📄 সংশ্লিষ্ট শব্দসমূহ
ক. الإبراء (আল-ইবরাউ)
এ শব্দের শাব্দিক অর্থ: মুক্ত করা, ত্রুটিমুক্ত করা, দোষমুক্ত সাব্যস্ত করা, পবিত্রকরণ, বস্তু থেকে দূরে রাখা। পরিভাষায় ইবরাউ (الإبراء) বলতে বুঝায় إِسْقَاطُ الشَّخْصِ حَقًّا لَهُ فِي ذِمَّةِ آخر أو قبله “কারো অন্যের দায়িত্বে বা অন্যের পক্ষে নিজ অধিকার প্রত্যাহার করা।” এ সংজ্ঞাটি ঐ সকল লোকের দৃষ্টিতে, যারা ঋণের দাবি প্রত্যাহার করাকেই দায়মুক্ত করা বিবেচনা করেন। কতিপয় ফিক্হবিদ দায়মুক্তকরণকে মালিকানা প্রদানরূপে বিবেচনা করেন। সাধারণভাবে সকল ফিক্হবিদের কথা দ্বারা বোঝা যায়, দায়মুক্তকরণ কথাটি একই সাথে রহিতকরণ এবং মালিকানা প্রদান এ উভয় অর্থ বোঝায়। তবে কোনো মাসআলায় প্রথমটি, কোনোটিতে অপরটি প্রাধান্য পায়। ইবরাউ (ابراء) শব্দটি তামলীক (تمليك) থেকে ব্যাপক।
খ. الإسقاط (আল-ইসকাত): রহিতকরণ, নিক্ষেপণ
ইসকাত (الإسقاط)-এর শাব্দিক অর্থ: পতিত করা, নিক্ষেপ করা, ফেলে দেওয়া। পরিভাষায় ইসকাত হলো, অপর কাউকে মালিক অথবা অধিকারী না বানিয়ে নিজের মালিকানা বা অধিকার রহিত করা। এই রহিতকরণের মাধ্যমে তার কাছে দাবি করার অধিকার রহিত হয়ে যায়। কারণ, পতিত বস্তু নিঃশেষ হয়ে বিলীন হয়ে যায়, কোথাও স্থানান্তরিত হয় না। যেমন—তালাক, আজাদকরণ, মৃত্যুদণ্ডের ক্ষমা।
মালিকানা প্রদান ও রহিতকরণে পার্থক্য হলো, মালিকানা প্রদান করার অর্থ (কারোর কোনো বস্তুতে মালিকানা) বিলীন করে (অন্য) মালিকের নিকট তা স্থানান্তর করা। অথচ রহিতকরণ অর্থ (কারোর মালিকানা) বিলীন করা হলেও তা অন্যত্র স্থানান্তর না করা, অন্যকে মালিক না বানানো। সুতরাং ইসকাত (الإسقاط) শব্দটি তামলীক (تمليك)-এর তুলনায় ব্যাপক অর্থজ্ঞাপক।
টিকাঃ
২. দুসতূরুল উলামা, খ. ১, পৃ. ৩৪৯; আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ২২৭
৩. আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যা, খ. ১, পৃ. ১৪২, ১৪৮, ১৪৯, খ. ৪, পৃ. ২২৬-২২৭
📄 মালিকানা প্রদানের ক্ষেত্র
কখনও মালিকানা প্রদান বাস্তব ক্ষেত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়। যেমন: বস্তুর মালিকানা প্রদান। আবার কখনও সাব্যস্তকৃত ক্ষেত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়। যেমন: লজ্জাস্থানের মালিকানা প্রদান অথবা কোনো বস্তু ভাড়াপ্রদান বা ধার হিসেবে প্রদানের মাধ্যমে বস্তুর মুনাফার মালিকানা প্রদান। এগুলোর মুনাফা সাব্যস্তকৃত, যেহেতু তার সাথে সংশ্লিষ্ট মালিকানা সাব্যস্তকৃত।
বস্তুত মালিকানা প্রদান কখনও বিনিময় নিয়ে হয়, যেমন ক্রয়বিক্রয়; আবার কখনও বিনিময় ছাড়া হয়। যেমন দান, অনুদান। যেমনিভাবে মুনাফার মালিকানা কখনও বিনিময় দ্বারা প্রদান করা হয়। যেমন: ভাড়া প্রদান। কখনও বিনিময় ছাড়া প্রদান করা হয়। যেমন কোন বস্তু ধার প্রদান। প্রত্যেকটির ব্যাখ্যার জন্য স্ব-স্ব স্থান দ্রষ্টব্য।
দেনার মালিকানা প্রদানের ক্ষেত্রে আল মুগনীর গ্রন্থকার বলেন: যদি দেনা এমন ব্যক্তিকে দান করা হয়—যে দেনাদার নয় অথবা যদি এমন ব্যক্তির নিকট তা বিক্রি করা হয়, তাহলে তা শুদ্ধ হবে না।
ইমাম আবু হানিফা, সুফিয়ান ছাওরী, ইসহাক রহ. দেনা বিক্রির ক্ষেত্রে অনুরূপ মত প্রকাশ করেছেন। ইমাম আহমদ রহ. বলেছেন: যদি তুমি কোনো ব্যক্তির নিকট কর্জ হিসেবে খাদ্যশস্যের পাওনাদার হয়ে থাক, তাহলে কর্জ গ্রহণকারীর নিকট অন্য কোনো বস্তু নগদ পরিশোধের বিনিময়ে তা বিক্রি করো। অন্যের নিকট নগদ বা বাকিতে বিক্রি করো না। যদি তুমি কাউকে দিনার বা দিরহাম কর্জ দিয়ে থাক, তাহলে বিনিময়রূপে অন্য কারো নিকট থেকে তোমার প্রাপ্য পাওনা নিয়ে নিয়ো না। আর ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন: যদি গরীব, কালক্ষেপণকারী বা ঋণ অস্বীকারকারীর নিকট পাওনা থাকে তাহলে তার নিকট বিক্রি করা শুদ্ধ হবে না। কারণ সে তা পরিশোধ করতে সম্মত নয়। আর যদি প্রচুর ব্যয়কারী ধনী ব্যক্তির নিকট হয়ে থাকে তাহলে তাতে দুটি মত রয়েছে।
মালেকী ফিকহবিদদের মতে নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে দেনাদার ছাড়া অন্যের কাছে দেনা বিক্রি করা জায়েয আছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও মতপার্থক্য জানতে পরিভাষা دَيْن দ্রষ্টব্য।
টিকাঃ
৪. আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ২২৬-২২৭
৫. যারকাশী রচিত আল-মানছুর ফিল কাওয়াইদ, খ. ৩, পৃ. ২২৮
৬. দুসতূরুল উলামা, খ. ১, পৃ. ৩৪৯; কারাফী রচিত আয-যাখিরা, পৃ. ১৫১; আল-ইখতিয়ার, খ. ২, পৃ. ৩
৭. ইবনে কুদামা রচিত আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৬৫৯
📄 হস্তগত করার পূর্বে ক্রয়কৃত বস্তুতে মালিকানা প্রদান
হস্তগত করার পর মালিকানাধীন বস্তুতে অপর কাউকে মালিকানা প্রদানের মাধ্যমে ইখতিয়ার চর্চা বৈধ, এ বিষয়ে ফিক্হবিদদের কোনো মতভেদ নেই। অবশ্য কজা করার পূর্বে কাউকে মালিকানা প্রদানের মাধ্যমে ইখতিয়ার চর্চা নিয়ে তারা মতভেদ করেছেন। তার বর্ণনা নিম্নরূপ:
📄 ক্রয়কৃত বস্তু হস্তগত করার পূর্বে বিক্রির মাধ্যমে তার মালিকানা প্রদান
হানাফী ও শাফেয়ী ফিক্হবিদদের মাযহাব, এটি ইমাম আহমদ রহ.-এর একটি বর্ণনা এবং মালেকী ফিক্হবিদগণের একটি উক্তি: কজা করার পূর্বে বিক্রির মাধ্যমে কাউকে মালিকানা প্রদান জায়েয নেই—তা খাবার জাতীয় বস্তু হোক কিংবা অন্য কিছু হোক।
তারা হস্তগত করার পূর্বে খাবার বিক্রি করা হতে রাসূলুল্লাহ স. যে নিষেধ করেছেন তা দ্বারা প্রমাণ পেশ করেন। তারা আরো প্রমাণ পেশ করেন এই হাদীস দ্বারা:
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا بَعَثَ عَتَابَ بْنَ أَسَيْدٍ إِلَى مَكَّةَ قَالَ : انْهَهُمْ عَنْ بَيْعِ مَا لَمْ يَقْبِضُوهُ ، وَعَنْ رِبْحِ مَا لَمْ يَضْمَنُوهُ
“রাসূলুল্লাহ স. আত্তাব ইবনে উসাইদকে মক্কায় প্রেরণকালে বললেন, তুমি তাদেরকে পণ্য হস্তগত করার পূর্বে বিক্রি করা থেকে নিষেধ করবে। এবং ঐ বস্তুর লাভগ্রহণ থেকে নিষেধ করবে যার ক্ষতিপূরণ তারা প্রদান করে না।”
দ্বিতীয়ত (হস্তগত না করার কারণে) তার মালিকানা পূর্ণতা লাভ করে নি। সুতরাং অনির্দিষ্ট বস্তুর ন্যায় তা বিক্রি করা জায়েয হবে না।
হানাফী ফিকহবিদগণ বিক্রিকৃত স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন বিধান বর্ণনা করেন এবং বিক্রি বাতিলের প্রতারণা না থাকার কারণে হস্তগত করার পূর্বে মালিকানা প্রদানকে বৈধতা দিয়ে থাকেন।
মালেকী ফিক্হবিদগণ মনে করেন: যদি (পণ্য) খাদ্যশস্য না হয়, তাহলে হস্তগত করার পূর্বে বিক্রির মাধ্যমে পণ্যের মালিকানা প্রদান বৈধ। এবং দলিল প্রদান করেন আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত হাদীস দ্বারা:
مَنِ ابْتَاعَ طَعَامًا فَلَا يَبْعْهُ حَتَّى يَكْتَالَ
“রাসূলুল্লাহ স. বলেন, যে ব্যক্তি খাবার ক্রয় করে সে তা না মাপা পর্যন্ত যেন বিক্রি না করে”।
তাদের মতে বিশুদ্ধ কথা হলো, এই নিষেধটি কিয়াস-ঊর্ধ্ব একটি বিষয়। তাই তার সাথে খাবার ছাড়া অন্য বিষয়কে তুলনা করা যাবে না। কেউ কেউ বলেন: বিষয়টি (যুক্তি বহির্ভূত নয়, বরং) বোধগম্য। কারণ এটি প্রকাশে শরীয়তপ্রণেতার একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। তা হলো, যদি হস্তগত করার পূর্বেই তা বিক্রি করার জন্য অনুমতি প্রদান করা হয়, তাহলে কতক সম্পদের মালিক তা প্রকাশের পূর্বেই বিক্রি করবে। পক্ষান্তরে যদি তা থেকে বারণ করা হয় তাহলে পরিমাপকারী ও বোঝা বহনকারী লোকেরা উপকৃত হবে এবং এভাবে গরীবদেরকে সাহায্য করা হবে। ফলে এর দ্বারা মানুষ আন্তরিক দৃঢ়তা লাভ করবে, বিশেষত অভাব ও দুর্ভিক্ষের সময়। বিস্তারিত জানতে بيع مَالَمْ يُقْبَضُ শিরোনাম দ্রষ্টব্য।
টিকাঃ
৮. হাদীস : نهى عن بيع الطعام قبل قبضه বুখারী (ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৩৪৯) ইবনে হাজমের বর্ণনায় আছে: أما الذي نهى عنه النبي فهو الطعام أن يباع حتى يقبض
৯. হাদীস : بعث عتاب بن أسيد إلى مكة أخرجه البيهقى (খ. ৫, পৃ. ৩১৩ দায়িরাতুল মায়ারিফিল উসমানী কর্তৃক মুদ্রিত) যা ইয়ালা বিন উমাইয়ার হাদীসে নিম্নের শব্দে বর্ণিত।
استعمل النبي صلى الله عليه وسلم عتاب بن اسيد على مكة فقال : انى قد أمتك على أهل الله عز وجل بتقوى الله عز وجل ولا يأكل آخر منهم من ربح ما لم يضمن .... وأن يبيع أحرهم ما ليس عرضة وفي اسناده انقطاع.
১০. ইবনে কুদামা রচিত আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১২৭, রিয়াদ থেকে মুদ্রিত; রওজাতুত তালিবীন, খ. ৩, পৃ. ৫০৬; দুরারুল হুককাম, খ. ১, পৃ. ২০১
১১. দুরারুল হুককাম, খ. ১, পৃ. ২০১, হাদীস من ابتاع طعاما فلا يبعه حتى يكتاله أخرجه مسلم (খ. ৩, পৃ. ১১৬০, প্রকাশক: হালাবী)। হাদীসের বর্ণনাকারী ইবনে আব্বাস রা.
১২. আল-কাওয়ানিন আল-ফিকহিয়্যা, পৃ. ১৭১, দারুল কলম হতে মুদ্রিত, দুসুকীর টীকা, খ. ৩, পৃ. ১৫১ হালবী মুদ্রিত