📄 তামাল্লুক বা মালিকানা লাভ-এর শরয়ী বিধান
বিষয়বস্তুর ভিন্নতার দরুন মালিকানার বিধান ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। মালিকানা লাভের কারণসমূহের শরীয়ত সম্মত হওয়া এবং প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত হওয়া ইত্যাদি হিসেবে যেমন বিশুদ্ধ, অশুদ্ধ ও ত্রুটিপূর্ণ মালিকানা ইত্যাদি আরোপিত বিধান কার্যকর হয়, তেমনি শরয়ী বিধান ফরয ও ওয়াজিব ইত্যাদির বিধানও জারি হয়।
📄 মালিকানা লাভের শর্ত ও কারণসমূহ
মালিকানা লাভ হলো মানুষের বৈশিষ্ট্য। মানুষ ছাড়া অন্য কিছুতে মালিকানা লাভের যোগ্যতা নেই।
মালিকানা শুদ্ধ হওয়ার জন্য মৌলিক দুটি শর্ত রয়েছে।
ক. মালিকানার যোগ্য হওয়া।
খ. মালিকানা লাভে প্রতিবন্ধকতা না থাকা।
মালিকানা লাভের বিভিন্ন কারণ বা উপকরণ রয়েছে। যথা: বিনিময় ও লেনদেন জাতীয় চুক্তি (যেমন ক্রয়-বিক্রয়), উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ প্রাপ্তি, দান, অনুদান, অসিয়তকৃত সম্পদ বা ওয়াকফকৃত সম্পদ হাতে আসা, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ প্রাপ্তি, বৈধ বস্তু আয়ত্তকরণ, অনাবাদ ভূমি আবাদকরণ, শর্ত সাপেক্ষে রাস্তায় পাওয়া বস্তুর মালিক হওয়া, মৃত ব্যক্তির রক্তপণ বা গর্ভস্থ ভ্রূণের রক্তপণ গ্রহণ, অপহৃত সম্পদের ক্ষতিপূরণ প্রদান—যদি অপহরণকারীর সম্পদের সাথে তা মিশিয়ে ফেলার পর তা পৃথক করা অসম্ভব হয়, যার ফলে অপহরণকারী উক্ত সম্পদের মালিক হয় এবং তার দায়িত্বে তার ক্ষতিপূরণ প্রদান ওয়াজিব হয়।
📄 মালিকানা লাভের ধরনসমূহ
মালিকানা লাভের মূল হলো ইচ্ছা ও এখতিয়ার। সুতরাং নিজ ইচ্ছা ছাড়া কোনো ব্যক্তির মালিকানায় কোনো কিছু আসবে না।
কিন্তু ফিক্হবিদগণ এমন কিছু অবস্থা উল্লেখ করেছেন যেগুলোতে মানুষ অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছুর মালিকানা লাভ করে। সেক্ষেত্রে কারণ, উপকরণের স্বাভাবিক চাহিদাই হলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালিকানা সংঘটিত হওয়া। যেমন, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ। উত্তরাধিকার রেখে কেউ মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরাধিকারী ব্যক্তি বাধ্যতামূলক ভাবে সে সম্পদের মালিকানা লাভ করে। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য إرْث
অপর একটি হলো অসিয়তকৃত সম্পদ। যদি আমরা বলি যে, যাকে অসিয়ত করা হয়েছে সে অসিয়তকারী ব্যক্তির মৃত্যুর সাথে সাথে সম্পদের মালিকানা লাভ করবে। এটি হলো শাফেয়ী ফিক্হবিদগণের একটি মত। অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর যদি অসিয়তকৃত বস্তু গ্রহণের পূর্বেই যাকে অসিয়ত করা হয়েছে সে মারা যায়, তাহলে হানাফী ফিকহবিদগণের মতে সে বাধ্যতামূলকভাবে সম্পদের মালিকানা লাভ করবে।
অপর একটি হলো, যদি সহবাসের পূর্বে স্বামী তালাক প্রদান করে তাহলে বাধ্যতামূলকভাবে স্ত্রী অর্ধেক মহরের মালিকানা লাভ করবে। আরো একটি হলো, বিক্রেতা চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর পণ্যে ত্রুটির কারণে ফেরত পণ্যের বাধ্যতামূলক মালিকানা লাভ করে। এমনি আরো হচ্ছে, অপরাধের ক্ষতিপূরণ এবং শুফার অংশের মূল্য। আরেকটি হলো, এক বছর পর্যন্ত প্রচার করার পর, হাম্বলী মাযহাব অনুযায়ী, রাস্তায় পাওয়া বস্তু বাধ্যতামূলকভাবে রাস্তা থেকে সংগ্রহকারী ব্যক্তির মালিকানায় চলে যাবে। দ্রষ্টব্য لُقَطَةٌ
কারণের ভিন্নতার দরুন ইচ্ছাকৃত মালিকানা বিভিন্ন হয়ে থাকে। আর্থিক বিনিময়ে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরই মালিকানা লাভ হয়—যদি তাতে (গ্রহণ করা, না করার) স্বাধীনতা না থাকে। এ বিষয়ে ফিক্হবিদগণের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য: عَقْدٌ
ভাড়ার মালিকানা লাভ
কোন্ ক্ষেত্রে ভাড়ার মালিকানা লাভ হবে—এ বিষয়ে ফকীহসমাজ মতানৈক্য করেছেন। শাফেয়ী ফিকহবিদগণ এবং ইমাম আহমদ রহ.-এর মাযহাব হলো, চুক্তি হওয়া মাত্র ভাড়ার মালিকানা লাভ হবে। যেমনটি বিক্রিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে—যদি ভাড়ায় গ্রহণকারী বিলম্বে পরিশোধ করার শর্ত না করে। হানাফী ফিকহবিদগণ বলেন: ভাড়া পরিশোধের মাধ্যমে বা নগদ পরিশোধের শর্ত দ্বারা মালিকানা লাভ হয়।
কর্জ বা ঋণের মালিকানা লাভ
কর্জের মধ্যে মলিকানা লাভের উপায় নিয়ে দুটি মত রয়েছে। হানাফী ও শাফেয়ী প্রতিটি মাযহাবের ফিক্হবিদগণের এ দুটি মত। এক: এটি হাম্বলী ফিক্হবিদগণেরও মত, হস্তগত করার দ্বারা মালিকানা লাভ হয়। দুই: ক্ষমতা প্রয়োগ/কর্তৃত্ব দ্বারা মালিকানা লাভ হয়।
মালেকী ফিক্হবিদগণ বলেন: চুক্তির দ্বারা মালিকানা অর্জিত হয়ে তা ঋণগ্রহীতার সম্পদে পরিণত হয় এবং তা কর্জদাতাকে পরিশোধ করার ফয়সালা প্রদান করা হয়।
মুদারাবা ব্যবসার লাভে মালিকানা
ফিক্হবিদগণের মতপার্থক্যের ভিত্তিতে ব্যবসায়ে লাভ প্রকাশিত হওয়ার দ্বারা অথবা লাভ বণ্টনের দ্বারা মুদারাবা-কর্মী লভ্যাংশের মালিক হবে। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য : مضاربة
ফল চাষের লভ্যাংশে মালিকানা
ফলের মুকুল অঙ্কুরিত হওয়ার দ্বারা বাগান-কর্মী স্বীয় ভাগের ফলের মালিকানা লাভ করবে। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য: مُسَاقَاةُ
শুফআর মাধ্যমে জমির অংশের মালিকানা লাভ
শাফেয়ী ও হাম্বলী ফিক্হবিদগণ বলেন, মালিকানা লাভের অর্থ প্রকাশকারী কোনো শব্দের দ্বারা শফী শুফাদাবিকৃত অংশের মালিকানা লাভ করবে। হানাফী ফিকহবিদগণের মতে পারস্পরিক সন্তুষ্টি অথবা বিচারকের ফয়সালা দ্বারা সে মালিকানা লাভ করবে। মালেকী ফিক্হবিদগণের মতানুসারে বিচারকের নির্দেশ অথবা কাউকে দিয়ে সাক্ষ্যপ্রদান বা মূল্য পরিশোধ করার দ্বারা শফী এ মালিকানা লাভ করবে। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য شُفْعَةٌ
দেনমোহরের মালিকানা লাভ
বিবাহবন্ধনের দ্বারাই স্ত্রী দেনমোহরের মালিকানা লাভ করবে। বিস্তারিত জানতে صداق দ্রষ্টব্য।
গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের মালিকানা লাভ
হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের ফিক্হবিদগণের মতে করায়ত্ত করার দ্বারাই যুদ্ধলব্ধ সম্পদে মালিকানা লাভ হয়। শাফেয়ী ফিক্হবিদগণের মতে তা বণ্টন করার অথবা দখল করার পর তাতে বাছাই করার দ্বারা মালিকানা লাভ হয়। বিস্তারিত জানতে غنیمة আলোচনা দ্রষ্টব্য।
দানকৃত বস্তুর মালিকানা লাভ
হানাফী, মালেকী ও শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহদের মত হচ্ছে, হস্তগত করার দ্বারা দানকৃত বস্তুতে গ্রহীতার মালিকানা লাভ হয়। হাম্বলী ফিক্হবিদগণ এ ধরনের বস্তুতে দুটো প্রকার করেছেন। এক. যা পরিমাপ অথবা পরিমাণ করা যায় এবং দুই. যা পরিমাপ অথবা পরিমাণ করা যায় না। তারা বলেন, যা পরিমাপ অথবা পরিমাণ করা যায় তাতে হস্তগত করার দ্বারা মালিকানা লাভ হয়। আর অন্য বস্তু কেবল চুক্তি সম্পন্ন হলেই মালিকানা লাভ হয়। বিস্তারিত জানতে هبة দ্রষ্টব্য।
অনাবাদ ভূমির মালিকানা লাভ
অনাবাদ ভূমি আবাদ করার দ্বারা মালিকানা লাভ হয়, এ বিষয়ে সকল ফিক্হবিদ একমত। তবে আবাদ করা কিসের দ্বারা সাব্যস্ত হয়, তা জানতে إِحْيَاءُ الْمَوَاتِ আলোচনা দ্রষ্টব্য।
সকলের ব্যবহার উপযোগী বস্তুর মালিকানা লাভ
সাধারণের ব্যবহার উপযোগী প্রতিটি বস্তুতে দখলের দ্বারা মালিকানা লাভ হয়। যেমন: ঘাস, লাকড়ি, পাহাড় থেকে সংগৃহীত ফল, মানুষের নিক্ষিপ্ত অথবা নষ্ট করা বস্তু যার প্রতি মনের আকর্ষণ নেই। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য حيازة
টিকাঃ
৮. রওজাতুত তালিবীন, খ. ৬, পৃ. ১৪৩; সুয়ূতী রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৪১২।
৯. ইবনে নুজাইম রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৪১১-১২; সুয়ূতী রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩১৪-৩১৫-৩১৮
১০. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৭০০
১১. ইবনে নুজাইম রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৪১৩
১২. সুয়ূতী রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩২০; ইবনে নুজাইম রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৪১৩; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৪৮; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭৮
১৩. ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ১৩৯; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১৬১; হাশিয়াতুল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ৫০৩; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৩২০
১৪. ইবনে নুজাইম রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৪১৪; আসনাল মাতালিব, খ. ৪, পৃ. ১৯৮; আল-ওয়াজীয, খ. ২, পৃ. ১৯৩; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ৮২
১৫. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ১২৪; দুসূকির টীকা, খ. ৪, পৃ. ১০১; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৪০৬; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৬৪৯
১৬. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৫৯৭; আল-কালয়ুবী, খ. ৩, পৃ. ২৯৯; ইবনে আবিদীনের টীকা, খ. ৩, পৃ. ৩২৪