📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 তৃতীয় : মালিকানা স্থানান্তরের সময় প্রযোজ্য শর্তাবলি

📄 তৃতীয় : মালিকানা স্থানান্তরের সময় প্রযোজ্য শর্তাবলি


ফিক্‌হবিদগণের মতামত হলো, মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত ও নিয়মনীতি রয়েছে। শরীয়ত হস্তান্তরের উপকরণসমূহকে—জীবদ্দশায় সাধারণ নিয়মের মতো—সন্তুষ্টি ও ইচ্ছার সাথে শর্তযুক্ত করেছে। এই সন্তুষ্টি ও সম্মতি প্রতারণা, আত্মসাৎ, জবর দখল, মিথ্যা ও ভুল বুঝাবুঝি ইত্যাদি দোষ হতে মুক্ত হতে হবে। কারণ, মহান আল্লাহর বাণী:

لا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِل إلا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ

“তোমরা তোমাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না। তবে পারস্পরিক সন্তুষ্টিতে বাণিজ্যিকভাবে তা ভোগ করা যেতে পারে”।

এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ স.-এর বাণী:

انما البيع عن تراض

“পরস্পর সম্মত থাকলেই তা হবে বিক্রি”।

অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ স. বলেন,

لا يحل مَال امْرِئٍ مُسلِم إِلَّا مَا أَعْطَاهُ عَنْ طِيبٍ نَفْسِهِ

“মুসলমানের সম্পর্দের কেবল ঐ অংশ বৈধ যা সে সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করে।” বিস্তারিত দ্রষ্টব্য পরিভাষা رضا

এমনিভাবে ফিক্‌হবিদগণ মৃত্যুশয্যায় শায়িত মালিকের ইচ্ছাকে এক-তৃতীয়াংশ সম্পদের সাথে নির্ধারিত করে দিয়েছেন—যদি তার কাজটি হয় দান, অনুদান পুরস্কার, উপহার, আনুকূল্যপূর্ণ দান, অথবা অসিয়ত। দ্রষ্টব্য : পরিভাষা مَرَضُ الْمَوْتِ

এমন ব্যক্তি যাকে শরীয়ত স্বাধীনভাবে ক্রয়বিক্রয় করতে অনুমতি দেয়নি, তার এমন চুক্তি ও লেনদেনে যাতে তার ক্ষতি হতে পারে বা যাতে ক্ষতি হওয়াই স্বাভাবিক তাতে তার সম্মতি প্রকাশে শর্ত আরোপ করেছে। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য حجر , سفه

মৃত্যু হলে মৃত ব্যক্তির যাবতীয় সম্পদ ফারায়েজের সূত্র অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের নিকট হস্তান্তরিত হয়। যেমনিভাবে এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি থেকে তার অসিয়ত পূরণ করা হয়। এবং যাদের জন্য ওসিয়ত করা হয়েছে সম্পদসমূহ তাদের মালিকানায় হস্তান্তর করা হয়। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: পরিভাষা إِرْثُ وَوَصِيَّةٌ

টিকাঃ
৪৮. সূরা নিসা, আয়াত ২৯
৪৯. হাদীস: ইবনে মাজা, (খ. ২, পৃ. ৭৩৭), আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর হাদীসের একাংশ
৫০. হাদীস: বায়হাকী (খ. ৬, পৃ. ৯৭), ইবনে আব্বাস রা. এ হাদীসের বর্ণনাকারী
৫১. ইনায়াসহ ফাতহুল কাদীর, খ. ৩, পৃ. ১৫৫; জামিউল ফুসুলাইন, খ. ২, পৃ. ১৮৩; শরহুত তালবীহ আলাত তাওযীহ, খ. ২, পৃ. ৩৫০; তাইসিরুত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ২৭৭; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৪, পৃ. ৫০; হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৩, পৃ. ৩৮৩; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৪, পৃ. ২০৭০, হাশিয়া দুসূকীসহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ৩০৬; বুলগাতুস সালেক লিআকরাবিল মাসালিক, খ. ২, পৃ. ৬৪২; ইবনে জুযাই রচিত আল-কাওয়ানিনুল ফিকহিয়‍্যা, পৃ. ২৭৬; শরহুল খিরাশী, খ. ৫, পৃ. ৩০৪; ইমাম শাফেয়ী রচিত আল-উম্ম, খ. ৪, পৃ. ৩৫; আল-মুখতাসার, খ. ৩, পৃ. ২১৭; রওজাতুত তালিবীন, খ. ৭, পৃ. ৩৮৭ এবং খ. ৮, পৃ. ৭২; ইবনে কুদামা রচিত আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ৮৪

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 চতুর্থ : দায়িত্বশীল ব্যক্তির জন্য প্রদত্ত শর্তাবলি

📄 চতুর্থ : দায়িত্বশীল ব্যক্তির জন্য প্রদত্ত শর্তাবলি


শরীয়ত দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে মালিকানার ওপর কতক শর্ত আরোপের অধিকার প্রদান করেছে। তন্মধ্যে একটি হলো:

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 প্রথম : জনকল্যাণার্থে বিশেষ মালিকানাকে সীমাবদ্ধকরণ

📄 প্রথম : জনকল্যাণার্থে বিশেষ মালিকানাকে সীমাবদ্ধকরণ


শরীয়ত ব্যক্তিমালিকানার স্বীকৃতি দেয়, তাকে রক্ষা ও সংরক্ষণ করে। তাতে শরীয়তের সীমাবদ্ধ করণের মানদণ্ড জনকল্যাণের ওপর নির্ভরশীল—যা ব্যক্তিবিশেষের বা জাতিবিশেষের সাথে নির্ধারিত নয়। এটি পুরো সমাজব্যাপী। ইমাম শাতেবী রহ. বলেন, জনস্বার্থ ব্যক্তিস্বার্থের তুলনায় অগ্রাধিকার পাওয়ার উপযোগী।

সুতরাং স্বত্ব যদিও মালিকের জন্য নির্ধারিত এবং তার যথা ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার আছে, তথাপি শরীয়ত কর্তৃক অন্যের অধিকারও সংরক্ষিত। তাই নিজের যাবতীয় অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে অন্যের যাবতীয় স্বার্থ রক্ষা করা শর্ত। তন্মধ্যে একটি হলো মালিকানা। ইমাম শাতেবী রহ. বলেন, অনুমোদিত স্থানে মানুষ তার রিজিক অন্বেষণের ক্ষেত্রে আল্লাহর অধিকার এবং অন্য মানুষের অধিকারের প্রতি যত্নশীল হওয়া একান্ত কর্তব্য। আর আল্লাহর অধিকার হলো যা জনস্বার্থের সাথে সংশ্লিষ্ট।

টিকাঃ
৫২. আল-মুওয়াফাকাত, খ. ১, পৃ. ৩০
৫৩. আল-মুওয়াফাকাত, খ. ৩, পৃ. ২৪৭

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দ্বিতীয় : মালিকানা লাভের অধিকারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ব্যক্তির জন্য প্রদত্ত শর্তাবলি

📄 দ্বিতীয় : মালিকানা লাভের অধিকারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ব্যক্তির জন্য প্রদত্ত শর্তাবলি


নিম্নোক্ত বিষয়গুলো এর আওতাভুক্ত।

ক. অনাবাদ ভূমি আবাদকরণ
রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমতি ছাড়া শুধু অনাবাদ ভূমি আবাদ করার মাধ্যমে ভূমির মালিকানা লাভ হবে কি? অথবা উক্ত ভূমির মালিক হওয়ার জন্য রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমতি শর্ত, ফিক্‌হবিদগণ এ বিষয় নিয়ে মতভেদ করেছেন। শাফেয়ী ফকীহগণ, হাম্বলী ফিক্‌হবিদগণ এবং হানাফী ফকীহ্‌দের মধ্যে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর মত হলো, ভূমি আবাদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমতি শর্ত নয়। আবু হানিফা রহ. এবং মালেকী ফিক্‌হবিদগণ তাদের বিরোধিতা করেন। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: পরিভাষা إِحْيَاءُ الْمَوَاتِ

খ. খনির মালিকানা লাভ
মালেকী ফিক্‌হবিদগণের মাযহাব হলো, সকল খনির মালিকানা রাষ্ট্রের তথা সকল মুসলিমের, খনিজ দ্রব্য ঘন হোক কিংবা তরল, খনি প্রকাশিত হোক কিংবা ভূগর্ভের ভিতরে থাকুক, বিশেষ মালিকানাধীন ভূমিতে হোক কিংবা মালিকানাহীন ভূমিতে হোক। রাষ্ট্র তা নির্দিষ্ট মেয়াদে ভাড়া দেওয়া কিংবা মালিক বানিয়ে জায়গির হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া ইত্যাদি জনকল্যাণ মূলক যে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
অনাবাদ ভূমিতে প্রকাশ্য খনি আবিষ্কৃত হলে হানাফী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী ফিক্‌হবিদগণের নিকট বিষয়টি অনুরূপ, তাতে রাষ্ট্রের মালিকানা হবে। তাদের মতানুসারে অনাবাদ ভূমি আবাদ করার দ্বারাই মালিকানা সাব্যস্ত হবে না। কারণ এর দ্বারা সাধারণ মুসলিমের ক্ষতি সাধিত হবে। অনুরূপ বিধান প্রযোজ্য ভূগর্ভের ভিতরের খনির ক্ষেত্রেও। শাফেয়ী মাযহাবের প্রাধান্য পাওয়া মতানুসারে এবং হাম্বলী ফকীহগণের দুই বর্ণনার যেটি অধিক প্রকাশিত সেটি অনুসারে, অনাবাদ ভূমি আবাদ করার দ্বারাই মালিকানা লাভ হয় না। বিস্তারিত জানার জন্য পরিভাষা إحياء الْمَوَاتِ দ্রষ্টব্য।

গ. সীমা/আইল
সীমানা নির্ধারণ করা অর্থাৎ আইল দেওয়া অনাবাদ ভূমি আবাদ করার জন্য শর্ত। সকল ফিক্‌হবিদ: হানাফী, মালেকী, হাম্বলী এবং শাফেয়ী ফকীহদের বিশুদ্ধ মাযহাব হলো, রাসূল সা. ছাড়া অন্য মুসলিম নেতৃবৃন্দের নিজেদের জন্য কোনো ভূমি সংরক্ষিত করার অধিকার নেই। তবে তারা এমন কিছু স্থান সংরক্ষিত রাখতে পারবে যেখানে মুসলিম যোদ্ধাদের ঘোড়া, কর হিসেবে প্রাপ্ত পশু, যাকাতের উট এবং মানুষের হারানো পশু বিচরণ করবে এভাবে, যেন তাতে অন্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এ চারণভূমি কল্যাণের সাথে শর্তযুক্ত। তাই তাতে সম্প্রসারণ জায়েয হবে না। বিস্তারিত জানার জন্য পরিভাষা إِحْيَاءُ الْمَوَاتِ وَحَمّى দ্রষ্টব্য।

টিকাঃ
৫৪. ইবনে রুশদ রচিত আল-মুকাদ্দামাতুল মুমাহহাদাত, খ. ১, পৃ. ২২৫; হাশিয়া দুসূকী আলাশ শারহিল কাবীর, খ. ১, পৃ. ৪৮৬; বুলগাতুস সালেক, খ. ১, পৃ. ২২৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00