📄 মালিকানা লাভের উপকরণসমূহ
মালিকানা লাভের অনেক উপকরণ ও মাধ্যম রয়েছে। ইবনে নুজাইম রহ. আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মালিকানা লাভের উপকরণগুলো নিম্নরূপ: আর্থিক বিনিময়সমূহ, দেনমোহর, খুলা (তালাকের বিনিময়ে অর্থ), উত্তরাধিকার, দান, সদকা, অসিয়ত, ওয়াকফ, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, বৈধ সম্পদে আধিপত্য লাভ, ভূমি আবাদ, শর্ত সাপেক্ষে রাস্তায় পাওয়া সম্পদের মালিকানা, নিহত ব্যক্তির রক্তমূল্য যার সে প্রথম মালিক হবে, অতঃপর তা উত্তরাধিকারীদের মালিকানায় স্থানান্তরিত হবে।
মালিকানার একটি মাধ্যম হলো গুররা (গর্ভের সন্তান) অর্থাৎ গর্ভবতী মায়ের ভ্রূণের রক্তমূল্য। প্রথমে ভ্রূণ তার মালিক হয়, এরপর তাতে উত্তরাধিকার কার্যকর হবে। অপহরণকারী যখন অপহরণকৃত বস্তুর মধ্যে ব্যাপক হস্তক্ষেপ করে এর নাম ও মূল উপকার বিনষ্ট করে ফেলে, সে এর মালিক হয়ে যায়। তদ্রূপ সমজাতীয় বস্তুর একটিকে আরেকটির সঙ্গে মিলিয়ে ফেললে—যার ফলে পার্থক্য করা যায় না—তাহলেও সে এর মালিক বনে যাবে।
ইমাম হাসকাফী রহ. উল্লেখ করেছেন, মালিকানা লাভের কারণ তিনটি: ১. মালিকানা স্থানান্তরকারী, যেমন বিক্রয় ও দান; ২. প্রতিনিধিত্ব, যেমন উত্তরাধিকার; ৩. মৌলিকত্ব, তা বাস্তবে কোনো বস্তুতে কর্তৃত্ব লাভ করার দ্বারা অর্জিত হয়; কিংবা হুকমী বা অপ্রকৃতভাবে অর্জিত হয় প্রস্তুতি গ্রহণ করার দ্বারা; যেমন, শিকার করার জন্য জাল পাতা।
কেফায়া গ্রন্থের বরাত দিয়ে আল্লামা সুয়ূতী রহ. উল্লেখ করেন, মালিকানা লাভের উপকরণ আটটি : উত্তরাধিকার, পারস্পরিক বিনিময়, দান, অসিয়ত, ওয়াকফ, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, ভূমি আবাদ, অনুদান।
ইবনুস সুবকী রহ. বলেন, আরো কিছু উপকরণ রয়েছে। যেমন: শর্ত সাপেক্ষে রাস্তায় পাওয়া বস্তুর মালিকানা। নিহত ব্যক্তির রক্তমূল্য যা প্রথমে নিহত ব্যক্তির মালিকানায় আসে। অতঃপর তা উত্তরসুরীদের কাছে স্থানান্তর হয়। এটি হলো বিশুদ্ধতম মত। এজন্য রক্তমূল্যের অর্থ থেকে নিহত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করা হয়। বিশুদ্ধতম মত অনুযায়ী গর্ভবতী মায়ের ভ্রূণ রক্তমূল্যের মালিকানা লাভ করবে। অপহরণকারী অপহরণকৃত সম্পদকে নিজের সম্পদের সাথে মিশিয়ে ফেলা অথবা অন্যের সম্পদের সাথে এমনভাবে মিলিয়ে ফেলা যা পার্থক্য করা যায় না। এটিও তার মালিকানা লাভকে আবশ্যক করবে। বিশুদ্ধ মতানুসারে অতিথি যা ভক্ষণ করে সে তার মালিকানা লাভ করে। সে কি তার সামনে খাবার রাখার দ্বারা মালিকানা লাভ করে, না-কি মুখে রাখার দ্বারা, না-কি খাবার স্পর্শ করার দ্বারা, না-কি মলন করার দ্বারা মালিকানা লাভ হয়, খাওয়ার সামান্য পূর্বে মালিকানা লাভ হয়? এ সকল অভিমতই রয়েছে।
টিকাঃ
৩০. ইবনে নুজাইম রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের; পৃ. ৩৪৬, ইবনে আবেদীন রচিত টীকা, খ. ৫, পৃ. ২৯৮
৩১. সুয়ূতী রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩১৭; ইবনে নুজাইম রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৪৬-৩৫০
📄 মালিকানা লাভে প্রযোজ্য শর্তাবলি
মালিকানায় আরোপিত হয় এমন কিছু শর্ত—যা উপকরণ বা ব্যবহার অথবা স্থানান্তরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তদ্রূপ এমন কিছু শর্ত রয়েছে যা দায়িত্বশীল এবং চুক্তি সম্পাদনকারীর প্রতি আরোপিত হয়।
প্রথম: মালিকানার উপকরণের ওপর আরোপিত শর্তাবলি
শরীয়তে মালিকানা লাভের উপকরণসমূহে বৈধ হওয়ার শর্ত রয়েছে, প্রকাশ্যভাবে তা শরীয়তসম্মত হতে হবে, যেমন খুশি নয়। এ কারণেই নিষিদ্ধ উপকরণসমূহ যথা : চুরি, অপহরণ, আত্মসাৎ, জুয়া অথবা সুদ ইত্যাদি মালিকানা লাভের উপকরণ ও মাধ্যম নয়। তাই শরীয়ত হারাম উপকরণ ও মালিকানার মাঝে পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে; এবং কঠিনভাবে অবৈধ মাধ্যম গ্রহণ করতে বারণ করেছে। আর সকল মুমিনের প্রতি দাবি রেখেছে যেন তাদের সম্পদ বৈধ এবং উত্তম হয়। এ প্রসঙ্গে অসংখ্য আয়াত ও হাদীস অবতীর্ণ হয়েছে। তন্মধ্যে একটি আয়াত:
لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ
“তোমরা পরস্পর অন্যায়ভাবে নিজেদের সম্পদ ভোগ করো না। তবে তোমাদের পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে যদি ব্যবসা হয় তাহলে কোন অসুবিধা নেই।”
উক্ত আয়াতের মধ্যে সন্তুষ্টি ও সম্মতি ছাড়া কারো সম্পদ ভোগ করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ উত্তম আহার গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করে বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَاشْكُرُوا لِلَّهِ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ
“হে মুমিনগণ! তোমরা আমার দেওয়া উত্তম রিজিক ভক্ষণ করো এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো—যদি তোমরা শুধু তারই ইবাদাত করো।”
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ স. বলেন:
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا ، وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِينَ بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِينَ فَقَالَ : { يَا أيُّهَا الرُّسُلِ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ } وَقَالَ { يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ } ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُل يُطِيلِ السَّفَرَ أَشْعَتْ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ : يَا رَبِّ يَا رَبِّ ، وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ ، وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ ، فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ
“হে লোকসকল! আল্লাহ উত্তম, তিনি কেবল উত্তমটি পছন্দ করেন, তিনি মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যা নবীগণকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘হে রাসূলগণ! তোমরা উত্তম আহার গ্রহণ করো এবং সৎকাজ করো, নিশ্চয় আমি তা জানি যা তোমরা করো’। তিনি আরো বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ভক্ষণ করো ঐ উত্তম রিজিক থেকে যা আমি তোমাদেরকে দান করেছি’। অতঃপর এমন এক ব্যক্তির আলোচনা করলেন, যে দীর্ঘ সফর করে, যার ধুলোমাখা এলোমেলো চুল, যে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, হে প্রতিপালক! হে প্রতিপালক! অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, সে হারামের দ্বারা পরিপুষ্ট। এ অবস্থায় এই ব্যক্তির দোয়া কিভাবে কবুল হবে?”
টিকাঃ
৩২. সূরা নিসা, আয়াত ২৯
৩৩. সূরা বাকারা, আয়াত ১৭২
৩৪. সূরা মুমিনূন, আয়াত ৫১
৩৫. সূরা বাকারা, আয়াত ১৭২
৩৬. হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, খ. ২, পৃ. ৭০৩
📄 প্রথম : মালিকানার উপকরণের ওপর আরোপিত শর্তাবলি
শরীয়তে মালিকানা লাভের উপকরণসমূহে বৈধ হওয়ার শর্ত রয়েছে, প্রকাশ্যভাবে তা শরীয়তসম্মত হতে হবে, যেমন খুশি নয়। এ কারণেই নিষিদ্ধ উপকরণসমূহ যথা : চুরি, অপহরণ, আত্মসাৎ, জুয়া অথবা সুদ ইত্যাদি মালিকানা লাভের উপকরণ ও মাধ্যম নয়। তাই শরীয়ত হারাম উপকরণ ও মালিকানার মাঝে পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে; এবং কঠিনভাবে অবৈধ মাধ্যম গ্রহণ করতে বারণ করেছে। আর সকল মুমিনের প্রতি দাবি রেখেছে যেন তাদের সম্পদ বৈধ এবং উত্তম হয়। এ প্রসঙ্গে অসংখ্য আয়াত ও হাদীস অবতীর্ণ হয়েছে। তন্মধ্যে একটি আয়াত:
لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ
“তোমরা পরস্পর অন্যায়ভাবে নিজেদের সম্পদ ভোগ করো না। তবে তোমাদের পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে যদি ব্যবসা হয় তাহলে কোন অসুবিধা নেই।”
উক্ত আয়াতের মধ্যে সন্তুষ্টি ও সম্মতি ছাড়া কারো সম্পদ ভোগ করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ উত্তম আহার গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করে বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَاشْكُرُوا لِلَّهِ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ
“হে মুমিনগণ! তোমরা আমার দেওয়া উত্তম রিজিক ভক্ষণ করো এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো—যদি তোমরা শুধু তারই ইবাদাত করো।”
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ স. বলেন:
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا ، وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِينَ بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِينَ فَقَالَ : { يَا أيُّهَا الرُّسُلِ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ } وَقَالَ { يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ } ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُل يُطِيلِ السَّفَرَ أَشْعَتْ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ : يَا رَبِّ يَا رَبِّ ، وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ ، وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ ، فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ
“হে লোকসকল! আল্লাহ উত্তম, তিনি কেবল উত্তমটি পছন্দ করেন, তিনি মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যা নবীগণকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘হে রাসূলগণ! তোমরা উত্তম আহার গ্রহণ করো এবং সৎকাজ করো, নিশ্চয় আমি তা জানি যা তোমরা করো’। তিনি আরো বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ভক্ষণ করো ঐ উত্তম রিজিক থেকে যা আমি তোমাদেরকে দান করেছি’। অতঃপর এমন এক ব্যক্তির আলোচনা করলেন, যে দীর্ঘ সফর করে, যার ধুলোমাখা এলোমেলো চুল, যে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, হে প্রতিপালক! হে প্রতিপালক! অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, সে হারামের দ্বারা পরিপুষ্ট। এ অবস্থায় এ ব্যক্তির দোয়া কিভাবে কবুল হবে?”
টিকাঃ
৩২. সূরা নিসা, আয়াত ২৯
৩৩. সূরা বাকারা, আয়াত ১৭২
৩৪. সূরা মুমিনূন, আয়াত ৫১
৩৫. সূরা বাকারা, আয়াত ১৭২
৩৬. হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, খ. ২, পৃ. ৭০৩
📄 দ্বিতীয় : মালিকানা ব্যবহারে প্রযোজ্য শর্তাবলি
শরীয়ত ব্যবহারের দিক দিয়ে মালিকানার কিছু শর্ত প্রণয়ন করে, তা মালিকের ওপর আরোপ করেছে:
ক. সে অপচয়কারী ও অপব্যয়ী হবে না এবং অতি কৃপণও হবে না। মহান আল্লাহ বলেন:
وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا
“তুমি আত্মীয়স্বজনকে তার অধিকার দাও, গরীব ও মুসাফিরকে তাদের অধিকার প্রদান করো, অপব্যয় করো না। অপব্যয়কারীগণ শয়তানের ভাই। আর শয়তান হলো স্বীয় প্রভুর অকৃতজ্ঞতাকারী।”
মহান আল্লাহ আরো বলেন:
وَلَا تَجْعَل يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطُهَا كُلِّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَحْسُورًا
“তুমি একেবারে ব্যয়কুণ্ঠ হয়ো না এবং একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে যাবে।”
এ বিষয়ে অনেক আয়াত ও হাদীস রয়েছে যেগুলো অপচয়-অপব্যয় এবং অনর্থক অর্থ নষ্ট করা হারাম হওয়ার প্রমাণ বহন করে—এমনকি খাবারের ক্ষেত্রেও। মুহাম্মদ ইবনে হাসান শায়বানী বলেন: মোটকথা হলো মানুষের হালাল উপার্জনে অপচয় ও কৃপণতা হারাম। অতঃপর খাবারের অপচয় বিভিন্ন ধরনের। তন্মধ্যে একটি হলো নানা ধরনের বৈধ খাবারে আতিশয্য করা।
খ. শরীয়ত যা অবৈধ করেছে মালিক তা ব্যবহার না করা। যেমন পুরুষের জন্য রেশমী পোশাক ও স্বর্ণ ব্যবহার, নারী-পুরুষের জন্য স্বর্ণ ও রৌপ্যের পাত্র ব্যবহার করা হারাম ও অবৈধ।
গ. যথাযথভাবে সম্পদ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা এবং সম্পদ নষ্ট না করা, যেন তা লেনদেন এবং জীবিকায় অবদান রাখতে পারে। এ বিষয়ে এমন সব আয়াত ও হাদীস প্রমাণ বহন করে যেগুলো নির্দেশসূচক শব্দের মাধ্যমে কাজ, ব্যবসা, শিল্প ও কৃষি কাজের প্রতি আহ্বান করে। যেমন মহান আল্লাহর বাণী:
هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولاً فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِنْ رِزْقِهِ
“তিনি ঐ সত্তা যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে বশীভূত করেছেন। সুতরাং তোমরা এর বিভিন্ন অঙ্গনে বিচরণ করো এবং তাঁর রিজিক ভক্ষণ করো।”
মহান আল্লাহ আরো বলেন:
فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ
“যখন নামায সমাপ্ত হয় তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ করো।”
হাদীসে রাসুলুল্লাহ স. বলেন:
مَنْ وَلِيَ يَتِيمًا لَهُ مَالٌ فَلْيَتَّحِرْ فِيهِ وَلَا يَتْرُكُهُ حَتَّى تَأْكُلَهُ الصَّدَقَةُ
“যে ব্যক্তি এমন এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ করে যার সম্পদ আছে, সে যেন উক্ত সম্পদকে বাণিজ্যিক কাজে লাগায়। তা এভাবে না রাখে যে, যাকাত দিতে দিতে তা ফুরিয়ে যায়”।
এমনিভাবে ফিক্হবিদগণ বলেছেন, যা ছাড়া উম্মাহর কল্যাণ ও স্বার্থ পূর্ণতা লাভ করে না, তা চর্চা করা ফরযে কেফায়া। তারা বলেছেন: যে কোনো পেশা, শিল্প, প্রয়োজনীয় ব্যবসা ফরযে কেফায়া। কারণ পৃথিবী এর মাধ্যমে টিকে থাকে। আর পৃথিবী টিকে থাকার ওপর ধর্ম টিকে থাকা নির্ভরশীল। তাই মানবজাতি যদি তা থেকে বিরত থাকে তাহলে তারা গুনাহগার হবে এবং ধ্বংসের পথে ধাবমান হবে। কারণ, মানুষ এমন কাজ করতে প্রকৃতগতভাবে অভ্যস্ত। সুতরাং এ কাজে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান শায়বানী রহ. বলেছেন: সকল ফিক্হবিদের সিদ্ধান্ত হলো, প্রয়োজন পরিমাণ উপার্জন ফরজ। এ পর্যায়ে كسب পরিভাষাটি দ্রষ্টব্য।
ঘ. ব্যক্তি ও সমাজের ক্ষতি না করা। ফিকহবিদগণ একমত পোষণ করেছেন যে, কোনো ব্যক্তি স্বীয় মালিকানাধীন বস্তু ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্যের ক্ষতিসাধনের ইচ্ছা পোষণ করা বৈধ নয়। যেহেতু রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন:
لا ضَرَرَ وَلَا صَرَارَ
“ক্ষতি সাধন ও ক্ষতির দ্বারা প্রতিশোধ বৈধ নয়।”
এ হাদীস মানুষের সম্পদ, জীবন ও সম্মানের ক্ষতিসাধন করা অবৈধ হওয়া প্রমাণ করে। এমনিভাবে ক্ষতির দ্বারা ক্ষতির মোকাবেলা, ধ্বংসের দ্বারা ধ্বংসের মোকাবেলা করা জায়েয হবে না। সুতরাং এমন সব কাজ—যদিও তা মালিকের মালিকানাধীন হয়ে থাকে—নিষিদ্ধ, যা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়। এজন্য ফিকহবিদগণ মালিককে ঝড়ের দিন আগুন প্রজ্জ্বলিত করতে নিষেধ করেছে—যদিও তা তার মালিকানাধীন। যদি সে আগুন জ্বালায় আর তার আগুন দ্বারা প্রতিবেশীর সম্পদ বিনষ্ট হয়, তাহলে সে সীমালঙ্ঘনকারী বিবেচিত হবে। তাই তার ওপর ক্ষতিপূরণ বর্তাবে।
তবে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড যেগুলোর দ্বারা প্রতিবেশীর ক্ষতি করা হয় তা থেকে প্রতিবেশীকে বারণ করার বিষয়ে ফকীহবৃন্দের তিনটি মত রয়েছে:
কতক ফিকহবিদ এমনটি করা থেকে বারণ করেননি। তারা হলেন হানাফী মাযহাবের পূর্ববর্তী ফকীহগণ, প্রাধান্যপ্রাপ্ত মতানুসারে শাফেয়ী ফিক্হবিদগণ এবং এক বর্ণনা মতে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ.।
আর কতক ফিক্হবিদ ক্ষতি করার ইচ্ছা থাকলে অথবা প্রচুর ক্ষতি হওয়ার ক্ষেত্রে বারণ করেছেন। তারা হলেন মালেকী ফিক্হবিদগণ, প্রসিদ্ধ মতানুসারে ইমাম আহমদ এবং কিছু শাফেয়ী ফিক্হবিদ।
আর কতক ফিক্হবিদ অধিক ক্ষতি ও অল্প ক্ষতির মধ্যে পার্থক্য করেন। তারা প্রথমটিতে বারণ করেন, আর দ্বিতীয়টিতে (অর্থাৎ অল্প ক্ষতির) ক্ষেত্রে বারণ করেন না। তারা হলেন এক বর্ণনা মতে ইমাম আবু ইউসুফ, হানাফীদের পরবর্তী ফিকহবিদগণ এবং কিছু শাফেয়ী ফিবিদ।
শরীয়ত যেমনিভাবে ব্যক্তির ক্ষতিসাধন থেকে বারণ করেছে তদ্রূপ সমাজের ক্ষতিসাধন থেকেও বারণ করেছে। এজন্য কুক্ষিগতকরণ, মজুদদারি, সুদ এবং এমন সব ব্যবসা অবৈধ করেছে যা ক্ষতির কারণ হয়।
টিকাঃ
৩৭. সূরা ইসরা, আয়াত ২৬-২৭
৩৮. সূরা ইসরা, আয়াত ২৯
৩৯. শায়বানী রচিত আল-কাসব, পৃ. ৭৯-৮২; তাহকীক ড. সুহাইল যাকার দামেস্ক
৪০. সূরা মুলক, আয়াত ১৫
৪১. সূরা জুমুআ, আয়াত ১০
৪২. হাদীস: তিরমিযী, (খ. ৩, পৃ. ২৪) যা আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা.-এর হাদীসের একাংশ
৪৩. মুগনিল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ২১৩; ইহয়াউ উলুমিদ্দীন, খ. ১, পৃ. ১৭; তাইসীরুত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ২১৩
৪৪. আল-কাসব, পৃ. ৪৪-৬৩
৪৫. হাদীস: মুওয়াত্তা, (খ. ২, পৃ. ৭৪৫) যা ইয়াহইয়া আল-মুযানীর হাদীসের একাংশ; ইবনে রাজাব কৃত জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম, খ. ২, পৃ. ২০৮-২১১; ইবনে সালাহ এ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, হাদীসটি সকল সনদে উত্তম
৪৬. সারাখসি রচিত আল-মাবসূত, খ. ১৫, পৃ. ১২; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৫০৬; ইবনে আবেদীন রচিত টীকা, খ. ৫, পৃ. ৪৪৩; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৩২৭; আল-কাওয়ানিনুল ফিকহিয়্যা, পৃ. ৩৭০; ইবনে কুদামা রচিত আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৮৮
৪৭. প্রাগুক্ত