📄 অংশীদার, উকীল ও মুদারিব কর্তৃক বাকিতে বিক্রি
শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহদের মাযহাব হচ্ছে, এমন ব্যক্তির বাকিতে বিক্রি করা বৈধ হবে না যার অন্যের সম্পদে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা আবশ্যক; যেমন মুদারাবার মধ্যে পুঁজির মালিক, বিক্রির জন্য প্রতিনিধি নিয়োগকারী, ব্যবসার সম্পদের অংশীদার ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া যথাক্রমে মুদারিব-কর্মী, উকীল এবং ব্যবসার সম্পদের অপর অংশীদার ব্যক্তি বাকিতে বিক্রি করতে পারবে না। তাকে অনুমতি প্রদান করা হলে বৈধ হবে।
মেয়াদ নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি না করা আবশ্যক। যদি তাতে কোনো সময় নির্ধারণ করা হয় তাহলে তা অনুসরণ করা হবে। আর যদি নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ না করা হয়, তাহলে যদি প্রচলন ও সাধারণ রীতি থাকে, তাহলে সে অনুপাতে সময় ধর্তব্য হবে; অন্যথায় কল্যাণের দিক বিবেচনা করবে। আর যদি এধরনের ব্যক্তিকে ক্রয়-বিক্রয়ের অনুমতি প্রদান করা হয়, তাহলে বাকিতে বিক্রয়কালে তার সাক্ষী রাখা আবশ্যক। যেমনিভাবে আস্থাভাজন ব্যক্তি হলেই কেবল তার সাথে বাকিতে ক্রয়-বিক্রয় করা আবশ্যক।
যদি উল্লিখিত ব্যক্তির সাথে আর্থিক লেনদেনের ব্যাপারটি শর্তহীন ও সাধারণ রাখা হয়, তাহলে তার জন্য বাকিতে বিক্রি জায়েয নেই। যদিও তা স্বাভাবিক মূল্য অপেক্ষা অধিক হয়। কারণ শর্তহীন হওয়ার চাহিদা হলো নগদ হওয়া। যেহেতু এটিই সাধারণত হয়ে থাকে।
তবে হাম্বলী ফকীহগণ শর্তহীনভাবে উল্লেখ করার ক্ষেত্রে উকীল (প্রতিনিধি) এবং মুদারিব কর্মী ও অংশীদারের মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা করে বলেন, যদি বাকি অথবা নগদের শর্ত ছাড়া সাধারণভাবে অনুমতি প্রদান করা হয়, তাহলে উকীল কর্তৃক বাকিতে বিক্রি করা বৈধ হবে না। আর মুদারাবা-কর্মী ও অংশীদার কর্তৃক বাকিতে বিক্রি করা বৈধ হওয়া প্রসঙ্গে দুই ধরনের বর্ণনা রয়েছে।
একটি বর্ণনা হলো, তাদের জন্য এরূপ করা বৈধ হবে না। কারণ বিক্রির ক্ষেত্রে তারা দুইজনই প্রতিনিধি। তাই এ বিষয়ে স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া তাদের দুই জনেরও উকীলের ন্যায় বাকিতে বিক্রি করা বৈধ হবে না। কারণ, প্রতিনিধির জন্য কেবল সাবধানতার ভিত্তিতে লেনদেন করা বৈধ। আর বাকিতে বিক্রির ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতারণার আশঙ্কা রয়েছে। আর অবস্থার প্রাসঙ্গিকতা শর্তহীন বক্তব্যকে শর্তযুক্ত করে দেয়। সুতরাং বিষয়টি এমন হলো যেন সে বলেছে, নগদ বিক্রি করো।
অপর বর্ণনাটি হলো, মুদারিব-কর্মী এবং ব্যবসার অংশীদারের জন্য বাকিতে বিক্রি করা বৈধ। কারণ মুদারাবা ও ব্যবসার ক্ষেত্রে অনুমতি বলে সাধারণ ব্যবসার অনুমতি বুঝানোই ব্যবসায়ীদের অভ্যাস। সেই সাথে এর দ্বারা লাভ উদ্দেশ্য। আর বাকিতেই লাভ অধিক হয়ে থাকে। এবং সাধারণ ওকালত থেকে মুদারাবা কর্মী ও অংশীদারের বিক্রি ভিন্ন ও আলাদা হবে। কারণ ওকালত লাভের উদ্দেশ্যের সাথে নির্ধারিত নয়। বরং তাতে কেবল উদ্দেশ্য হল মূল্য লাভ করা। সুতরাং যদি (বাকির) ঝুঁকি ছাড়া মূল্য লাভ করা সম্ভব হয় তাহলে তা উত্তম হবে। তা ছাড়া বিক্রির ক্ষেত্রে শর্তহীন ওকালত (দায়িত্ব অর্পণ) এ কথা সাব্যস্ত করে যে, উকীল নিয়োগকারীর নগদ মূল্যের প্রয়োজন; অতএব তাতে বিলম্ব করা বৈধ হবে না। পক্ষান্তরে মুদারাবার বিষয়টি ভিন্ন (তাতে লাভই উদ্দেশ্য। তাই তাতে বাকি বিক্রি বৈধ।) তাই যদি সে তাকে বলে, তুমি তোমার বিবেচনা মতো কাজ করো, তাহলে সে বাকিতে বিক্রি করতে পারবে। কারণ ব্যাপকার্থক শব্দে অনুমতি এবং তার অবস্থার প্রাসঙ্গিকতা সব ধরনের বিক্রয় এবং ব্যবসার মধ্যে তার বিবেচনার প্রতি অন্যপক্ষের সন্তুষ্ট হওয়া প্রমাণ করে। আর এটিও যাবতীয় বিক্রির একটি। সুতরাং যদি আমরা বলি, সে বাকিতে বিক্রি করতে পারবে তাহলে বিক্রি শুদ্ধ হবে। এরপর সে মূল্য হাতছাড়া হলে তার জরিমানা প্রদান করা আবশ্যক হবে না। তবে যদি আস্থাভাজন নয় বা অপরিচিত ব্যক্তির নিকট বিক্রির মাধ্যমে সীমালঙ্ঘন করে তাহলে ক্রেতা মূল্য থেকে যতটুকু কম দেবে ততটুকুর জরিমানা প্রদান করা তার আবশ্যক হবে। আর যদি বলি, তার বাকিতে বিক্রি করার অধিকার নেই, তাহলে বিক্রি অকার্যকর হবে। কারণ সে এমন কাজ করেছে যে কাজের তাকে অনুমতি প্রদান করা হয়নি। সুতরাং এটি অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তির বিক্রির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে।
উকীল (অর্থাৎ দায়িত্বপ্রাপ্ত লোক)-কে যদি মুদ্রার বিনিময়ে অথবা নগদ বিক্রির জন্য মোতায়েন করা হয়, তাহলে তার বিপরীত করা তার জন্য বৈধ নয়। আর যদি শর্তহীনভাবে তাকে মোতায়েন করা হয় তাহলে তা নগদ বিক্রির জন্য সাব্যস্ত হবে। কারণ বিক্রির ক্ষেত্রে নগদই মূল।
উকীল-এর বিষয়টি মুদারাবা থেকে দুইভাবে ভিন্নতা রাখে : প্রথমত: মুদারাবা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো লাভ ও মুনাফা। নগদ মূল্য পরিশোধ করার দ্বারা প্রয়োজন পূরণ করা উদ্দেশ্য নয়। পক্ষান্তরে ওকালত (দায়িত্বপ্রদান)-এর দ্বারা কখনও নগদ প্রয়োজন পূরণ করা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে যা বিলম্বে মূল্য পরিশোধ করার দ্বারা হাতছাড়া হতে পারে। দ্বিতীয়ত: মুদারাবার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মূল্য আদায় করা কর্মীর দায়িত্ব। সুতরাং আদায়ের ক্ষেত্রে বিলম্বের ক্ষতি তার ঘাড়ে আসবে। পক্ষান্তরে ওকালত এর বিপরীত, উকীল নিয়োগকারী ক্ষতির দায় বহন করতে রাজি হয় না। তা ছাড়া মুদারাবাতে মূল্য ধ্বংসের দায় কর্মীর ওপর বর্তাবে। কারণ, লাভ ও মুনাফা থেকে মূল্যকে হিসাব করে কর্তন করা হয়। এভাবে মুনাফার মাধ্যমে মূলধন সংরক্ষিত রাখা হয়। আর ওকালতের ক্ষেত্রে (মূল্য ধ্বংসের) দায় উকীল নিয়োগকারীর উপর বর্তায়। সুতরাং একটিকে অপরটির সাথে যুক্ত করা যাবে না। আর যদি কোনো পণ্য বাকিতে বিক্রির জন্য তাকে উকীল বানায়, অতঃপর সে উক্ত পণ্যটি নগদে বিক্রি করে, তাহলে তার বিক্রি কার্যকর হবে না। কারণ সে নিয়োগদাতার নির্দেশ অমান্য করেছে। কেননা নিয়োগদাতা বাকি মূল্যেই সন্তুষ্ট, নগদ মূল্যে নয়।
আর যদি বাকির সমান মূল্যে নগদে পণ্যটি বিক্রি করে অথবা উকীলকে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়, অতঃপর সে নগদে ঐ নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করে তাহলে কাযী ইয়ায বলেন, তার বিক্রি শুদ্ধ হবে। কারণ সে আরো ভালো করেছে। তাই প্রথা অনুযায়ী উকীল তার অনুমতিপ্রাপ্ত হবে। যেমন পণ্যের মালিক তাকে পণ্যটি দশের বিনিময়ে বিক্রির জন্য উকীল নিয়োগ করে, অতঃপর সে দশের অধিক মূল্যে তা বিক্রি করলে তার অনুমতিপ্রাপ্ত হবে।
তাই এ বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। সুতরাং যদি বাকিতে বিক্রির ক্ষেত্রে নিয়োগদাতার কোন স্বার্থ না থাকে তাহলে বিক্রি শুদ্ধ হবে। আর যদি বাকিতে বিক্রির ক্ষেত্রে তার স্বার্থ থাকে, যেমন বর্তমানে মূল্য সংরক্ষণে তার ক্ষতি হওয়া অথবা মূল্য ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা, ডাকাতের ভয় বা মেয়াদ আসা পর্যন্ত মূল্যের অবস্থায় পরিবর্তন হওয়া। তাহলে সে হবে অনুমোদনহীন ব্যক্তির মতো। কারণ নগদের বিধান ঐ বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে না যে বিষয়ে নীরবতা পালন করা হয়েছে। তবে যদি জানতে পারে যে, এটি স্বার্থ ও কল্যাণের দিক থেকে আলোচিত বিষয়ের মতো অথবা তার চেয়ে ভালো, তাহলে সতর্কতামূলক বা সাদৃশ্যের দিক থেকে এক্ষেত্রেও বিধানটি সাব্যস্ত হবে। যদি আলোচিত বিষয়ে বিশেষ কোনো স্বার্থ থাকে তাহলে তা হাতছাড়া করা জায়েয হবে না। এবং তা বাদ দিয়ে অন্য ক্ষেত্রে বিধান সাব্যস্ত হবে না।
আর হানাফী ফকীহগণ বলেন, শর্তহীনভাবে উল্লেখ করার ক্ষেত্রে মুদারাবার কর্মী, ব্যবসার অংশীদার ও বিক্রির উকীল (দায়িত্বপ্রাপ্ত)-এর বাকিতে বিক্রি করা জায়েয, যদি সর্বজনবিদিত মেয়াদে বাকি বিক্রি হয়। কারণ শর্তহীন ওকালত (দায়িত্বপ্রদান) প্রয়োজন পূরণ করার জন্য প্রথাজাত নিয়ম এবং লেনদেন দ্বারা শর্তযুক্ত হয়ে থাকে। অতএব শর্তহীন উকীল লেনদেনের বিভিন্ন অবস্থা দ্বারা শর্তযুক্ত হবে। আর প্রথাগত নিয়ম হলো নগদ বিক্রি অথবা সর্বজনবিদিত মেয়াদে বিক্রি। আর ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন, বিক্রির পর মূল্যকে বিলম্বিত করা উকীলের জন্য জায়েয নেই। আর মুদারাবার কর্মী কর্তৃক মূল্য বিলম্বিত করা জায়েয, যদিও তা বিক্রির পর হয়। কারণ সে ইকালা বা বিক্রি বাতিলকরণের অধিকার রাখে। পক্ষান্তরে বিক্রির উকীলের সে অধিকার নেই।
টিকাঃ
১৩. তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৬, পৃ. ৯৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২২২, ২১৪, ৩১৫; আল-মুহাল্লা শারহুল মিনহাজ, খ. ২, পৃ. ৫৬, ৩৩৫, ৩৪১; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৩৯
১৪. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৩৯
১৫. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৪০
১৬. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৩৪
১৭. আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৩৪-১৩৫
১৮. প্রাগুক্ত
১৯. তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ২৭০, খ. ৫, পৃ. ৬৮; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৩, পৃ. ৩৪৫
২০. তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৫, পৃ. ৬৮