📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দ্বিতীয়ত : নাকদ (النَّقْدُ)-এর অর্থ সোপর্দ করা

📄 দ্বিতীয়ত : নাকদ (النَّقْدُ)-এর অর্থ সোপর্দ করা


পণ্য সোপর্দ করার পূর্বে মূল্য নগদ পরিশোধ:
বিভিন্ন ধরনের চুক্তিতে ভিন্নতার কারণে বিধান ভিন্ন ভিন্ন হয়।
সরফ (الصرف) (অর্থাৎ মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা বিক্রি) এবং মুকায়াযাহ (الْمُقَايَضَة) (অর্থাৎ পণ্যের বিনিময়ে পণ্য বিক্রি)-এর ক্ষেত্রে কোনো একজনের প্রথমে মূল্য পরিশোধ করা আবশ্যক নয়। কারণ, এক্ষেত্রে একজন অপরজনের তুলনায় অধিক দায়বদ্ধ নয়। আর যদি তারা উভয়ে মতবিরোধ করে, তাহলে তাদের দুইজনের মাঝে অপর একজন ন্যায় বিচারককে সালিস রূপে নির্ধারিত করা হবে যিনি তাদের দুইজনের নিকট থেকে হস্তগত করে অপরজনের কাছে তা পরিশোধ করবে। তবে সালাম বিক্রি (অর্থাৎ যে বিক্রিতে অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করা হয়)-এর ক্ষেত্রে প্রথমে মূল্য পরিশোধ করা আবশ্যক, যেমনটি পূর্বে বলা হয়েছে।
আর আল-বায়‘উল মুতলাক (البيع الْمُطْلَق) অর্থাৎ মুদ্রার বিনিময়ে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে প্রথমে কে পরিশোধ করবে তা নিয়ে ফকীহগণের ব্যাখ্যা ও মতবিরোধ রয়েছে। বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্রষ্টব্য: تسلیم ও ثَمَن এবং مُقَايَضَة

টিকাঃ
১৫. আল-ইখতিয়ার লি তালিলিল মুখতার, খ. ২, পৃ. ৮; হাশিয়াতুদ দুসূকী আলাশ শারহিল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ১৪৭; আল-কালয়ুবী আলা শারহিল মিনহাজ, খ. ২, পৃ. ২১৮

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 খিয়ারুন নকদ (خِيَارُ النَّقْدِ)

📄 খিয়ারুন নকদ (خِيَارُ النَّقْدِ)


খিয়ারুন নকদ হলো চুক্তিসম্পন্নকারী দুই ব্যক্তির মধ্যে একজন অপরজনের ওপর শর্ত বেঁধে দেওয়া যে, যদি সে নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে মূল্য পরিশোধ না করে তাহলে তাদের মাঝে চুক্তি থাকবে না। এ শর্তটি কোনো সময় বিক্রেতার স্বার্থে আরোপিত হয়, আবার কখনও ক্রেতার স্বার্থে আরোপিত হয়।
উক্ত শর্তের বৈধতার ব্যাপারে ফকীহগণ মতবিরোধ করেছেন। হানাফী ও হাম্বলী ফকীহগণ এটি বৈধ মনে করেন। এটি শাফেয়ী ফকীহগণের বিশুদ্ধ মতের পরিপন্থী একটি মত। এর কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, উমর রা. উক্ত মত গ্রহণ করেছেন এবং কাজী শুরাইহ উক্ত মতানুসারে বিচার করেছেন। দ্বিতীয়ত ক্রেতা মূল্য পরিশোধ করার ব্যাপারে স্বীয় সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বিক্রেতারও এ বিষয়টি জানা প্রয়োজন যে, ক্রেতা মূল্য পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলেও অথবা মূল্য পরিশোধ করতে বাহানা করলেও তাকে পণ্য দিতে হবে কি-না।

মালেকী ফকীহগণের মতে শায়েখ উলাইশ বলেন: আমার জানামতে উক্ত মাসআলায় সাতটি মত রয়েছে: প্রথম: শুরুতেই এই বিক্রি মাকরূহ। তবে যদি এটি সংঘটিত হয় তাহলে বিক্রি শুদ্ধ হবে, আর শর্ত বাতিল হয়ে যাবে। এটিই হল মুদাউওয়ানা গ্রন্থের অভিমত। দ্বিতীয়: বিক্রি বাতিল। তৃতীয়: বিক্রি বৈধ এবং শর্তও বৈধ। তামবিহাত নামক গ্রন্থে কাজী ইয়াজ (عياض) উক্ত মতগুলো বর্ণনা করেছেন।
চতুর্থ: তার নিম্নোক্ত এ দু কথার বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে: যদি তুমি আমার নিকট মূল্য নিয়ে আস এবং যদি তুমি আমার নিকট মূল্য নিয়ে না আস।
সুতরাং যদি সে বলে আমি তোমার নিকট এই শর্তে বিক্রি করব, যদি তুমি মূল্য নিয়ে আস তাহলে আমার ও তোমার মাঝে বিক্রি হবে, তবে মূল্য নগদ পরিশোধ করতে হবে। এভাবে যেন সে এটিকে চূড়ান্ত বিক্রি মনে করছে এবং বিলম্বে মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে বিক্রয় বাতিল করার ইচ্ছা করছে। তাই শর্ত বাতিল হবে এবং নগদ মূল্য পরিশোধ করতে হবে। আর যদি বলে, যদি তুমি আমার নিকট মূল্য না নিয়ে আস তাহলে যেন তাদের উভয়ের মাঝে বিক্রয় চুক্তি সংঘটিত হয়নি, তবে যদি সে মূল্য নিয়ে আসে (তাহলে বিক্রি সংঘটিত হবে)। সুতরাং নগদ মূল্য পরিশোধে তাকে বাধ্য করা হবে না। তবে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত বাধ্য করা যাবে।
পঞ্চম: ক্রেতাকে আটকে রাখবে। অতঃপর যদি সে নগদ মূল্য পরিশোধ করে তাহলে বিক্রয় কার্যকর হবে; অন্যথায় তা প্রত্যাখ্যান করা হবে।
ষষ্ঠ: যে সব পণ্যে ত্বরিৎ পরিবর্তন ঘটে না সে সব পণ্যে এরূপ বৈধ। আর যে সব পণ্যে ত্বরিৎ পরিবর্তন ঘটে সে সব পণ্যে এরূপ মাকরূহ।
সপ্তম: মেয়াদ হয়তো এক মাস উল্লেখ করা হলো, তাহলে এটির বিধান অশুদ্ধ বিক্রির বিধানের মতো হবে, যা ইবনুল কাসিমের বরাত দিয়ে ইবনে লুবাবা তামবিহাত নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।

শাফেয়ী ফকীহগণের নিকট বিশুদ্ধ মত হলো, উক্ত চুক্তি বাতিল। কারণ উক্ত শর্ত খিয়ারের শর্ত নয়। বরং তা বিক্রয় অশুদ্ধকারী শর্ত। কারণ সে বিক্রির মধ্যে সাধারণ শর্ত করেছে। তাই এটি নিম্নের বিষয়ের সাথে তুলনীয় হয়ে গেল। তা হলো এই শর্তে বিক্রি করা যে, যদি যায়েদ আগমন করে তাহলে তাদের দুইজনের মধ্যে কেনাবেচা হবে না। হানাফী ফকীহ ইমাম যুফার রহ. এরূপই বলেছেন। বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্রষ্টব্য: خيار النقد

টিকাঃ
১৬. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়‍্যা, খ. ৩, পৃ. ৩৯; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৫০২; বাদায়েউস সানায়ে’, খ. ৫, পৃ. ১৭৫; আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৫৩১; আল-মাজমু, খ. ৯, পৃ. ১৯৩
১৭. ফাতহুল আলী আল-মালেক, খ. ১, পৃ. ৩৫৩
১৮. আল-মাজমু, খ. ৯, পৃ. ১৯৩; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ৩৯; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৫০২; বাদায়েউস সানায়ে’, খ. ৫, পৃ. ১৭৫

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 তৃতীয়ত : নাকদ (النَّقْدُ)-এর অর্থ জাল মুদ্রা থেকে সঠিক মুদ্রা পৃথক করা

📄 তৃতীয়ত : নাকদ (النَّقْدُ)-এর অর্থ জাল মুদ্রা থেকে সঠিক মুদ্রা পৃথক করা


ব্যবসায়ী কর্তৃক মুদ্রা চেনা
ইমাম গাযালী রহ. ইহয়াউ উলুমিদ্দীন গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ব্যবসায়ীর মুদ্রা চেনা আবশ্যক। এটি শিক্ষা করা, জানা নিজের জন্য নয়। বরং সে যেন নিজের অজান্তে মুসলিমের নিকট জাল মুদ্রা অর্পণ করা থেকে নিরাপদ থাকতে পারে। সুতরাং এই বিদ্যা অর্জনে অবহেলার কারণে পাপী হবে। কারণ, যে কোনো আমল শিক্ষা করার দ্বারা মুসলিমদের প্রতি অনুগ্রহ করা হয়ে থাকে, তা অর্জন করা আবশ্যক। এ সব কারণে পূর্ববর্তী মনীষীগণ মুদ্রার চিহ্নসমূহ শিক্ষা করতেন ধর্মের স্বার্থে, পার্থিব স্বার্থে নয়।

টিকাঃ
১৯. ইহয়াউ উলুমিদ্দীন, খ. ৪, পৃ. ৭৭৮; মুদ্রণ: দারুশ শায়াব

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মুদ্রা পরখকারীর পারিশ্রমিক

📄 মুদ্রা পরখকারীর পারিশ্রমিক


মূল্য ও মুদ্রা পরখকারীর পারিশ্রমিক কার দায়িত্বে থাকবে তা নিয়ে ফকীহগণ মতভেদ করেছেন:
মালেকী ফকীহগণের মাযহাব, যা হানাফী ফকীহগণের বিশুদ্ধ মত, তা হলো, এটি ক্রেতার দায়িত্বে থাকবে। হানাফী ফকীহগণের এ মতের ওপরই ফতোয়া। এবং এটি জাহির রেওয়ায়াতের ভাষ্য। কারণ সঠিক মুদ্রা মূল্য হিসাবে হস্তান্তর করা তার জন্য আবশ্যক। আর পরীক্ষা ব্যতীত ভালো হওয়ার বিষয়টি জানা সম্ভব না। যেমন পরিমাপের দ্বারা পরিমাণ জানা যায়। যদি হস্তগত করার পূর্বে পরখ করা হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে উক্ত নিয়ম প্রযোজ্য হবে। পক্ষান্তরে পণ্য হস্তগত করার পর হলে মুদ্রা পরীক্ষা করার খরচ বিক্রেতার ওপর ধার্য করা হবে।
আর শাফেয়ী ফকীহগণের মাযহাব হলো মুদ্রা পরীক্ষার খরচ বিক্রেতার ওপর আরোপিত হবে। হাম্বলী ফকীহগণ বলেন, মুদ্রা পরীক্ষার পারিশ্রমিক যে তা খরচ করবে তার ওপর আরোপিত হবে। সে বিক্রেতা হোক কিংবা ক্রেতা হোক। বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্রষ্টব্য: ثَمَن ও بَيْع

টিকাঃ
২০. শরহু ফাতহিল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ১০৮; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৫৬০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৩; শরহুল মুনতাহা, খ. ২, পৃ. ১৯১-১৯২; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ২৮; আশ-শারহুল কাবীর মায়া হাশিয়া আদ-দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ১৪৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00