📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 সময় নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক ও মতবিরোধ

📄 সময় নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক ও মতবিরোধ


মূল্য আদায়ে সময় নির্ধারণ করা নিয়ে যদি মতবিরোধ দেখা দেয়, তাহলে যে তা অস্বীকার করবে, সে হচ্ছে বিক্রেতা, তার কথা গ্রহণ করা হবে। যেহেতু বিক্রিতে নগদ মূল্য প্রদান হচ্ছে স্বাভাবিক নিয়ম। যদি সময় নির্ধারণের সীমা নিয়ে বিতর্ক হয়, যে অল্পদিনের কথা বলবে তার কথা গৃহীত হবে, এক্ষেত্রেও সে সাধারণভাবে বিক্রেতাই হবে। তার কথা গ্রহণ করার কারণ, সে অধিক হওয়া অস্বীকার করেছে। মেয়াদ এক্ষেত্রে কম হওয়াই হচ্ছে স্বাভাবিক রীতি।

উপরিউক্ত দুটো মাসআলাতেই ক্রেতাকে নিজের মতের পক্ষে দলিল উপস্থাপন করতে হবে, যেহেতু সে বাহ্যিক ও স্বাভাবিক অবস্থার বিপরীতে বক্তব্য প্রদান করছে। নিয়ম হচ্ছে, যে কোন কিছু নতুন ভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে বা স্বাভাবিকের বিপরীত কিছু বলবে তাকে তা প্রমাণ করতে হবে।

ক্রেতা ও বিক্রেতা কতদিন সময় ধার্য হয়েছিল সে কথায় একমত হলেও নির্ধারিত সে সময় চলে গেছে, না এখনো বাকী আছে তা নিয়ে যদি তাদের মতান্তর হয় তাহলে নিশ্চয় ক্রেতা বলবে, সময় এখনো শেষ হয়নি। এক্ষেত্রে তার কথা গ্রহণ করা হবে। উভয়ে দলিল প্রদান করলে ক্রেতার দলিল গ্রহণ করা হবে। যেহেতু তারা এ কথায় একমত, সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, তাই তাতে সময় বাকী থাকাই হচ্ছে মৌলিক অবস্থা, তাই ক্রেতার বক্তব্য গ্রহণ করা হবে। সময় শেষ হওয়ার দাবি করে বিক্রেতা মূলত তার নিকট মূল্যপ্রদান দাবি করছে, যা প্রকাশ্য। ক্রেতা তা অস্বীকার করছে, তাই তার অস্বীকৃতিটাই এখানে গৃহীত হবে।

ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই যখন নিজ নিজ মতের পক্ষে দলিল প্রদান করবে তখন ক্রেতার দলিলটি এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য হবে। এর কারণ জাওহারা গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করে আল বাহরুর রায়েক-এর গ্রন্থকার লিখেন: ক্রেতার দলিলটি এখানে বিক্রেতার দলিলের তুলনায় অগ্রগণ্য হওয়ার কারণ সম্ভবত, বিক্রেতা যা দাবি করেছে তা হচ্ছে স্বাভাবিক; তার বিপরীতে ক্রেতা দলিল প্রদান করায় তারটি অগ্রগণ্য বিবেচিত হয়েছে। ইবনে আবেদীন এক্ষেত্রে বলেন: এভাবে ফয়সালা প্রদান বড়ই মুশকিল, কারণ দলিলের কাজ হচ্ছে, যা প্রকাশ্য তার বিপরীতটি প্রতিষ্ঠা করা। এক্ষেত্রে ক্রেতা দাবি করছে সময় শেষ হয়ে যায়নি, এটিই প্রকাশ্য। এর বিপরীত হিসাবে বিক্রেতার দলিলটি এখানে অগ্রগণ্য হয়। ইবনে আবেদীনের এ কথার জবাবে বলা হয়, এখানে ক্রেতা দাবি করেছে সময় এখনো রয়েছে; তা এই বিতর্কের অন্তর্নিহিত চাহিদা। যেহেতু ক্রেতার দলিলটি সে চাহিদা পূরণ করেছে তাই তার দলিল গ্রহণ করা হবে।

এ সময় বলা হবে, ক্রেতার দলিলটি এখানে অগ্রগণ্য হয়েছে, যেহেতু তা অধিকতর বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করেছে। এ মাসআলার সমর্থন পাওয়া যায় অপর একটি মাসআলায়। তা হচ্ছে, সালাম বিক্রির নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হয়েছে না এখনো বাকী রয়েছে, একথায় যদি ক্রেতা বিক্রেতায় মতান্তর ঘটে তাহলে সেক্ষেত্রে বিক্রেতার কথাই কসমের সাথে গৃহীত হয়ে থাকে, যেহেতু সে অধিক (সময়ের) দাবি করে।

যদি উভয়েই দলিল উপস্থাপন করে তবে ক্রেতার দলিলটি গৃহীত হবে। আল-বাহরুর রায়েক গ্রন্থে এর কারণ বলা হয়েছে, ক্রেতা বিক্রেতার তুলনায় অধিক মেয়াদ দাবি করে তা প্রতিষ্ঠা করছে। তাই তার কথাই গ্রহণ করা হবে, দলিল তারটাই গৃহীত হবে। দ্রষ্টব্য : أحل

টিকাঃ
৬১. আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ৩০১; আদ-দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৩২
৬২. আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ৩০১; আদ-দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৩২

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 বাকীতে মূল্য প্রদানের ক্ষেত্রে বিক্রয়স্থল ও বিক্রয়কাল লক্ষণীয়

📄 বাকীতে মূল্য প্রদানের ক্ষেত্রে বিক্রয়স্থল ও বিক্রয়কাল লক্ষণীয়


যখন কোনো বিক্রিতে ছামান পরে দেওয়ার আলোচনা করা হবে তখন যে জায়গায় বিক্রি সম্পন্ন হয়েছে মূল্য প্রদানকালে সে জায়গাই ধর্তব্য হবে। ক্রেতা বা বিক্রেতা কোন্ এলাকায় রয়েছে তা লক্ষ করা হবে না। যেমন কোনো লোক কারো কাছে পণ্য বিক্রি করল ইস্পাহান নগরীতে। ক্রেতা তখন মূল্য পরিশোধ করে নাই। পরে বিক্রেতা বুখারাতে তার সাক্ষাৎ পেলে সেখানে সে বুখারার মুদ্রায় নয়, বরং ইস্পাহান এলাকার মুদ্রার হিসাবেই তার নিকট মূল্য চাইবে। এভাবে সাব্যস্ত হলো, যে এলাকায় বিক্রয় হয়েছে সেই এলাকার মুদ্রা ধর্তব্য হবে, কোন্ এলাকায় লেনদেন হচ্ছে তা দেখা হবে না।

ইবনে আবিদীন এ সম্পর্কে বলেন: যদি দু শহরের দীনারের মূল্যমান দু ধরনের হয়, যে শহরে বিক্রয় সংঘটিত হয়েছে যে কোনো কারণে সে শহরের দীনার দেওয়া-নেওয়া এখন সম্ভব, না হওয়ার প্রেক্ষিতে অন্য শহরের দীনার লেনদেনে তারা উভয়ে সম্মত হয়, তাহলে যে এলাকায় বিক্রয় হয়েছে সে এলাকার দীনারের মূল্যমান হিসাব করে এ এলাকার দীনার নিতে হবে। বুখারার মুদ্রার মান যদি অধিক হয়, তবে ইস্পাহানের যত দীনার মূল্য সাব্যস্ত হয়েছে বুখারার তত দীনার নেওয়া সঙ্গত হবে না। এ হচ্ছে হানাফী আলেমদের অভিমত। মালেকী ও শাফেয়ী মাযহাবের আলেমদের সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতে, বিক্রয়স্থলের প্রতি লক্ষ রাখা বাঞ্ছনীয়ও কর্তব্য।

মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে যেমন বিক্রয়স্থল বিবেচনা করা হয়েছে, তেমনি বিক্রয়ের সময়ের প্রতিও লক্ষ রাখা হবে। যে সময়ে মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে তা বিবেচনা করা হবে না, যেহেতু যখন বিক্রয় সম্পন্ন হয় তখন মূল্য পরিশোধকালে পণ্যটির মূল্য কত হবে তা জানা থাকে না।

'মাজমা' নামক গ্রন্থের ব্যাখ্যা করে আল-বাহরুর রায়েক গ্রন্থে লেখা হয়েছে, যদি বিক্রেতা এক নির্ধারিত সময়ে মূল্য পরিশোধের ভিত্তিতে বিক্রি করে, তাতে সে শর্ত করে, মূল্য পরিশোধকালে যে মুদ্রা প্রচলিত থাকবে ক্রেতা তা দিয়েই মূল্য পরিশোধ করবে তাহলে বিক্রি ফাসেদ হয়ে যাবে। এভাবে সাব্যস্ত হলো, বিক্রয়কালে যে মুদ্রা প্রচলিত তা দিয়েই বিক্রির লেনদেন হতে হবে।

টিকাঃ
৬২. আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ৩০১; আদ-দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৩২
৬৩. আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ৩০৩; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৩৬; শারবীনী কৃত মুগনিল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ১৭; আল-মুদাউওয়ানা, খ. ৪, পৃ. ২২২

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মূল্যে বৃদ্ধি বা হ্রাস ঘটানো

📄 মূল্যে বৃদ্ধি বা হ্রাস ঘটানো


বিক্রয় নিষ্পন্ন হওয়ার পর ক্রেতা বা বিক্রেতা হয়তো দেখল, সে ক্ষতির শিকার হয়েছে অথবা অন্য কোনো কারণে পূর্বের লেনদেন থেকে সরে যাওয়া মঙ্গল বিবেচনা করল, এ অবস্থায় পণ্যে বা মূল্যে হ্রাস বা বৃদ্ধি ঘটানো সকল আলেম ও ফকীহের মতে জায়েয। তবে এই হ্রাসবৃদ্ধি মূল চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা তা নিয়ে ফকীহগণ মতান্তর করেছেন নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে। অনুসন্ধানে তাদের তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়।

প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি: মালেকী মাযহাবের আলেমগণ এবং যুফার রহ. ব্যতীত হানাফী মাযহাবের আলেমগণ এ সম্পর্কে বলেন: মূল্য বৃদ্ধি বা হ্রাস বা পণ্যে বৃদ্ধি মূল বিক্রয়চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং নতুনভাবে হিসাবটি গৃহীত হবে। যেমন কেউ কোনো পণ্য কিনেছে একশ দিরহামে, পরে সে বিক্রেতাকে আরো দশ দিরহাম দিয়েছে, এক্ষেত্রে পণ্যের মূল্য এখন আর একশ দিরহাম বলা হবে না; বলা হবে একশ দশ দিরহাম। যদি কেউ কোনো পণ্য বিক্রি করেছে একশ দিরহামে, পরে সে পণ্য কিছু বাড়িয়ে দিয়েছে, তাহলে সে সাকল্যে যতটুকু পণ্য দিয়েছে তার মূল্য ধরবে একশ দিরহাম। কোনো পণ্য একশ দিরহামে বিক্রি করার পর বিক্রেতা পণ্যের মূল্য কিছু কমিয়ে দিলে এখন সেটাই ধর্তব্য হবে। এভাবে কমানো বাড়ানো জায়েয এবং তা মূল্য হিসাবে যুক্ত। অতএব নতুন হিসাবই হবে মূল হিসাব।

যেহেতু নতুন হিসাবই মূল হিসাব বলে গণ্য হবে তাই এ হিসাবে যতটুকু যার পাওনা হবে সে ততটুকুর অধিকারী হবে, দাবি করতে পারবে। তাই পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করা হলে সে পরিবৃদ্ধিটুকু না পাওয়া পর্যন্ত বিক্রেতা পণ্য হস্তান্তর না করে নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে যদি নগদে বিক্রি হয়ে থাকে। ক্রেতা ঐ পরিবৃদ্ধিটুকু প্রদান না করা পর্যন্ত বিক্রেতার নিকট পণ্য হস্তান্তরের দাবিও করতে পারবে না। যদি বিক্রেতা ক্রেতার নিকট পণ্য হস্তান্তর করার পর সে পণ্যটিতে কেউ মালিকানা দাবি করে, তার দাবি যথাযথ বলে প্রমাণিত হওয়ার প্রেক্ষিতে ক্রেতার নিকট থেকে সে সেই পণ্য নিয়ে যায়, তাহলে ক্রেতা এখন বিক্রেতার নিকট থেকে মূল মূল্য তার পরিবৃদ্ধিসহ ফেরত নিবে।

মূল্য হ্রাস করার ক্ষেত্রে : মূল্য কমানোর পর এখন যা সাব্যস্ত হয়েছে ক্রেতা তা প্রদান করার পর বিক্রেতাকে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি/আহ্বান করতে পারবে। এভাবে একথাই সাব্যস্ত এবং হানাফী আলেমদের নিকট স্বীকৃত, মূল্য হ্রাস বা বৃদ্ধি মূল বিক্রয়ের সাথে সম্পৃক্ত হবে; এখন এটিই মূল মূল্য বলে গণ্য হবে। তারা এর ওপর ভিত্তি করে বলেন:

এক. ক্রেতা ও বিক্রেতা পণ্যে বা মূল্যে হ্রাসবৃদ্ধি করে পারস্পরিক সম্মতিতেই বিক্রয়চুক্তিটিকে শরীয়তসম্মত এক অবস্থা থেকে শরীয়তসম্মত অপর এক অবস্থায় বদলে দিয়েছে। পূর্বের বিক্রিতে হয়তো বিক্রেতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, অথবা লাভবান অথবা লাভ-লোকসানের মাঝামাঝি অবস্থায় ছিল। এখন ক্রেতা মূল্য বাড়িয়ে দেওয়ায় ক্ষতি কেটে মাঝামাঝি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, অথবা পূর্বে মাঝামাঝি অবস্থা থেকে বদলে এখন বিক্রেতার লাভ হয়েছে। এর বিপরীতে প্রথমে নির্ধারিত মূল্য থেকে কমানো হলে পূর্বে যা লাভজনক ছিল তা এখন হবে মাঝামাঝি অবস্থা, পূর্বে মাঝামাঝি অবস্থায় থাকলে এখন বিক্রেতা হবে ক্ষতিগ্রস্ত। এমনিভাবে পণ্যের বৃদ্ধি ঘটালেও ক্রেতার অবস্থাতে নানা পরিবর্তন সংঘটিত হবে।

দুই. ক্রেতা ও বিক্রেতা বিক্রয়চুক্তি সম্পন্ন করার পর ইকালাহ (الإقالة) বা বাতিল করার মাধ্যমে মূল চুক্তিটিই যেহেতু উপরে ফেলতে পারে, বিক্রয় সম্পন্ন করার পর তা এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় তারা নিতেই পারবে। মূল চুক্তিতে রদবদল ঘটানোর চেয়ে তার বৈশিষ্ট্যে রদবদল ঘটানো তো সহজ কাজ। তাদের এই রদবদল অপর একটি অবস্থার সাথে তুলনীয়। তা হলো, ক্রেতা বা বিক্রেতার অথবা উভয়ের হয়তো খিয়ারুশ শর্ত ছিল, তারা তাদের শর্ত প্রত্যাহার করে নিল অথবা বিক্রয় সম্পন্ন হওয়ার পর শর্ত করল। যা-ই তারা করুক, বিক্রির বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন সূচিত হবে। এমনিভাবে মূল্যে বা পণ্যে পরিবর্তন মূল বিক্রিতে পরিবর্তন করবে। তাই এ পরিবর্তন বিক্রি নিষ্পন্ন হওয়ার পরও যথার্থ বলে গণ্য হবে। যেহেতু তা যথার্থ তাই এ পরিবর্তন মূল চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হবে। যেহেতু মূল্যে বা পণ্যে বৃদ্ধি তার বৈশিষ্ট্যতুল্য, কোনো বৈশিষ্ট্যের স্বতন্ত্র কোনো অস্তিত্ব থাকে না, বরং যার বৈশিষ্ট্য তাতে তার প্রকাশ ঘটে। তেমনি এ হ্রাসবৃদ্ধিও মূল চুক্তির সাথে বৈশিষ্ট্যের ন্যায় সম্পৃক্ত হবে, স্বতন্ত্রভাবে তার কোনো অস্তিত্ব ধর্তব্য হবে না।

তিন. বিয়ের মহর স্থির করার পর বিয়ে সংঘটিত হয়েছে। এরপরও স্বামী বা স্ত্রী মহরে হ্রাসবৃদ্ধি ঘটাতে পারে। অর্থাৎ ঘোষিত মহরে স্বামী বাড়াতে এবং স্ত্রী কমাতে পারে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন: وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا تَرَاضَيْتُم بِهِ مِن بَعْدِ الْفَرِيضَة "মহর নির্ধারণের পর (হ্রাসবৃদ্ধি) কোনো বিষয়ে পরস্পর রাজি হলে তাতে তোমাদের কোনো দোষ ও গোনাহ নেই।"
এ আয়াত সুস্পষ্ট করে দিয়েছে, মোহর সাব্যস্ত হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী পরস্পর সম্মতিতে সে ঘোষিত মোহরে বাড়াতে পারে, কমাতে পারে। এ অবস্থায় পরিবর্তিত মোহরই ধার্য হবে, পূর্বের ঘোষিত মোহর আর ধর্তব্য হবে না। বিক্রির বিষয়টিও তেমনি।

চার. হাদীসে বর্ণিত হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে লোক ছামান হিসাবে বস্তু মাপছিল তাকে বলেছেন: زن وأرجح "পাল্লা ঝুঁকিয়ে মাপো।" আর পাল্লা ঝুঁকানো মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা ও কাজে মানুষকে এমন উত্তম আচরণ প্রদর্শন করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি যে কাজে উদ্বুদ্ধ করেছেন তা অন্ততপক্ষে জায়েয তো হবেই।

হানাফী মাযহাবের আলেমগণ মূল্যে বা পণ্যে বৃদ্ধি ঘটানোর ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত শর্তাবলি আলোচনা করেছেন:
এক. এক পক্ষ যা বৃদ্ধি করবে অপর পক্ষ তা কবুল করা। যদি ক্রেতা বা বিক্রেতা মূল্যে বা পণ্যে বৃদ্ধি ঘটালে অপর পক্ষ তা কবুল না করে, তাহলে এ বৃদ্ধি বৃদ্ধি বলে পরিগণিত হবে না। যা বৃদ্ধি করা হবে অপরকে তার মালিক বানানো হবে। অতএব দ্বিতীয় পক্ষ তা কবুল করলেই তা বৃদ্ধি হিসাবে মূল হিসাবে যুক্ত হবে।

দুই. বৃদ্ধি ও কবুল একই বৈঠকে হতে হবে। যদি কবুল করার আগেই তারা বৈঠক শেষ করে উঠে পড়ে তাহলে বৃদ্ধিটা বাতিল হয়ে যাবে। কেননা, পণ্যে বা মূল্যে বৃদ্ধির কথা হচ্ছে ঈজাব বা প্রস্তাব, তা ঐ বৈঠকেই গ্রহণ করতে হবে, যেমন মূল বেচাকেনার বেলায় প্রস্তাব ও তা কবুল করা একই বৈঠকে হতে হয়।

বিক্রেতা তার পণ্যের মূল্য কমানোর ক্ষেত্রে অপর পক্ষের তা কবুল করা শর্ত নয়। যেহেতু এটি বিক্রেতার নিজস্ব প্রাপ্তিতে ক্ষমতা প্রয়োগ, তাই সে তার আংশিক ছাড় দিতে পারে। অপরপক্ষ কবুল না করলেও তা কার্যকর হবে। তবে ক্রেতা তা প্রত্যাখ্যান করলে ছাড় না’ হয়ে হিসাবে বহাল থাকবে, যেমন পুরোটা বাদ দিলে তা বাদ পড়বে না, হিসাবে বহাল থাকবে।

ক্রেতা মূল্যে বৃদ্ধি ঘটানোর ক্ষেত্রে জরুরি হলো পণ্য বহাল থাকা। বিক্রয়চুক্তির সূচনাকাল থেকেই তাতে কর্তৃত্ব প্রদর্শনের সুযোগ থাকা। তাই পণ্য ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর মূল্যে বৃদ্ধি ঘটানো কার্যকর হবে না। কিন্তু পণ্য ধ্বংস হওয়ার পর বিক্রেতা তার মূল্য কমিয়ে দেওয়া সহীহ ও কার্যকর হবে, যেহেতু তা হবে ছেড়ে দেওয়া এবং ছাড় দেওয়া। এর বিপরীতে বাড়ানো হচ্ছে মূল্য বহাল রাখা; অথচ পণ্যই নেই।

দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি: শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের মত হচ্ছে, যদি মূল্যে বৃদ্ধি বা হ্রাস ঘটানো হয় খিয়ারে মজলিস বা খিয়ারে শর্ত চলাকালে, তাহলে তা মূল লেনদেনে অন্তর্ভুক্ত হবে। এ আধিক্য বা হ্রাস ছামানের (মূল্যের) জন্যে প্রযোজ্য বিধান গ্রহণ করে ছামানে অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু যদি এ বৃদ্ধি বা হ্রাস বিক্রয় সম্পন্ন হওয়ার পর, উল্লিখিত খিয়ারগুলো না থাকা অবস্থায় সংঘটিত হয়, তবে তা মূল বিক্রির সাথে যুক্ত হবে না।

তৃতীয় দৃষ্টিভঙ্গি: এটি হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ যুফার রহ.-এর একক মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি বলেন, মূল্যে বৃদ্ধি বা হ্রাস-কে মূল বিক্রয়চুক্তির সাথে সম্পর্কিত করা যথাযথ নয়। বরং মূল্যে বৃদ্ধি ক্রেতার পক্ষ থেকে এবং পণ্যে বৃদ্ধি বিক্রেতার পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র সদাচরণ এবং মূল্য হ্রাস করা বিক্রেতার পক্ষ থেকে আংশিক মূল্য প্রত্যাহার করা; যখনই সে তা ফিরিয়ে নিতে চাইবে তা ফিরে যাবে।

তার দলিল হলো, প্রথমে যে মূল্য ধার্য করা হয়েছে, পণ্য সে পরিমাণ অর্থের বিপরীতেই ক্রেতার মালিকানায় চলে এসেছে। যদি এরপর ক্রেতা মূল্যে বৃদ্ধি ঘটায়, সে বৃদ্ধিটুকু মূল লেনদেনে যদি অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে অবস্থাটা এ পর্যায়ে উপনীত হবে, ক্রেতা ঐ পণ্যের বিপরীতেই এ বৃদ্ধিটুকু দিচ্ছে, অথচ এ পণ্য তার আগেই তার নিজের মালিকানায় চলে এসেছে। তারই মালিকানাধীন বস্তুর বিপরীতে এ অধিক দেওয়া তাই মূল্য হিসাবে গৃহীত হতে পারে না।

এমনিভাবে প্রথমে যে পরিমাণ পণ্যের বিপরীতে মূল্য ধার্য করা হয়েছে, সে মূল্য বিক্রেতার মালিকানায় চলে এসেছে। এরপর বিক্রেতা যদি পণ্যে বৃদ্ধি ঘটায় সে বৃদ্ধিটুকু যদি মূল লেনদেনে অন্তর্ভুক্ত হয় তবে অবস্থা এই দাঁড়াবে বিক্রেতা ঐ মূল্যের বিপরীতেই এ বৃদ্ধিটুকু দিচ্ছে, অথচ এর পূর্বেই মূল্য তার মালিকানায় এসে গেছে। তাই তারই মালিকানাধীন মূল্যের বিপরীতে এ অধিক বস্তু পণ্য হিসাবে ধর্তব্য হবে না।

টিকাঃ
৬৪. আল-হিদায়া ও ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৭০; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ৮৩; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৬, পৃ. ১২৯; রদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ১৫৪; আল-ইখতিয়ার, খ. ১, পৃ. ১৮১; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২৮১; হাশিয়া দুসূকী,খ. ৩, পৃ. ৩৫ ও ১১৬৫; কুরূক পার্শ্ব টীকা, খ. ৩, পৃ. ২৯০
৬৫. আল-হিদায়া ও ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৭০
৬৬. সূরা নিসা, আয়াত ২৪
৬৭. নাসায়ী, খ. ৭, পৃ. ২৮৪, মাকতাবা তিজারিয়‍্যা; মুসতাদরাকে হাকেম, খ. ৪, পৃ. ১৯২, দায়েরাতুল মাআরিফ আল-উছমানিয়‍্যা। হাদীসটির বর্ণনাকারী সাহাবী হচ্ছেন সুওয়াইদ ইবনে কায়িস রা.। হাকেম হাদীসটিকে সহীহ মানের বলে মত প্রকাশ করেছেন, আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন।
৬৮. আল-ইনায়া (হিদায়া গ্রন্থের শরাহ), খ. ৫, পৃ. ২৭১; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২৮৪; আল-ইখতিয়ার, খ. ১, পৃ. ১৮১
৬৯. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২৮৪; আল-ইখতিয়ার, খ. ১, পৃ. ১৮১
৭০. আল-মাজমু, খ. ৯, পৃ. ৩৭০; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৯৬; আল-জুমাল, খ. ৩, পৃ. ৮৫; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৫১-১৮৩ ও ৪৪৬; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ২৩৪
৭১. আল-হিদায়া ও ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৭০-২৭১

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 বৃদ্ধি ও হ্রাস মূল্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে উদ্ভূত বিভিন্ন মাসআলা

📄 বৃদ্ধি ও হ্রাস মূল্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে উদ্ভূত বিভিন্ন মাসআলা


যারা মূল্যে বা পণ্যে বৃদ্ধি বা হ্রাস-কে মূল লেনদেনে অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করেন, তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিতে যে সকল মাসআলার উদ্ভব হয় সেগুলো নিম্নরূপ,

এক. তাওলিয়া (تولية) (কেনা দামে বেচা) এবং মুরাবাহা (مرابحة) (লাভ করে বেচা) এ উভয় ধরনের বিক্রিতে মূল্য বৃদ্ধি ও হ্রাস উভয়টি প্রযোজ্য হবে। যেমন কোনো বস্তুর মূল্য একশ টাকা। ক্রেতা একশ দশ টাকা দিয়ে পণ্যটি নিলে সে একশ'র সাথে দশ টাকা যুক্ত করে তার ওপর ভিত্তি করেই তাওলিয়া বা মুরাবাহা করবে। যদি একশ টাকার বস্তুতে বিক্রেতা নব্বই টাকা রাখে তাহলে ক্রেতা এখন তার মূল্য নব্বই ধরে তাওলিয়া বা মুরাবাহা করতে পারে।

দুই. শুফআ (পার্শ্ববর্তী জমিওয়ালার অগ্রক্রয়ের অধিকারে) মূল্যবৃদ্ধি প্রযোজ্য না হলেও মূল্যহ্রাস কার্যকর হয়। তাই ক্রেতাকে প্রথমে যে দাম বলা হয়েছে তা থেকে কম দিতে বিক্রেতা সম্মত হলে পাশের জমিওয়ালা ঐ কম দামেই শুফআ দাবি করতে পারবে। যদি এর বিপরীতে বিক্রেতার বলা দাম থেকে ক্রেতা আরো বেশি দিতে চায়, পাশের জমিওয়ালা ঐ অধিক দামে শুফআ দাবি করবে না, বিক্রেতা যে দাম বলেছে তার ভিত্তিতেই শুফআ দাবি করবে। ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে যে বিক্রয়চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে তার ভিত্তিতেই পাশের জমিওয়ালার শুফআ দাবি করার অধিকার জন্মেছে। এখন ক্রেতা মূল্যে বৃদ্ধি ঘটিয়ে তা বিনষ্ট করতে চাইছে, অথচ পাশের জমিওয়ালার এ অধিকার ক্রেতা ও বিক্রেতা কারোরই বিনষ্ট করার অধিকার নেই। তাই শুফআ দাবি করায় এ মূল্যবৃদ্ধি কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না, তা গণ্য করা হবে না। এখানে লক্ষণীয়, ক্রেতা পাশের জমিওয়ালার ওপর কোনো ক্ষমতা বা জোর খাটাতে পারবে না। এর বিপরীতে পাশের জমিওয়ালা তার ওপর ক্ষমতা দেখাতে পারবে, ক্রেতার সকল কাজ বাতিল করে বিক্রিচুক্তি পর্যন্ত বাতিল করে দিতে পারবে। মূল জমিওয়ালা যখন মূল্য হ্রাস করবে তখন পাশের জমিওয়ালা সে হ্রাসকৃত মূল্যে শুফআ দাবি করতে পারবে, যেহেতু তাতে বিক্রেতার সে কোনো ক্ষতি করছে না।

তিন. দাবিদারের দাবি সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে : যদি বিক্রীত পণ্যের কোনো দাবিদার বের হয়, তার দাবি প্রমাণিত হওয়ার প্রেক্ষিতে কার্যকর হয়, পণ্য দাবিদারের হাতে চলে যায়, তাহলে ক্রেতা তার মূল্য যখন বিক্রেতার নিকট থেকে ফিরিয়ে নিবে তখন অতিরিক্ত দিয়ে থাকলে তা-ও ফেরত নিবে। যদি দাবিদার সে বিক্রি বহাল রাখে তাহলে বিক্রয়মূল্য সে বিক্রেতার নিকট থেকে নিয়ে নিবে, তখন অতিরিক্তটুকুও নিবে।

চার. পণ্য আটকে রাখা : মূল্য অধিক দেওয়ার কথা জানালে সে অধিকটুকু না পাওয়া পর্যন্ত বিক্রেতা তার পণ্য হাতে রাখতে পারবে, ক্রেতার নিকট হস্তান্তরে বাধ্য হবে না।

পাঁচ. যদি বিক্রেতা পণ্য বাড়িয়ে দেয়, সে বাড়তিটুক ক্রেতা কজা করার পূর্বেই যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে মূল্য থেকে সে পরিমাণ বাদ পড়বে। কিন্তু পণ্য থেকে সৃষ্ট বা উৎপন্ন (যেমন গাভীর বাছুর বা গাছের ফল ইত্যাদি) যদি ক্রেতা কজা করার পূর্বে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে তার বিপরীতে মূল্য থেকে কিছুই কম করা যাবে না। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য : বিয়ু'

টিকাঃ
৭২. আল-ইনায়া, খ. ৫, পৃ. ২৭১; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ৮৩-৮৪; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৬, পৃ. ১৩০; রদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ১৫৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00