📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দুই প্রকার চুক্তি এরূপ চুক্তি থেকে ভিন্ন হবে

📄 দুই প্রকার চুক্তি এরূপ চুক্তি থেকে ভিন্ন হবে


প্রথম প্রকার: যে ক্ষেত্রে নগদ পরিশোধ করা আবশ্যক:
ক. সোনা বা রুপার বিনিময়ে সোনা বা রুপা বিক্রি শুদ্ধ হবে, যদি উভয় পক্ষ থেকে নগদ সোপর্দ করা হয়। তা না করে কেউ যদি বাকিতে বিক্রি করে অথবা চুক্তির বৈঠকের পর পরিশোধ করে তাহলে শুদ্ধ হবে না। কারণ রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন:
الذَّهَبُ بِالذَّهَبِ ، وَالْفِضَّةُ بِالْفِضَّةِ ، وَالْبُرُّ بِالْبُرِّ ، وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ ، وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ ، وَالْمِلْحُ بِالْمِلْحِ ، مثلاً بِمِثْلٍ ، سَوَاءً بِسَوَاءِ ، يَدًا بَيْدٍ ، فَإِذَا اخْتَلَفَتْ هَذِهِ الْأَصْنَافُ فَبِيعُوا كَيْفَ شِئْتُمْ ، إِذَا كَانَ يَدًا بِيَدِ
“স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, লবণের বিনিময়ে লবণ, সমান সমান করে নগদ বিক্রি করতে হবে। যদি এ সব বস্তুর শ্রেণী পরিবর্তন হয় তাহলে তোমরা তোমাদের ইচ্ছামতো বিক্রি করতে পারবে, যদি তা নগদ বিক্রি করো।” এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্রষ্টব্য: ربا ও صرف
কতিপয় ফকীহের মতে ফুলুস (الفلوس) (অর্থাৎ স্বর্ণ ও রৌপ্য ব্যতীত অন্য সিলযুক্ত মুদ্রা)-কে এই বিধানে সোনা এবং রুপার সাথে যুক্ত করা হবে। অবশ্য কিছু ফকীহের মতে ফুলুস-এর মধ্যে সুদ নেই। বিস্তারিত জানতে দেখুন: صرف

খ. অধিকাংশ ফকীহের মতে সালাম (যে বিক্রিতে মূল্য অগ্রিম পরিশোধ করা হয়) বিক্রি শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত হলো, চুক্তির বৈঠকে মূল্য পরিশোধ করা। এর কারণ, যদি মূল্য প্রদানে কেউ বৈঠক থেকে বিলম্ব করে তাহলে তা বাকির বিনিময়ে বাকি বিক্রি সাব্যস্ত হবে। রাসূলুল্লাহ স. নিম্নোক্ত হাদীসটিতে তা থেকে নিষেধ করেছেন: قَدْ نَهَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ بَيْعِ الْكَالِئِ بِالْكَالِئِ নবী স. বাকির বিনিময়ে বাকি বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।
মালেকী ফকীহগণ হস্তগত করার ক্ষেত্রে এক, দুই, তিন দিনের বিলম্ব বৈধ ঘোষণা করেছেন। এ সম্পর্কে মালেকীগণের বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে। দেখুন: سلم

গ. বিক্রীত পণ্যের মূল্য, পারিশ্রমিক, ধারে নেয়া বস্তু ইত্যাদির বিনিময়ে দায়িত্বে সাব্যস্ত হওয়া দেনা দেনাদার ব্যক্তি ছাড়া অন্য ব্যক্তির নিকট বিক্রি করা বৈধ হবে না। তবে দেনাদার ব্যক্তির নিকট বিক্রি করা বৈধ হবে। এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো, চুক্তির বৈঠক থেকে তারা দুইজন পৃথক হওয়ার পূর্বে ক্রেতা কর্তৃক মূল্য পরিশোধ করা—যদি তা এমন বস্তুর বিনিময়ে বিক্রি করা হয় যা বাকিতে বিক্রি করা যায় না। কারণ ইবনে উমর রা.-এর হাদীসে আছে, তিনি বলেন, আমি বললাম:
يَا رَسُولَ اللَّهِ ، إِنِّي أَبِيعُ الإِبِلَ بِالْبَقِيعِ فَأَبِيعُ بِالدَّنَانِيرِ وَآخُذُ الدَّرَاهِمَ ، وَأَبِيعُ بِالدَّرَاهِمِ وَآخُذُ الدُّنَانِيرَ ، أَخُذُ هَذِهِ مَنْ هَذِهِ ، وَأُعْطِى هَذِهِ مِنْ هَذِهِ ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ " لَا بَأْسَ أَنْ تَأْخُذَهَا بِسِعْرٍ يَوْمِهَا مَا لَمْ تَفْتَرِقَا وَبَيْنَكُمَا شَيْءٌ
“হে আল্লাহর রাসূল, আমি বাকী নামক বাজারে উট বিক্রি করি, আমি দীনারের বিনিময়ে বিক্রি করে দিরহাম গ্রহণ করি। এবং দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করি এবং দীনার গ্রহণ করি। এভাবে আমি এটির বিনিময়ে ওটি গ্রহণ করি এবং এটির বিনিময়ে ওটি প্রদান করি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ স. বললেন, যদি তোমাদের দুই জনের মধ্যে কোনো কথা অবশিষ্ট রেখেই তোমরা পৃথক হয়ে যাবে, এমন না হয়, তাহলে ঐ দিনের দর অনুযায়ী গ্রহণ করলে কোনো সমস্যা নেই।”
সুতরাং এটি এ কথা প্রমাণ করে যে, দেনাদার ব্যক্তির নিকট যে মুদ্রা পাওনা আছে, পাওনাদার কর্তৃক সেই মুদ্রার বিনিময়ে অপর মুদ্রা বিক্রি করা (অর্থাৎ একটির পরিবর্তে অপরটি প্রদান করা) জায়েয হবে—যদি নগদ বিক্রি হয়। এমনিভাবে বিক্রির সাথে অন্য লেনদেনের তুলনা করা হবে। যদি চুক্তির বৈঠকে তা হস্তগত না করা হয় তাহলে শুদ্ধ হবে না। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ এবং মতভেদের জন্য দ্রষ্টব্য: صرف ও دين

দ্বিতীয় প্রকার: যেখানে নগদের বাধ্যবাধকতা অসম্ভব:
ক. ভুলক্রমে হত্যা এবং ইচ্ছাকৃত হত্যার সাথে তুলনীয় হত্যার রক্তমূল্য এ প্রকারের আওতাভুক্ত। কারণ তিন বছরের প্রতি বছরের শেষে এক-তৃতীয়াংশ রক্তমূল্য হত্যাকারী ব্যক্তির দায়িত্বশীলদের ওপর ওয়াজিব হবে। এর কারণ, বর্ণিত আছে, ইবনে উমর এবং আলী রা. অনুরূপ বিচার করেছেন। তাদের কোনো বিরোধিতাকারী ছিল বলে জানা নেই। সুতরাং তাতে ইজমার বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়।

খ. খিয়ারুশ শরত (অর্থাৎ শর্তের ভিত্তিতে বিক্রয়চুক্তি চূড়ান্ত করা বা বাতিল করার ক্ষমতা) থাকাকালীন সময়ে নগদ মূল্য পরিশোধ করা। ফকীহগণ এ কথায় একমত, খিয়ারুশ শর্ত (خيار الشرط) বিশিষ্ট বিক্রির ক্ষেত্রে নগদ মূল্য পরিশোধ করা ক্রেতার জন্য আবশ্যক নয়। বরং বিলম্বে পরিশোধ করাও তার জন্য বৈধ। কারণ বিক্রি বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ইচ্ছা করলে নগদ মূল্য পরিশোধ করাও তার জন্য বৈধ হবে। তবে এটি বিক্রয়চুক্তি চূড়ান্ত করা বা বাতিল করার ক্ষমতা রহিত করবে না।

গ. মালেকী ফকীহগণ মতপোষণ করেন, যদি খিয়ারবিশিষ্ট বিক্রির মধ্যে বিক্রেতা ক্রেতাকে নগদ মূল্য পরিশোধ করার শর্ত প্রদান করে, তাহলে বিক্রি বাতিল হয়ে যাবে। কারণ ক্রেতা যা নগদ পরিশোধ করবে তা দোদুল্যমান থাকবে; যদি চুক্তি বাতিল হয়ে যায় তাহলে এটি ঋণ হবে; আর যদি বাতিল না হয় তাহলে এটি মূল্য হবে। পক্ষান্তরে যদি বিনা শর্তে স্বেচ্ছায় নগদে মূল্য পরিশোধ করে তাহলে চুক্তি বাতিল হবে না।
মালেকী ফকীহগণ এমন কিছু অবস্থা বর্ণনা করেছেন যেগুলো এটির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং এতে নগদ মূল্য পরিশোধ করার শর্ত করা যায় না। যদি নগদ প্রদত্ত মূল্যটি বিনিময় অথবা ঋণ হওয়ায় দোদুল্যমান হয় তাহলে তা নিষিদ্ধ হবে। কারণ এটি হবে এমন ঋণ যা দ্বারা উপকার লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে। উক্ত অবস্থাসমূহের কিছু উদাহরণ:
যদি চাষ করার জন্য কেউ স্বীয় ভূমি ভাড়ায় প্রদান করে, আর উক্ত ভূমিতে পানির সরবরাহে সে নিশ্চিত না হয়, বরং এ ব্যাপারে সন্দেহ থেকে যায়, যেমন ঐ সমস্ত ভূমি যা বৃষ্টির পানিতে সিক্ত হয়। সে ভূমি চাষ করাকালে যদি সিক্ত হয় তাহলে নগদ প্রদত্ত অর্থ ভাড়া হবে। আর যদি উক্ত ভূমি সিক্ত না হয় তাহলে নগদ প্রদত্ত অর্থ হবে ঋণ।
যদি কেউ কোনো নির্দিষ্ট শ্রমিক ভাড়া করে, আর সে এক মাস পর কাজ আরম্ভ করে, তাহলে যদি পারিশ্রমিক নগদ প্রদান করার শর্ত করে, তাহলে ইজারা বাতিল হয়ে যাবে। কারণ এক্ষেত্রে শ্রমিক মারা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাহলে প্রদত্ত অর্থ হবে ঋণ এবং শ্রমিক নিরাপদ থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে, তাহলে উক্ত অর্থ হবে পারিশ্রমিক।
মালেকী ফকীহগণের মতে সে ক্ষেত্রেও নগদ পরিশোধ করা নিষিদ্ধ, যে ক্ষেত্রে খিয়ার-এর দিনসমূহ অতিবাহিত হওয়ার পর তা হস্তগত করা হয়, যদিও তাতে কোনো শর্ত না করা হয় এবং যদিও মূল্যটি এমন বস্তু হয় যা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না, অর্থাৎ মূল্যটি সমজাতীয় বস্তু হয়। এক্ষেত্রে নিষেধের কারণ হলো পরবর্তী সময়ে যা দায়িত্বে আবশ্যক হবে তা বাতিল করা। তারা এর অনেক উদাহরণ উল্লেখ করেছেন।
যেমন: খিয়ারের মেয়াদ শেষে আরোহণের জন্য যদি কেউ কোনো বাহন ভাড়া করে, তা নির্দিষ্ট হোক কিংবা অনির্দিষ্ট, তাহলে কোনোভাবেই উক্ত বাহনের ভাড়া নগদ পরিশোধ বৈধ হবে না। কারণ যদি খিয়ারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে ভাড়াকে শর্তযুক্ত করে, তাহলে ভাড়ায় গ্রহণকারী ব্যক্তি ভাড়া প্রদানকারী ব্যক্তির দায়িত্বে থাকা তার মূল্যকে এমন বস্তুর বিনিময়ে বাতিল করল যা সে এখনই নিয়ে নিতে পারছে না। বরং খিয়ারের মেয়াদ শেষান্তে নিতে পারবে। কারণ শুরুতে হস্তগতকরণ শেষে হস্তগতকরণের সমতুল্য নয়।

ঘ. কমিশনের ক্ষেত্রে নগদ পরিশোধের শর্ত করা নিষিদ্ধ। তাই যদি নগদে পরিশোধ করার শর্ত করে, তাহলে মালেকী এবং শাফেয়ী ফকীহগণের মতে উক্ত শর্তের কারণে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি শর্ত করার কারণে নয়, বরং স্বেচ্ছামূলক নগদ পরিশোধ করে, তাহলে চুক্তি বাতিল হবে না। দ্রষ্টব্য: جعالة

টিকাঃ
৭. ‘স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য...’ এটি উবাদা বিন সামিতের বর্ণিত হাদীস, ইমাম মুসলিম (খ. ৩, পৃ. ১২১১, প্রকাশক: ঈসা আল হালাবী) কর্তৃক উদ্ধৃত।
৮. হাদীসটি ইমাম বায়হাকী কর্তৃক সুনান (খ. ৫, পৃ. ২৯০, মুদ্রণ দারুল মায়ারিফিল উছমানিয়া) এবং ইমাম হাকেম কর্তৃক মুসতাদরাক (খ. ২, পৃ. ৫৭, দায়েরাতুল মাআরিফ) গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে। ইবনে হাজার বুলুগুল মারামে (পৃ. ১৯৩, মুদ্রণ আব্দুল সাজীদ মাফনী) এ হাদীসটি দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন।
৯. রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২১৭; মুগনিল মুহতাজ শরহুল মিনহাজ, খ. ২, পৃ. ১০২; ইবনে কুদামা, আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ২৯৫, তৃতীয় মুদ্রণ; হাশিয়া দুসূকী আলাশ শারহিল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ১৯৫; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭২-৭৫
১০. হাদীস: সেই দিনের মূল্য অনুযায়ী পণ্য গ্রহণ করায় কোন সমস্যা নেই। হাদীসটি আবু দাউদ (খ. ৩, ৬৫০-৬৫১, মুদ্রণ: হিমস) কর্তৃক উদ্ধৃত হয়েছে। ইমাম বায়হাকী বর্ণনা করেছেন, এটি ইবনে উমরের মাওকূফ হাদীস হওয়ার কারণে শু‘বা হাদীসটিকে ত্রুটিপূর্ণ বলেছেন, যা ইবনে হাজার রহ. তাঁর তালখীস (খ. ৩, খ. ২৬, মুদ্রণ শারিকাতুত তিবাআতিল ফাননিয়া) গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
১১. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৮৮; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭০; হাশিয়াতুল কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ২১৪, শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২২২; আল-ফুরু, খ. ৪, পৃ. ২২, ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৪৪
১২. ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ৪১১; দুসুকী, খ. ৪, পৃ. ২৮৫; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৭, পৃ. ৩০১; আল-মুগনী মায়াশ শারহিল কাবীর, খ. ৯, পৃ. ৪৯২
১৩. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৪৯৯; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া, খ. ৩, পৃ. ৪২; আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৫১৮; আদ-দুসূকী আলাশ শারহিল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ৯৪, ৯৬-৯৮
১৪. আশ-শারহুল কাবীর ওয়া হাশিয়াতুদ দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ৯৬, নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৪৬৩

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দ্বিতীয়ত : নাকদ (النَّقْدُ)-এর অর্থ সোপর্দ করা

📄 দ্বিতীয়ত : নাকদ (النَّقْدُ)-এর অর্থ সোপর্দ করা


পণ্য সোপর্দ করার পূর্বে মূল্য নগদ পরিশোধ:
বিভিন্ন ধরনের চুক্তিতে ভিন্নতার কারণে বিধান ভিন্ন ভিন্ন হয়।
সরফ (الصرف) (অর্থাৎ মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা বিক্রি) এবং মুকায়াযাহ (الْمُقَايَضَة) (অর্থাৎ পণ্যের বিনিময়ে পণ্য বিক্রি)-এর ক্ষেত্রে কোনো একজনের প্রথমে মূল্য পরিশোধ করা আবশ্যক নয়। কারণ, এক্ষেত্রে একজন অপরজনের তুলনায় অধিক দায়বদ্ধ নয়। আর যদি তারা উভয়ে মতবিরোধ করে, তাহলে তাদের দুইজনের মাঝে অপর একজন ন্যায় বিচারককে সালিস রূপে নির্ধারিত করা হবে যিনি তাদের দুইজনের নিকট থেকে হস্তগত করে অপরজনের কাছে তা পরিশোধ করবে। তবে সালাম বিক্রি (অর্থাৎ যে বিক্রিতে অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করা হয়)-এর ক্ষেত্রে প্রথমে মূল্য পরিশোধ করা আবশ্যক, যেমনটি পূর্বে বলা হয়েছে।
আর আল-বায়‘উল মুতলাক (البيع الْمُطْلَق) অর্থাৎ মুদ্রার বিনিময়ে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে প্রথমে কে পরিশোধ করবে তা নিয়ে ফকীহগণের ব্যাখ্যা ও মতবিরোধ রয়েছে। বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্রষ্টব্য: تسلیم ও ثَمَن এবং مُقَايَضَة

টিকাঃ
১৫. আল-ইখতিয়ার লি তালিলিল মুখতার, খ. ২, পৃ. ৮; হাশিয়াতুদ দুসূকী আলাশ শারহিল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ১৪৭; আল-কালয়ুবী আলা শারহিল মিনহাজ, খ. ২, পৃ. ২১৮

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 খিয়ারুন নকদ (خِيَارُ النَّقْدِ)

📄 খিয়ারুন নকদ (خِيَارُ النَّقْدِ)


খিয়ারুন নকদ হলো চুক্তিসম্পন্নকারী দুই ব্যক্তির মধ্যে একজন অপরজনের ওপর শর্ত বেঁধে দেওয়া যে, যদি সে নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে মূল্য পরিশোধ না করে তাহলে তাদের মাঝে চুক্তি থাকবে না। এ শর্তটি কোনো সময় বিক্রেতার স্বার্থে আরোপিত হয়, আবার কখনও ক্রেতার স্বার্থে আরোপিত হয়।
উক্ত শর্তের বৈধতার ব্যাপারে ফকীহগণ মতবিরোধ করেছেন। হানাফী ও হাম্বলী ফকীহগণ এটি বৈধ মনে করেন। এটি শাফেয়ী ফকীহগণের বিশুদ্ধ মতের পরিপন্থী একটি মত। এর কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, উমর রা. উক্ত মত গ্রহণ করেছেন এবং কাজী শুরাইহ উক্ত মতানুসারে বিচার করেছেন। দ্বিতীয়ত ক্রেতা মূল্য পরিশোধ করার ব্যাপারে স্বীয় সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বিক্রেতারও এ বিষয়টি জানা প্রয়োজন যে, ক্রেতা মূল্য পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলেও অথবা মূল্য পরিশোধ করতে বাহানা করলেও তাকে পণ্য দিতে হবে কি-না।

মালেকী ফকীহগণের মতে শায়েখ উলাইশ বলেন: আমার জানামতে উক্ত মাসআলায় সাতটি মত রয়েছে: প্রথম: শুরুতেই এই বিক্রি মাকরূহ। তবে যদি এটি সংঘটিত হয় তাহলে বিক্রি শুদ্ধ হবে, আর শর্ত বাতিল হয়ে যাবে। এটিই হল মুদাউওয়ানা গ্রন্থের অভিমত। দ্বিতীয়: বিক্রি বাতিল। তৃতীয়: বিক্রি বৈধ এবং শর্তও বৈধ। তামবিহাত নামক গ্রন্থে কাজী ইয়াজ (عياض) উক্ত মতগুলো বর্ণনা করেছেন।
চতুর্থ: তার নিম্নোক্ত এ দু কথার বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে: যদি তুমি আমার নিকট মূল্য নিয়ে আস এবং যদি তুমি আমার নিকট মূল্য নিয়ে না আস।
সুতরাং যদি সে বলে আমি তোমার নিকট এই শর্তে বিক্রি করব, যদি তুমি মূল্য নিয়ে আস তাহলে আমার ও তোমার মাঝে বিক্রি হবে, তবে মূল্য নগদ পরিশোধ করতে হবে। এভাবে যেন সে এটিকে চূড়ান্ত বিক্রি মনে করছে এবং বিলম্বে মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে বিক্রয় বাতিল করার ইচ্ছা করছে। তাই শর্ত বাতিল হবে এবং নগদ মূল্য পরিশোধ করতে হবে। আর যদি বলে, যদি তুমি আমার নিকট মূল্য না নিয়ে আস তাহলে যেন তাদের উভয়ের মাঝে বিক্রয় চুক্তি সংঘটিত হয়নি, তবে যদি সে মূল্য নিয়ে আসে (তাহলে বিক্রি সংঘটিত হবে)। সুতরাং নগদ মূল্য পরিশোধে তাকে বাধ্য করা হবে না। তবে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত বাধ্য করা যাবে।
পঞ্চম: ক্রেতাকে আটকে রাখবে। অতঃপর যদি সে নগদ মূল্য পরিশোধ করে তাহলে বিক্রয় কার্যকর হবে; অন্যথায় তা প্রত্যাখ্যান করা হবে।
ষষ্ঠ: যে সব পণ্যে ত্বরিৎ পরিবর্তন ঘটে না সে সব পণ্যে এরূপ বৈধ। আর যে সব পণ্যে ত্বরিৎ পরিবর্তন ঘটে সে সব পণ্যে এরূপ মাকরূহ।
সপ্তম: মেয়াদ হয়তো এক মাস উল্লেখ করা হলো, তাহলে এটির বিধান অশুদ্ধ বিক্রির বিধানের মতো হবে, যা ইবনুল কাসিমের বরাত দিয়ে ইবনে লুবাবা তামবিহাত নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।

শাফেয়ী ফকীহগণের নিকট বিশুদ্ধ মত হলো, উক্ত চুক্তি বাতিল। কারণ উক্ত শর্ত খিয়ারের শর্ত নয়। বরং তা বিক্রয় অশুদ্ধকারী শর্ত। কারণ সে বিক্রির মধ্যে সাধারণ শর্ত করেছে। তাই এটি নিম্নের বিষয়ের সাথে তুলনীয় হয়ে গেল। তা হলো এই শর্তে বিক্রি করা যে, যদি যায়েদ আগমন করে তাহলে তাদের দুইজনের মধ্যে কেনাবেচা হবে না। হানাফী ফকীহ ইমাম যুফার রহ. এরূপই বলেছেন। বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্রষ্টব্য: خيار النقد

টিকাঃ
১৬. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়‍্যা, খ. ৩, পৃ. ৩৯; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৫০২; বাদায়েউস সানায়ে’, খ. ৫, পৃ. ১৭৫; আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৫৩১; আল-মাজমু, খ. ৯, পৃ. ১৯৩
১৭. ফাতহুল আলী আল-মালেক, খ. ১, পৃ. ৩৫৩
১৮. আল-মাজমু, খ. ৯, পৃ. ১৯৩; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ৩৯; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৫০২; বাদায়েউস সানায়ে’, খ. ৫, পৃ. ১৭৫

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 তৃতীয়ত : নাকদ (النَّقْدُ)-এর অর্থ জাল মুদ্রা থেকে সঠিক মুদ্রা পৃথক করা

📄 তৃতীয়ত : নাকদ (النَّقْدُ)-এর অর্থ জাল মুদ্রা থেকে সঠিক মুদ্রা পৃথক করা


ব্যবসায়ী কর্তৃক মুদ্রা চেনা
ইমাম গাযালী রহ. ইহয়াউ উলুমিদ্দীন গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ব্যবসায়ীর মুদ্রা চেনা আবশ্যক। এটি শিক্ষা করা, জানা নিজের জন্য নয়। বরং সে যেন নিজের অজান্তে মুসলিমের নিকট জাল মুদ্রা অর্পণ করা থেকে নিরাপদ থাকতে পারে। সুতরাং এই বিদ্যা অর্জনে অবহেলার কারণে পাপী হবে। কারণ, যে কোনো আমল শিক্ষা করার দ্বারা মুসলিমদের প্রতি অনুগ্রহ করা হয়ে থাকে, তা অর্জন করা আবশ্যক। এ সব কারণে পূর্ববর্তী মনীষীগণ মুদ্রার চিহ্নসমূহ শিক্ষা করতেন ধর্মের স্বার্থে, পার্থিব স্বার্থে নয়।

টিকাঃ
১৯. ইহয়াউ উলুমিদ্দীন, খ. ৪, পৃ. ৭৭৮; মুদ্রণ: দারুশ শায়াব

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00