📄 নির্ধারণ করার দরুন ছামান নির্দিষ্ট হওয়া
নির্ধারণ করা হলে ছামান নির্দিষ্ট হবে কি-না, তা নিয়ে ফকীহগণ ভিন্ন ভিন্ন দুটো মত বর্ণনা করেছেন:
প্রথম মত: নির্ধারণ করলে হামান নির্দিষ্ট হয় না
আলিমগণের প্রথম মত হচ্ছে, মুদ্রা নির্দিষ্ট করা হলেও নির্দিষ্ট হয় না। তাই কেউ যদি একটি দিরহামের বিপরীতে কোনো কিছু কিনে অন্য একটি দিরহাম প্রদান করে, তবে তা জায়েয হবে। এটি যুফার রহ. ব্যতীত হানাফী মাযহাবের অন্য সকল আলেমের মত, এটি ইমাম আহমদ রহ.-এর একটি মত। মালেকী মাযহাবেও এ মতটিই অধিক প্রসিদ্ধ। তবে তারা বলেন, যদি বিক্রেতা সন্দেহপ্রবণ লোক হয় তবে ক্রেতা তাকে যে দিরহাম দেখিয়েছে তা-ই প্রদান করবে; অন্যটি নয়।
হানাফী মাযহাবের আলেমগণ এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। যদি মুদ্রা প্রচলিত থাকে, তাহলে বিক্রি, ভাড়া প্রদান ইত্যাদি চুক্তিতে নির্ধারণ করলেও মুদ্রা নির্দিষ্ট হবে না। যদি বিক্রি বা ভাড়ার ন্যায় বিনিময় চুক্তি না হয়ে তা হয় আমানত, অংশীদারি, মুদারাবা ইত্যাদি, তাহলে মুদ্রা নির্ধারণ করলে তা নির্দিষ্ট হবে। এক্ষেত্রে অপহরণ ও ছিনতাই এবং কাউকে উকীল হিসাবে দায়িত্ব প্রদানও এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। উল্লিখিত ক্ষেত্রগুলোতে নির্ধারণ করলে মুদ্রা নির্দিষ্ট হওয়ার কারণ হচ্ছে, এসকল ক্ষেত্রে মুদ্রা কোনো কিছু পাওয়ার মাধ্যম নয়, বরং মুদ্রাগুলোই খোদ উদ্দেশ্য ও কাঙ্ক্ষিত। তাই দেখা যায়, অংশীদারি কারবারে কোনো এক অংশীদারের টাকা অন্যদের টাকার সাথে মিলানো এবং তা দিয়ে কিছু কেনার পূর্বেই যদি তার পুঁজির টাকা ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে তার সাথে অংশীদারি কারবারই ভেঙ্গে যায়।
যদি বিক্রি বা ভাড়া জাতীয় বিনিময় চুক্তিতে মুদ্রা ব্যতীত অন্য কোনো বস্তু ছামান বা মূল্য হয় তবে নির্ধারণ করার দ্বারা তা নির্দিষ্ট হবে। যেহেতু তা মুদ্রা নয়, তাই বিনিময়ে তা যেমন ছামান বলে ধার্য হতে পারে, পণ্য হিসাবেও গণ্য হতে পারে। পণ্যের ক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে তা নির্ধারণ করলে নির্দিষ্ট হয়।
দিরহাম ও দীনার ইত্যাদির মুদ্রাতে যদি স্বর্ণ ও রৌপ্যের তুলনায় খাদই থাকে অধিক, তারপরেও তা মুদ্রা হিসাবে প্রচলিত থাকে, তবে যেহেতু তা পারিভাষিক অর্থে মুদ্রা, তাই তা নির্দিষ্ট করলেও নির্দিষ্ট হবে না। যে পর্যন্ত এগুলো মুদ্রা হিসাবে প্রচলিত থাকবে, সে পর্যন্তই এগুলোতে ছামান হওয়ার বৈশিষ্ট্য বহাল থাকবে, নির্দিষ্ট করলেও তা নির্দিষ্ট হবে না। তবে যদি এ মুদ্রাগুলো এখন আর প্রচলিত না থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট করলে সেগুলো নির্দিষ্ট হবে। যেহেতু মুদ্রা হিসেবে প্রচলিত হওয়া এগুলোতে ছামান হওয়ার বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠা করেছিল, ফলে তখন তা নির্দিষ্ট করলেও নির্দিষ্ট হয়নি। কিন্তু এখন যখন তা আর মুদ্রা হিসাবে প্রচলিত নয়, অতএব তাতে ছামান-এর বৈশিষ্ট্যও বহাল নেই। মুদ্রাগুলোতে খাদের পরিমাণ অধিক থাকায় এগুলো মূলত ছিল পণ্য ও সামগ্রী শ্রেণিভুক্ত। প্রচলন থাকার প্রেক্ষিতে এগুলো হয়ে ছিল মুদ্রা, হয়েছিল ছামান। এখন যখন এগুলোর প্রচলন বাতিল হয়ে গেছে, তাই এগুলো এখন আর মুদ্রা নয়। এ অবস্থায় এগুলোতে মৌলিক অবস্থার ভিত্তিতে বিধান সাব্যস্ত ও কার্যকর হবে। তা হচ্ছে, এগুলো নির্দিষ্ট করা হলে নির্দিষ্ট হবে।
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ ‘সরফ’ বিক্রি ও ভাড়া প্রদান এ দুটো ক্ষেত্র ব্যতিক্রম হিসাবে গণ্য করেন। তারা বলেন, এ দুটো লেনদেনে মুদ্রা নির্ধারণ করলে নির্ধারিত হয়। তাদের কথার বিস্তারিত বিশ্লেষণ হচ্ছে, নগদ মুদ্রা—স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রা—বিনিময় জাতীয় লেনদেনে (যেমন বিক্রি ও ভাড়া ইত্যাদি) নির্ধারণ করলেও নির্দিষ্ট হয় না। তারা বলেন, পণ্য ও ছামান, এ দুটোর সংজ্ঞা আলোচনা করলে দেখা যায়, পণ্য ও ছামান একটি অপরটির বিপরীত। ফলে এগুলোর বৈশিষ্ট্য একটির অপরটির বিপরীত। পণ্যের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা নির্দিষ্ট করলে নির্দিষ্ট হয়। এর বিপরীতে ছামান নির্দিষ্ট করলেও তার মুদ্রা নির্দিষ্ট হয় না। দিরহাম ও দীনার যেহেতু মুদ্রা, বিনিময় চুক্তিগুলোতে এ সকল মুদ্রা হয় ছামান, তাই এগুলো নির্দিষ্ট করলেও নির্দিষ্ট হয় না। সে হিসাবে কেউ যদি বলে, আমি তোমার এ কাপড়টি এ দিরহামগুলোর বা দীনারগুলোর বদলে বিক্রি করছি তাহলে বিক্রি সম্পন্ন হবে। এ সময় ক্রেতা সে দিরহাম দীনারগুলো দিতে পারে, সেগুলো না দিয়ে সে পরিমাণ অন্য দিরহাম ও দীনারও দিতে পারে।
যদি কোনো কারণে কারো ওপর জরিমানার বিধান প্রযোজ্য হয়, তবে জরিমানার বস্তু, তার প্রকার-বৈশিষ্ট্য ও পরিমাণ যা নির্ধারণ করা হবে তা নির্ধারিত হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো কিছু ইশারা করে নির্ধারণ করা হলে তা নির্দিষ্ট হবে না। বরং তার সমতুল্য অন্য কোনো বস্তু দিয়ে জরিমানা আদায় করা যাবে। তাই যে জিনিসের প্রতি ইশারা করা হয়েছে, তা ধ্বংস হয়ে গেলেই চুক্তি বাতিল হবে না, তেমনি জরিমানা প্রদানও বাতিল না হয়ে বহাল থাকবে। জিনিস ধ্বংস হলে তার প্রকার পরিমাণ ও বৈশিষ্ট্য ইত্যাদিতে কোনো পরিবর্তন না করে জরিমানা প্রদান করতে হবে।
ছামান শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, যা দায়িত্বে ন্যস্ত হয়। ফাররা, যিনি আরবী ভাষার অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব ও ব্যাকরণবিদ, তার পক্ষ থেকে ছামান শব্দের এ অর্থই বর্ণিত হয়েছে। যদিও বিক্রয়চুক্তিতে বিপরীত দুটি বস্তুর একটির নাম ছামান বা মূল্য এবং অপরটির নাম পণ্য, ভাষার প্রচলনে এবং শরীয়তের পরিভাষায় উভয়ভাবে এ নাম স্বীকৃত ও প্রচলিত, তাই নামের বিভিন্নতা এ কথাই প্রকাশ করে যে, এগুলোর মূল পরিচিতিতেও ভিন্নতা ও পার্থক্য বিদ্যমান। তবে ভাষার ব্যাপকতার দরুন একটিকে অপরটির স্থানে ব্যবহার করারও অনুমতি ও নমুনা রয়েছে প্রচুর। যেহেতু পণ্য ও মূল্য শব্দ দুটোর একটি অপরটির বিপরীত, তাই এক শব্দ অপর শব্দের স্থানে ব্যবহৃত হওয়া সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত। যেমন পবিত্র কুরআনে الْإِحْسَانُ -এর বিপরীত স্থানেও الْإِسَاءَةُ (মন্দ) এবং الْإِعْتِدَاء -এর বিপরীত স্থানেও إِعْتِدَاء (বাড়াবাড়ি) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
ছামান শব্দটি যেহেতু যা দায়িত্বে ন্যস্ত তা বুঝায়, তাই ইশারার দ্বারা তাতে নির্দিষ্ট হওয়ার উপযোগিতা তৈরি হয় না। এ কারণে সুনির্দিষ্ট কিছু মুদ্রার দাবিদার হওয়ার ক্ষেত্রে তা নির্ধারণ করা অত্যাবশ্যক হলেও সত্যিকার অর্থে তা সম্ভব হয় না। তাই যে মুদ্রাগুলোর প্রতি ইশারা করার ইচ্ছা সেগুলোর নাম, প্রকার, পরিমাণ ও বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বর্ণনা করতে হবে, একজন জ্ঞান-বোধসম্পন্ন মানুষের দাবি যথাসম্ভব বহাল রাখার লক্ষ্যে।
যেহেতু ছামানে নির্ধারণ করার কোনো উপকারিতা নেই, নির্ধারণ করার পরও লেনদেনের ক্ষেত্রে যা নির্ধারণ করা হয়েছে তা না দিয়ে তার সমতুল্য টাকা পয়সা প্রদান করা জায়েয, তাই কিছু মুদ্রার মালিকানা দাবি করার ক্ষেত্রেও তা নির্দিষ্ট করার কোনোই লাভ নেই। তার এক্ষেত্রে যা করণীয় তা হচ্ছে দিরহাম নাকি দীনার, মুদ্রার নাম, প্রকার, বৈশিষ্ট্য ও পরিমাণ ইত্যাদি নির্ধারণ করে দেওয়া। কারণ, এ বিষয়গুলোর নির্ধারণ যথাযথ ও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত।
যেহেতু লেনদেনে শুধু দিরহাম বা দীনার শব্দ উল্লেখ করা হয়, তাই তা নির্দিষ্ট করলেও নির্দিষ্ট হয় না। যেমন পাত্র দিয়ে মেপে দেওয়ার ক্ষেত্রে পাত্র নির্দিষ্ট হয় না।
হানাফী ও মালেকী মাযহাবের আলেমগণ ছামান সম্পর্কিত এই বিধান থেকে সরফ বিক্রিকে ব্যতিক্রম গণ্য করেন। যেহেতু সরফ বিক্রিতে যে বৈঠকে বেচাকেনার আলোচনা হয়, সে বৈঠকেই স্বর্ণ ও রৌপ্য ক্রেতা ও বিক্রেতা কজা করে নেওয়া শর্ত, তাই এখানে যে স্বর্ণ-রৌপ্য নির্দিষ্ট করা হয় তা-ই নির্দিষ্ট হয়। কেউ কেউ ভাড়া প্রদানও ব্যতিক্রম বলে উল্লেখ করেছেন।
দ্বিতীয় মত: নির্ধারণ করলে ছামান নির্ধারিত হয়
আলেমদের দ্বিতীয় মত হচ্ছে, নির্ধারণ করলে ছামান নির্দিষ্ট হয়। তাই যে মুদ্রার প্রতি ইশারা করা হবে তা নির্দিষ্ট হবে। তাই বিক্রেতা ক্রেতার নিকট ঐ দিরহামগুলোর দাবি করতে পারবে, যে দিরহামগুলো ক্রেতা বিক্রেতাকে বিক্রয়কালে দেখিয়েছে। যেমন মুদ্রা ব্যতীত অন্য কোনো বস্তুকে ছামান হিসাবে নির্ধারণ করা হলে তা নির্দিষ্ট হয়ে যায়। এবং তা না দেওয়া হলে বিক্রেতা তা দাবি করতে পারে।
যদি ছামান হিসাবে নির্ধারিত মুদ্রা কজা করার পূর্বে ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে সে বিক্রয় বাতিল হয়ে যাবে, ধ্বংস হয়ে যাওয়া মুদ্রার বদলে অন্য মুদ্রা প্রদান করা জায়েয ও সঠিক হবে না। যেমন মুদ্রা ব্যতীত অন্য কোনো সামগ্রীকে ছামান নির্ধারণ করার পর তা কজা করার পূর্বে ধ্বংস হয়ে গেলে বিক্রি বাতিল হয়ে যায়। সুতরাং সেখানে ঐ বস্তুর পরিবর্তে অপর বস্তু দেওয়া সঠিক ও জায়েয হয় না।
উপরিউক্ত মতটি শাফেয়ীদের। হাম্বলী মাযহাবের এটি সর্বাধিক প্রকাশ্য মত, হানাফী মাযহাবের যুফারও তাদের সাথে রয়েছেন। এ মতের প্রবক্তারা বলেন, আরবী ভাষায় বায় (بيع) ও শিরা (شراء) উভয়টি কেনা ও বেচা উভয় অর্থে ব্যবহৃত হয়। যে সময় বস্তুর বদলে বস্তু বেচাকেনা হতো তখন প্রতিটি বস্তু বেচাও হতো আবার কেনাও হতো। আর যে ক্রেতা হতো এক বস্তুর, সে অন্য বস্তুর বিক্রেতা হতো। তাই, যে বস্তু হতো একের হাতে পণ্য, তা অন্যের হাতে মূল্য। এভাবে উভয় বস্তুই পণ্যও হতো, মূল্যও হতো। কারণ, উভয়পক্ষ থেকে কেনাও হতো, বেচাও হতো। যে হিসাবে পণ্য ও মূল্য একই বস্তুতে একই সাথে প্রয়োগ করা হতো, সে দিকে লক্ষ্য করলে এ উভয় শব্দ অর্থাৎ ছামান বা মূল্য (الثمن) মাবী বা পণ্য (المبيع) সমার্থক তুল্য হয়ে যায়।
তবে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এতোটুকু পার্থক্য করা হয়েছে, যেটিকে মূল্য ধরা হয়েছে তার পূর্বে ب অক্ষর আনা হবে, যেটিকে পণ্য বিবেচনা করা হয়েছে তার পূর্বে বা অন্য কোনো হরফ আনা হবে না। এ মতের ধারকগণ এ পর্যায়ে দলীল দেন পবিত্র কুরআনের আয়াত لَا تَشْتَرُوا بِآيَاتِي ثَمَناً قَلِيلًاً “তোমরা আমার আয়াতগুলোকে তুচ্ছ মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করো না।” এ আয়াতের মর্ম: তোমরা আয়াতের বিপরীতে তুচ্ছ সামগ্রী গ্রহণ করো না। এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা ছামানকে করেছেন পণ্য, যা গ্রহণ করা হয় এবং آياتي (আমার আয়াত)কে করেছেন ছামান, যেহেতু তার পূর্বে ب আনা হয়েছে, অথচ এটিই মূল পণ্য, তুচ্ছ সামগ্রী হচ্ছে তার ছামান। এভাবে বিপরীত ব্যবহার করেছেন, যেহেতু যেটি পণ্য সেটিই মূল্য এবং যেটি মূল্য সেটিই পণ্য হয়। এমন বিপরীতার্থক হওয়ার দরুন বায় (بيع) ও শিরা (شراء) পরস্পর বিপরীত অর্থে ব্যবহৃত হয়। বায় যেমন বিক্রয় বোঝায়, ক্রয়ও বোঝায়। শিরাও তেমনি ক্রয়ের পাশাপাশি বিক্রয়ও বোঝায়। বলা হয় : شَرَيْتُ الشَّيْء অর্থ হয় بعنهُ “আমি জিনিসটি বিক্রি করলাম। আল্লাহ তাআলা ইউসুফ আ.-এর আলোচনায় বলেছেন وَشَرَوْهُ بِثَمَنِ بَخْسٍ دَرَاهِمَ مَعْدُودَة : “তারা অল্প মূল্যে কত দিরহামের বিনিময়ে ইউসুফকে বিক্রি করে দিল।” এ আয়াতে شَرَو এর অর্থ بَاعُوهُ
যেহেতু ছামান হচ্ছে বস্তুর মূল্য বা কীমাত। কীমাত বস্তুর স্থলবর্তী হয়ে থাকে। (যেমন বস্তু না দিয়ে তার মূল্য প্রদান করা সহীহ হয়।) বস্তুর কায়েম মাকাম বা স্থলবর্তী হওয়ার প্রেক্ষিতেই তার নাম হয়েছে কীমাত। এভাবে বস্তু ও তার মূল্য একটি অপরটির বরাবর ও স্থলবর্তী হয়েছে। তন্মধ্যে একটিকে মূল্য এবং অপরটিকে পণ্য বিবেচনা করা হয়েছে। যেহেতু এ দুটো শব্দ বরাবর এবং মূল্য ও পণ্য একটি অপরটির স্থলবর্তী তাই যেটি পণ্য সেটিই মূল্য, যেটি মূল্য সেটিই পণ্য। এভাবে সাব্যস্ত হলো, ভাষাগতভাবে মূল্য ও পণ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তাই বিধানেও কোনো পার্থক্য থাকবে না। পণ্যে নির্ধারণ করা হলে তা নির্দিষ্ট হয়ে যায়, সে হিসেবে ছামানেও নির্ধারণ করা হলে তা নির্দিষ্ট হয়ে যাবে। যেহেতু তা ছামান হওয়ার সাথে সাথে পণ্যও বটে। তারা আরো বলেন, ছামান হচ্ছে বিক্রয়চুক্তিতে বদল ও বিনিময়। সাধারণত বদল ও বিনিময়টি নির্ধারণ করলে নির্দিষ্ট হয়ে যায়, তাই ছামানও নির্দিষ্ট হবে।
ছামান নির্ধারিত হবে কিভাবে?
ছামান নির্ধারিত হয় ইশারার দ্বারা। তার সাথে নাম যুক্ত হতে পারে, নাও হতে পারে। যেমন, বিক্রেতা বলল : بعتُكَ هَذَا الثَّوْبَ بِهَذه الدَّرَاهم “আমি তোমার নিকট এ কাপড় বিক্রি করছি এ দিরহামগুলোর বিনিময়ে।” এক্ষেত্রে الدراهم বাদ দিয়ে শুধু বলাও শুদ্ধ হবে।
এ বাক্যটি আরো সংক্ষিপ্ত আকারে বলা যেতে পারে مَّكَ هَذَا بِهَذَا পণ্য ও মূল্য কোনোটিই উল্লেখ না করে শুধু ইশারা করাই যথেষ্ট হবে।
তেমনিভাবে ইশারা না করে শুধু নাম উল্লেখও যথেষ্ট হবে—যদি ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের সে সম্পর্কে জানা থাকে।
তৃতীয় শর্ত: নির্দিষ্ট হামানটি ক্রেতার মালিকানায় থাকতে হবে
ছামান যথাযথ হওয়ার জন্যে তৃতীয় শর্ত হচ্ছে, নির্ধারিত ছামানটি ক্রেতার মালিকানায় থাকতে হবে। এ কথায় সকল ফকীহ একমত। ক্রেতা যখন পণ্য কিনবে তখন ছামানটিতে তার পূর্ণ মালিকানা থাকবে। তাতে তখন আর কারো কোনো অধিকার থাকবে না। তারা এ সম্পর্কে দলীল প্রদান করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাকীম ইবনে হিযামকে বলেছেন : لاَ تَبِعُ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ “তোমার কাছে যা নেই তা তুমি বিক্রি করো না।” এ হাদীসে এ কথা স্পষ্ট হলো, বিক্রয়ের পণ্যটা বিক্রেতার পূর্ণ মালিকানায় থাকতে হবে। তারা বলেন, নির্ধারিত ছামান হচ্ছে পণ্যের সদৃশ, তাই এতেও পণ্যের এই বিধান কার্যকর হবে।
চতুর্থ শর্ত: নির্ধারিত ছামানটি হস্তান্তর করা সম্ভব হতে হবে
সকল মাযহাবের সকল ফকীহ এ কথায় একমত, নির্ধারিত ছামানটি এমন হতে হবে যা হস্তান্তর করা সম্ভব। কেননা, যা হস্তান্তর করা সম্ভব হবে না তা অস্তিত্বহীন তুল্য। যা অস্তিত্বহীন তা ছামান হওয়া যথার্থ নয়। তাই শূন্যে থাকা পাখি যেমন ছামান হবে না, তেমনি পালিয়ে যাওয়া উট—যা এখনো মালিকের নিয়ন্ত্রণে আসেনি—তাও ছামান হবে না।
তাদের দলিল, আবু হুরায়রা রা.-এর বর্ণনা:
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ بَيْعِ الْحَصَاةِ وَعَنْ بَيْعِ الْغَرَرِ
“রাসূলুল্লাহ স. কঙ্কর নিক্ষেপে বিক্রি এবং ধোঁকাপূর্ণ বিক্রি করা থেকে নিষেধ করেছেন।”
মাওয়ারদী এ হাদীসের ব্যাখ্যা করে বলেন, ধোঁকা হচ্ছে পরস্পর বিপরীত দুটি বিষয়ের মধ্যে যেটি অধিক আশঙ্কাজনক সেটি হওয়ার অধিক সম্ভাবনা হওয়া। (অর্থাৎ কোনো বস্তুতে যথাযথ হওয়া এবং যথাযথ না হওয়া এ দুটো অবস্থাই যখন হতে পারে এবং যথার্থ না হওয়ার আশঙ্কাই থাকে প্রবল।) কেউ বলেছেন, যার পরিণতি আমাদের থেকে গোপন ও লুকায়িত তাই হচ্ছে ধোঁকা। পণ্য ও নির্ধারিত মূল্য যদি হস্তান্তর করা সম্ভব না হয় তবে তা ধোঁকাপূর্ণ বিক্রির অন্তর্ভুক্ত হবে, হাদীসে যার নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে।
পঞ্চম শর্ত: ছামানের পরিমাণ ও বৈশিষ্ট্য জানা থাকা
হানাফী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, ছামান বা মূল্য হয়তো ইশারা করে দেখানো হবে অথবা তাতে ইশারা করা হবে না। যদি ইশারা করে তা দেখানো হয় তবে বিক্রয় জায়েয ও যথার্থ হওয়ার জন্যে তার পরিমাণ বা বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি কিছুই জানার প্রয়োজন নেই। পরিমাণ: যেমন পাঁচ দশ দিরহাম, পাঁচ দশ কুর গম। বৈশিষ্ট্য: যেমন কুয়েতী দীনার, জর্দানী দীনার, ইরি ধান, বোরো ধান ইত্যাদি।
কেউ যদি বলে, তোমার হাতে থাকা দিরহামগুলোর বিপরীতে আমি গমের এ স্তূপ বিক্রি করছি, বলার সময় হাতের দিরহামগুলো দেখা যাচ্ছে, তাহলে বিক্রয় সহীহ ও যথাযথ বলে গণ্য হবে। যেহেতু ইশারা করা পরিচয়ের সর্বাধিক বলিষ্ঠ পন্থা। তাই এরপর কত দিরহাম, কোন্ দেশি দিরহাম কতটুকু গম ইত্যাদির উল্লেখ না করা হলেও এ বিক্রয়ে পণ্য ও মূল্য হস্তান্তরে এমন কোনো ঝগড়ার উদ্ভব হবে না—যে ঝগড়া হলে বিক্রয় আর বৈধ ও জায়েযই হয় না। যেহেতু ইশারা করার ক্ষেত্রে পণ্য ও মূল্য উভয়ই উভয়ের সামনে উপস্থিত, এ অবস্থায় ইশারা করে স্পষ্টভাবে কোন্টির বিনিময়ে কোন্টি তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যে সকল বস্তুতে সুদের সম্ভাবনা থাকে, সেগুলোর একজাতীয় বস্তুতে বিক্রয় ও বিনিময় সম্পাদনকালে এভাবে ইশারা করা যথেষ্ট নয়। যেহেতু বিনিময়ের উভয় পক্ষ বরাবর হওয়া জরুরী, কমবেশি হলে তাতে সুদ হয়ে যাবে, তাই এ অবস্থায় অনুমান করে বিক্রি করা জায়েয হবে না। বরং এক স্তূপের বিপরীতে অপর স্তূপ বিক্রি করা হলে উভয়টি পরিপূর্ণ ভাবে মেপে নিতে হবে, মেপে সমান হলেই বিক্রি করা জায়েয হবে।
সালাম বিক্রির বিষয়টিও সুদের সম্ভাবনাপূর্ণ বস্তুর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এখানেও যদি অগ্রিম মূল্যটি অর্থসম্পদ না হয়ে কোনো পরিমাপযোগ্য বস্তু হয় তবে শুধু ইশারা করে স্তূপ দেখিয়ে দেওয়া যথেষ্ট হবে না। বরং মেপে তার সঠিক পরিমাণ ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জেনে নিতে হবে। অবশ্য ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেছেন, যদি স্তূপে কী পরিমাণ শস্য রয়েছে তা পূর্বেই জানা থাকে তাহলে এখন ইশারা করাই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে।
হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ এ আলোচনায় হানাফী আলেমদের মত সমর্থন করেন। ইবনে কুদামা বলেন, ছামান ও পণ্য—উভয়টি অনুমানে বিক্রি করা জায়েয, তাতে কোনোই পার্থক্য নেই।
সে হিসাবেই তারা বলেন, যদি কেউ মূল্য হিসাবে কোনো পাত্রভরে দিরহাম দেয় যা দেখার দরুন তাদের নিকট পরিচিত, তাহলে বিক্রি জায়েয ও সম্পন্ন হবে। এমনিভাবে যদি কোনো পাথরের ওজন পরিমাণ রূপা বা সোনার বিনিময়ে কোনো কিছু বেচাকেনার কথা হয়, পাথরটির ওজন কত তা সবার জানা না থাকলেও ক্রেতা ও বিক্রেতার তা জানা থাকে, তাহলে বিক্রি জায়েয ও সম্পন্ন হবে। মূলত এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে ঝগড়া লাগার কোনো সূত্র যেন না থাকে বা না তৈরি হয়।
সে হিসাবেই তারা বলেন, গম বা যবের স্তূপ বা দিরহামের ঢিপি প্রত্যক্ষ করার ভিত্তিতে যদি ক্রেতা বিক্রেতা তা বেচাকেনা করে, তা ওজনও না করে, পাত্র দিয়ে পরিমাপ না করে বা দিরহাম না গুণে, তবুও বিক্রি বৈধ হবে। যেহেতু তারা সঠিক পরিমাণ বা সংখ্যা না জানলেও দেখে একমত হওয়ায় তাতে ঝগড়ার আর সম্ভাবনা নেই।
শাফেয়ী মাযহাবের আলেমদের মতও প্রায় এরূপ। শিরাজী বলেন, যদি নির্ধারিত ছামান প্রত্যক্ষ করে সে সম্পর্কে অনুমান করে তার বিপরীতে কেউ পণ্য বিক্রি করে তবে তা সহীহ ও জায়েয হবে, যেহেতু তা প্রত্যক্ষ করা হয়েছে। অবশ্য এ ধরনের বেচাকেনা মাকরূহ হবে, যেহেতু ছামানের মূল পরিমাণটা তো বাস্তবে জানা হয়নি।
মালেকী মাযহাবের আলেমদের মত হচ্ছে, সোনা ও রূপা যদি অনুমান করে বেচাকেনা করা হয় তাহলে তা জায়েয হবে না, যদি সেগুলো মুদ্রা হয় এবং মানুষের মধ্যে সেগুলোর গণনার বা ওজনসহ গণনার নিয়ম প্রচলিত থাকে। যেহেতু মুদ্রার ছাপ দেওয়াই হয়েছে হিসাব করার জন্যে, তাই সেক্ষেত্রে অনুমান করা যথাযথ হবে না। কিন্তু যদি সোনা রূপায় কোন ছাপ না থাকে, মানুষ সে ছাপহীন সোনরূপা গুণে ব্যবহার করুক বা ওজন করে ব্যবহার করুক, সেগুলো দিয়ে অনুমান করে ছামান প্রদান করা যাবে, তাতে যেহেতু হিসাব করার লক্ষ্যে ছাপই দেওয়া হয়নি।
যদি ছামান হিসাবে ইশারা করা হবে এমন কোনো বস্তু সামনে না থাকে, তাহলে সকল আলেম ও ফকীহ এ কথায় একমত, ছামান হিসাবে যা উল্লেখ করা হবে তার পরিমাণ ও বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জানা থাকতে হবে, তাহলে বেচাকেনা সহীহ ও জায়েয হবে। পরিমাণ ও বৈশিষ্ট্য জানা না থাকলে তাতে ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে ঝগড়া লাগার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। সে ঝগড়ার দরুন পণ্য ও মূল্য পরস্পরে হস্তান্তর করা নিয়েও আপত্তি উত্থাপিত হবে। এরূপ হলে সে বেচাকেনায় কোনই উপকার হবে না। তাই পরিমাণ ও বৈশিষ্ট্য জানা না থাকলে বিক্রয়ই সম্পন্ন হবে না। ছামান সম্পর্কে অজানা থাকাই শুধু নয়, অন্য যে কোনো বিষয়ে অজ্ঞতাও যেহেতু ঝগড়ার সূত্রপাত ঘটায়, তাই তা বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী, তাই এ সকল ক্ষেত্রেই বিক্রয় অবৈধ।
পরিমাণ জানা থাকা যেমন জরুরি, বৈশিষ্ট্যও জানা থাকা তেমনি অত্যাবশ্যক। নতুবা বিক্রেতা দিতে চাইবে নিকৃষ্ট মানের বস্তু, অপর পক্ষে ক্রেতা চাইবে উৎকৃষ্ট বস্তু। ফলে নিশ্চিতই ঝগড়ার সূত্রপাত হবে। ইসলামী শরীয়ত চায় কোনো ঝগড়াঝাটি না করে প্রত্যেকে নিজের চাহিদা পূরণে সক্ষম হোক। বৈশিষ্ট্য আলোচনা না করে তা গোপন রাখলে সে উদ্দেশ্য পূরণ হবে না, ঝগড়া লেগে যাবে। তাই সকল মাযহাবের সকল আলেমের মত, ঝগড়া থেকে মুক্ত থেকে বিক্রয় যথাযথ ও সহীহ করার জন্যে প্রয়োজনীয় নানা বিষয়ে জ্ঞান থাকা আবশ্যক শর্ত।
উপরিউক্ত কথার ওপর ভিত্তি করে হানাফী আলেমগণ বলেন:
এক. কোনো জিনিস তার বাজারমূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করা জায়েয নয়। যদি কেউ এভাবে বিক্রি করে তবে তা ফাসেদ হবে, যেহেতু সে মূল্য নির্ধারণ করেছে বাজারদর। অথচ বাজারদর অনেক উঠানামা করে, একই সময়ে একজন বাজারদর যা বিবেচনা করে অন্যজন অন্যরূপ ধারণা করে। ফলে বাজারদর শব্দটি হয়ে গেল অজানা। মূল্য অজানা হলে বিক্রয় অবশ্যই ফাসেদ হবে।
দুই. যদি কেউ তার পণ্য বিক্রয়কালে বলে, সে যে মূল্যে তা খরিদ করেছে সে মূল্যে বা তাতে যত টাকা খরচ হয়েছে তা মূল্য ধরে বা তার যা পুঁজি ছিল বা আপনি যত টাকা মূল্য হওয়া পছন্দ করেন/ আপনার যা পছন্দ, বা অমুক যত দিয়ে কিনেছে তত টাকা মূল্যে বিক্রয় করছে তাহলে তা জায়েয হবে না। যেহেতু এভাবে মূল্য জানা ও স্থির করা হয় না। তবে যদি ক্রেতার জানা থাকে বিক্রেতা কত টাকা দিয়ে তা কিনেছে বা অমুক কত দিয়ে কিনেছে বা বিক্রেতার কত খরচ পড়েছে, এমনিভাবে ক্রেতার কত টাকা পছন্দ তা যদি বিক্রেতার জানা থাকে, তাহলে যেহেতু মূল্য জানা ও স্থির হবে, তাই এভাবে বলা হলেও বিক্রয় সহীহ ও জায়েয হবে। পূর্বে জানা না থাকলেও এখন যদি তাদের জানা হয় এবং তাতে তারা সম্মতি প্রকাশ করে তাহলেও বিক্রি জায়েয হবে, যেহেতু ঝগড়ার আর কোনো সম্ভাবনা থাকবে না।
তিন. যদি কেউ বলে বস্তুটির মূল্য এক হাজার দিরহাম থেকে এক দীনার কম বা এক দিরহাম বাদে একশ দীনার তাহলে বিক্রি জায়েয হবে না। যেহেতু যা বাদ দেওয়া হচ্ছে তা এক জাতীয় মুদ্রা না হওয়ায় প্রকৃত মূল্য সুস্পষ্ট হয়নি।
চার. যদি বিক্রেতা বলে, সবাই যে দামে বিক্রি করছে সে দামে বিক্রি করছি তাহলে বিক্রি জায়েয হবে না। তবে যদি বস্তুটি এমন হয় যা সকলে একই দামে বিক্রি করে তাহলে তাতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের দাম জানা থাকে বিধায় তা সহীহ হবে। যেমন: গরুর গোশত, পরোটা ইত্যাদি।
পাঁচ. যদি বিক্রেতা ক্রেতাকে বলে, আপনি বা অমুক যে মূল্য সাব্যস্ত করে দিবেন তা মূল্য ধরে বিক্রি করছি, তাহলে বিক্রি সঠিক হবে না। যেহেতু কত ফয়সালা করবে তা জানা নেই, ফলে ছামান এখনো অজানা রয়েছে।
হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন:
এক. যদি বিক্রেতা বলে, বাজারে সর্বোচ্চ যে দাম উঠেছে তা মূল্য ধরে বা অমুক যে দামে বিক্রি করেছে সে দামে বিক্রি করছি, যদি তারা দুজন বা দুজনের কোনো একজন সে দাম সম্পর্কে না জানে তাহলে বিক্রি যথাযথ ও জায়েয হবে না। যেহেতু মূল্য তাদের দুজন বা একজনের নিকট অজানা, তাই তাতে ঝগড়া লাগার খুবই আশঙ্কা থাকবে।
দুই. যদি বিক্রেতা বলে, সোনা ও রূপা মিলিয়ে বস্তুটির দাম এক হাজার দিরহাম, তাহলে তার কথা হলো যেমন, মূল্য একশ দিরহাম তবে তার কিছু অংশ রূপা না হয়ে সোনা হতে হবে। এ কথায় যেমন কতটুকু স্বর্ণ এবং কতটুকু রৌপ্য তা সুস্পষ্ট হয়নি, প্রথম কথাতেও স্বর্ণ ও রৌপ্যের পরিমাণ রয়েছে অনির্দিষ্ট তাই উভয় কথাতে পরিমাণ অজানা হেতু এগুলো ধোঁকা পূর্ণ বিক্রির আওতায় পড়বে। নবী ধোঁকাপূর্ণ বিক্রিতে নিষেধ করেছেন, এ আলোচিত রূপগুলো তাই নিষিদ্ধ হবে।
তিন. যদি বিক্রেতা বলে, জিনিসটির গায়ে যে নম্বর লেখা আছে বা যে দাম লেখা আছে তা-ই এর মূল্য, তাহলে যদি তা তাদের উভয়ের জানা থাকে তাহলে সে বিক্রি জায়েয হবে, নতুবা জায়েয হবে না। যদি তাদের উভয়ের বা কোনো একজনের দাম জানা হয় বিক্রি হওয়ার পর তাহলে সে বিক্রি সঠিক হবে না, ভেঙ্গে দিতে হবে। এটি হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেম ও ফকীহদের সম্মিলিত মত।
চার. বিক্রেতা অনেক সময় পণ্যের গায়ে মূল্য নির্দেশক নম্বর বা চিহ্ন দিয়ে রাখে যা ক্রেতার জানা ও বোঝার বাইরে থাকে। নম্বরের ওপর ভিত্তি করে বেচাকেনা করা হলে তা ফাসেদ হবে। কেননা তাতে মূল বিক্রিতে অজ্ঞতা থেকে যায়, বস্তুটির মূল্য ক্রেতার অজানা থাকে। নম্বর বিক্রেতার জানা অথবা তার পক্ষ থেকে প্রদত্ত, কিন্তু ক্রেতার সে সম্পর্কে কিছুই না জানা থাকার কারণে তা জুয়ার তুল্য হয়ে যায়। জুয়াতে যেমন নানা বিপর্যয় ঘটতে পারে এক্ষেত্রেও তেমনি বিপর্যয়ের ও ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে যথেষ্ট। যদি ক্রেতা কেনার সময় নম্বর দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে তা পরিষ্কারভাবে জানতে পারে এবং তাতে রাজি থাকে, তাহলে বিক্রি যথাযথ ভাবে সম্পন্ন হবে। যদি জানার আগে তারা ভিন্ন হয়ে যায় তাহলে সে বিক্রি ভেঙ্গে ফেলতে হবে।
ইমাম শামসুল আইম্মা হুলওয়ানি বলেন, যদি ক্রেতা সে বৈঠকে নম্বরের মর্ম বুঝতে পারে তবুও বিক্রি করা জায়েয হবে না। তবে যদি নম্বরের মর্ম বোঝার পর বিক্রেতা তাতে তার সার্বক্ষণিক সম্মতি এবং সে বৈঠকে ক্রেতা তার সম্মতি প্রকাশ করে, তাহলে মূল্য স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হওয়ার পর তাতে উভয়পক্ষের সম্মতি ও সন্তোষ প্রকাশিত হওয়ায় নতুনভাবে বিক্রি সম্পন্ন হবে।
ইবনে কুদামা তার আল-মুগনীতে লিখেছেন, ইমাম আহমদ বলেন, নম্বরের ওপর ভিত্তি করে বেচাকেনায় কোনো সমস্যা নেই। তাঁর এ কথার অর্থ : বিক্রেতা বলবে : بثمن এ কাপড়ের গায়ে যে দাম লেখা রয়েছে সে দামে আমি তোমার কাছে বিক্রি করছি। কাপড়ের গায়ে লিখে রাখা দাম উভয়েরই বিক্রি সম্পাদনকালে জানা থাকলে এ কথায় বিক্রি জায়েয হবে। সাধারণভাবে সকল ফকীহ একে আপত্তিহীন ভাবে অনুমোদন দিয়েছেন। কেবল তাউস এভাবে বিক্রি করা মাকরূহ বলে মতপ্রকাশ করেছেন।
তার আপত্তির জবাবে অন্য আলেমগণ বলেন, যেহেতু কাপড়ের গায়ে (এমনি ভাবে অন্য কোন বস্তুর গায়ে) দাম লেখা থাকে, তা ক্রেতা বিক্রেতা উভয়েই বিক্রয় সম্পাদনের পূর্বে দেখে তার নির্ধারিত মূল্য জানতে পারে। তাই এক্ষেত্রে বিক্রি জায়েয হবে, যেমন মুখে স্পষ্টভাবে মূল্য উচ্চারণ করলে সে বিক্রি সঠিক হয়। যদি বিক্রেতা বলে, আমি যত দিয়ে কিনেছি তত দিয়ে বিক্রি করছি, বিক্রেতা কত দিয়ে কিনেছে তা যদি ক্রেতার জানা থাকে তাহলে এ বিক্রয় সহীহ হয়। কেননা, বিক্রেতা সুস্পষ্টভাবে মূল্য না বললেও তা ক্রেতার জানা রয়েছে বিধায় এটি নিয়ে তাদের মাঝে ঝগড়ার কোনো আশঙ্কা থাকে না। তেমনিভাবে পণ্যের গায়ে যে দাম লেখা রয়েছে তা বিক্রেতার সাথে সাথে ক্রেতারও জানা রয়েছে বা বিক্রয় সম্পাদনকালে জানা হয়েছে। ফলে তা সুস্পষ্টভাবে দাম বলার তুল্য হবে এবং তাতে ঝগড়ার কোনো অবকাশ থাকবে না।
এ আলোচনায় একথা সুস্পষ্ট হলো, পণ্যের গায়ে দাম লেখা থাকলে সেখানে যে নম্বর লেখা থাকে, তা দেখে ক্রেতা কিছুই অনুধাবন করতে পারে না। সেক্ষেত্রে সে নম্বরের শুধু উল্লেখ করলে বিক্রি সঠিক হবে না। যেহেতু তাতে ক্রেতার মূল্য সুস্পষ্টভাবে জানা হয় না, ফলে ঝগড়ার অবকাশ থাকে। এভাবে একথাই সাব্যস্ত হলো, মূল্য জানা থাকা বা না থাকার ভিত্তিতে বিক্রি সহীহ হওয়া বা না হওয়া নির্ণীত হয়।
টিকাঃ
২১. রদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ১৫৩; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ১৪১; মাজাল্লা তুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ২৪৩ ও ২৪৪; আলী হায়দার কৃত দুরারুল হুককাম, খ. ১, পৃ. ১৯১; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ২৯৯; এবং খ. ৬, পৃ. ২১৮; আল-ইনায়া, খ. ৫, পৃ. ৮৩; আল-মুনতাকা শারহু মুওয়াত্তা, খ. ৪, পৃ. ২৬৮; হাশিয়া দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ১৫৫; আল-মুগনী ও আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ১৬৯ ও ১৭৫
২২. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২২৩-৩২২৫; আল-মুনতাকা শারহুল মুওয়াত্তা, খ. ৪, পৃ. ২৬৮; ইবনে কুদামা কৃত আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১৬৯; আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ১৭৫
২৩. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২২৪; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৩৬৮; আল-মুহায্যাব, খ. ১, পৃ. ২৬৬; আল-মাজমু, খ. ৯, পৃ. ৩৩২ মুদ্রণ মুনীরিয়্যা; ইবনে কুদামা কৃত আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১৬৯; আশ-শারহুল কাবীর, পৃ. ১৭৫; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ২৭০; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ১৮৭
২৪. সূরা বাকারা, আয়াত ৪১
২৫. সূরা ইউসুফ, আয়াত ২০
২৬. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২২৪; ইবনে কুদামা কৃত আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১৬৯; আশ-শারহুল কাবীর, পৃ. ১৭৫; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৬৬
২৭. মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ১৮৮; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ২৭১
২৮. রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫০৫; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ২৭৯; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ১৫৭; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ১৮; যুরকানী, খ. ৫, পৃ. ১৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৫; কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ১৬০
২৯. তিরমিযী। ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করার পর হাদীসটি হাসান পর্যায়ের বলে মত প্রকাশ করেছেন। দ্র. তুহফাতুল আহওয়াযী, খ. ৪, পৃ. ৪৩০ আল-মাকতাবা আস-সালাফিয়্যা, মদীনা
৩০. কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ১৫৭; মাতালিবু উলিন নুহা, ক. ৩, পৃ. ১৮
৩১. আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ২৭৯; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫০৫; দারদীর কৃত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ১০; যুরকানী, খ. ৫,প. ১৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১২; কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ১৫৮; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ১৬২; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ২৫
৩২. মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১১৫৩, প্রকাশক: হালাবী
৩৩. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১২; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১১
৩৪. কুর (کرر-ماده) হচ্ছে আরব দেশীয় পরিমাপ, গম যব ইত্যাদি এই পরিমাপে মেপে কেনাবেচা করা হতো। এর বহুবচন کرار আল-মিসবাহ আল-মুনীর নামক অভিধানগ্রন্থে লেখা হয়েছে, এক কুর (5) হচ্ছে ষাট কফীয (قفیز) প্রতি কফীয হচ্ছে আট مكوك প্রতি مكوك হচ্ছে ½ صاع সে হিসাবে এক کر হচ্ছে ৪৮০ مكوك বা ৭২০ صاع
৩৫. তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ৫; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ২৯৪; আদ-দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৩০; মাজাল্লা তুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ২৩৮ ও ২৩৯; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৮২
৩৬. ইবনে কুদামা কৃত আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ২২৭; আশ-শারহুল কাবীর, পৃ. ৩৫; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ১৭৩; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৩৮
৩৭. আল-মুহায্যাব, খ. ১, পৃ. ২৬৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৮
৩৮. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৮
৩৯. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৮; হাশিয়া দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ২২
৪০. আল-হিদায়া ও আল-ইনায়া, খ. ৫, পৃ. ৮৩; আদ-দুররুল মুখতার, খ. ৪, পৃ. ৫২৯ এবং খ. ৫, পৃ. ৫০৫; কানযুদ দাকায়েক ও তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ৪। সেই সাথে দ্রষ্টব্য: বাদায়েউস সানায়ে’, খ. ৬, পৃ. ৩০৫৩ (ان معرفة وصف ………. مالم يره); আল-মিনহাজ ও মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩৬; কালয়ুবী, খ. ২, পৃ. ১৫৭; ইবনে রুশদ কৃত আল মুকাদ্দামাত আল-মুমাহহাদাত, পৃ. ৫৫০; ইবনে রুশদ কৃত বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১৪৭; (পূর্ববর্তী ইবনে রুশদ ও এই ইবনে রুশদ এক ব্যক্তি নয়। বরং প্রথমোক্ত জন দাদা এবং পরবর্তী জন তার নাতি।) দারদীর কৃত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ১৫; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৬; ইবনে জুযাই কর্তৃক লিখিত আল-কাওয়ানীন, পৃ. ২৭২; ইবনে কুদামা কৃত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৩; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ১৭৩; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৩৮
৪১. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৮৩; বাদায়েউস সানায়ে’, খ. ৬, পৃ. ৩০৪১; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ২৯৬
৪২. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৩০৪১; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ২৯৬; ইবনে কুদামা রচিত শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৩; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ১৭৪; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৬; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৬৬; দারদীর কৃত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ১৫
৪৩. ‘বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৩০৪২; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ২৯৬; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫১৪ ও ৫৪১; মিনহাতুল খালেক আলাল বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ২৯৬; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৬৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৭; ইবনে কুদামা কৃত আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ২৬৬; আশ-শারহুল কাবীর, পৃ. ৩৩; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪০; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ১৭৪
৪৪. ইবনে কুদামা কৃত আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ২৯৪
📄 খাদ্যশস্যের স্তূপ এক কক্ষীয় এক দিরহাম দরে বিক্রি করা
এক কফীয (বা এমনি কোনো পরিমাপ-পরিমাণ) এক দিরহাম এভাবে মূল্য ধার্য করে শস্যের স্তূপ বিক্রি করার মাসআলায় ফকীহগণ বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হচ্ছে:
প্রথম মত: এক কফীয বিক্রি করাও জায়েয হবে না। এটি আব্দুল আযীয ইবনে আবি সালামা এবং কতক শাফেয়ী আলেমের অভিমত। তাদের দলিল: ঢিপি বা স্তূপে কী পরিমাণ শস্য রয়েছে, তার দাম কত হয়—কিছুই বেচাকেনা করার সময় ক্রেতা-বিক্রেতা কারোরই জানা নেই; জানা হবে সবগুলো মাপা শেষ হলে, তখন দামও ফয়সালা হবে। এভাবে বিক্রি সঠিক নয়।
দ্বিতীয় মত: এক কাফীয শস্য বিক্রি করা জায়েয হবে; এর অধিক নয়। তবে শুরুতেই যদি বিক্রেতা বলে দিতে পারে, এ স্তূপে কত কাফীয রয়েছে, তাহলে ঢিপির সব শস্য বিক্রি করা সহীহ ও জায়েয হবে। এটি ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মত। তাঁর দলিল : এ স্তূপে কত কাফীয শস্য আছে এবং সে হিসাবে পুরো স্তূপের মূল্য কত হয় তা কারো জানা নেই। অর্থাৎ পণ্য ও মূল্য উভয়টি অজানা, এ অবস্থায় উভয়ের মাঝে ঝগড়া হওয়ার আশঙ্কা কম নয়। ক্রেতা হয়তো বিক্রয়ের শুরুতেই পূর্ণ মূল্য হস্তগত করতে চাইবে, অথচ এখনো দুজনের কেউই জানে না, এ স্তূপের মোট মূল্য কত? তাই পুরো স্তূপের পরিমাণ যদি বিক্রেতা বলতে পারে সেক্ষেত্রে পুরো স্তূপের দাম কত হয় তা নির্ধারণ করা যাবে, তাতে কোনো বিতর্কের সূত্রপাত হবে না, তাই তা জায়েয হবে। যদি বিক্রেতা এখানে কত কাফীয রয়েছে তা বলতে না পারে, তাহলে সবটুকু বিক্রয়ের কথা বলে অজানা পণ্য ও অজানা মূল্য হওয়ার পর্যায়ে যাওয়া ঠিক হবে না। সেক্ষেত্রে কেবল এক কাফীয এক দিরহামে বিক্রি করা যাবে; যা এ স্তূপের সর্বনিম্ন স্তর, যেহেতু এটুকু উভয়ের জানা আছে। তবে যদি ঐ বৈঠকেই মোট কত কাফীয শস্য রয়েছে তা হিসাব করে বা পূর্বের হিসাব স্মরণ করে যেভাবেই হোক বলে দেয় তবে স্তূপের পুরোটা বিক্রি করা সহীহ হবে। এক্ষেত্রে বৈঠক অনেক দীর্ঘ হলেও ক্ষতি নেই, যেহেতু যত দীর্ঘই হোক তা এক বৈঠক বলেই গণ্য হবে এবং এক বৈঠকেই অজ্ঞতা দূর হয়ে গেলে তা ছিল বলে আর ধরা হবে না।
তৃতীয় মত: বিক্রির শুরুতে কত কাফীয শস্য রয়েছে তা জানা না থাকলেও স্তূপের পুরোটাই বিক্রি করা জায়েয হবে। হানাফী মাযহাবের ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ রহ. এবং মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ এবং শাফেয়ী মাযহাবের অধিকাংশ আলেম এই মত ব্যক্ত করেছেন।
তাদের দলিল: পণ্য সামনে উপস্থিত তা প্রত্যক্ষ করার দরুন তা আর আজানা নয়। মূল্যও জানা হয়ে যাবে এমন এক কাজের দ্বারা যা স্তূপের সবটুকুর পরিমাণই জানিয়ে দিবে, অথচ তাতে ক্রেতা বা বিক্রেতার কোনো ভূমিকা থাকবে না। তা হচ্ছে, স্তূপের পরিমাপ বা ওজন করা। এভাবে পণ্য ও মূল্য অবগতির মাঝে চলে আসায় সবটাই বিক্রি করা জায়েয হবে।
যদি বাহাত্তরজন লোক তাদের সম্মিলিত পুঁজি বিক্রি করে প্রত্যেকে তেরো দিরহাম করে, তাহলে এ মুহূর্তেই কত দিরহাম হলো তা বলা যাবে না। কিন্তু হিসাব করলেই তা বলা যাবে, তাতে খুব বিলম্ব হবে না। তেমনিভাবে স্তূপে কী পরিমাণ ফসল এবং তাতে মূল্য কত দিরহাম হয় তা হিসাব করলেই জানা যাবে, তাতে খুব বিলম্ব হবে না।
তারা এ সম্পর্কে অন্যভাবেও আলোচনা করে থাকেন। তা হলো, পণ্য তো প্রত্যক্ষ করার দ্বারাই জানা যাবে। মূল্যও জানা যাবে এভাবে, যতটুকু পণ্য মাপা হবে, ততটুকুতে মূল্যও সাব্যস্ত হতে থাকবে। যতটুকু মাপা হবে, ততটুকুতে ধোঁকার কোনো অবকাশ আর থাকবে না। ফলে স্তূপে কী পরিমাণ শস্য রয়েছে তা বিস্তারিতভাবে না জানার দ্বারা ধোঁকায় পড়ার সম্ভাবনা যা ছিল তা দূর হয়ে যাবে। এ সম্পর্কে মোটামুটি জানা থাকলেই বিক্রি সঠিক হয়ে যাবে, সেক্ষেত্রে বিস্তারিত জানা থাকলে তো সহীহ হবেই। এভাবে সাব্যস্ত হলো, শুরুতে স্তূপের মোট মূল্য কত তা জানা না থাকলেও তা ক্ষতির কারণ হবে না, যেহেতু পরবর্তী সময়ে তা বিস্তারিতভাবেই জানা যাচ্ছে, ধোঁকার সম্ভাবনাও আর থাকছে না। ফলে অনুমান করে নির্দিষ্ট কোনো মূল্য বলা হলে যেমন জায়েয হতো, এখনও তেমনি জায়েয হবে। শুরুতে যার অনুমান করা হলেও শেষে হবে নির্দিষ্ট মূল্য। তারা এ সম্পর্কে আরো বলেন, স্তূপের মূল্য সম্পর্কে অজ্ঞানতা দূর করার বিষয়টি ক্রেতা ও বিক্রেতার হাতেই। তারা মেপে মেপে সে অজ্ঞতা দূর করে দিতে পারে। অতএব, এ অজ্ঞানতা এখানে বিক্রি জায়েয হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধাই সৃষ্টি করবে না। এক্ষেত্রে দ্রষ্টব্য : بَيْعُ الْجُزَافَ
টিকাঃ
৪৫. আল-মুকাদ্দামাত আল-মুমাহহাদাত, পৃ. ৫৪১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৭
৪৬. আল-হিদায়া ও আল-ইনায়া, খ. ৫, পৃ. ৮৮; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ৫; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ৩০৭; আল-ইখতিয়ার, খ. ১, পৃ. ১৭৮; বাদায়েউস সানায়ে’. খ. ৬, পৃ. ৩০৪৩; ইবনে কুদামা কৃত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৪; যুরকানী, খ. ৫, পৃ. ২৩; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১৫৮
৪৭. হানাফী মাযহাবের পূর্বোক্ত গ্রন্থাবলি: আল-হিদায়া ও আল-ইনায়া, তাবয়ীনুল হাকায়েক, আল বাহরুর রায়েক, বাদায়েউস সানায়ে,’ আল-ইখতিয়ার, যুরকানী, খ. ৫, পৃ. ২৩; দারদীর প্রণীত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ.১৫; ইবনে কুদামা প্রণীত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৪; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১৫৮; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪২; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ১৭৪; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৬৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ১৭
৪৮. পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থ।
📄 মূল্যের বৈশিষ্ট্য জানা না থাকলে বিক্রয় সঠিক ও জায়েযই হবে না
হানাফী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি কেউ মুদ্রার পরিমাণ বা সংখ্যা বললেও তার বৈশিষ্ট্য উল্লেখ না করে, যেমন বলল, আমি এটি দশ দিরহাম দিয়ে কিনেছি, সে দশ সংখ্যা বললেও বলেনি, সে দিরহামগুলো কি বুখারী এলাকার, না সমরকন্দ এলাকার, তাহলে সে এলাকায় যে মুদ্রা অধিক প্রচলিত তা ধর্তব্য হবে। শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণও এ মতই প্রদান করেছেন।
তাদের দলিল: কুরআন হাদীসের মাধ্যমে কোনো বিষয় জানা গেলে তা যেমন কার্যকর হবে, সমাজের প্রচলন ও পরিভাষার মাধ্যমে কোনো বিষয় জানা হলে তা-ও তেমনই কার্যকর হবে; বিশেষত আর্থিক লেনদেন সঠিক করে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমাজে প্রচলিত অর্থ ও মর্ম অবশ্যই গ্রহণ করা হবে।
হানাফী মাযহাবের আলেমগণ এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে বলেন, যদি কোথাও বিভিন্ন মূল্যের মুদ্রা প্রচলিত থাকে, যেমন মিসরী দীনার ও মাগরেবী দীনার, এ দুটোর মাঝে মাগরেবীর তুলনায় মিসরীটি অধিক মূল্যের। অথচ সে এলাকায় হয়তো এ দু ধরনের দীনারই সমান প্রচলিত। সে অবস্থায় বিক্রেতা চাইবে মিসরী দীনার যা উচ্চমূল্যের সেটি দেওয়া হোক। আর ক্রেতা চাইবে মাগরেবী দীনার যা কমমূল্যের তা দিয়ে দাম পরিশোধ করবে। ফলে তাদের মধ্যে ঝগড়া লাগার প্রবল আশঙ্কা থাকবে। কোন্ দেশী মুদ্রা দেওয়া হবে তা সুস্পষ্ট না করায় যে অজ্ঞতা এখানে রয়েছে তা উভয়কে ঝগড়ায় লিপ্ত করবে। তাই এভাবে বিক্রি করা ফাসেদ হবে, বিক্রি ভেঙ্গে দিতে হবে। কিন্তু যদি বেচাকেনার আলাপচারিতার সময় কোনো একজন এটি পরিষ্কার করে বলে, এ লেনদেনে কোন্ দেশি দীনার দেওয়া হবে এবং অন্যজন তাতে সম্মতি প্রকাশ করে তাহলে আর বিষয়টিতে অজ্ঞতা থাকবে না, ফলে ঝগড়া লাগার আশঙ্কাও আর থাকবে না; যার ফলে বিক্রয় যথাযথ ও সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে। এক্ষেত্রে যা বিক্রিকে ফাসেদ করত তা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে বিদায় করে দেওয়া হবে।
যদি বিভিন্ন মুদ্রা বিভিন্ন মূল্যের হয়, কিন্তু সবগুলো সমানভাবে প্রচলিত না হয় তাহলে যেটি অধিক প্রচলিত সেটি ধর্তব্য হবে। এভাবে একটি মুদ্রা নির্দিষ্ট হওয়ার প্রেক্ষিতে বিক্রয় সহীহ হবে, ফাসেদ বা বিনষ্ট হবে না।
যদি বিভিন্ন মুদ্রা সমমূল্যের হয়, কিন্তু সবগুলো সমানভাবে প্রচলিত না হয় সেক্ষেত্রেও যেটি অধিক প্রচলিত সেটি ধার্য হবে, পূর্ববর্তী অবস্থায় যেরূপ অধিক প্রচলিতটি ধর্তব্য হয়েছে। যেহেতু কোন্ মুদ্রা ধর্তব্য হবে তা সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়েছে, সুতরাং বিক্রি সহীহ ও জায়েয হবে।
যদি বিভিন্ন মুদ্রা সমমূল্যের এবং এলাকায় সমান প্রচলিত হয়, তাহলে ক্রেতা তার পছন্দের মুদ্রা দিয়ে মূল্য পরিশোধ করতে পারবে। যেহেতু প্রচলনও সমান, মূল্যও সমান, যেমন মিসরী ও দামেশকী, তার যেটিই ক্রেতা দিতে চায় দিতে পারবে, যেহেতু তা নিয়ে তাদের মাঝে ঝগড়া হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
উপরিউক্ত মাসআলাগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করলে মোট চারটি রূপ প্রতিভাত হয়। কেননা, বিভিন্ন মুদ্রা হয়তো মুদ্রামান ও প্রচলন উভয়টিতে সমপর্যায়ের অথবা উভয়টিতে তারতম্য বিদ্যমান অথবা মুদ্রামানে সমান হলেও প্রচলনে তারতম্য রয়েছে অথবা তার বিপরীত প্রচলনে সমান হলেও মুদ্রামানে সমান নয়।
এ চারটি রূপের মাঝে একটিতে বিক্রি হবে ফাসেদ। তা হচ্ছে, বিভিন্ন মুদ্রা প্রচলনে সমান কিন্তু মুদ্রার মূল্যমানে সমান নয়। এ একটি ব্যতীত অপর তিনটি রূপে বিক্রয় সঠিক হয়ে যাবে। এই ফাসেদ রূপটি মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণও উল্লেখ করেছেন।
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ এ সম্পর্কে বলেন, যদি কোনো এলাকায় বিভিন্ন ধরনের মুদ্রা প্রচলিত থাকে, ক্রেতা কোন মুদ্রা দ্বারা মূল্য পরিশোধ করবে তা সুস্পষ্ট করে বলেনি, এ অবস্থায় যদি সকল মুদ্রা সমান প্রচলিত হয়, তাহলে ক্রেতা তার ইচ্ছামাফিক যে কোনো মুদ্রা দিয়ে মূল্য পরিশোধ করতে পারবে। যদি মুদ্রাগুলো সমভাবে প্রচলিত না হয়, তবে কোনোটি অধিক প্রচলিত থাকলে সেটি দিয়ে তাকে মূল্য প্রদান করতে হবে। যদি কোনোটিই অধিক প্রচলিত না হয় তাহলে বিক্রি ফাসেদ হিসাবে ভেঙ্গে যাবে।
শাফেয়ী মাযহাবের আলেম শারবীনী লিখেন: যদি কোনো শহরে দু ধরনের মুদ্রা প্রচলিত থাকে তন্মধ্যে একটি অপরটি থেকে অধিক প্রচলিত নয় অথবা একটি অপরটি থেকে অধিক প্রচলিত, মুদ্রাগুলোর মূল্যমানে তারতম্য রয়েছে, তাহলে সুস্পষ্ট শব্দ উচ্চারণ করে কোন্ মুদ্রা প্রদান করবে, ক্রেতাকে তা উল্লেখ করতে হবে: এটি বিক্রয় যথাযথ হওয়ার জন্যে শর্ত। যেহেতু মূল্যমান একরূপ নয় তাই বিষয়টি সুস্পষ্ট করা জরুরি।
হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের মতে, যদি বেচাকেনার সময় কেবল দীনার শব্দটি উচ্চারণ করা হয়, কোন্ দেশি দীনার তা না বলা হয়—অথচ সে শহরে বিভিন্ন দেশের দীনার প্রচলিত থাকে, সবগুলো সমান প্রচলিত কিন্তু মূল্য সমান নয়, তাহলে সে বিক্রয় সহীহ ও সঠিক হবে না।
টিকাঃ
৪৯. আল-হিদায়া ও আল-ইনায়া, খ. ৫, পৃ. ৮৪; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ৫; আল-ইখতিয়ার, খ. ১, পৃ. ১৭৮; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৩০৪২; যুরকানী, খ. ৫, পৃ. ২৪; আল-মিনহাজ ও মুগনিল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ১৭; ইবনে কুদামা কৃত আ- শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৩; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪০; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ১৭৪
৫০. আল-হিদায়া ও আল-ইনায়া, খ. ৫, পৃ. ৮৫; তাবয়ীনুল হাকারেক, খ. ৪, পৃ. ৫। মাগরেবী মুদ্রার তুলনায় মিসরী মুদ্রার উচ্চ মূল্য হওয়ার এ উদাহরণ প্রদান করেছেন ইনায়া-এর গ্রন্থকার বাবরতী (মৃ. ৭৮৬ হিঃ) তার যুগের ভিত্তিতে। ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৮৫; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৩৬ ও ৫৩৮; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৩০৪৩
৫১. আল-ইনায়া (আল-হিদায়া গ্রন্থের শরাহ) খ. ৫, পৃ. ৮৫; যুরকানী, খ. ৫, পৃ. ২৪; আল- মুকাদ্দামাত আল-মুমাহহাদাত, পৃ. ৫৫০; আল-মিনহাজ ও মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭; ইবনে কুদামা রচিত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৩; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ১৭৪; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪০
৫২. আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ১১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ১৭৪
📄 নগদ বা বাকীতে মূল্যপ্রদান
বিক্রি নগদ মূল্যে যেমন জায়েয, বাকীতেও জায়েয যদি সময় নির্ধারণ করে নেওয়া হয় এবং তা উভয়ের জানা থাকে।
এ সম্পর্কিত দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন: وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ “আল্লাহ তাআলা বিক্রি হালাল করেছেন।” এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বিক্রি শব্দটিকে কোনো শর্তযুক্ত না করে সাধারণভাবে বলেছেন। অতএব, নগদে বিক্রির ন্যায় বাকীতে বিক্রিও এর অন্তর্ভুক্ত হবে।
সেই সাথে এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আয়েশা রা. বলেন:
اشْتَرَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ يَهُودِي طَعَامًا إِلَى أَجَلٍ وَرَهَنَهُ دِرْعًا مِنْ حَدِيدٍ
“নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক ইয়াহুদী ব্যক্তির নিকট থেকে বাকীতে কিছু খাদ্যদ্রব্য কেনেন। তিনি তখন ঐ ইয়াহুদীর নিকট লোহার তৈরি এক যুদ্ধের পোশাক বন্ধক রেখেছিলেন।”
আস-সিরাজুল ওহহাজ গ্রন্থকার লিখেন : নগদ মূল্য প্রদান হচ্ছে বিক্রয় চুক্তির স্বাভাবিক চাহিদা ও ফল, বাকীতে বিক্রয় হবে শর্তসাপেক্ষে। (এখানে শর্ত হচ্ছে, মেয়াদ নির্ধারণ করা।) কেউ যদি নগদ হিসাবে বিক্রি করে, ক্রেতা এরপর বিলম্বের সময় নির্ধারণ করে, তবে বিক্রয় সহীহ ও জায়েয হবে। যেহেতু মূল্যগ্রহণ করা বিক্রেতার অধিকার—সে তা নগদ না নিয়ে পরে নিতে পারে।
উপরিউক্ত আলোচনা হানাফী মাযহাবের আলেমদের, মালেকী মাযহাবের আলেমগণও এরূপই বলেন : যদি নগদ মূল্য প্রদানের শর্তে বিক্রি করা হয়, এরপর ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ে বাকীতে বিক্রয়ে এবং পরবর্তী সময়ে মূল্য পরিশোধে সম্মত হয় তাহলে মুরাবাহা (লাভজনক) বিক্রিতে সময়ের উল্লেখ করা জরুরি। এভাবে তারা দুজনে যে সময়ে একমত হবে সে সময়েই তা আদায় করা জরুরি—এ বিষয়টি বুঝে আসে। তারা বলেন, চুক্তির পর যা যুক্ত হয় তা চুক্তিকালে সম্পাদিত শর্তের ন্যায়ই পালনীয় বলে ধর্তব্য হবে।
শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি খিয়ারে মজলিস বা খিয়ারে শর্তের মেয়াদের মাঝেই মূল্য পরে পরিশোধের আলোচনাও করা হয়, তাহলে তা মূল বিক্রয়চুক্তিতেই অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কিন্তু যদি বিক্রি সম্পন্ন হওয়ার পর মূল্য পরে পরিশোধের কথা বলা হয়, তবে তা মূল বিক্রিতে সংযুক্ত হবে না। তবে তার আবদার পূরণ করা মুস্তাহাব, যেমন ঋণ আদায়ের সময় হয়ে যাওয়ার পর তাতে সময়ের আবদার পূরণ করা মুস্তাহাব।
মূল্য পরিশোধে সময় নেওয়া হলে তা পরবর্তী কোন সময়, উভয়ের তা জানা থাকা কর্তব্য। দলীল: এক, না জানা ঝগড়ার সূত্রপাত ঘটায়। ক্রেতার দায়িত্ব পণ্য বুঝে পাওয়ার প্রেক্ষিতে মূল্য হস্তান্তর করা এবং বিক্রেতার কর্তব্য তা বুঝে নেওয়া। সময় নির্ধারিত না করা হলে বিক্রেতা হয়তো তাড়াতাড়িই তার মূল্য চাইবে আর ক্রেতা অনেক দেরি করবে। ফলে ঝগড়া লেগে যাবে সহসাই, যা শরীয়তে মোটেই কাম্য নয়।
দুই. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘সালাম’ বিক্রির ক্ষেত্রে বলেছেন,
مَنْ أَسْلَفَ فِي تَمْرٍ فَلْيُسْلِف فِي كَيْلٍ مَعْلُومٍ وَوَزْنِ مَعْلُومٍ إِلَى أَجَلٍ مَعْلُومٍ
“কেউ যদি কারো সাথে সালাম পদ্ধতিতে বেচাকেনা করে তবে তাতে যেন সময় নির্ধারণ করে পরিমাণ বা ওজন নির্ধারণ করে নেয়।”
এ হাদীসে নবী স. যে বিক্রিতে সময় নির্ধারণ করা বৈশিষ্ট্য, তাতেই সময় নির্ধারণ করতে বলেছেন। এর ওপর ভিত্তি করে ছামানেও সময় নির্ধারণের ফয়সালা করা হয়েছে।
তিন. এ সব কথাতেই ফকীহদের ইজমা (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
হানাফী মাযহাবের আলেমগণ সুস্পষ্ট ভাষায় এ কথা উল্লেখ করেছেন, যে বিক্রিতে মূল্য পরে পরিশোধের কথা আলোচিত হবে সে বিক্রি সহীহ ও সঠিক হওয়ার জন্যে পরবর্তী সময়টি নির্ধারিত হতে হবে এবং তা ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ের জানা থাকতে হবে। যদি বিষয়টি অজানা থাকে তাহলে বিক্রি ফাসেদ হয়ে যাবে।
টিকাঃ
৫৩. সূরা বাকারা, আয়াত ২৭৫
৫৪. বুখারীতে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৪৩৩ মুদ্রণ সালাফিয়্যা; মুসলিম, খ. ৩,প. ১২২৬; প্রকাশক: হালাবী। এখানে মুসলিম থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে।
৫৫. আল-হিদায়া ও ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৮৩-৮৪; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ৫; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২২৭; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ৩০১; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৩১; আল-ইখতিয়ার, খ. ১, পৃ. ১৮১
৫৬. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৫৭; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১২০; ইবনে কুদামা রচিত আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৪৯, মুদ্রণ: রিয়াদ; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ২৩৪, আলমুল কুতুব
৫৭. হাদীসটি বুখারীতে সংকলিত হয়েছে। ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৪২৯ প্রকাশক : সালাফিয়্যা; মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১২২৭ প্রকাশক : হালাবী। এখানে বর্ণনাটি মুসলিম এর বর্ণনাকারী সাহাবী হচ্ছেন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.।
৫৮. আল-হিদায়া, ফাতহুল কাদীর ও আল-ইনায়া, খ. ৫, পৃ. ৮৪; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ৫ (علة الانضاء الى المنازعة অধ্যায়); আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ৩০১; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৩১