📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 গ. কারণের বিবেচনায় মালিকানার প্রকারভেদ

📄 গ. কারণের বিবেচনায় মালিকানার প্রকারভেদ


কারণের দিক বিবেচনা করলে ইচ্ছাকৃত ও বাধ্যগত মালিকানা—এ দুভাগে মালিকানা বিভক্ত হয়। আল্লামা যারকাশী বলেন: মালিকানা দু প্রকার, যার একটি বাধ্যগত ও অবশ্যম্ভাবী, যেমন: উত্তরাধিকার-সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি ও ওয়াকফের মুনাফা। দ্বিতীয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে অর্জিত হয়। এটি দুই প্রকার: ১. কথার দ্বারা সম্পাদিত। এটি যাবতীয় বিনিময়ে হয়ে থাকে। যেমন বিক্রয়। বিনিময় ছাড়া অন্য বিষয়ের মধ্যেও হয়। যেমন, দান, অসিয়ত এবং ওয়াকফ, যদি আমরা কবুল করাকে শর্ত করি। ২. কাজের দ্বারা সম্পাদিত। যেমন বৈধ বস্তুসমূহ গ্রহণ করা, শিকার করা, শিকার লালন-পালন করা।

যারকাশী রহ. উক্ত দুই প্রকারের মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা করে বলেন, প্রথম পার্থক্য হলো, ইচ্ছাকৃত ও বাধ্যগত মালিকানার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তা হলো, ইচ্ছাকৃত মালিকানার মধ্যে নির্দিষ্ট বিনিময় দ্বারা মালিকানা লাভ করা যায়। অথবা দায়িত্বে ঋণ রেখে তার দ্বারা মালিকানা লাভ করা যায়। নগদ মূল্য পরিশোধের ওপর তা নির্ভরশীল হয় না। এ বিষয়ে কোনো মতভেদও নেই। আর বাধ্যগত মালিকানা, যেমন শুফাআহর মাধ্যমে গ্রহণ করা। তাতে ক্রেতা শফীর নিকট থেকে মূল্য কব্জা না করা পর্যন্ত অথবা দুই মতের একটির ভিত্তিতে বিলম্বে মূল্য পরিশোধ করার ব্যাপারে রাজি না হওয়া পর্যন্ত শফী মালিক হতে পারবে না। বিশুদ্ধ মত হলো, উক্ত প্রক্রিয়ায় ক্রেতা বিলম্বে সম্মত না হলেও শফীর পক্ষে বিচারক ফয়সালা প্রদান করলে সে মালিকানা লাভ করতে পারে।

দ্বিতীয় পার্থক্য হলো, অন্যের মালিকানাধীন সম্পদ দখলের মাধ্যমে বাধ্যগত মালিকানা অর্জিত হয়। যেমন কাফেরদের সম্পদ দখল করলে তাতে মালিকানা সৃষ্টি হয়। কিন্তু ইচ্ছাকৃত মালিকানা এর বিপরীত।

তৃতীয় পার্থক্য হলো, বাধ্যগত মালিকানায় বস্তুটি দেখা বা এ জাতীয় শর্তসমূহ জানা থাকা শর্ত কি-না, তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। যেমনিভাবে শুফ‘আর ক্ষেত্রে মতবিরোধ বিদ্যমান। দুই মতের একটি অনুযায়ী সে জমির যে অংশ দেখেনি তা গ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু ইচ্ছাকৃত মালিকানার ক্ষেত্রে শর্তসমূহ জানা থাকা আবশ্যকীয়ভাবে শর্ত।

চতুর্থ পার্থক্য হলো, ইচ্ছাকৃত মালিকানায় যা ক্ষমাযোগ্য নয় তা বাধ্যগত মালিকানায় ক্ষমাযোগ্য। যেমন: ত্রুটির কারণে ফেরত দেওয়া, মুহরিম ব্যক্তি শিকার করা। ইচ্ছাকৃত মালিকানায় মালিক এ সব করার অধিকার রাখে না।

আল্লামা কারাফী রহ. বলেন: আলেমগণ মতভেদ করেছেন যে, মালিকানার কর্মগত কারণসমূহ শক্তিশালী, না-কি উক্তিগত কারণসমূহ। কেউ কেউ বলেছেন, কর্মগত কারণসমূহ অধিক শক্তিশালী। আবার কেউ কেউ বলেছেন, উক্তিগত কারণসমূহ অধিক শক্তিশালী।
কারাফী রহ. কারণদ্বয়ের মাঝে পার্থক্য বর্ণনা করে বলেন: অপ্রাপ্তবয়স্ক অবোধ শিশুর পক্ষ থেকে কর্মগত কারণসমূহ শুদ্ধ হবে, কিন্তু উক্তিগত কারণসমূহ শুদ্ধ হবে না। সুতরাং এ ধরনের বোধহীন লোক শিকার করার দ্বারা শিকারের মালিক হবে। আবাদ করার দ্বারা ভূমির মালিক হবে। অথচ সে বিক্রয়চুক্তি ও দানচুক্তি করার অধিকার রাখে না। এ পার্থক্যের কারণ, কর্মগত কারণসমূহ তার জন্য কল্যাণ ও উপকার বয়ে আনছে। পক্ষান্তরে উক্তিগত কারণসমূহ ধোঁকা ও প্রতারণার স্থান। যা তার জন্য অকল্যাণ ও ক্ষতি বয়ে আনে। এখানে আরেকটি দিক আছে যা প্রতারণা ও ধোঁকার প্রতি তাকে আকর্ষণ করে। কিন্তু সে জ্ঞান ও বুদ্ধিগাতভাবে দুর্বল, তাই সে নিজের কল্যাণ ও উপকার সন্ধান করতে পারে না।

টিকাঃ
২৭. আল-মানসূর ফিল কাওয়াইদ, খ. ৩, পৃ. ২৩১-২৩৩
২৮. আল-ফুরুক, খ. ১, পৃ. ২০৪

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ঘ. রহিত হওয়া না হওয়ার দিক থেকে মালিকানার প্রকারভেদ

📄 ঘ. রহিত হওয়া না হওয়ার দিক থেকে মালিকানার প্রকারভেদ


রহিত হওয়া বা না হওয়ার সম্ভাবনার দিক বিবেচনায় মালিকানা দুই ভাগে বিভক্ত: স্থায়ী ও স্থিতিশীল মালিকানা—যা চুক্তির ক্ষেত্র অথবা বিনিময় ধ্বংস হওয়ার দ্বারা রহিত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে না। যেমন: হস্তগত করার পর পণ্যের মূল্য এবং সহবাসের পর মহর ধ্বংস হলেও পণ্যে এবং স্ত্রীতে মালিকানা রহিত হবে না। আর অস্থায়ী মালিকানা—যা রহিত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। যেমন মুনাফা পূর্ণ প্রাপ্তির পূর্বে ভাড়া, পণ্য হস্তগত করার পূর্বে মূল্য (ধ্বংস হলে মালিকানা রহিত হয়।)

টিকাঃ
২৯. আল-মানসূর, খ. ৩, পৃ. ২৪০

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মালিকানা লাভের উপকরণসমূহ

📄 মালিকানা লাভের উপকরণসমূহ


মালিকানা লাভের অনেক উপকরণ ও মাধ্যম রয়েছে। ইবনে নুজাইম রহ. আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মালিকানা লাভের উপকরণগুলো নিম্নরূপ: আর্থিক বিনিময়সমূহ, দেনমোহর, খুলা (তালাকের বিনিময়ে অর্থ), উত্তরাধিকার, দান, সদকা, অসিয়ত, ওয়াকফ, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, বৈধ সম্পদে আধিপত্য লাভ, ভূমি আবাদ, শর্ত সাপেক্ষে রাস্তায় পাওয়া সম্পদের মালিকানা, নিহত ব্যক্তির রক্তমূল্য যার সে প্রথম মালিক হবে, অতঃপর তা উত্তরাধিকারীদের মালিকানায় স্থানান্তরিত হবে।

মালিকানার একটি মাধ্যম হলো গুররা (গর্ভের সন্তান) অর্থাৎ গর্ভবতী মায়ের ভ্রূণের রক্তমূল্য। প্রথমে ভ্রূণ তার মালিক হয়, এরপর তাতে উত্তরাধিকার কার্যকর হবে। অপহরণকারী যখন অপহরণকৃত বস্তুর মধ্যে ব্যাপক হস্তক্ষেপ করে এর নাম ও মূল উপকার বিনষ্ট করে ফেলে, সে এর মালিক হয়ে যায়। তদ্রূপ সমজাতীয় বস্তুর একটিকে আরেকটির সঙ্গে মিলিয়ে ফেললে—যার ফলে পার্থক্য করা যায় না—তাহলেও সে এর মালিক বনে যাবে।

ইমাম হাসকাফী রহ. উল্লেখ করেছেন, মালিকানা লাভের কারণ তিনটি: ১. মালিকানা স্থানান্তরকারী, যেমন বিক্রয় ও দান; ২. প্রতিনিধিত্ব, যেমন উত্তরাধিকার; ৩. মৌলিকত্ব, তা বাস্তবে কোনো বস্তুতে কর্তৃত্ব লাভ করার দ্বারা অর্জিত হয়; কিংবা হুকমী বা অপ্রকৃতভাবে অর্জিত হয় প্রস্তুতি গ্রহণ করার দ্বারা; যেমন, শিকার করার জন্য জাল পাতা।

কেফায়া গ্রন্থের বরাত দিয়ে আল্লামা সুয়ূতী রহ. উল্লেখ করেন, মালিকানা লাভের উপকরণ আটটি : উত্তরাধিকার, পারস্পরিক বিনিময়, দান, অসিয়ত, ওয়াকফ, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, ভূমি আবাদ, অনুদান।

ইবনুস সুবকী রহ. বলেন, আরো কিছু উপকরণ রয়েছে। যেমন: শর্ত সাপেক্ষে রাস্তায় পাওয়া বস্তুর মালিকানা। নিহত ব্যক্তির রক্তমূল্য যা প্রথমে নিহত ব্যক্তির মালিকানায় আসে। অতঃপর তা উত্তরসুরীদের কাছে স্থানান্তর হয়। এটি হলো বিশুদ্ধতম মত। এজন্য রক্তমূল্যের অর্থ থেকে নিহত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করা হয়। বিশুদ্ধতম মত অনুযায়ী গর্ভবতী মায়ের ভ্রূণ রক্তমূল্যের মালিকানা লাভ করবে। অপহরণকারী অপহরণকৃত সম্পদকে নিজের সম্পদের সাথে মিশিয়ে ফেলা অথবা অন্যের সম্পদের সাথে এমনভাবে মিলিয়ে ফেলা যা পার্থক্য করা যায় না। এটিও তার মালিকানা লাভকে আবশ্যক করবে। বিশুদ্ধ মতানুসারে অতিথি যা ভক্ষণ করে সে তার মালিকানা লাভ করে। সে কি তার সামনে খাবার রাখার দ্বারা মালিকানা লাভ করে, না-কি মুখে রাখার দ্বারা, না-কি খাবার স্পর্শ করার দ্বারা, না-কি মলন করার দ্বারা মালিকানা লাভ হয়, খাওয়ার সামান্য পূর্বে মালিকানা লাভ হয়? এ সকল অভিমতই রয়েছে।

টিকাঃ
৩০. ইবনে নুজাইম রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের; পৃ. ৩৪৬, ইবনে আবেদীন রচিত টীকা, খ. ৫, পৃ. ২৯৮
৩১. সুয়ূতী রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩১৭; ইবনে নুজাইম রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৪৬-৩৫০

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মালিকানা লাভে প্রযোজ্য শর্তাবলি

📄 মালিকানা লাভে প্রযোজ্য শর্তাবলি


মালিকানায় আরোপিত হয় এমন কিছু শর্ত—যা উপকরণ বা ব্যবহার অথবা স্থানান্তরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তদ্রূপ এমন কিছু শর্ত রয়েছে যা দায়িত্বশীল এবং চুক্তি সম্পাদনকারীর প্রতি আরোপিত হয়।

প্রথম: মালিকানার উপকরণের ওপর আরোপিত শর্তাবলি
শরীয়তে মালিকানা লাভের উপকরণসমূহে বৈধ হওয়ার শর্ত রয়েছে, প্রকাশ্যভাবে তা শরীয়তসম্মত হতে হবে, যেমন খুশি নয়। এ কারণেই নিষিদ্ধ উপকরণসমূহ যথা : চুরি, অপহরণ, আত্মসাৎ, জুয়া অথবা সুদ ইত্যাদি মালিকানা লাভের উপকরণ ও মাধ্যম নয়। তাই শরীয়ত হারাম উপকরণ ও মালিকানার মাঝে পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে; এবং কঠিনভাবে অবৈধ মাধ্যম গ্রহণ করতে বারণ করেছে। আর সকল মুমিনের প্রতি দাবি রেখেছে যেন তাদের সম্পদ বৈধ এবং উত্তম হয়। এ প্রসঙ্গে অসংখ্য আয়াত ও হাদীস অবতীর্ণ হয়েছে। তন্মধ্যে একটি আয়াত:
لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ
“তোমরা পরস্পর অন্যায়ভাবে নিজেদের সম্পদ ভোগ করো না। তবে তোমাদের পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে যদি ব্যবসা হয় তাহলে কোন অসুবিধা নেই।”

উক্ত আয়াতের মধ্যে সন্তুষ্টি ও সম্মতি ছাড়া কারো সম্পদ ভোগ করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ উত্তম আহার গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করে বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَاشْكُرُوا لِلَّهِ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ
“হে মুমিনগণ! তোমরা আমার দেওয়া উত্তম রিজিক ভক্ষণ করো এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো—যদি তোমরা শুধু তারই ইবাদাত করো।”

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ স. বলেন:
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا ، وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِينَ بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِينَ فَقَالَ : { يَا أيُّهَا الرُّسُلِ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ } وَقَالَ { يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ } ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُل يُطِيلِ السَّفَرَ أَشْعَتْ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ : يَا رَبِّ يَا رَبِّ ، وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ ، وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ ، فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ
“হে লোকসকল! আল্লাহ উত্তম, তিনি কেবল উত্তমটি পছন্দ করেন, তিনি মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যা নবীগণকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘হে রাসূলগণ! তোমরা উত্তম আহার গ্রহণ করো এবং সৎকাজ করো, নিশ্চয় আমি তা জানি যা তোমরা করো’। তিনি আরো বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ভক্ষণ করো ঐ উত্তম রিজিক থেকে যা আমি তোমাদেরকে দান করেছি’। অতঃপর এমন এক ব্যক্তির আলোচনা করলেন, যে দীর্ঘ সফর করে, যার ধুলোমাখা এলোমেলো চুল, যে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, হে প্রতিপালক! হে প্রতিপালক! অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, সে হারামের দ্বারা পরিপুষ্ট। এ অবস্থায় এই ব্যক্তির দোয়া কিভাবে কবুল হবে?”

টিকাঃ
৩২. সূরা নিসা, আয়াত ২৯
৩৩. সূরা বাকারা, আয়াত ১৭২
৩৪. সূরা মুমিনূন, আয়াত ৫১
৩৫. সূরা বাকারা, আয়াত ১৭২
৩৬. হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, খ. ২, পৃ. ৭০৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00