📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ইসলামে মালিকানার মর্যাদা

📄 ইসলামে মালিকানার মর্যাদা


ইসলাম মালিকানা রক্ষা করেছে, তাই মালিকানায় সীমালঙ্ঘন করা অবৈধ সাব্যস্ত করেছে। এর সপক্ষে অনেক প্রমাণ রয়েছে। প্রমাণ হলো আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী:
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِل
“তোমরা পরস্পর অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাৎ করো না।”
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِل
“হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায় ভাবে আত্মসাৎ করো না।”

রাসূলুল্লাহ স.-এর হাদীস:
إِنْ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ حَرَامٌ عَلَيْكُمْ
“তোমাদের একের জান, মাল ও সম্মান তোমাদের অপরের জন্য হারাম।”

তিনি আরো বলেন:
أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنْ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ ، وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ ، وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّ الْإِسْلَامِ ، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ
“আমাকে মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে আদেশ করা হয়েছে, যে পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, মুহাম্মদ সা. আল্লাহর রাসূল, নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত প্রদান করে। তারা যদি উক্ত কার্যসমূহ সম্পাদন করে তাহলে তারা আমার থেকে তাদের প্রাণের ও সম্পদের নিরাপত্তা লাভ করবে; তবে ইসলামের অধিকারের ব্যাপারটি ব্যতিক্রম; তাদের হিসাব আল্লাহর কাছে হবে।”

ইমামুল হারামাইন বলেন, গ্রহণযোগ্য সূত্র হলো, মালিকগণ স্বীয় মালিকানায় স্বতন্ত্র অধিকারী। তাই যথাযথ অধিকার ছাড়া মালিক হিসেবে অন্য কেউ তার সম্পদে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। প্রয়োজনের তাগিদে সম্পদের মালিকগণ তাতে বিনিময় করে থাকেন। সুতরাং অধিকার ছাড়া অন্যের সম্পদ দখল, আধিপত্য বিস্তার বা হস্তক্ষেপ হারাম, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন: ‘ব্যক্তি তার সন্তান, পিতা এবং সকল মানুষের তুলনায় স্বীয় সম্পদের বেশি অধিকার রাখে।’

ইসলাম সম্পদের মালিকানা লাভ করাকে (আল্লাহর) প্রতিনিধিত্ব এবং প্রতিপালকের দানরূপে সাব্যস্ত করেছে। কারণ, সম্পদের প্রকৃত মালিক হলেন মহান আল্লাহ তাআলা। তবে তিনি মানুষকে মালিকানার অধিকার লাভ করার সুযোগ দিয়েছেন এবং সম্পদে তাকে প্রতিনিধি সাব্যস্ত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন:
وَأَنْفِقُوا مِمَّا جَعَلَكُمْ مُسْتَخْلَفِينَ فِيهِ
“তিনি তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী বানিয়েছেন তা থেকে খরচ করো।”

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন:
وَأَتُوهُمْ مِنْ مَالِ اللَّهِ الَّذِي آتَاكُمْ
“তিনি তোমাদেরকে যে সম্পদ দান করেছেন তোমরা তা থেকে প্রদান করো”।

উপরিউক্ত অর্থের সমর্থনে অনেক আয়াত রয়েছে। আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, তোমাদের সামনে বিদ্যমান সম্পদসমূহ সৃষ্টিগতভাবে আল্লাহর সম্পদ। তিনি তোমাদেরকে কেবল তা ব্যবহার করার ক্ষমতা প্রদান করেছেন। তিনি তোমাদেরকে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে প্রতিনিধি বানিয়েছেন। তাই এই সকল সম্পদ প্রকৃতপক্ষে তোমাদের সম্পদ নয়। সম্পদে তোমাদের রয়েছে প্রতিনিধির অবস্থান। তাই মহান আল্লাহ সম্পদের মধ্যে ফকীর, মিসকিন, আত্মীয়স্বজন প্রমুখের জন্য অনেক অধিকার ফরয করেছেন।

টিকাঃ
৬. সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮
৭. সূরা নিসা, আয়াত: ২৯
৮. হাদীস: বুখারী, (বরাত ফাতহুল বারী, খ. ১০, পৃ. ৭-৮), মুসলিম (খ. ৩, পৃ. ১৩০৫-১৩০৬) যা আবি বকরা রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের একাংশ।
৯. হাদীস: বুখারী, (বরাত ফাতহুল বারী, খ. ১, পৃ. ৭৫) যা ইবনে উমর রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের একাংশ।
১০. ইমামুল হরামাইন রচিত আল-গায়াছা, পৃ. ৪৯৪-৪৯৫, তাহকীক: আব্দুল আজিম আদদীব, কাতার
১১. মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ২৯, পৃ. ১৮৯; রিয়াদ
১২. সূরা হাদীদ, আয়াত ৭
১৩. সূরা নূর, আয়াত ৩৩
১৪. তাফসীরুল কাশশাফ, খ. ৪, পৃ. ৬১ আল্লামা যামখশারী কর্তৃক রচিত, প্রকাশক: মুস্তফা হালবী

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মালিকানার প্রকারসমূহ

📄 মালিকানার প্রকারসমূহ


বিভিন্ন দিক বিবেচনায় মালিকানা কয়েক প্রকার:
মালিকানার প্রকৃতিগত বিবেচনায়: হয়তো পূর্ণাঙ্গ মালিকানা অথবা অপূর্ণাঙ্গ মালিকানা।
মালিকানা দ্বারা উপকৃত ব্যক্তির বিবেচনায়: হয়তো সাধারণ মালিকানা অথবা বিশেষ মালিকানা।
মালিকানার কারণের বিবেচনায়: হয়তো ইচ্ছাকৃত মালিকানা অথবা বাধ্যগত মালিকানা।
মালিকানা রহিত হওয়ার সম্ভাবনার বিবেচনায়: হয়তো স্থায়ী মালিকানা অথবা অস্থায়ী মালিকানা।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ক. প্রকৃতিগত বিবেচনায় মালিকানার প্রকারভেদ

📄 ক. প্রকৃতিগত বিবেচনায় মালিকানার প্রকারভেদ


প্রকৃতিগত বিবেচনায় মালিকানা পূর্ণাঙ্গ ও অপূর্ণাঙ্গ মালিকানারূপে বিভক্ত হয়। পূর্ণাঙ্গ মালিকানা হলো মূলবস্তু ও মুনাফা উভয়টির মালিকানা। আর অপূর্ণাঙ্গ মালিকানা হলো কেবল সত্তার মালিকানা অথবা কেবল মুনাফার মালিকানা অথবা শুধু উপকৃত হওয়ার মালিকানা।

ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, পূর্ণাঙ্গ মালিকানার ক্ষেত্রে মালিক তার বস্তু বিক্রি ও দান করা ইত্যাদি করতে পারে, বস্তুর উত্তরাধিকারী হতে পারে। তার মুনাফার মধ্যে ধার ও ভাড়া প্রদানের মাধ্যমে কর্তৃত্ব প্রকাশ এবং অন্যান্য উপকার লাভ করতে পারে।

কতক ফিক্‌হবিদ অপূর্ণাঙ্গ মালিকানাকে দুর্বল মালিকানারূপে ব্যক্ত করেছেন। যারকাশী রহ. বলেন, মালিকানা দুই প্রকার: পূর্ণাঙ্গ ও দুর্বল। আর পূর্ণাঙ্গ মালিকানা লাভের পর মালিকানাধীন বস্তুতে সর্বপ্রকার হস্তক্ষেপ করা যায়। আর দুর্বল মালিকানা উপরিউক্ত মালিকানার বিপরীত। এক্ষেত্রে ‘অসম্পূর্ণ’ পরিভাষাও ব্যবহার করা হয়েছে।

মালিকানার ক্ষেত্রে মূল হলো পূর্ণাঙ্গ মালিকানা। অপূর্ণাঙ্গ মালিকানা হলো তার বিপরীত। যেমনিভাবে মালিকানা শরীয়তসম্মত করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মালিকানাধীন সকল বস্তু দ্বারা উপকৃত হওয়া, তাই মুনাফা ছাড়া বস্তুর মালিকানা অপূর্ণাঙ্গ মালিকানারূপে গণ্য হবে। যেমন: এক লোকের জন্য শুধু বস্তুর মুনাফার অসিয়ত করা অথবা এক লোকের জন্য কোনো বস্তুর সত্তা আর অন্য লোকের জন্যে মুনাফার অসিয়ত করা।

মুনাফা বা উপকারের মালিকানা হলো একটি পরিব্যাপ্ত বিষয়। ভাড়া প্রদানের ক্ষেত্রে ভাড়া গ্রহণকারীর জন্য উক্ত মালিকানা সাব্যস্ত হয়। ধারে প্রদানের ক্ষেত্রে ধার গ্রহণকারীর জন্য সাব্যস্ত হয়। শুধু মুনাফার অসিয়তের ক্ষেত্রেও সাব্যস্ত হয়। ওয়াক্কের ক্ষেত্রে সাব্যস্ত হয়—যা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ বিষয়। এমন খারাজী ভূমির খারাজ দ্বারা মুনাফা সাব্যস্ত হয় যা তার দখলে আছে। ইবনে শুবরুমা এবং ইবনে আবী লায়লা ব্যতীত সকল ফকীহের মতে মুনাফার অসিয়ত করা জায়েয। উপকার লাভের মালিকানার বিষয়টি মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী সকল ফিকহবিদ উল্লেখ করেছেন। যদিও এর বিধানসমূহের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তারা মতভেদ করেছেন।

হাম্বলী ফিক্সবিদ ইবনে রজব রহ. মালিকানাকে চার ভাগে বিভক্ত করেছেন:
১. মূল সম্পদ ও মুনাফা উভয়টির মালিকানা,
২. মুনাফা ছাড়া মূল সম্পদের মালিকানা,
৩. মূল সম্পদ ছাড়া মুনাফার মালিকানা,
৪. মুনাফার মালিকানা ছাড়া শুধু উপকৃত হওয়ার অধিকার।

অতঃপর তিনি বলেন:
প্রথম প্রকার : সাধারণ মালিকানা—যা মালিকানাধীন মূল সম্পদে মালিকানা লাভের কারণ। যেমন: বিক্রয়, দান, উত্তরাধিকার ইত্যাদির মাধ্যমে অর্জন।
দ্বিতীয় প্রকার : মুনাফা ছাড়া কেবল বস্তুর মালিকানা।
তৃতীয় প্রকার : মূল বস্তুর মালিকানা ছাড়া মুনাফার মালিকানা লাভ করা। এটি সর্বসম্মত ভাবে প্রমাণিত। এ ধরনের মালিকানা দু প্রকার :
প্রথম : স্থায়ী মালিকানা। এর অধীনে কয়েকটি রূপ বিদ্যমান। এক. মুনাফার অসিয়ত করা। দুই. ওয়াক্ফ্ফ; যার নিকট ওয়াকফ করে দেওয়া হয়েছে মুনাফা ও ফলসমূহ তার মালিকানায় দেওয়া। তিন. খারাজী ভূমি।
দ্বিতীয় : অস্থায়ী মালিকানা। যার একটি হলো ভাড়ায় প্রদান। দ্বিতীয়টি হলো বিক্রির ঐ মুনাফা যা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিক্রয়-চুক্তি হতে বাদ দেওয়া হয়েছে।
চতুর্থ প্রকার : কেবল উপকৃত হওয়ার সুযোগ ও অধিকার। এরও রয়েছে বিভিন্ন রূপ ও ধরন।
এক: ধারে গ্রহণকারীর মালিকানা, সে উপকৃত হওয়ার অধিকার রাখে, কিন্তু মুনাফার মালিক হতে পারে না। তবে ইমাম আহমদের মত, ইবনে মানসূরের বর্ণনা অনুযায়ী, ঐ ব্যক্তি মুনাফার মালিক হতে পারবে।
দুই: প্রতিবেশীর বাড়িতে কাঠ বা পথ ইত্যাদি রাখা। প্রতিবেশীর মালিকানা থেকে উপকারভোগী উক্ত কাজটি যদি সন্ধির মাধ্যমে করে তাহলে এটি ইজারা বা ভাড়া প্রদান বলে গণ্য হবে।
তিন. সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা। যেমন: বাজারে বসার স্থান ব্যবস্থা করা।
চার. দখল লাভের পূর্বে অমুসলিম দেশের খাবার। মুসলিম সেনাদল প্রয়োজন অনুসারে তা দ্বারা উপকৃত হতে পারবে। তার সাথে তুলনীয় কুরবানীর গোশত খাওয়া, ঝুলন্ত ফল খাওয়া ইত্যাদি।
পাঁচ. মেহমান কর্তৃক মেজবানের খাবার খাওয়া। এটি নিরেট বৈধ।

মালেকী ফিক্‌হবিদ আল্লামা কারাফী রহ. উপকারভোগের মালিকানা (مِلْكُ الانْتِفَاعِ) ও মুনাফার মালিকানার (مِلْكُ الْمَنْفَعَةِ) মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা করে বলেন, উপকারভোগের মালিকানার অর্থ সে কেবল নিজে ভোগ্যবস্তু ব্যবহার করতে পারবে। আর মুনাফার মালিকানা ব্যাপক ও সাধারণ অর্থজ্ঞাপক। তাই সে নিজেও তা ব্যবহার করতে পারে এবং বিনিময় গ্রহণ করে যেমন, ভাড়ায় প্রদান অথবা বিনিময় গ্রহণ না করে যেমন, ধারে প্রদানের মাধ্যমে অন্যকেও ভোগ্যবস্তু থেকে উপকারভোগ করার জন্যে তা দিতে পারবে।
প্রথমটি অর্থাৎ স্বয়ং উপকারভোগের মালিকানার উদাহরণ বিদ্যালয়ের ও অশ্বশালার, আবাসস্থান, মসজিদ ও বাজারের বৈঠক, হজের স্থানসমূহ যেমন, তাওয়াফের স্থান, সাঈ করার স্থান ইত্যাদি; এগুলোর শুধু সে নিজে উপকারভোগ করতে পারবে। পক্ষান্তরে মুনাফার মালিক যেমন, ভাড়ায় বাড়ি গ্রহণকারী অথবা ধারে বাড়ি গ্রহণকারী ব্যক্তি উক্ত বাড়ি অন্যের নিকট ভাড়া দিতে পারবে। অথবা বিনিময় ছাড়া অন্যকে বসবাসের সুযোগ দিতে পারবে। মালিকগণ যেরূপ আচরণ করে সেও এই মুনাফার মধ্যে সেরূপ আচরণ করতে পারবে।

উপকারভোগের অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট চারটি মাসআলা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
প্রথম: বিবাহ, এটি উপভোগের মালিকানা ও সুযোগ প্রদান করে, তাতে মুনাফার মালিকানা প্রদান করা হয় না।
দ্বিতীয়: বিনিময়হীন প্রতিনিধিত্ব : এটি উপকারভোগের সুযোগ প্রদানের অন্তর্ভুক্ত, মুনাফার মালিকানা প্রদানের আওতাভুক্ত নয়। পক্ষান্তরে বিনিময়সহ প্রতিনিধিত্ব ভাড়া প্রদানের আওতাভুক্ত।
তৃতীয়: মুদারাবা (একজনের অর্থ এবং অপরজনের শ্রম দেওয়ার মাধ্যমে অংশীদারী ব্যবসা), মুসাকাত (একজনের পরিচর্যা এবং অপরজনের ভূমি প্রদানের ভিত্তিতে বাগানে অংশীদারী), এবং মুগারাসা (একজনের বৃক্ষরোপণ এবং অপরজনের ভূমি দানের ভিত্তিতে অংশীদারিত্ব)। এক্ষেত্রে মালিক শ্রমিক থেকে কেবল ভোগ করার অধিকার রাখে, মুনাফার মালিকানা লাভ করতে পারে না। যার প্রমাণ হলো মালিক স্বীয় শ্রমিক থেকে যা লাভ করে তা অন্যকে কোন কিছুর বিনিময় হিসাবে প্রদান করার অধিকার রাখে না। এমনিভাবে যাকে ইচ্ছা ভাড়ায় প্রদানের অধিকারও তার নেই। বরং মুদারাবার শর্ত অনুযায়ী কেবল নিজে ভোগ করায় সীমাবদ্ধ থাকতে হয়।
চতুর্থ: যদি কোনো ব্যক্তি এই শর্তে ওয়াক্ফ করে যে, তাতে সে বাস করবে অথবা তাতে বসবাস করা হবে। এ ছাড়া বাড়তি কিছু না বলে, তাহলে বাহ্যত বোঝা যায়, ওয়াকফকারী ওয়াকফ করে যার হাতে দেবে সে লোককে আবাসন দ্বারা উপকৃত হওয়ার অধিকারী বানাবে। মুনাফার মালিক বানাবে না। তাই সে নিজে বসবাস না করে অন্যের কাছে ভাড়া দিতে পারবে না।

শাফেয়ী ফিকহবিদগণ মুনাফার মালিকানা (مَلْكَ الْمُنْفَعَة) যেমন: ভাড়া গ্রহণকারী এবং উপভোগের সুযোগ (مُلْكُ الْاِنْتِفَاعِ) যেমন: ধারে গ্রহণকারীর মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে বলেন, মুনাফার মালিক ইজারা ও আরিয়া (ভাড়ায় ও ধারে প্রদান করা) উভয়টির অধিকার লাভ করে। আর যার উপভোগের সুযোগ আছে তার কোনোভাবেই ভাড়া প্রদানের অধিকার নেই। এবং বিশুদ্ধ মতানুসারে ধারে প্রদানেরও অধিকার নেই।

এমন কিছু মাসআলায় ফিকহবিদগণ মতবিরোধ করেছেন যেগুলো কোনো কোনো ফিক্‌হবিদের মতে উপভোগের মালিকানার সাথে সংশ্লিষ্ট, অন্য ফিক্‌হবিদগণের মতে উক্ত মালিকানার সাথে সংশ্লিষ্ট নয়; বরং মুনাফার মালিকানার সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন ধারে প্রদান। এ ক্ষেত্রে ইমাম কারখী ছাড়া হানাফী সকল ফিক্‌হবিদ এবং মালেকী ফিক্‌হবিদগণের মাযহাব, যা হাম্বলীদের একটি মত, তা হলো ধারে প্রদান করার অর্থ হলো বিনিময় ছাড়া কাউকে মুনাফার মালিক বানিয়ে দেওয়া। আর এজন্য তারা ফিক্‌হবিদ কর্তৃক প্রণীত শর্ত সাপেক্ষে ধারে গ্রহণকারীর জন্য ধারকৃত বস্তুটি অন্যত্র ধার প্রদান অনুমোদন করেছেন। শাফেয়ী ফকীহদের মাযহাব, যা হাম্বলী ফিকহবিদগণের বিশুদ্ধ মাযহাব এবং ইমাম কারখীর মতে ধারে প্রদান হলো ভোগের মালিক বানিয়ে দেওয়া।

পূর্ণ মালিকানা ও অপূর্ণ মালিকানার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য
পূর্ণ মালিকানা এবং অপূর্ণ মালিকানার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। যার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপ:
প্রথম: পূর্ণ মালিকানাধারী ব্যক্তির শরীয়তসম্মত সকল লেনদেন করার অধিকার আছে। তাই যে সকল চুক্তি পূর্ণ মালিকানা বা অপূর্ণ মালিকানা সৃষ্টি করে সে সবই তার করার অধিকার আছে। শরীয়তের সীমারেখা অতিক্রম না করে যাবতীয় লেনদেনের ক্ষেত্রে সে স্বাধীন। পক্ষান্তরে অপূর্ণ মালিকানাধীন লোকের পক্ষে সব ধরনের লেনদেন করার অধিকার নেই। সে কেবল মুনাফা উপভোগের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ। কেননা সে একই সাথে সত্তার এবং মুনাফার মালিক নয়।
দ্বিতীয়: পূর্ণ মালিকানার স্থায়িত্ব। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পূর্ণ মালিকানা হলো স্থায়ী, যা নিঃশেষ হয় না। তবে শরীয়তসম্মত অকাট্য কারণে নিঃশেষ হতে পারে। এমনিভাবে তাতে সময় নির্ধারণ করা জায়েয নয়। আর এজন্যই বিক্রয় এবং এ ধরনের পূর্ণ মালিকানা সৃষ্টিকারী চুক্তিসমূহে সাময়িকীকরণ জায়েয নেই। তাই এমনটি বলা যাবে না যে, এক বছরের জন্য তোমার নিকট আমি এই বাড়িটি বিক্রি করলাম। তবে যদি উক্ত বাক্য দ্বারা ভাড়া প্রদান করা বোঝায় তাহলে উক্ত অর্থেই প্রযোজ্য হবে। কারণ চুক্তির ক্ষেত্রে লক্ষ্য ও অর্থই বিবেচ্য, শব্দ ও বর্ণ বিবেচ্য নয়।
অপূর্ণ মালিকানা হলো ঐ সকল চুক্তি যেগুলো মুনাফা কেন্দ্রিক, তাতে সময় নির্ধারণ করা আবশ্যক। যেমন ভাড়া প্রদান, ধারে প্রদান ইত্যাদি। এগুলোতে সময় ও স্থান এবং উপভোগের ধরন ইত্যাদির শর্ত আরোপিত হওয়ার অবকাশ আছে।

টিকাঃ
১৫. মাজমূউল ফাতাওয়া, খ. ২৯, পৃ. ১৭৮
১৬. আল-মানসুর, খ. ৩, পৃ. ২৩৮
১৭. ইবনে নুজাইম রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩১৫, সুয়ূতী রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৭৯, ইবনে রজব রচিত আল-কাওয়াইদ, পৃ. ১৯৫-১৯৬
১৮. প্রাগুক্ত
১৯. ইবনে রজব রচিত আল-কাওয়াইদ, পৃ. ২০৮-২১০
২০. কারাফী রচিত আল-ফুরুক, খ. ১, পৃ. ১৮৭-১৮৮, বৈরুতের দারুল মারেফা কর্তৃক মুদ্রিত আল-ফুরুকের টীকা: তাহজীবুল ফুরুক, খ. ১, পৃ. ১৯৩-১৯৫
২১. মিসরের আল-মাকতাবা আত-তিজারিয়া কর্তৃক মুদ্রিত শরহুল মানহাজ-এর হাশিয়াতুল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ৪৫২-৪৫৩; সুয়ূতী রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩২৬
২২. ইবনে নুজাইম রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৫২; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৭, পৃ. ২৮০; কারাফী রচিত আল-ফুরুক, খ. ১, পৃ. ১৮৭; ইবনে আরাফা রচিত হুদুদের ব্যাখ্যাগ্রন্থ, পৃ. ৩৪৫; কাশশাফুল কিনা, খ. ২, পৃ. ৩৩৬; আল-ইনসাফ, খ. ৬, পৃ. ১১৪; জুমালের টীকা, খ. ৩, পৃ. ৪৫২-৪৫৩
২৩. প্রাগুক্ত; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৪১৩
২৪. সুয়ূতী রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৯; ইবনে নুজাইম রচিত আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ২৭
২৫. ইবনে আবেদীনের টীকা, খ. ৫, পৃ. ১৯, ৩; হাশিয়া দুস্কীসহ আশ-শারহুল কাবীর, খ. ২১, পৃ. ২; বায়যাবী রচিত আল-গায়াতুল কাসওয়া, খ. ২, পৃ. ৬১৯; দারুল ইসলাহ কর্তৃক মুদ্রিত ইবনে কুদামা রচিত আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৪৩৪

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 খ. উপকারভোগী ব্যক্তির বিবেচনায় মালিকানার প্রকারভেদ

📄 খ. উপকারভোগী ব্যক্তির বিবেচনায় মালিকানার প্রকারভেদ


উপকারভোগী ব্যক্তির বিবেচনায় মালিকানাকে বিশেষ মালিকানা ও সাধারণ মালিকানা রূপে ভাগ করা যায়। বিশেষ মালিকানা হলো যার নির্দিষ্ট মালিক আছে, তা ব্যক্তি হোক বা গোষ্ঠী। আর সাধারণ মালিকানা হলো যার কোনো নির্দিষ্ট মালিক নেই। তাতে অনির্দিষ্ট ভাবে বহু লোক অংশ নিয়ে থাকে। যেমন: পানি, ঘাস ও আগুনের মালিকানা। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ স. বলেন:
الْمُسْلِمُونَ شُرَكَاء فِي ثَلَاثَ فِي الْكَلأَ وَالْمَاءِ وَالنَّارِ
“সকল মুসলমান তিন বস্তুতে অংশীদার : ঘাস, পানি এবং আগুনে।”

টিকাঃ
২৬. হাদীস: আবু দাউদ, (খ. ৩, পৃ. ৭৫১) যা জনৈক মুহাজির সাহাবীর হাদীসের একাংশ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00