📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা

📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা


ক. القيمة (আল-কীমাহ্): যথার্থ মূল্য
কোনো বস্তুর কীমাত হচ্ছে তার যথার্থ মূল্য, যা তার সঠিক মান নির্ধারক, সঠিক মূল্য থেকে অধিকও নয়, কমও নয়। এর বিপরীতে ছামান হচ্ছে বস্তুর যে দামে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে একমত হয়—তা কীমাত থেকে বেশিও হতে পারে, কম হওয়ার সম্ভাবনা ও তাতে বিদ্যমান।

এভাবে এ দুটির পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে যায়। কীমাত হচ্ছে কোনো বস্তুর যথার্থ সমান মূল্য; আর ছামান হচ্ছে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সম্মতিতে স্থিরীকৃত মূল্য, যা কীমাত বরাবর হতে পারে, তা থেকে বেশিও হতে পারে, কমও হতে পারে। যথার্থ সমতুল মূল্য (ثَمَنُ الْمَثْل) সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য : القيمة

খ. السفر (আস-সি‘র): পণ্যের নির্ধারিত মূল্য
তাই সি’র ও ছামান এ দুটোতে পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে যায়। তা হচ্ছে, সি’র হলো বিক্রেতা কর্তৃক পণ্যের নির্ধারিত মূল্য এবং ছামান হচ্ছে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে যে দামে একমত হয়েছে, তা বিক্রেতার নির্ধারিত মূল্য হতে কম হতে পারে, নাও হতে পারে।

টিকাঃ
৩. আল-মুগরিব, مادة ثمن-; আল-মাজাল্লা, ধারা ১৫৩; রাদ্দুল মুহতার, ২য় মুদ্রণ, মিসর, ১৯৬৬ ঈ, খ. ৪, পৃ. ৫৭৫
৪. সুয়ূতীকৃত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৪০
৫. আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ২; আয-যুরকানী, খ. ৫, পৃ. ৩; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ১৪৬; রুহায়বানী কৃত মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ছামান বিক্রয়চুক্তির অন্যতম মৌলিক অংশ

📄 ছামান বিক্রয়চুক্তির অন্যতম মৌলিক অংশ


মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ এ কথায় একমত, বিক্রীত পণ্য এবং তার মূল্য (الثمن والمبيع)—চুক্তিতে আলোচিত এ উভয়টি বিক্রয়চুক্তির মৌলিক দু অংশ। হানাফী মাযহাবের আলেমগণ শুধু প্রস্তাব (ইজাব) ও কবুল—এ দুটি বাক্যকে বিক্রয়ের মৌলিক অঙ্গ বলে অভিহিত করেন। তাদের দৃষ্টিতে ছামান বা মূল্য হচ্ছে বিক্রয়চুক্তির ক্ষেত্র-এর একটি অংশ। বিক্রয়চুক্তির ক্ষেত্রে দুটি অংশ রয়েছে: এক. বিক্রীত পণ্য ও দুই. মূল্য। তারা বলেন, বিক্রয়চুক্তির ক্ষেত্র চুক্তির মৌলিক অংশের অন্তর্ভুক্ত নয়।

হানাফী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি ক্রেতা তার পণ্য এবং বিক্রেতা সে পণ্যের মূল্য বুঝে পাওয়ার পর তারা বিক্রিটি বাতিল করে দেয়, তাহলে ক্রেতা সে পর্যন্ত পণ্যটি নিজ আওতায় ধরে রাখতে পারবে, যে পর্যন্ত বিক্রেতা তার বিনিময়ে নেওয়া মূল্য ফেরত না দিবে। মূল্য নগদ টাকা পয়সা হোক বা কোনো সম্পদ-সামগ্রী হোক, উভয়ে সাব্যস্তকৃত মূল্য হোক বা বাজারের স্বাভাবিক মূল্য হোক। ক্রেতা পণ্যটি আটকে রাখতে পারবে এ কারণে যে, সে মূল্য বাবদ যা প্রদান করেছিল পণ্যটি তার বিনিময়ে তার হাতে এসেছে। বন্ধক গ্রহণ করার ক্ষেত্রে যেমন, ঋণের টাকা প্রদান করার বিনিময়ে কোনো বস্তু তার হাতে এসেছে। ঋণের টাকা ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত সে বন্ধকের জিনিসটি আটকে রাখতে পারবে, তেমনি মূল্য বাবদ প্রদত্ত টাকা ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত সে পণ্যটি আটকে রাখতে পারবে।

যদি ক্রেতা-বিক্রেতা পরস্পর সম্মতিতে বিক্রয় বাতিল করার পর টাকা ফেরত দেওয়ার পূর্বে বিক্রেতা মারা যায়, তাহলে ক্রেতা সে অবস্থায় পণ্যটি অবশ্যই আটকে রাখবে। কেননা, বিক্রেতা বেঁচে থাকাকালেই সে মূল্য ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত পণ্য ধরে রাখার অধিকারী ছিল, তখনই বিক্রেতার ক্রেতাকে টাকা ফেরত দেওয়া ছিল প্রাধান্য পাওয়ার উপযোগী। এখন মারা যাওয়ার পর এ ঋণতুল্য মূল্য ফেরত হতে হবে সব কিছুর আগে। সে লক্ষ্যে ক্রেতা তার পণ্য ধরে রাখবে।

টিকাঃ
৬. আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ২৭৮; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫০৪
৭. যায়লায়ী কৃত তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ৬৫; হিদায়া-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ আল-ইনায়া ও ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৩৪, প্রকাশক: মুস্তাফা মুহাম্মদ, মিসর, ১৩৫৬ হি.

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ছামানের সাথে সম্পর্কিত শর্তাবলি

📄 ছামানের সাথে সম্পর্কিত শর্তাবলি


সকল ফকীহ এ কথায় একমত, বিক্রয়চুক্তিতে মূল্য উল্লেখ করা জরুরি এবং তা অবশ্যই সম্পদ শ্রেণীভুক্ত হতে হবে। তা ক্রেতার মালিকানাধীন হবে, বিক্রেতাকে বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভবপর হতে হবে, এবং তার পরিমাণ ও অপর কোনো বৈশিষ্ট্য থাকলে সেসব উভয়পক্ষের জানা থাকতে হবে।
পরবর্তী আলোচনায় এ কথাগুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে:

প্রথম শর্ত: ছামান উল্লেখ করা
বেচাকেনার সময় ছামান উল্লেখ করা অত্যাবশ্যক। যদি মূল্য আলোচনা না করে বিক্রেতা কোনো কিছু বিক্রয় করে তবে তা হবে ফাসেদ-ত্রুটিপূর্ণ। কেননা, মূল্য প্রদান না করার শর্ত করে বিক্রি করলে তা হয় বাতিল। যেহেতু সেক্ষেত্রে কোনো বিনিময় প্রদান করা হয় না, আর মূল্য আলোচনা না করে বিক্রি করলে তা হবে ফাসেদ-ত্রুটিপূর্ণ। এটিই হানাফী মাযহাবের আলেমদের অভিমত।

অতএব, যদি কোনো মাল বিক্রি হয়, তাতে মূল্য সত্যিকারভাবেই উল্লেখ না করা হয় যেমন, বিক্রিকালে বিক্রেতা ক্রেতাকে বলল, আমি এটি তোমার নিকট বিক্রি করছি বিনামূল্যে, কোনো বিনিময় ব্যতীত, ক্রেতা তার জবাবে যদিও বলে, আমি তা কবুল করলাম, তবুও বিক্রি বাতিল বলে গণ্য হবে।

যদি মাল বিক্রয়কালে মূল্য বাহ্যিকভাবে বলা হলেও কার্যত তা অনুল্লেখ থাকে, যেমন বিক্রেতা বিক্রয়কালে বলল, এ জিনিসটি আমি তোমার নিকট ঐ এক হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করছি, যে হাজার টাকা তুমি আমার কাছে পাবে। ক্রেতাও তার এ কথায় সম্মতি প্রকাশ করল। অথচ তারা দুজনেই জানে যে, বিক্রেতার নিকট ক্রেতার ঋণ বা অন্য কোনো বাবদে কোনো পাওনা নেই। তাহলে এভাবে সম্পাদিত বিক্রয়ও বাতিল বলে গণ্য হবে। এটি এবং এর পূর্ববর্তীটি এ উভয় অবস্থায় বিক্রি বাতিল হয়ে বস্তুটি ক্রেতাকে দান ও অনুদান করা হবে।

যদি বেচাকেনার সময় দামের কোনো আলোচনা না করা হয়, তাহলে এ বেচাকেনাটা হবে ফাসেদ, বাতিল হয়ে যাবে না। ফাসেদ বা ত্রুটিযুক্ত হওয়ার কারণ, কোনো কিছু বিক্রয় করাই হয় তার বিনিময়ে মূল্য হস্তগত করার জন্যে। তাই বিক্রেতা তার জিনিসটি বিক্রি করার সময় তার মূল্য কত তা নিয়ে কোনো আলোচনা না করলেও বিক্রি করার দ্বারা সে একথাই বুঝিয়েছে, আমি এটি তার যে দাম রয়েছে সে দামে বিক্রি করছি। এভাবে মূল্য মোটামুটিভাবে বলা হলেও তা অনির্দিষ্ট রয়েছে, তাই বিক্রিটা হবে ফাসেদ বা ত্রুটিযুক্ত।

যে সকল জিনিসে পরিমাণ ও মূল্য লেখা থাকে সেসব কেনাবেচায় মূল্য আলোচনা করা হয় না। তথাপি তা যথাযথ ও সঠিক বলে গণ্য হয়, যেহেতু বস্তুর পরিমাণ ও মূল্য উভয়ই ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জানা রয়েছে, তাতে তাদের সম্মতিও বিদ্যমান, যদিও তাতে বৈশিষ্ট্য না পাওয়া যায় তথাপি এই মূল্যে এই পরিমাণ ক্রয়বিক্রয় সঠিক হবে।

মালেকী ও শাফেয়ী মাযহাবের আলেমদের মতে, ছামান বা মূল্যের উল্লেখ না করা হলে বিক্রয় যথার্থ হবে না। ইবনে রুশদ তার মুকাদ্দামাত নামক গ্রন্থে বিবাহের মহর প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, মহর হচ্ছে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক অনুদান ও উপহার—যা তিনি স্ত্রীদের দেওয়ার জন্যে স্বামীদের প্রতি ফরজ করেছেন। এটি কোনো কিছুর বিনিময় হিসাবে প্রদান করা হয় না। তাই বিবাহবন্ধন-কালে এর উল্লেখ জরুরি নয়। যদি তা না হয়ে মহর হতো স্ত্রী-অঙ্গের বাস্তবিক মূল্য, তাহলে তা উল্লেখ না করা হলে বিবাহ শুদ্ধ হতো না, যেমন মূল্য উল্লেখ না করা হলে বিক্রয়চুক্তি বিশুদ্ধ হয় না।

নবভী রহ. তার ‘আল-মাজমু’ গ্রন্থে বলেন: বিক্রয় যথাযথ ও সঠিক হওয়ার জন্যে শর্ত হচ্ছে, বিক্রয়কালে পণ্যের মূল্য উল্লেখ করা। বিক্রেতা ক্রেতাকে বলবে, আমি তোমার নিকট এ জিনিসটি এই মূল্যে বিক্রয় করছি, তাহলে বিক্রি সঠিক হবে। তা না বলে যদি শুধু বলে, আমি তোমার নিকট এটি বিক্রি করছি, এর অধিক কিছু না বলে, আর তার এটুকু কথার জবাবেই ক্রেতা বলে, আমি তা কিনলাম বা তোমার কথা কবুল করে নিলাম, তাহলে এটি বিক্রয় বলে গণ্য হবে না। এ কথায় সকলে একমত, কারো বিরোধ নেই। এভাবে যে কবুল করবে সে বস্তুটির মালিক হবে না—এটি ফকীহদের নির্ভরযোগ্য মত এবং অধিকাংশ ফকীহ এই মতই ব্যক্ত করেছেন। অবশ্য অন্য এক মত হচ্ছে, এ ধরনের চুক্তি নিয়ে দুটি মত রয়েছে। একটি তো তা, যা মাত্রই উল্লেখ করা হলো। অপর মতে বিক্রয় যথাযথ না হওয়ায় এটি দান ও অনুদান বলে গণ্য হবে।

আল্লামা সুয়ূতী বলেন, বিক্রেতা যদি বলে আমি তোমার নিকট এটি বিক্রি করছি মূল্য ছাড়া, কিংবা বলল: আমার তোমার নিকট এজন্যে কোনো ছামানের দাবি নেই। ক্রেতা জবাবে বলল, আমি কিনলাম, তা বলে সে জিনিসটি কজা করল, তাহলে এটি বিক্রয় বলে গণ্য হবে না। এটি দান বা উপহার বলে গণ্য হবে কি-না? তা নিয়ে দুটো মত বর্ণিত হয়েছে। শব্দের দিকে লক্ষ্য করে এক মত, অর্থের দিকে লক্ষ্য করে অপর মত ব্যক্ত করা হয়েছে। ফলে এ দুটো মত পরস্পর বিপরীত হয়ে গেছে। বিক্রেতা যখন বলবে, আমি এ জিনিসটি তোমার নিকট বিক্রি করছি, যদি সে এ সময় মূল্য না বলে তাহলে অর্থের দিকে লক্ষ্য করে আমরা বলব, এভাবে দান ও বখশিশ সম্পন্ন হয়েছে। যদি শব্দের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে তা হবে ফাসেদ বিক্রয় যার সংশোধন করা কর্তব্য।

হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের এ সম্পর্কিত মত ‘আল-ইনসাফ’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে: বিশুদ্ধ মতে বিক্রয় সম্পন্নকালে মূল্য জানা থাকা শর্ত, আলেমগণ এ মতটিকেই সমর্থন জানিয়েছেন। অবশ্য শায়খ ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, মূল্য উল্লেখ না করা হলেও বিক্রয় যথাযথ হবে। সেক্ষেত্রে বাজারে যে মূল্য প্রচলিত (تَمَنُ الْثل) রয়েছে তার ভিত্তিতে পণ্যের মূল্য সাব্যস্ত হবে। যেমন: বিবাহে মহর উল্লেখ না করলেও বিবাহ সম্পন্ন হবে এবং যে পরিমাণ মহর কনের বংশে প্রচলিত রয়েছে তার ভিত্তিতে এ বিয়েতে মহর সাব্যস্ত হবে।

দ্বিতীয় শর্ত: ছামান যে কোনো মাল হওয়া
হানাফী মাযহাবের আলেমদের মতে, বিক্রয়চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার জন্যে শর্ত হচ্ছে, ছামান বা পণ্যের মূল্য বাবদ যা প্রদান করা হবে তা মূল্যহীন কোনো বস্তু হতে পারবে না; মূল্য রয়েছে এমন বস্তু হতে হবে। যেহেতু বিক্রির সংজ্ঞাই হচ্ছে, মূল্যমানসম্পন্ন এক বস্তুর বিপরীতে অপর বস্তু উভয়পক্ষের সম্মতিতে অদলবদল করা। তাই বিক্রীত পণ্যের যেমন মূল্য থাকবে, ছামান হিসাবে যা দেওয়া হবে তারও মূল্য থাকবে।

আরবী ভাষায় বায় (بيع) (বিক্রয়)-এর সংজ্ঞা প্রদানকালে বলা হয়েছে, মালের পরিবর্তে মালের আদানপ্রদান। মাল হচ্ছে এমন বস্তু যার প্রতি স্বাভাবিকভাবে সকলের ঝোঁক ও আসক্তি রয়েছে এবং মানুষ যা প্রয়োজনের ও অভাবের সময় বিবেচনা করে সঞ্চয় করে রাখে। সেই সাথে কোনো বস্তু মাল হওয়া তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন তাতে সকল বা কতক লোক মূল্য ধার্য করে এবং তা মূল্যবান মনে করে।

কোনো বস্তু মূল্যধারী হওয়ার বিষয়টি সাব্যস্ত হয় দু’ভাবে: এক. তাতে মূল্য ধার্য করা এবং দুই. তাছাড়া শরীয়তসম্মত পন্থায় লাভবান ও উপকৃত হওয়ার বৈধতা। এ দুটো বিষয় একই সাথে পাওয়া যাওয়া শর্ত। তাই যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় সত্য, কিন্তু তার মূল্য ধার্য হয় না, তা প্রকৃতপক্ষে মাল নয়। যেমন গমের একটি দুটি দানা। যা মানুষের দৃষ্টিতে মূল্যধারী হলেও তা দ্বারা উপকৃত হওয়া বৈধ নয়, তাও মূল্যধারী মাল বলে বিবেচিত হবে না। যেমন: মদ। যদি দুটি বিষয়ই অনুপস্থিত থাকে তাহলে তাতে মালের দুটি বৈশিষ্ট্যের কোনটিই প্রতিষ্ঠিত হবে না। যেমন রক্ত। এটি মানুষের মাঝে মাল বলে গণ্য নয়, মানুষ এর দ্বারা লাভবান হবে বলে সঞ্চয়ও করে রাখে না।

উপরিউক্ত আলোচনায় সাব্যস্ত হলো, মূল্যধারী বস্তুর তুলনায় মাল বা সম্পদ হচ্ছে ব্যাপক। কেননা, মূল্যধারী বস্তু ও সম্পদ উভয়টি সঞ্চিত করার উপযোগী হলেও তন্মধ্যে যা মূল্যধারী তা বৈধ হওয়া আবশ্যক, কিন্তু যা সম্পদ তা বৈধ না হয়ে অবৈধও হতে পারে। যেমন মদ। এটি কতক লোকের নিকট মাল হলেও তা মূল্যধারী নয়, যেহেতু এটি অবৈধ। তাই এটিকে ছামান বা মূল্য নির্ধারণ করা হলে বিক্রি ফাসেদ বলে গণ্য হবে। আর যদি এটিকে পণ্য নির্ধারণ করা হয় তাহলে বিক্রি হবে বাতিল।

যা মাল হলেও মূল্যধারী নয় তা ছামান বা মূল্য হিসাবে প্রদান করা হলে বিক্রি ফাসেদ, অথচ এ জিনিসটি পণ্য হলে বিক্রি বাতিল, এ পার্থক্য এজন্যে যে, বিক্রয়চুক্তিতে পণ্যটা হয় মূল উদ্দিষ্ট বস্তু, মূল্যটা মূল উদ্দিষ্ট না হয়ে হয় তার মাধ্যম। পণ্য দ্বারা উপকৃত হওয়ার আলোচনা করা হয়, মূল্য দ্বারা নয়। তাই পণ্য অস্তিত্বে থাকা বিক্রয় সম্পন্ন হওয়ার জন্যে শর্ত, কিন্তু ছামান বা মূল্য বিক্রয়কালে মজুদ থাকা শর্ত নয়। এভাবে আলোচনা করে যা সাব্যস্ত হয় তা হলো, পণ্য হচ্ছে মূল উদ্দিষ্ট বস্তু এবং মূল্য হচ্ছে তাতে অন্যতম শর্ত যা উপকরণতুল্য।

এদিকে লক্ষ্য করেই আল-বাহরুর রায়েক-এর গ্রন্থকার বলেছেন, যদিও বিক্রয়চুক্তির মূল ভিত্তি হচ্ছে বিনিময়; কিন্তু এ দুটোর মাঝে পণ্যই হচ্ছে মূল; মূল্য নয়। তাই পণ্যটি বিক্রেতার মালিকানায় ও কজায় থাকা শর্ত, কিন্তু ছামান ক্রেতার মালিকানায় থাকা বা কজায় থাকা শর্ত নয়। এমনিভাবে আরো একটি ক্ষেত্রে পার্থক্য হয়েছে। তা হলো, পণ্যটি ক্রেতা বুঝে পাওয়ার আগে ধ্বংস হলে বিক্রিচুক্তি বাতিল হয়ে যায়, বিক্রি ভেঙ্গে যায়। কিন্তু ছামান ধ্বংস হলে তাতে বিক্রির কোনো ক্ষতি হয় না।

মূল্যধারী হওয়া ছামান বা মূল্যের সঠিকতার শর্ত, আর পণ্যের বেলায় তা বিক্রি সম্পন্ন হওয়ার শর্ত। মালেকী ও শাফেয়ী মাযহাবের আলেমগণ একমত হয়ে বলেন, ছামান যথাযথ হওয়ার জন্যে শর্ত হচ্ছে: মূল পণ্যটি হতে হবে পবিত্র বস্তু। অতএব, যা মৌলিকভাবে নাপাক তার বিনিময়ে ছামান গ্রহণ যথাযথ হবে না। যেমন: মৃত জন্তুর চামড়া বা মদ ইত্যাদি। এক্ষেত্রে দলিল হচ্ছে:
এক. বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হাদীস:
أَنَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ ثَمَنِ الْكَلْبِ
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুরের মূল্য গ্রহণে নিষেধ করেছেন।”
দুই. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ حَرَّمَ بَيْعَ الْخَمْرِ وَالْمَيْتَةِ وَالْخِنْزِيرِ وَالْأَصْنَامِ
“আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলুল্লাহ স. মদ, মৃতজন্তু, শূকর ও প্রতিমা বিক্রি হারাম করেছেন।”

মালেকী ও শাফেয়ী মাযহাবের আলেমগণ উপরিউক্ত হাদীসগুলোতে কিয়াস করে তাতে কতক দিক চিহ্নিত করেছেন। তারা বলেন, এ চিহ্নিত বিষয়গুলো অন্য যে সকল স্থানে পাওয়া যাবে সেখানেও নাজায়েয ও হারাম হওয়াই সাব্যস্ত হবে। তারা বলেন: এ হাদীসগুলোর আলোকে বোঝা যায়, যদি কোনো কিছু নাপাক হওয়ার পর তা আর পাক করা সম্ভবপর না হয়, যেমন: নাপাক হয়ে যাওয়া দুধ বা তরল ঘি, তাহলে এটি মদের ন্যায় বিক্রি করা হারাম হবে। এমনিভাবে যদি কোনো বস্তু দ্বারা শরীয়তসম্মত পন্থায় লাভবান হওয়া না যায়, তা বর্তমানে না হয়ে ভবিষ্যতেই হোক, তা বিক্রি করে ছামান বা মূল্য নেওয়া যথাযথ হবে না। যেমন: ছোট হিংস্র প্রাণী, এটি কুকুর বিক্রির ন্যায় নিষিদ্ধ হবে। সুতরাং যার দ্বারা কারো কোনো উপকার হয় না তাও বিক্রি করা জায়েয হবে না। কীটপতঙ্গ বিক্রি করার ন্যায় যা উপকারী নয় তা কোনো মাল বলে গণ্য হবে না, আর তাই কীটপতঙ্গ বিক্রি করা জায়েয হবে না।

হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন: বিক্রয়চুক্তিতে অন্যতম শর্ত হচ্ছে, ছামান বা মূল্যটি শরীয়ত স্বীকৃত মাল হতে হবে। তারা বলেন, শরীয়তসম্মত মাল হচ্ছে, যার উপকারপ্রাপ্তি শর্তহীনভাবে জায়েয এবং প্রয়োজন ছাড়াও যা সঞ্চয় করে রাখা বৈধ। তাদের এই সংজ্ঞা বর্ণনার দরুন যে সবের কোন উপকার পাওয়া যায় না সেগুলো মাল বলে গণ্য হবে না। যেমন: ক্ষুদ্র কতক কীটপতঙ্গ। যেগুলোর উপকারপ্রাপ্তি জায়েয নয় সেগুলোও মাল বলে ধর্তব্য হবে না। যেমন: মদ। চাহিদার প্রেক্ষিতে যার উপকারগ্রহণ জায়েয করা হয়েছে তাও মালের অন্তর্ভুক্ত হবে না। যেমন, কুকুর। অপারক অবস্থায় যার উপকার গ্রহণে অনুমতি দেওয়া হয়েছে তাও মালের আওতায় আসবে না। যেমন : চরম অভাবে ও প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে মৃতজন্তু খাওয়া, গলায় আটকে যাওয়া খাবার গলা থেকে নামাতে মদপান করা।

টিকাঃ
৮. মাজাল্লা তুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা ২৩৭; এবং তার মুনীর কাজী কর্তৃক বিশ্লেষণ, খ. ১, পৃ. ২৭৬; মিনহাতুল খালেক, আল-বাহরুর রায়েক-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ, খ. ৫, পৃ. ২৯৬
৯. দুরারুল হুককাম, শরহে মাজাল্লা তিল আহকাম, আলী হায়দার, খ. ১, পৃ. ১৮৫
১০. আল-মুকাদ্দামাত আল-মুমাহহাদাত, খ. ২, পৃ. ৩০; আল-মাজমু’, খ. ৯, পৃ. ১৫৮; তাহকীকুল মুতীঈ ও আল-আশবাহ লিস সুয়ূতী, পৃ. ১৮৪; আল-ইনসাফ, খ. ৪, পৃ. ৩০৯; আল-ইখতিয়ারাতুল ফিকহিয়্যা, পৃ. ১২২
১১. আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ২৭৭
১২. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫০১; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৫, পৃ. ২৭৮।
১৩. আবু দাউদ, খ. ৩, পৃ. ৭৫৪; ইযযাত উবাইদ-এর তাহকীক। হাদীসটির বর্ণনাকারী সাহাবী জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা.। মূল হাদীসটি মূলত মুসলিম বর্ণিত হয়েছে, খ. ৩, পৃ. ১১৯৯, প্রকাশক: হালাবী
১৪. বুখারীর বর্ণনা, ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৪২৪ মুদ্রণ সালাফিয়্যা। এ হাদীসটির বর্ণনাকারীও জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা.।
১৫. দারদীর কৃত আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ১০; শারহুয যুরকানী, খ. ৫, পৃ. ১৬; আল- মিনহাজ ও মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১১; কাশশাফুল কিনা’, খ. ৩, পৃ. ১৫২; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ১২

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ছামান হওয়া হিসেবে মাল বা সম্পদের শ্রেণিবিভাগ

📄 ছামান হওয়া হিসেবে মাল বা সম্পদের শ্রেণিবিভাগ


হানাফী মাযহাবের আলেমগণ সম্পদের চারটি প্রকার করেছেন:
এক. সর্বাবস্থায় তা ছামান বা মূল্য থাকে। এটি হচ্ছে স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রা। ছামানের পূর্বে আসা স্বাভাবিক নিয়ম হলেও এক্ষেত্রে আনা হোক বা না আনা হোক, এগুলো মূল্যই বুঝাবে। সমজাতীয় মুদ্রা পণ্য হতে পারে, অন্য কোনো কিছুও পণ্য হতে পারে; সব ধরনের পণ্যেই এগুলো হবে ছামান বা মূল্য। যেহেতু আরববাসীর দৃষ্টিতে এগুলো নির্দিষ্ট না হয়ে হয় দায়িত্বে পাওনা। এ কথাগুলো বলেছেন বিশিষ্ট আরবী বৈয়াকরণ ফাররা। ফাররার কথা যথার্থ। এ সব মুদ্রা বিক্রয়চুক্তিতে দায়িত্বে পাওনা হিসাবেই আলোচিত হয়ে থাকে, তাই এগুলো সর্বাবস্থায় ছামানই হবে।

দুই. সর্বাবস্থায় ব্যবসায়িক পণ্য হয়। যেমন: জীবজন্তু এবং এ ধরনের আরো সে সব বস্তু যেগুলো মিছলী নয়। যেগুলোর প্রত্যেকটির ভিন্ন ভিন্ন মূল্য হয়ে থাকে। যেহেতু এগুলো নানা ধরনের বস্তু বা প্রাণী, তাই এগুলো সর্বদা পণ্য হয়ে থাকে, কখনো ছামান বা মূল্য বলে বিবেচিত হয় না।

তিন. এক হিসেবে ছামান অপর বিবেচনায় পণ্য। স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রা ব্যতীত কোনো মিছলী বস্তুর বিপরীতে অপর মিছলী বস্তু বিনিময় করা হলে এ উভয় দিক বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হয়। যেমন: ধানের বদলে ডিম। যেহেতু অন্য সকল ব্যবসায়িক পণ্যের ন্যায় এগুলোও বস্তু এবং এগুলোর দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়, তাই এগুলোকে যেমন পণ্য বিবেচনা করা যথার্থ, তেমনি মিছলী হওয়ার দরুন এগুলো নির্ধারণ করলেও নির্ধারিত হয় না, একটি দেখিয়ে অন্যটি আদায় করা যায়, তাই এগুলো ছামান-এর সাথে তুল্য। তাই বাক্যে ব্যবহারকালে কোনো একটিকে নির্দিষ্ট করা হলে তা হবে পণ্য। নির্দিষ্ট না করা হলে, পণ্যের বিপরীতে ধার হলে এবং তার পূর্বে অব্যয় আনা হলে তা হবে ছামান বা মূল্য। তাই ব্যতীত শব্দটি হবে পণ্য, যুক্তটি হবে ছামান।
যেহেতু মিছলী বস্তু কখনো বিক্রয়চুক্তিতে মূল বস্তু হয়, কখনো তা নিছক দায়িত্বে অর্পিত হয়। তাই কখনো তার পূর্বে আনা হবে না পণ্য বিবেচনা করে, কখনো আনা হবে ছামান বা মূল্য বিবেচনা করে।

চার. প্রচলিত মুদ্রা, টাকা-পয়সা ইত্যাদি। যদি মুদ্রা প্রচলিত থাকে তাহলে তা অবশ্যই ছামান ও মূল্য বলে গণ্য হবে। কিন্তু যদি সে মুদ্রা প্রচলিত না হয় তা হলে তা ছামান না হয়ে হবে পণ্য।

হাসকাফী ও ইবনে আবিদীন উপরিউক্ত আলোচনা থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে যে মন্তব্য সংকলন করেছেন, তা হচ্ছে: মিছলী বস্তু ছামান বলে ধার্য হবে—যদি তার পূর্বে আসে, তার বিপরীতে দিরহাম-দীনার ইত্যাদি ছামান হিসাবে উল্লেখ না করা হয়, সে মিছলী বস্তুটি নির্দিষ্ট করা হোক বা না হোক। এমনিভাবে যদি মিছলী বস্তুর পূর্বে না আসে, তা নির্ধারিতও হয়, কিন্তু তার বিপরীতে কোনো হামানের উল্লেখ না করা হয় তাহলেও এটি ছামান বলে গণ্য হবে। মিছলী বস্তুটি পণ্য বলে সাব্যস্ত হবে যদি তার বিপরীতে ছামানের উল্লেখ থাকে সে ছামানের পূর্বে আসুক বা না আসুক এবং মিছলী বস্তুটি নির্দিষ্ট হোক বা না হোক। এমনিভাবে যদি নির্দিষ্ট না হয়, তার পূর্বে না আসে, তার বিপরীতে ছামানের উল্লেখ না করা হলেও তা পণ্য বলে গণ্য হবে। যেমন, بِهَذَا الْعَبْدِ بَيْتُ كُرْ حِنْطَةٌ “আমি তোমার নিকট এই ক্রীতদাসের বিপরীতে এক কুর (আরবীয় মাপ) গম বিক্রি করেছি।”

আল্লামা কাসানী বলেন: মুদ্রা যদি প্রচলিত হয় এবং মুদ্রা ব্যতীত অন্য কোনো বস্তুর বিপরীতে উল্লেখ করা হয় তাহলে মুদ্রা নিশ্চিতই ছামান হবে; কিন্তু যদি সমগোত্রীয় মুদ্রার বিপরীতে উল্লেখ করা হয় তাহলে দেখা হবে সমগোত্রীয় মুদ্রা সংখ্যায় বরাবর না অধিক। যদি বরাবর সংখ্যক হয় তাহলেও প্রচলিত মুদ্রা হবে ছামান। কিন্তু যদি সমগোত্রীয় মুদ্রা হয় অধিক সংখ্যক, তাহলে প্রচলিত মুদ্রাগুলো হয়ে যাবে পণ্য। এটি ইমাম আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ রহ.-এর মত। ইমাম মুহাম্মদ রহ. অধিক বা বরাবরের বিশেষণ ব্যতীত সর্বাবস্থায় প্রচলিত মুদ্রাকে ছামান বলে মতপ্রকাশ করেছেন।

উপরিউক্ত আলোচনার নিকটবর্তী কথাই শাফেয়ী মাযহাবের সর্বাধিক সঠিক মত বলে গৃহীত হয়েছে। তারা বলেন, যদি কোনো কিছুর বিপরীতে দিরহাম দীনার ইত্যাদি উল্লেখ করা হয় তাহলে দিরহাম দীনারই হবে ছামান, যেহেতু ব্যাপকভাবে এরই প্রচলন রয়েছে। যদি বিনিময়ের উভয় দিক হয় মুদ্রা অথবা উভয় দিক হয় দ্রব্যসামগ্রী, তবে যে শব্দের পূর্বে আনা হবে তা হবে ছামান এবং অপরটি হবে বিক্রীত পণ্য।

মালেকী মাযহাবের আলেমগণ এ সম্পর্কে বলেন: যখন মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা আদান-প্রদান হয়, তখন যে কোনোটিকে অপরটির ছামান ও পণ্য—উভয়টি ধরা যেতে পারে। মুদ্রার ছামান হওয়া তো প্রকাশ্য। পণ্য হওয়াতেও আপত্তির কিছু নেই। যেহেতু উভয়দিকে মুদ্রা থাকাকালে উভয়দিকে পণ্য হওয়ার মত প্রদান করা যায়, অতএব একদিকে ছামান হয়ে অপর এক দিক শুধু পণ্য সাব্যস্ত করা তো যথার্থই হবে। তবে স্বাভাবিকভাবে যে নিয়ম প্রচলিত রয়েছে তা হলো, বিনিময়ের একদিকে যদি থাকে দিরহাম-দীনার, অপর দিকে থাকে কোনো পণ্যসামগ্রী, তাহলে দিরহাম-দীনার হবে ছামান এবং অন্য সামগ্রী হবে পণ্য, এটিই স্বাভাবিক নিয়ম।

হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ এ সম্পর্কে সহজবোধ্য এক নিয়ম বর্ণনা করেছেন। তারা বলেন, কোন্টি পণ্য এবং কোন্টি তার মূল্য তা নির্ধারিত হবে অক্ষর দ্বারা। যার পূর্বে আনা হবে তা হবে ছামান, অপরটি হবে পণ্য। এক্ষেত্রে বিনিময়ের একদিকে মুদ্রা এবং অপরদিকে সামগ্রী যাই থাকুক তা বিবেচনা করা হবে না। তাই যদি বলা হয় : دينار ثوب তাহলে الثرْبُ (কাপড়) হবে ছামান এবং دينار (দীনার) হবে তার পণ্য।

টিকাঃ
১৬. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৬১; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ১৩৫-এ উল্লেখ করা হয়েছে, এখানে ছামান বলে দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) ও দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) বোঝানো হয়েছে। যেহেতু স্বর্ণ ও রৌপ্য সৃষ্টি করা হয়েছে ছামান হিসাবে। তাই এগুলো নির্দিষ্ট করলেও নির্দিষ্ট হয় না।
১৭. সূরা বাকারার ৪১ নং আয়াত : وَلَا تَشْتَرُوا بِآيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلًاً নিয়ে আলোচনা কালে বিখ্যাত আরবী ব্যাকরণবিদ ফাররা বলেছেন, কখনো বস্তুর বিপরীতে বস্তু ক্রয়-বিক্রয় হয়। যেমন : اشتريت ثوبا بكساء এ ধরনের বাক্যে যেহেতু বিনিময়ের উভয় বস্তুই বস্তুসামগ্রী, সৃষ্টিগতভাবে কোনোটিই ছামান নয়, তাই যে কোনো একটিকে পণ্য এবং অপরটিকে তার মূল্য বিবেচনা করা যাবে। সে হিসাবে অব্যয়টি کاء-এর পূর্বে যেমন আনা যাবে, ثوب-এর পূর্বেও আনা যাবে। যদি এর বিপরীত হয়, বিনিময়ের উভয় দিক হয় মুদ্রা, তাহলেও উভয়টি যেহেতু সৃষ্টিগত ভাবে ছামান, কোনটি পণ্য নয় তাই যে কোনোটিকে পণ্য এবং অপরটিকে তার ছামান ধরা যাবে। তাই বলা যাবে بعت الله بعث الدنانير بالدراهم الدراهم بالدنانير কিন্তু যদি একপক্ষ সামগ্রী এবং অপর পক্ষ হয় মুদ্রা তাহলে মুদ্রাই ছামান হবে, তাই তার পূর্বেই আনা হবে। যেমন সুরা ইউসুফের ২০ নং আয়াত, وَشَرَوْهُ بِمَنِ بَحْسٍ دَرَاهِمَ مَعْدُودَةٍ ফাররা কৃত মাআনিল কুরআন, খ. ১, পৃ. ৩০
১৮. তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ১৪৫; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৬, পৃ. ২২১; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৩১ এবং খ. ৫, পৃ. ২৭২; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৮৩ ও ৩৬৮; বাদায়ে ‘উস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩২২৫
১৯. আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ৮৬; আল-খাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ৪৭৯; আল-মাজমু শারহুল মুহাযযাব, খ. ৯, পৃ. ২৬২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭২
২০. মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ১৮৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00