📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন 📄 মূল্যের বৈশিষ্ট্য জানা না থাকলে বিক্রয় সঠিক ও জায়েযই হবে না

📄 মূল্যের বৈশিষ্ট্য জানা না থাকলে বিক্রয় সঠিক ও জায়েযই হবে না


হানাফী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি কেউ মুদ্রার পরিমাণ বা সংখ্যা বললেও তার বৈশিষ্ট্য উল্লেখ না করে, যেমন বলল, আমি এটি দশ দিরহাম দিয়ে কিনেছি, সে দশ সংখ্যা বললেও বলেনি, সে দিরহামগুলো কি বুখারী এলাকার, না সমরকন্দ এলাকার, তাহলে সে এলাকায় যে মুদ্রা অধিক প্রচলিত তা ধর্তব্য হবে। শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণও এ মতই প্রদান করেছেন।
তাদের দলিল: কুরআন হাদীসের মাধ্যমে কোনো বিষয় জানা গেলে তা যেমন কার্যকর হবে, সমাজের প্রচলন ও পরিভাষার মাধ্যমে কোনো বিষয় জানা হলে তা-ও তেমনই কার্যকর হবে; বিশেষত আর্থিক লেনদেন সঠিক করে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমাজে প্রচলিত অর্থ ও মর্ম অবশ্যই গ্রহণ করা হবে।

হানাফী মাযহাবের আলেমগণ এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে বলেন, যদি কোথাও বিভিন্ন মূল্যের মুদ্রা প্রচলিত থাকে, যেমন মিসরী দীনার ও মাগরেবী দীনার, এ দুটোর মাঝে মাগরেবীর তুলনায় মিসরীটি অধিক মূল্যের। অথচ সে এলাকায় হয়তো এ দু ধরনের দীনারই সমান প্রচলিত। সে অবস্থায় বিক্রেতা চাইবে মিসরী দীনার যা উচ্চমূল্যের সেটি দেওয়া হোক। আর ক্রেতা চাইবে মাগরেবী দীনার যা কমমূল্যের তা দিয়ে দাম পরিশোধ করবে। ফলে তাদের মধ্যে ঝগড়া লাগার প্রবল আশঙ্কা থাকবে। কোন্ দেশী মুদ্রা দেওয়া হবে তা সুস্পষ্ট না করায় যে অজ্ঞতা এখানে রয়েছে তা উভয়কে ঝগড়ায় লিপ্ত করবে। তাই এভাবে বিক্রি করা ফাসেদ হবে, বিক্রি ভেঙ্গে দিতে হবে। কিন্তু যদি বেচাকেনার আলাপচারিতার সময় কোনো একজন এটি পরিষ্কার করে বলে, এ লেনদেনে কোন্ দেশি দীনার দেওয়া হবে এবং অন্যজন তাতে সম্মতি প্রকাশ করে তাহলে আর বিষয়টিতে অজ্ঞতা থাকবে না, ফলে ঝগড়া লাগার আশঙ্কাও আর থাকবে না; যার ফলে বিক্রয় যথাযথ ও সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে। এক্ষেত্রে যা বিক্রিকে ফাসেদ করত তা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে বিদায় করে দেওয়া হবে।

যদি বিভিন্ন মুদ্রা বিভিন্ন মূল্যের হয়, কিন্তু সবগুলো সমানভাবে প্রচলিত না হয় তাহলে যেটি অধিক প্রচলিত সেটি ধর্তব্য হবে। এভাবে একটি মুদ্রা নির্দিষ্ট হওয়ার প্রেক্ষিতে বিক্রয় সহীহ হবে, ফাসেদ বা বিনষ্ট হবে না।

যদি বিভিন্ন মুদ্রা সমমূল্যের হয়, কিন্তু সবগুলো সমানভাবে প্রচলিত না হয় সেক্ষেত্রেও যেটি অধিক প্রচলিত সেটি ধার্য হবে, পূর্ববর্তী অবস্থায় যেরূপ অধিক প্রচলিতটি ধর্তব্য হয়েছে। যেহেতু কোন্ মুদ্রা ধর্তব্য হবে তা সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়েছে, সুতরাং বিক্রি সহীহ ও জায়েয হবে।

যদি বিভিন্ন মুদ্রা সমমূল্যের এবং এলাকায় সমান প্রচলিত হয়, তাহলে ক্রেতা তার পছন্দের মুদ্রা দিয়ে মূল্য পরিশোধ করতে পারবে। যেহেতু প্রচলনও সমান, মূল্যও সমান, যেমন মিসরী ও দামেশকী, তার যেটিই ক্রেতা দিতে চায় দিতে পারবে, যেহেতু তা নিয়ে তাদের মাঝে ঝগড়া হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

উপরিউক্ত মাসআলাগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করলে মোট চারটি রূপ প্রতিভাত হয়। কেননা, বিভিন্ন মুদ্রা হয়তো মুদ্রামান ও প্রচলন উভয়টিতে সমপর্যায়ের অথবা উভয়টিতে তারতম্য বিদ্যমান অথবা মুদ্রামানে সমান হলেও প্রচলনে তারতম্য রয়েছে অথবা তার বিপরীত প্রচলনে সমান হলেও মুদ্রামানে সমান নয়।
এ চারটি রূপের মাঝে একটিতে বিক্রি হবে ফাসেদ। তা হচ্ছে, বিভিন্ন মুদ্রা প্রচলনে সমান কিন্তু মুদ্রার মূল্যমানে সমান নয়। এ একটি ব্যতীত অপর তিনটি রূপে বিক্রয় সঠিক হয়ে যাবে। এই ফাসেদ রূপটি মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণও উল্লেখ করেছেন।

মালেকী মাযহাবের আলেমগণ এ সম্পর্কে বলেন, যদি কোনো এলাকায় বিভিন্ন ধরনের মুদ্রা প্রচলিত থাকে, ক্রেতা কোন মুদ্রা দ্বারা মূল্য পরিশোধ করবে তা সুস্পষ্ট করে বলেনি, এ অবস্থায় যদি সকল মুদ্রা সমান প্রচলিত হয়, তাহলে ক্রেতা তার ইচ্ছামাফিক যে কোনো মুদ্রা দিয়ে মূল্য পরিশোধ করতে পারবে। যদি মুদ্রাগুলো সমভাবে প্রচলিত না হয়, তবে কোনোটি অধিক প্রচলিত থাকলে সেটি দিয়ে তাকে মূল্য প্রদান করতে হবে। যদি কোনোটিই অধিক প্রচলিত না হয় তাহলে বিক্রি ফাসেদ হিসাবে ভেঙ্গে যাবে।

শাফেয়ী মাযহাবের আলেম শারবীনী লিখেন: যদি কোনো শহরে দু ধরনের মুদ্রা প্রচলিত থাকে তন্মধ্যে একটি অপরটি থেকে অধিক প্রচলিত নয় অথবা একটি অপরটি থেকে অধিক প্রচলিত, মুদ্রাগুলোর মূল্যমানে তারতম্য রয়েছে, তাহলে সুস্পষ্ট শব্দ উচ্চারণ করে কোন্ মুদ্রা প্রদান করবে, ক্রেতাকে তা উল্লেখ করতে হবে: এটি বিক্রয় যথাযথ হওয়ার জন্যে শর্ত। যেহেতু মূল্যমান একরূপ নয় তাই বিষয়টি সুস্পষ্ট করা জরুরি।

হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের মতে, যদি বেচাকেনার সময় কেবল দীনার শব্দটি উচ্চারণ করা হয়, কোন্ দেশি দীনার তা না বলা হয়—অথচ সে শহরে বিভিন্ন দেশের দীনার প্রচলিত থাকে, সবগুলো সমান প্রচলিত কিন্তু মূল্য সমান নয়, তাহলে সে বিক্রয় সহীহ ও সঠিক হবে না।

টিকাঃ
৪৯. আল-হিদায়া ও আল-ইনায়া, খ. ৫, পৃ. ৮৪; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ৫; আল-ইখতিয়ার, খ. ১, পৃ. ১৭৮; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৩০৪২; যুরকানী, খ. ৫, পৃ. ২৪; আল-মিনহাজ ও মুগনিল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ১৭; ইবনে কুদামা কৃত আ- শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৩; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪০; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ১৭৪
৫০. আল-হিদায়া ও আল-ইনায়া, খ. ৫, পৃ. ৮৫; তাবয়ীনুল হাকারেক, খ. ৪, পৃ. ৫। মাগরেবী মুদ্রার তুলনায় মিসরী মুদ্রার উচ্চ মূল্য হওয়ার এ উদাহরণ প্রদান করেছেন ইনায়া-এর গ্রন্থকার বাবরতী (মৃ. ৭৮৬ হিঃ) তার যুগের ভিত্তিতে। ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৮৫; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৩৬ ও ৫৩৮; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৩০৪৩
৫১. আল-ইনায়া (আল-হিদায়া গ্রন্থের শরাহ) খ. ৫, পৃ. ৮৫; যুরকানী, খ. ৫, পৃ. ২৪; আল- মুকাদ্দামাত আল-মুমাহহাদাত, পৃ. ৫৫০; আল-মিনহাজ ও মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭; ইবনে কুদামা রচিত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৩; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ১৭৪; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪০
৫২. আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ১১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ১৭৪

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন 📄 নগদ বা বাকীতে মূল্যপ্রদান

📄 নগদ বা বাকীতে মূল্যপ্রদান


বিক্রি নগদ মূল্যে যেমন জায়েয, বাকীতেও জায়েয যদি সময় নির্ধারণ করে নেওয়া হয় এবং তা উভয়ের জানা থাকে।
এ সম্পর্কিত দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন: وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ “আল্লাহ তাআলা বিক্রি হালাল করেছেন।” এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বিক্রি শব্দটিকে কোনো শর্তযুক্ত না করে সাধারণভাবে বলেছেন। অতএব, নগদে বিক্রির ন্যায় বাকীতে বিক্রিও এর অন্তর্ভুক্ত হবে।

সেই সাথে এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আয়েশা রা. বলেন:
اشْتَرَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ يَهُودِي طَعَامًا إِلَى أَجَلٍ وَرَهَنَهُ دِرْعًا مِنْ حَدِيدٍ
“নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক ইয়াহুদী ব্যক্তির নিকট থেকে বাকীতে কিছু খাদ্যদ্রব্য কেনেন। তিনি তখন ঐ ইয়াহুদীর নিকট লোহার তৈরি এক যুদ্ধের পোশাক বন্ধক রেখেছিলেন।”

আস-সিরাজুল ওহহাজ গ্রন্থকার লিখেন : নগদ মূল্য প্রদান হচ্ছে বিক্রয় চুক্তির স্বাভাবিক চাহিদা ও ফল, বাকীতে বিক্রয় হবে শর্তসাপেক্ষে। (এখানে শর্ত হচ্ছে, মেয়াদ নির্ধারণ করা।) কেউ যদি নগদ হিসাবে বিক্রি করে, ক্রেতা এরপর বিলম্বের সময় নির্ধারণ করে, তবে বিক্রয় সহীহ ও জায়েয হবে। যেহেতু মূল্যগ্রহণ করা বিক্রেতার অধিকার—সে তা নগদ না নিয়ে পরে নিতে পারে।

উপরিউক্ত আলোচনা হানাফী মাযহাবের আলেমদের, মালেকী মাযহাবের আলেমগণও এরূপই বলেন : যদি নগদ মূল্য প্রদানের শর্তে বিক্রি করা হয়, এরপর ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ে বাকীতে বিক্রয়ে এবং পরবর্তী সময়ে মূল্য পরিশোধে সম্মত হয় তাহলে মুরাবাহা (লাভজনক) বিক্রিতে সময়ের উল্লেখ করা জরুরি। এভাবে তারা দুজনে যে সময়ে একমত হবে সে সময়েই তা আদায় করা জরুরি—এ বিষয়টি বুঝে আসে। তারা বলেন, চুক্তির পর যা যুক্ত হয় তা চুক্তিকালে সম্পাদিত শর্তের ন্যায়ই পালনীয় বলে ধর্তব্য হবে।

শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি খিয়ারে মজলিস বা খিয়ারে শর্তের মেয়াদের মাঝেই মূল্য পরে পরিশোধের আলোচনাও করা হয়, তাহলে তা মূল বিক্রয়চুক্তিতেই অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কিন্তু যদি বিক্রি সম্পন্ন হওয়ার পর মূল্য পরে পরিশোধের কথা বলা হয়, তবে তা মূল বিক্রিতে সংযুক্ত হবে না। তবে তার আবদার পূরণ করা মুস্তাহাব, যেমন ঋণ আদায়ের সময় হয়ে যাওয়ার পর তাতে সময়ের আবদার পূরণ করা মুস্তাহাব।

মূল্য পরিশোধে সময় নেওয়া হলে তা পরবর্তী কোন সময়, উভয়ের তা জানা থাকা কর্তব্য। দলীল: এক, না জানা ঝগড়ার সূত্রপাত ঘটায়। ক্রেতার দায়িত্ব পণ্য বুঝে পাওয়ার প্রেক্ষিতে মূল্য হস্তান্তর করা এবং বিক্রেতার কর্তব্য তা বুঝে নেওয়া। সময় নির্ধারিত না করা হলে বিক্রেতা হয়তো তাড়াতাড়িই তার মূল্য চাইবে আর ক্রেতা অনেক দেরি করবে। ফলে ঝগড়া লেগে যাবে সহসাই, যা শরীয়তে মোটেই কাম্য নয়।
দুই. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘সালাম’ বিক্রির ক্ষেত্রে বলেছেন,
مَنْ أَسْلَفَ فِي تَمْرٍ فَلْيُسْلِف فِي كَيْلٍ مَعْلُومٍ وَوَزْنِ مَعْلُومٍ إِلَى أَجَلٍ مَعْلُومٍ
“কেউ যদি কারো সাথে সালাম পদ্ধতিতে বেচাকেনা করে তবে তাতে যেন সময় নির্ধারণ করে পরিমাণ বা ওজন নির্ধারণ করে নেয়।”
এ হাদীসে নবী স. যে বিক্রিতে সময় নির্ধারণ করা বৈশিষ্ট্য, তাতেই সময় নির্ধারণ করতে বলেছেন। এর ওপর ভিত্তি করে ছামানেও সময় নির্ধারণের ফয়সালা করা হয়েছে।
তিন. এ সব কথাতেই ফকীহদের ইজমা (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

হানাফী মাযহাবের আলেমগণ সুস্পষ্ট ভাষায় এ কথা উল্লেখ করেছেন, যে বিক্রিতে মূল্য পরে পরিশোধের কথা আলোচিত হবে সে বিক্রি সহীহ ও সঠিক হওয়ার জন্যে পরবর্তী সময়টি নির্ধারিত হতে হবে এবং তা ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ের জানা থাকতে হবে। যদি বিষয়টি অজানা থাকে তাহলে বিক্রি ফাসেদ হয়ে যাবে।

টিকাঃ
৫৩. সূরা বাকারা, আয়াত ২৭৫
৫৪. বুখারীতে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৪৩৩ মুদ্রণ সালাফিয়‍্যা; মুসলিম, খ. ৩,প. ১২২৬; প্রকাশক: হালাবী। এখানে মুসলিম থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে।
৫৫. আল-হিদায়া ও ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৮৩-৮৪; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ৫; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২২৭; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ৩০১; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৩১; আল-ইখতিয়ার, খ. ১, পৃ. ১৮১
৫৬. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৫৭; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১২০; ইবনে কুদামা রচিত আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৪৯, মুদ্রণ: রিয়াদ; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ২৩৪, আলমুল কুতুব
৫৭. হাদীসটি বুখারীতে সংকলিত হয়েছে। ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৪২৯ প্রকাশক : সালাফিয়‍্যা; মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১২২৭ প্রকাশক : হালাবী। এখানে বর্ণনাটি মুসলিম এর বর্ণনাকারী সাহাবী হচ্ছেন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.।
৫৮. আল-হিদায়া, ফাতহুল কাদীর ও আল-ইনায়া, খ. ৫, পৃ. ৮৪; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ৫ (علة الانضاء الى المنازعة অধ্যায়); আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ৩০১; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৩১

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন 📄 সময় অজানা থাকার আরো কিছু পন্থা ও পদ্ধতি

📄 সময় অজানা থাকার আরো কিছু পন্থা ও পদ্ধতি


এক. যদি কেউ কারো নিকট পণ্য বিক্রিকালে শর্ত করে, তার নিকট মূল্য পরিশোধ করতে হবে অন্য এক শহরে, তার এ শর্ত বাতিল হবে। তেমনিভাবে যদি বলে, তুমি এক মাস পরে মূল্য অমুক শহরে প্রদান করবে। তাহলে এক মাসের শর্তটুকু বহাল থাকবে, অন্য শহরের শর্ত বাতিল হয়ে যাবে, যেহেতু মূল্যটি এমন বস্তু নয় যা অন্য শহরে নেওয়ার এবং এজন্যে ঝামেলা পোহানোর প্রয়োজন আছে। তথাপি শর্ত করে তা অন্য শহরে নেওয়ার কথা তাই প্রত্যাখ্যাত হবে; তবে যদি মূল্যটি এমন বস্তু হয়ে থাকে যা অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার যোগ্য তবে এ শর্ত প্রয়োগ সঠিক হবে।

দুই. ইমাম মুহাম্মদ রহ. বলেন: যদি এ শর্ত করা হয়, মূল্য বুঝিয়ে দেওয়ার পূর্বে পণ্য বুঝিয়ে দিতে হবে, তাহলে বিক্রি ফাসেদ হয়ে যাবে। মুহাম্মদ রহ. এর কারণ হিসাবে বলেন, এভাবে মূল্য পরিশোধের সময় অনির্দিষ্ট ও অজানা হয়ে যায়। তাই তিনি বলেন, যদি পণ্য কবে হস্তান্তর করা হবে তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়, তাহলে আর বিক্রি ফাসেদ হবে না, পূর্ববর্তী শর্তটি করা সত্ত্বেও। কেননা, পণ্য আগে বুঝিয়ে দেওয়াই স্বাভাবিক নিয়ম। তার সময় নির্ধারিত হওয়ায় প্রকারান্তরে মূল্য পরিশোধের দিনও নির্ধারিত হয়ে গেছে। যেহেতু পণ্য হস্তান্তরের পর তা আর বেশি বিলম্বিত হবে না। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. অবশ্য এটিকে [মূল্য পরিশোধের পূর্বে পণ্য হস্তান্তর] অনাবশ্যক শর্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। যার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই, তাই তা বাতিল হবে এবং এ শর্ত করা হলেও বিক্রি সহীহ হবে।

মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, সময় অনির্ধারিত বা অজানা থাকা মূল্যে ধোঁকার অন্তর্ভুক্ত। তারা উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেমন কেউ বলল : সে পণ্যটি বিক্রি করছে যায়দের এখানে আসা বা তার মৃত্যু হওয়ার পূর্বে মূল্য পরিশোধ করার শর্তে, তাহলে বিক্রি ফাসেদ হবে। ইবনে রুশদ এ সম্পর্কে বলেন: যদি কেউ কিছু বিক্রি করে যার মূল্য অজানা বা তা প্রদানের সময় অজানা, তাহলে ক্রেতা-বিক্রেতা দুজনে রাজী হোক বা অমত করুক, বিক্রি ভেঙ্গে দেওয়া কর্তব্য হবে।

শাফেয়ী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি কেউ বাকীতে বিক্রি করে তাহলে অনির্ধারিত সময় পর্যন্ত তা দীর্ঘায়িত করা যাবে না। ‘সালাম’ বিক্রিতে যেমন পণ্য হস্তান্তরের সময় অজানা থাকা জায়েয নয়, এমনিভাবে বাকীতে মূল্য প্রদানের সময় অজানা থাকাও জায়েয নয়। তারা এ প্রসঙ্গে নাজায়েয অপর এক প্রকার বিক্রি নিয়ে আলোচনা করেন। তা হচ্ছে, কেউ গরু বিক্রি করে তার দুধ এক মাসের জন্যে নিজে নেওয়ার শর্ত করা বা উপহার প্রদানের শর্ত করা বা এরূপ কোনো বিক্রি। এভাবে দুধ উপহার নেওয়া বিক্রিতে বদল বলে গণ্য হয়, যা জায়েয নয়। এরূপ শর্ত করা হলে বিক্রি বাতিল হবে।

হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, অনির্ধারিত সময় পর্যন্ত মূল্য আদায় বিলম্বিত করার শর্ত করা জায়েয নয়। এরূপ করা হলে শর্তটি বাতিল হয়ে যাবে, বিক্রি সঠিক বলে গৃহীত হবে। তবে শর্ত ফাসেদ হওয়ার দরুন বিক্রয়ে ক্রেতার উদ্দেশ্য হাতছাড়া হওয়ার দরুন সে বিক্রিটা ভেঙ্গে দিতে পারবে।

টিকাঃ
৫৯. আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ২৮১ ও ৩০১-৩০২; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫০৫ ও ৫৩১; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৮৪
৬০. আল-মুকাদ্দামাত আল-মুমাহহাদাত, পৃ. ৫৪২-৫৫০; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১৪৭; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৬৬; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ১৯৪; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৮৪

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন 📄 সময় নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক ও মতবিরোধ

📄 সময় নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক ও মতবিরোধ


মূল্য আদায়ে সময় নির্ধারণ করা নিয়ে যদি মতবিরোধ দেখা দেয়, তাহলে যে তা অস্বীকার করবে, সে হচ্ছে বিক্রেতা, তার কথা গ্রহণ করা হবে। যেহেতু বিক্রিতে নগদ মূল্য প্রদান হচ্ছে স্বাভাবিক নিয়ম। যদি সময় নির্ধারণের সীমা নিয়ে বিতর্ক হয়, যে অল্পদিনের কথা বলবে তার কথা গৃহীত হবে, এক্ষেত্রেও সে সাধারণভাবে বিক্রেতাই হবে। তার কথা গ্রহণ করার কারণ, সে অধিক হওয়া অস্বীকার করেছে। মেয়াদ এক্ষেত্রে কম হওয়াই হচ্ছে স্বাভাবিক রীতি।

উপরিউক্ত দুটো মাসআলাতেই ক্রেতাকে নিজের মতের পক্ষে দলিল উপস্থাপন করতে হবে, যেহেতু সে বাহ্যিক ও স্বাভাবিক অবস্থার বিপরীতে বক্তব্য প্রদান করছে। নিয়ম হচ্ছে, যে কোন কিছু নতুন ভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে বা স্বাভাবিকের বিপরীত কিছু বলবে তাকে তা প্রমাণ করতে হবে।

ক্রেতা ও বিক্রেতা কতদিন সময় ধার্য হয়েছিল সে কথায় একমত হলেও নির্ধারিত সে সময় চলে গেছে, না এখনো বাকী আছে তা নিয়ে যদি তাদের মতান্তর হয় তাহলে নিশ্চয় ক্রেতা বলবে, সময় এখনো শেষ হয়নি। এক্ষেত্রে তার কথা গ্রহণ করা হবে। উভয়ে দলিল প্রদান করলে ক্রেতার দলিল গ্রহণ করা হবে। যেহেতু তারা এ কথায় একমত, সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, তাই তাতে সময় বাকী থাকাই হচ্ছে মৌলিক অবস্থা, তাই ক্রেতার বক্তব্য গ্রহণ করা হবে। সময় শেষ হওয়ার দাবি করে বিক্রেতা মূলত তার নিকট মূল্যপ্রদান দাবি করছে, যা প্রকাশ্য। ক্রেতা তা অস্বীকার করছে, তাই তার অস্বীকৃতিটাই এখানে গৃহীত হবে।

ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই যখন নিজ নিজ মতের পক্ষে দলিল প্রদান করবে তখন ক্রেতার দলিলটি এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য হবে। এর কারণ জাওহারা গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করে আল বাহরুর রায়েক-এর গ্রন্থকার লিখেন: ক্রেতার দলিলটি এখানে বিক্রেতার দলিলের তুলনায় অগ্রগণ্য হওয়ার কারণ সম্ভবত, বিক্রেতা যা দাবি করেছে তা হচ্ছে স্বাভাবিক; তার বিপরীতে ক্রেতা দলিল প্রদান করায় তারটি অগ্রগণ্য বিবেচিত হয়েছে। ইবনে আবেদীন এক্ষেত্রে বলেন: এভাবে ফয়সালা প্রদান বড়ই মুশকিল, কারণ দলিলের কাজ হচ্ছে, যা প্রকাশ্য তার বিপরীতটি প্রতিষ্ঠা করা। এক্ষেত্রে ক্রেতা দাবি করছে সময় শেষ হয়ে যায়নি, এটিই প্রকাশ্য। এর বিপরীত হিসাবে বিক্রেতার দলিলটি এখানে অগ্রগণ্য হয়। ইবনে আবেদীনের এ কথার জবাবে বলা হয়, এখানে ক্রেতা দাবি করেছে সময় এখনো রয়েছে; তা এই বিতর্কের অন্তর্নিহিত চাহিদা। যেহেতু ক্রেতার দলিলটি সে চাহিদা পূরণ করেছে তাই তার দলিল গ্রহণ করা হবে।

এ সময় বলা হবে, ক্রেতার দলিলটি এখানে অগ্রগণ্য হয়েছে, যেহেতু তা অধিকতর বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করেছে। এ মাসআলার সমর্থন পাওয়া যায় অপর একটি মাসআলায়। তা হচ্ছে, সালাম বিক্রির নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হয়েছে না এখনো বাকী রয়েছে, একথায় যদি ক্রেতা বিক্রেতায় মতান্তর ঘটে তাহলে সেক্ষেত্রে বিক্রেতার কথাই কসমের সাথে গৃহীত হয়ে থাকে, যেহেতু সে অধিক (সময়ের) দাবি করে।

যদি উভয়েই দলিল উপস্থাপন করে তবে ক্রেতার দলিলটি গৃহীত হবে। আল-বাহরুর রায়েক গ্রন্থে এর কারণ বলা হয়েছে, ক্রেতা বিক্রেতার তুলনায় অধিক মেয়াদ দাবি করে তা প্রতিষ্ঠা করছে। তাই তার কথাই গ্রহণ করা হবে, দলিল তারটাই গৃহীত হবে। দ্রষ্টব্য : أحل

টিকাঃ
৬১. আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ৩০১; আদ-দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৩২
৬২. আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ৩০১; আদ-দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৩২

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية