানাল, পণ্যের মূল্য আমার পরিবর্তে অমুক ব্যক্তি আদায় করবে, সে ব্যক্তিও এ দায়িত্বের কথা স্বীকার করে নিলে বিক্রেতা এখন আর পণ্য আটকে রাখবে না। বিক্রেতা হয়তো ক্রেতাকে জানাল, আমার পক্ষ থেকে আমার অমুক পাওনাদার এ মূল্যটা গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রেও বিক্রেতা পণ্য ধরে রাখতে পারবে না; ক্রেতাকে বুঝিয়ে দিতে হবে।
ইমাম মুহাম্মদ রহ. বলেন, যদি ক্রেতার পক্ষ থেকে মূল্য আদায়ের দায়িত্ব কাউকে প্রদান করা হয় তাহরে বিক্রেতার পণ্য আটকে রাখার অধিকার বাতিল হবে না। বরং এখন যাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সে সে দায়িত্ব কবুল করেছে তার পক্ষ থেকে মূল্য আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিক্রেতা তার পণ্য ধরে রাখতে পারবে। যদি বিক্রেতার পক্ষ থেকে কাউকে মূল্য গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যদি সে লোকের বিক্রেতার নিকট কোনো পাওনা না থাকে বা পাওনা থাকার প্রতি কোনো লক্ষ না করে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলেও বিক্রেতার পণ্য আটকে রাখার অধিকার বিনষ্ট হবে না। কিন্তু যদি বিক্রেতার কাছে সে লোকের পাওনা থাকে, সে হিসেবেই তাকে মূল্য আদায় করার দায়িত্ব দেওয়া হয়, সে লোকও এ দায়িত্ব গ্রহণ করে তাহলে বিক্রেতার এখন আর পণ্য আটকে রাখার অধিকার থাকবে না।
উপরিউক্ত আলোচনায় বোঝা গেল, আবু ইউসুফ রহ. যে পর্যন্ত মূল্য ঋণ হিসাবে ক্রেতার দায়িত্বে থাকবে সে পর্যন্ত বিক্রেতার পণ্য আটকে রাখার মত দিয়েছেন। কিন্তু যখন ক্রেতা মূল্য আদায় করার দায়িত্ব অন্য কাউকে প্রদান করবে তখন বিক্রেতার পণ্য আটকে রাখার সে অধিকার আর থাকবে না। কিন্তু ইমাম মুহাম্মদ রহ. বলেন, যে পর্যন্ত বিক্রেতার মূল্য দাবি করার পরিস্থিতি থাকবে তার পণ্য আটকে রাখার অধিকারও বহাল থাকবে। ক্রেতা মূল্য পরিশোধের দায়িত্ব অপর কাউকে দিলেও বিক্রেতার মূল্য চাওয়া তো বন্ধ হয়ে যায়নি। সে পূর্বে ক্রেতার নিকট মূল্য দাবি করেছে, এখন ক্রেতার পক্ষ থেকে যে দায়িত্ব নিয়েছে তার কাছে মূল্য দাবি করবে। সুতরাং তার পণ্য আটকে রাখার অধিকার যথাপূর্ব বহাল থাকবে। তবে যদি বিক্রেতার নিকট কারো পাওনা থাকার ভিত্তিতে বিক্রেতা তাকে পণ্যের মূল্য গ্রহণের দায়িত্ব প্রদান করে এবং সে লোক দায়িত্ব গ্রহণ করে তখন ক্রেতার সাথে বিক্রেতার আর কোনো দাবি না থাকার দরুন এখন আর সে পণ্য আটকে রাখতে পারবে না, তার সে অধিকার শেষ হয়ে যাবে।
আল্লামা কাসানী বলেন: ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর কথাই এক্ষেত্রে সঠিক ও যথার্থ। কারণ, পণ্য আটকে রাখা বা না রাখার অধিকার মূল্য আদায়ের দাবির সাথে সম্পর্কিত। যদি মূল্য আদায় না করে তাহলে পণ্য আটকে রাখা হবে, যদি মূল্য আদায় করে তবে পণ্য আটকে রাখবে না। কেবল ছামান বা মূল্য বিক্রয়ে বহাল থাকলেই পণ্য আটকে রাখা হবে না। যেমন: বিক্রি যখন নগদ না হয়, পরে মূল্য আদায় করার শর্তেই যখন বিক্রি সম্পন্ন হয় তখন মূল্য তো ক্রেতার দায়িত্বে বহালই থাকে, কিন্তু সে সময় পণ্য আটকে রাখা যায় না। এ সময় পণ্য হস্তান্তর করতে হয়, যেহেতু এ সময় মূল্য আদায়ের দাবি করা যায় না।
এ দলিল দ্বারা এ কথাই প্রতিষ্ঠিত হলো, মূল্য বহাল থাকার সাথে পণ্য আটকে রাখার কোন সম্পর্কে নেই; পণ্য আটকে রাখার সম্পর্ক মূল্য আদায়ের দাবির সাথে সম্পর্কিত। তাই যখন ক্রেতা মূল্য আদায়ের দায়িত্ব অপর কাউকে প্রদান করে, সে ব্যক্তি এ দায়িত্ব কবুল করে আজও মূল্য দাবি করার অবকাশ থাকার প্রেক্ষিতে বিক্রেতার পণ্য আটকে রাখার অধিকার বহাল থাকে। বিক্রেতা যদি তার কোন পাওনার দাবি ব্যতীত সাধারণভাবে কাউকে সে মূল্য গ্রহণের দায়িত্ব প্রদান করে তাহলেও বিক্রেতার সে পণ্য আটকে রাখার অধিকার থাকবে। কিন্তু যদি কোনো পাওনার বিপরীতে বিক্রেতা কাউকে মূল্য গ্রহণের অধিকার প্রদান করে তবে সেক্ষেত্রে বিক্রেতা পণ্য আটকে রাখতে পারবে না, যেহেতু তার পক্ষ থেকে আর দাবি থাকবে না।
টিকাঃ
৮৮. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২৬৪; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ১০৯; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৬১
📄 পণ্য আটকে রাখার অধিকার কি বাতিল হয়?
মূল্য পরিশোধের দায়িত্ব অন্য কারো উপর অর্পিত হলে পণ্য আটকে রাখার অধিকার কি বাতিল হয়? ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন, মূল্যপ্রদান বা মূল্য আদায়ের দায়িত্ব অপর কাউকে দিলে পণ্য আটকে রাখার অধিকার বাতিল হবে। ক্রেতা বিক্রেতাকে জানাল, পণ্যের মূল্য আমার পরিবর্তে অমুক ব্যক্তি আদায় করবে, সে ব্যক্তিও এ দায়িত্বের কথা স্বীকার করে নিলে বিক্রেতা এখন আর পণ্য আটকে রাখবে না। বিক্রেতা হয়তো ক্রেতাকে জানাল, আমার পক্ষ থেকে আমার অমুক পাওনাদার এ মূল্যটা গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রেও বিক্রেতা পণ্য ধরে রাখতে পারবে না; ক্রেতাকে বুঝিয়ে দিতে হবে।
ইমাম মুহাম্মদ রহ. বলেন, যদি ক্রেতার পক্ষ থেকে মূল্য আদায়ের দায়িত্ব কাউকে প্রদান করা হয় তাহরে বিক্রেতার পণ্য আটকে রাখার অধিকার বাতিল হবে না। বরং এখন যাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সে সে দায়িত্ব কবুল করেছে তার পক্ষ থেকে মূল্য আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিক্রেতা তার পণ্য ধরে রাখতে পারবে। যদি বিক্রেতার পক্ষ থেকে কাউকে মূল্য গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যদি সে লোকের বিক্রেতার নিকট কোনো পাওনা না থাকে বা পাওনা থাকার প্রতি কোনো লক্ষ না করে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলেও বিক্রেতার পণ্য আটকে রাখার অধিকার বিনষ্ট হবে না। কিন্তু যদি বিক্রেতার কাছে সে লোকের পাওনা থাকে, সে হিসেবেই তাকে মূল্য আদায় করার দায়িত্ব দেওয়া হয়, সে লোকও এ দায়িত্ব গ্রহণ করে তাহলে বিক্রেতার এখন আর পণ্য আটকে রাখার অধিকার থাকবে না।
উপরিউক্ত আলোচনায় বোঝা গেল, আবু ইউসুফ রহ. যে পর্যন্ত মূল্য ঋণ হিসাবে ক্রেতার দায়িত্বে থাকবে সে পর্যন্ত বিক্রেতার পণ্য আটকে রাখার মত দিয়েছেন। কিন্তু যখন ক্রেতা মূল্য আদায় করার দায়িত্ব অন্য কাউকে প্রদান করবে তখন বিক্রেতার পণ্য আটকে রাখার সে অধিকার আর থাকবে না। কিন্তু ইমাম মুহাম্মদ রহ. বলেন, যে পর্যন্ত বিক্রেতার মূল্য দাবি করার পরিস্থিতি থাকবে তার পণ্য আটকে রাখার অধিকারও বহাল থাকবে। ক্রেতা মূল্য পরিশোধের দায়িত্ব অপর কাউকে দিলেও বিক্রেতার মূল্য চাওয়া তো বন্ধ হয়ে যায়নি। সে পূর্বে ক্রেতার নিকট মূল্য দাবি করেছে, এখন ক্রেতার পক্ষ থেকে যে দায়িত্ব নিয়েছে তার কাছে মূল্য দাবি করবে। সুতরাং তার পণ্য আটকে রাখার অধিকার যথাপূর্ব বহাল থাকবে। তবে যদি বিক্রেতার নিকট কারো পাওনা থাকার ভিত্তিতে বিক্রেতা তাকে পণ্যের মূল্য গ্রহণের দায়িত্ব প্রদান করে এবং সে লোক দায়িত্ব গ্রহণ করে তখন ক্রেতার সাথে বিক্রেতার আর কোনো দাবি না থাকার দরুন এখন আর সে পণ্য আটকে রাখতে পারবে না, তার সে অধিকার শেষ হয়ে যাবে।
আল্লামা কাসানী বলেন: ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর কথাই এক্ষেত্রে সঠিক ও যথার্থ। কারণ, পণ্য আটকে রাখা বা না রাখার অধিকার মূল্য আদায়ের দাবির সাথে সম্পর্কিত। যদি মূল্য আদায় না করে তাহলে পণ্য আটকে রাখা হবে, যদি মূল্য আদায় করে তবে পণ্য আটকে রাখবে না। কেবল ছামান বা মূল্য বিক্রয়ে বহাল থাকলেই পণ্য আটকে রাখা হবে না। যেমন: বিক্রি যখন নগদ না হয়, পরে মূল্য আদায় করার শর্তেই যখন বিক্রি সম্পন্ন হয় তখন মূল্য তো ক্রেতার দায়িত্বে বহালই থাকে, কিন্তু সে সময় পণ্য আটকে রাখা যায় না। এ সময় পণ্য হস্তান্তর করতে হয়, যেহেতু এ সময় মূল্য আদায়ের দাবি করা যায় না।
এ দলিল দ্বারা এ কথাই প্রতিষ্ঠিত হলো, মূল্য বহাল থাকার সাথে পণ্য আটকে রাখার কোন সম্পর্কে নেই; পণ্য আটকে রাখার সম্পর্ক মূল্য আদায়ের দাবির সাথে সম্পর্কিত। তাই যখন ক্রেতা মূল্য আদায়ের দায়িত্ব অপর কাউকে প্রদান করে, সে ব্যক্তি এ দায়িত্ব কবুল করে আজও মূল্য দাবি করার অবকাশ থাকার প্রেক্ষিতে বিক্রেতার পণ্য আটকে রাখার অধিকার বহাল থাকে। বিক্রেতা যদি তার কোন পাওনার দাবি ব্যতীত সাধারণভাবে কাউকে সে মূল্য গ্রহণের দায়িত্ব প্রদান করে তাহলেও বিক্রেতার সে পণ্য আটকে রাখার অধিকার থাকবে। কিন্তু যদি কোনো পাওনার বিপরীতে বিক্রেতা কাউকে মূল্য গ্রহণের অধিকার প্রদান করে তবে সেক্ষেত্রে বিক্রেতা পণ্য আটকে রাখতে পারবে না, যেহেতু তার পক্ষ থেকে আর দাবি থাকবে না।
টিকাঃ
৮৮. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২৬৪; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ১০৯; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৬১