📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ঋণ

📄 ঋণ


কীমী বস্তু ঋণ দেওয়া যাবে কি-না, তা নিয়ে ফকীহদের মাঝে যথেষ্ট মতপার্থক্য হয়েছে। হানাফী মাযহাবের আলেমদের অভিমত হচ্ছে, জীবজন্তু জমিজমা এবং আরো যে সকল বস্তুর একটির অপরটি থেকে ভিন্নতা ও ব্যবধান রয়েছে, এগুলোর কোনোটি কর্জ দেওয়া জায়েয নয়। কর্জ বা ঋণে দুটি দিক রয়েছে: এক. সূচনায় ঋণ হচ্ছে ধারপ্রদান, তাই তা ধার দেওয়ার কথা বলেই প্রদান করা জায়েয। দুই. শেষ পর্যায়ে ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে মূলত প্রদত্ত হচ্ছে বিনিময়। কেউ কোনো বস্তু (যেমন টাকা) ধার নেওয়ার পর তার দ্বারা উপকৃত হওয়ার পন্থা কেবল এটিই যে, তা ব্যবহার করে শেষ করে ফেলা হবে। তাহলে তার ক্ষতিপূরণ আদায় করা থাকবে তার দায়িত্বে। বিনিময় হতে হবে মূল বস্তুর সমান ও সদৃশ। তা মিছলী বস্তুতেই কেবল সম্ভব। কীমী বস্তুতে, যেমন জন্তুতে সদৃশ ও সমান পর্যায়ের কোনো প্রাণী পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে তার দায়িত্বে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান থাকলেও সে তা আদায় করতে পারবে না। তাই এ জাতীয় বস্তু ঋণ হিসাবে দেওয়াই যথার্থ হবে না।
আল-বাহরুর রায়েক-এর গ্রন্থকার এ সম্পর্কে বলেন, মিছলী দ্রব্য ব্যতীত অন্য কোনো কিছু ঋণ দেওয়া জায়েয নয়, যেহেতু অন্য কিছু দায়িত্বে ন্যস্ত করা সম্ভব হয় না। (যেহেতু সে দায়িত্ব পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না।)
যে ব্যক্তি কোনো কিছু কর্জ হিসাবে গ্রহণ করে সে তা যথানিয়মে কজা করলে তার মালিক হয়ে যায়। যদি কর্জগ্রহণ যথানিয়মে না হয়ে থাকে তাহলে তা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে নির্দিষ্ট হয়। যদি কর্জগ্রহণ যথানিয়মে হয়, তবে সেটিই ফিরিয়ে দেওয়া জরুরি নয়, বরং তা হাতে থাকলেও তার বিকল্প ফেরত দেওয়া জায়েয ও বৈধ।
উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা হয়, যদি কোনো কীমী বস্তু কর্জ হিসাবে প্রদান করা হয়, যা মূলত কর্জপ্রদান করা জায়েয নয়, তাহলে তা নিছক আরিয়াত বলে ধর্তব্য হবে এবং সেক্ষেত্রে হুবহু সে বস্তুটিই ফিরিয়ে দিতে হবে।
শাফেয়ী মাযহাবের আলেমদের এ সম্পর্কে সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, তা হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের এক মত, যেমনটা আবুল খাত্তাব বর্ণনা করেছেন, যে সকল কীমী বস্তুর বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ করা সম্ভব নয় অথবা যা খুবই দুর্লভ, সেগুলো কর্জ প্রদান জায়েয নয়। যেহেতু তার বিনিময় বা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা যথেষ্ট কষ্টকর বা তা অসম্ভবই, অথচ বিনিময় প্রদান করা হচ্ছে জরুরি ও কর্তব্য; এটিই প্রকাশ্য মত।
মালেকী মাযহাবের গৃহীত মতটি শাফেয়ী মাযহাবের দ্বিতীয় মত, যা তাদের নিকট সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতের বিপরীত, এটিই হাম্বলী মাযহাবের দ্বিতীয় মত। তা হচ্ছে, কীমী বস্তুতে কর্জ প্রদান করা জায়েয। তারা বলেন, যেহেতু এটি হুবহু ফেরত না দেওয়া গেলেও মূল্য হিসাবে তার সদৃশ বস্তু ফেরত দেওয়া জায়েয। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধার নিয়েছিলেন কমবয়সী এক উট, ফেরত দিয়েছিলেন বেশি বয়সী উট। এর দ্বারা বোঝা গেল, কীমী বস্তুতে সে ধরনের মূল্যবান বস্তু হলেই তা ফেরত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই সূচনায় এ ধরনের বস্তু ধার নেওয়া জায়েয হবে। তা ছাড়া, যদি তার সদৃশ বস্তু ফেরত না দিয়ে তার মূল্য ফেরত দিতে হয় তাহলে অবশ্যই সে বস্তুটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে। ইবনে আব্দুল বার বলেন, যে কোনো বস্তু কর্জ প্রদান এবং কর্জ চাওয়া উভয়ই জায়েয, তা যে কোনো সামগ্রী বা যে কোনো বস্তু বা যে কোনো প্রাণী হোক না কেন।

টিকাঃ
১১. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ১৭১
১২. মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১২২৪
১৩. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১১৯; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৫০; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ৩১৪
১৪. ইবনে আব্দুল বার প্রণীত আল-কাফী, খ. ২, পৃ. ৭২৮

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 অংশীদারী

📄 অংশীদারী


অংশীদারী কারবারে কীমী সম্পদ পুঁজি হিসাবে বিনিয়োগ করা জায়েয নয়। যেহেতু অন্য মূল্যধারী বস্তুর সাথে একে মিলানো সম্ভব নয়। যেহেতু এ কীমী বস্তু হচ্ছে স্বতন্ত্র সম্পদ। মিলানো যখন সম্ভব হবে না, তাতে অংশীদারী কারবার কি করে সম্ভব হবে? এমন হওয়া খুবই সম্ভব, কীমী বস্তুর কিছু বিনষ্ট হবে। তাহলে এই বিনষ্টে কীমী বস্তুর মালিক একা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাহলে আর অংশীদারী রইল কোথায়?
তা ছাড়া যদি অংশীদারী কারবার ভেঙ্গে দেওয়া হয় তাহলে কীমী বস্তুর মালিককে তার বিনিয়োগকৃত বস্তু বা তার সমতুল্য বস্তু ফিরিয়ে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কীমী বস্তুর অবর্তমানে যখন সমতুল্য বস্তু প্রদানের পালা, তখন সমতুল্য বস্তুও পাওয়া যাবে না, যেহেতু তা মিছলী নয়।
এ পর্যায়ে বলা যেতে পারে, সূচনাতেই কীমী বস্তুর মূল্য নির্ধারণ করে তা বিনিয়োগ করা হবে। কিন্তু তা জায়েয নয় এজন্যে যে, বিনিয়োগকৃত এ কীমী বস্তুতে পরবর্তী সময়ে বিক্রির পূর্বেই মূল্য বৃদ্ধি পেলে তাতে অন্য জনও অংশীদার হবে। অথচ এটি বেচাকেনার সময় তার যে মূল্য হবে অংশীদারী চুক্তিকালে তার অস্তিত্ব ছিল না, তাই তাতে কারো মালিকানাও ছিল না।
এ হচ্ছে সামগ্রিকভাবে আলেম ও ফকীহদের অভিমত। অবশ্য তাতে মালেকী মাযহাবের আলেমদের মতপার্থক্য রয়েছে। তারা বলেন, যে কোনো মূল্যযুক্ত বস্তুতে অংশীদারী জায়েয, তা কোনো প্রাণী হোক বা বস্তু সামগ্রী। এ সবই মূল্য নির্ধারণ করার পর পুঁজি বলে সাব্যস্ত হবে। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য : شركة

টিকাঃ
১৫. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৫৯; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১১৬; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৬; মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ৩২০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00