📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 কিয়ামিয়াত সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত বিধিবিধান

📄 কিয়ামিয়াত সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত বিধিবিধান


এমন অনেক লেনদেন রয়েছে যেগুলোতে সকল ফকীহের ঐকমত্যে কীমী বস্তু হতে পারে মূল চুক্তিবদ্ধ বস্তু। নিম্নে নমুনা হিসাবে কতক লেনদেনের আলোচনা করা হচ্ছে:
এক. বিক্রয়: সকল ফকীহ এ কথায় একমত, বিক্রয়ের পণ্যটি কীমী বস্তু হতে পারে। যেমন: যে কোনো প্রাণী বা যে কোনো সামগ্রী। এগুলো বিক্রি করা কালে অবশ্যই বিক্রয় সম্পর্কিত শর্তাবলির প্রতি যথাযথ লক্ষ রাখা হবে। যেমন : বিক্রির জন্যে যে পণ্য উপস্থাপন করা হবে তা বিক্রেতার মালিকানায় থাকতে হবে, তার হাতে থাকতে হবে, ক্রেতাকে বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভবপর হতে হবে, ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের পণ্যটি সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি থাকতে হবে, তা থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব হতে হবে ইত্যাদি। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য : البيع
দুই: ভাড়া প্রদান: কীমী বস্তুর লাভটি লেনদেনের মূল বিষয় হতে পারে। এই লাভ অর্জন করার লক্ষ্যে ভাড়া নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। থাকার জন্যে ঘর এবং আরোহণ বা বোঝা বহনের জন্যে বাহন ভাড়া দেওয়া-নেওয়ার ব্যবস্থা শরীয়তে স্বীকৃত রয়েছে। এক্ষেত্রেও লক্ষ রেখে যাবতীয় শর্ত পূরণ করতে হবে। যেমন: যা ভাড়া নেওয়া হবে তা থেকে উপকারপ্রাপ্তি সম্ভব হওয়া, ঘর বা বাহন বুঝিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। এ আলোচনায়ও সকল ফকীহ ও আলেম একমত। বিস্তারিত জানার জন্যে দ্রষ্টব্য : إجَارَةُ
কতক লেনদেন নিয়ে ফকীহদের নিজেদের মাঝে বিতর্ক ও মতবিরোধ রয়েছে, কীমী বস্তুতে সে সকল লেনদেন সঠিক হবে কি-না, নিম্নে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে:

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 সালাম বিক্রি

📄 সালাম বিক্রি


সালাম বিক্রি (السّلم)
সালাম-এর নিয়মে বিক্রির ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে, যে পণ্য বিক্রেতা বুঝিয়ে দেবে, ক্রেতা তার বৈশিষ্ট্যাবলি এবং তার পরিমাণ ইত্যাদি এতটা বিস্তারিতভাবে বলবে, তার বলার পর বিষয়টিতে পার্থক্য দেখা গেলেও তা হবে অল্প, অধিক পার্থক্যের কোনো অবকাশ সেখানে থাকবে না। যেমন কোন্ প্রকার ধান, কী পরিমাণ তা বিস্তারিতভাবে বলার পর কৃষক বা চাষী পণ্য যখন ক্রেতার সামনে উপস্থিত করবে, বর্ণনার সাথে বাস্তবে হয়তো কোনো পার্থক্যই হবে না, হলেও তা হবে নিতান্তই সামান্য। তাই পরিমাপযোগ্য বস্তু, ওজন করার যোগ্য বস্তু, হাত দিয়ে মেপে দেওয়ার বস্তু ইত্যাদি মিছলী বস্তুতে সালাম নিয়মে বিক্রি করা যায়, এ কথায় সকল আলেম একমত।
হানাফী মাযহাবের আলেমগণ ব্যতীত অন্য মাযহাবের আলেমদের মত হচ্ছে, কীমী বস্তুর বৈশিষ্ট্য ও পরিমাণ ইত্যাদি বলে দেওয়ার পর বস্তুটি উপস্থাপন করা হলে দেখা যাবে, যে রকমটি চাওয়া হয়েছে সেরকমই তৈরি করা হয়েছে। তাই এ সকল সামগ্রীতেও সালাম বিক্রি জায়েয। যেমন আলমারি তৈরি করা। হানাফী আলেমগণ বলেন, কতক ক্ষেত্রে জায়েয হওয়া ব্যতীত সাধারণভাবে কীমী বস্তুতে সালাম বিক্রি নাজায়েয।
কাসানী বলেন, হাত বা ফিতা দিয়ে মেপে যা বিক্রি করা হয়, যেমন: কাপড়, চাটাই, মাদুর ও পাটি ইত্যাদিতে স্বাভাবিক যুক্তি ও কিয়াস হচ্ছে এগুলোতে সালাম জায়েয হবে না। যেহেতু এগুলোতে পার্থক্য থাকে, এক কাপড় অন্য কাপড়ের সদৃশ হয় না, এক চাটাই অপর চাটাই থেকে গুণগত মানে ভিন্ন থাকার প্রেক্ষিতে দুটোর মূল্য বরাবর থাকে না। আর তাই এগুলো নষ্ট করা হলে একটির স্থলে অপর একটি দিয়ে জরিমানা আদায় করা যায় না, বরং জরিমানা হিসাবে মূল্য আদায় করতে হয়। মণি-মুক্তা কেনাবেচার ক্ষেত্রে সালাম এজন্যেই জায়েয নয়, যেহেতু একটি অপরটি থেকে ভিন্ন হয়, তাতে মূল্যেরও বেশ পার্থক্য থাকে।
কিন্তু তারপরও কাপড় ও চাটাই ইত্যাদিতে সালাম বিক্রি জায়েয বলে মতপ্রদান করা হয়েছে ইসতিহসান (সূক্ষ্ম কিয়াস ও যুক্তি) হিসাবে। ইসতিহসানের বিবরণ হচ্ছে: আল্লাহ তাআলা কুরআন শরীফে ঋণ সম্পর্কিত আয়াতে বলেছেন:
وَلَا تَسْأَمُوا أَن تَكْتُبُوهُ صَغِيرًا أَو كَبِيرًا إِلَى أَجَلِهِ
“তোমরা তা ছোট হোক বা বড় হোক লিখে রাখতে বিরক্ত বোধ করো না।”
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা ছোট ও বড় শব্দ এনেছেন যা পরিমাপযোগ্য বস্তু বা ওজনের বস্তুতে ব্যবহৃত হয় না, এ শব্দগুলো ব্যবহৃত হয় সে সব জিনিসে যেগুলো হাত বা ফিতা দিয়ে মেপে বেচাকেনা করা হয় অথবা গুণে গুণে লেনদেন করা হয়।
তা ছাড়া, কাপড়ে সালাম বিক্রি মানুষের মধ্যে বহুল প্রচলিত, যেহেতু এভাবে কাপড় কেনার চাহিদা সব সময়ই থেকেছে। ফলে ফকীহগণ এক্ষেত্রে যুক্তি বা কিয়াস বর্জন করে সকলেই এটি জায়েয হওয়ার মত প্রদান করেছেন। এভাবে বিষয়টিতে ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সেই সাথে লক্ষণীয়, ক্রেতা যখন কাপড়ের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, রঙ, ডিজাইন, কী কাপড়, কেমন কাপড় ইত্যাদি বিষয় বলে দিবে, বিক্রেতা তার চাহিদা মাফিক কাপড় তৈরিতে হয়তো মোটেই তারতম্য ঘটাবে না বা ঘটালেও তা হবে নিতান্তই সামান্য। তাই সালাম বিক্রির আলোচনায় মিছলী বস্তুর সাথে কাপড়ও অন্তর্ভুক্ত হবে। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য: سلم
অধিকাংশ ফকীহ কীমী বস্তুতেও সালাম বিক্রি জায়েয হবে কি-না তা নিয়ে মতপার্থক্য করেছেন। কীমী বস্তুটিতে যে সকল বৈশিষ্ট্য থাকা ক্রেতার পছন্দ, ক্রেতা যদি বিক্রেতাকে সেসব বৈশিষ্ট্য বলে পরিষ্কারভাবে বোঝাতে সক্ষম হয়, তাহলে তাতে সালাম জায়েয হবে। যদি বিক্রেতাকে ক্রেতা তার পছন্দ বোঝাতে সক্ষম না হয়, বৈশিষ্ট্যগুলো বর্ণনা করে দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে সে কীমী বস্তুতে সালাম জায়েয হবে না।
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যে কোনো কীমী বস্তুতেই সালাম পদ্ধতি বৈধ ও জায়েয, যেহেতু কীমী বস্তুর বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রকাশ করে বোঝানো সম্ভব। তাই তাদের মত অনুসারে যাবতীয় প্রাণী, সব ধরনের কাপড়, বড় বড় মণি ও মুক্তা ইত্যাদিতে সালাম জায়েয। কেননা, তারা বলেন: এ সবকিছুতেই কাঙ্ক্ষিত বস্তুর যাবতীয় বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা সম্ভব। তাই কেউ যদি মুক্তাও কিনতে চায়, সে বিক্রেতাকে বলবে, মুক্তাটি কতটুকু বড় হবে, তার ওজন কত ক্যারেট হবে, কী রঙের হবে ইত্যাদি। সুতরাং এ মুক্তাও তার সালাম পদ্ধতিতে কেনা সম্ভব।
শাফেয়ী মাযহাবের আলেমগণ এ বিষয়ে বলেন, সালাম পদ্ধতি কার্যকর হবে কেবল কতক বস্তুতে। সেগুলো হচ্ছে: কাপড়, পশম, কাঠ ও পাথর। তাদের দৃষ্টিতে এ বস্তুগুলোতে কেবল বস্তুর যাবতীয় বৈশিষ্ট্য বিক্রেতাকে বোঝানো সম্ভব। বিক্রেতা ক্রেতার চাহিদা অনুধাবন করে ঠিক তার কাঙ্ক্ষিত বস্তুটিই উপস্থাপন করতে পারবে। তারা এ আলোচনার সূচনাতেই পশু ও জন্তুর বেলায় সালাম বৈধ বলে মতপ্রদান করেছেন, যেহেতু হাদীসে এর বর্ণনা রয়েছে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লোকের নিকট থেকে একটি কমবয়েসী উট কর্জ হিসাবে নিলেন। এর কিছুদিন পর যাকাতের বেশ কিছু উট এলো। নবী স. আবু রাফে রা.-কে সে লোকের কর্জ পরিশোধ হিসাবে একটি কমবয়সী উট দিয়ে দিতে বললেন। আবু রাফে রা. ফিরে এসে জানালেন, সেখানে চার দাঁতবিশিষ্ট বয়সী উট ছাড়া কমবয়সী কোনো উট নেই। নবী বললেন, তা-ই একটি দাও। যে সুন্দরভাবে পাওনা আদায় করে সে-ই মানুষের মাঝে সর্বোত্তম।
শাফেয়ী আলেমগণ বলেন, যেহেতু ঋণ পরিশোধ করা দায়িত্বে ন্যস্ত ও অর্পিত বিষয়, তাই তা অবশ্যই আদায় করতে হবে। তারা সালাম বিক্রিকে ঋণের সাথে তুলনা করে এটিকে কাপড় ও পশম ইত্যাদিতে জায়েয হওয়ার মত প্রদান করেন। কিন্তু দামী পাথর, মণিমুক্তা, এমনকি চামড়া কেনাবেচাতেও সালাম জায়েয হওয়ার মত দেন না। তারা বলেন, এগুলোতে কাঙ্ক্ষিত সকল বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। তাই এগুলোতে সালাম যথাযথ নয়।
হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের কীমী বস্তুতে সালাম বিক্রির বৈধতার বিষয়ে পরস্পর বিপরীত দুটি মত পাওয়া যায়। ইবনে কুদামা বলেন: জন্তু-জানোয়ার কেনাবেচায় সালাম পদ্ধতি বৈধ কি-না, এ বিষয়ে আলেমদের মত পরস্পর বিপরীত। একমত হচ্ছে তা সঠিক ও জায়েয নয়। এটি সুফিয়ান সাওরী রহ.-এরও মত। সাহাবী ও তাবেয়ীদের মধ্যে উমর, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও হুযায়ফা, সাঈদ ইবনে জুবাইর, শা’বী ও জুরজানী রহ.-এরও মত ছিল এটিই। উমর রা. এ সম্পর্কে বলেছেন:
إِنَّ مِنَ الرِّبَا أَبْوَابًا لَا تَخْفَى وَإِنَّ مِنْهَا السَّلَمَ فِي السِّنِّ
“সুদের দরজা অনেক, সেগুলো গোপন নয়। সে সবেরই একটি হচ্ছে বয়সী প্রাণীতে সালাম।”
তাছাড়া, প্রাণীতে প্রাণীতে অনেক পার্থক্য থাকে যা অনুল্লেখ্যও নয় বা উপেক্ষণীয়ও নয়। যেহেতু প্রাণীর বৈশিষ্ট্যে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, তাই তাতে সালাম জায়েয নয়।
হাম্বলী মাযহাবের প্রকাশ্য মত যা তাদের মধ্যে অধিক প্রচলিত তা হচ্ছে, প্রাণীতে সালাম পদ্ধতি বৈধ। আছরামের বর্ণনায় তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইবনুল মুনযির বলেন, যাদের বর্ণনায় জানা যায়, প্রাণীতে সালাম পদ্ধতি গ্রহণে কোনো বাধা নেই তারা হচ্ছেন : আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা., সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব, হাসান বসরী, শা’বী, মুজাহিদ, ইবনে শিহাব যুহরী ও আওযায়ী রহ.।
সেই সাথে লক্ষণীয়, আবু রাফে রা. তাঁর বর্ণনায় বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির নিকট থেকে একটি কমবয়সী উট কর্জ হিসাবে নিয়েছিলেন। কর্জ ও সালাম সাদৃশ্যপূর্ণ লেনদেন, তাই ফকীহগণ একটিকে অপরটির সাথে তুলনা করে থাকেন। এ অবস্থায় নবী স. যদি একটি প্রাণীর বিপরীতে অপর একটি প্রাণী দ্বারা কর্জ পরিশোধ করতে পারেন, তাহলে বিক্রেতাও সালাম পদ্ধতিতে পশু বিক্রয় এবং ক্রেতা সে পশু ক্রয় করতে পারে।
তারা আরো একটি কিয়াস উল্লেখ করেছেন। তা হলো, কেউ যদি বিবাহকালে মহর হিসাবে একটি জন্তু প্রদানের উল্লেখ করে তবে তা তার দায়িত্বে বহাল থাকবে। এমনিভাবে সালাম পদ্ধতিতেও দায়িত্বে বহাল থাকতে পারে। কাপড় কেনাবেচা করা হলে তা যেমন বিক্রেতার দায়িত্বে বহাল থাকে।
ইবনে কুদামা বলেন, জীবজন্তু ব্যতীত অন্য যে কোনো বস্তু যা পরিমাপযোগ্য নয়, ওজনে বিক্রি করার বস্তুও নয়, যা চাষ করা হয় না, তাতে সালাম বিক্রি জায়েয কি-না, তা নিয়ে আলেমগণ বিপরীতধর্মী দুটি বক্তব্য প্রদান করেছেন। ইসহাক ইবনে ইবরাহীম বলেন: ইমাম আহমদ রহ. এ সম্পর্কে বলেছেন, যা পরিমাপযোগ্য, যা ওজন করে বেচাকেনা করা হয় বা যার পরিমাণ জানা রয়েছে, কেবল সে সবে সালাম পদ্ধতি বৈধ ও জায়েয।
আবুল খাত্তাব বলেন, ইমাম আহমদ রহ.-এর কথার শেষ অংশ ছিল ‘যার পরিমাণ জানা রয়েছে’, এর অর্থ হচ্ছে, সালাম পদ্ধতিতে যা বেচাকেনা করা হচ্ছে তার এই পরিমাণ যা উভয়ের জানা রয়েছে, যেমন শস্যের স্তূপ। ডালিম বা ডিম ইত্যাদিতে তিনি বলেন, আমার মতে সালাম জায়েয নয়। ইবনুল মুনযির ইমাম আহমদ ও ইমাম ইসহাকের মত বর্ণনা করে বলেন, ডালিম, সাফারজাল (পেয়ারা জাতীয় ফল), তরমুজ, শসা, ক্ষিরা ইত্যাদিতে সালাম পদ্ধতি কল্যাণকর নয়। যেহেতু এগুলো পরিমাপযোগ্য বস্তু নয়, ওজন করে মাপার বস্তু নয়। সেই সাথে এগুলোর কোনোটা হয় ছোট, কোনোটা হয় বড়।
এ বর্ণনা অনুসারে, যে সব বস্তু গুণে গুণে বিক্রি করা হয় সেগুলো সমআকৃতির না হলে সেগুলোতে সালাম বৈধ নয়। যেমন: শাকসবজি। একই সবজি একই গাছে নানা আকৃতির হয়ে থাকে। যেমন: কদ্দু। সবজির আঁটি দিয়েও হিসাব করা সম্ভব নয়, যেহেতু আঁটির কোনোটি ছোট আর কোনোটি বড় হতে পারে। তাই এগুলোর কোনোটিতে সালাম জায়েয নয়, যেমন মণিমুক্তার ক্ষেত্রেও কোনোটি বড় এবং কোনোটি ছোট হওয়ার প্রেক্ষিতে তাতে সালাম জায়েয নয়। এর বিপরীতে ইসমাইল ইবনে সাঈদ ও ইবনে মানসুর বলেন, সালাম পদ্ধতি জায়েয যাবতীয় ফলে, সাফারজালে, ডালিমে, কলায় এবং যাবতীয় সবজিতে। তারা বলেন, এগুলোর অধিকাংশই হয় কাছাকাছি আকারের; ছোটগুলোকে ভিন্ন এবং বড় গুলোকে ভিন্নভাবে বিন্যস্ত করা যায়। যেগুলো বিন্যস্ত করা সম্ভব না হবে সেগুলো ওজন করে লেনদেন করা হবে।

টিকাঃ
৫. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮২, ঋণ সংক্রান্ত আয়াত
৬. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২০৮
৭. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭২; হাশিয়া দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ২১৫
৮. মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১২২৪
৯. আল-মুহায্যাব, খ. ১, পৃ. ৩০৪; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১০৭-১১০
১০. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩০৭-৩০৯

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ঋণ

📄 ঋণ


কীমী বস্তু ঋণ দেওয়া যাবে কি-না, তা নিয়ে ফকীহদের মাঝে যথেষ্ট মতপার্থক্য হয়েছে। হানাফী মাযহাবের আলেমদের অভিমত হচ্ছে, জীবজন্তু জমিজমা এবং আরো যে সকল বস্তুর একটির অপরটি থেকে ভিন্নতা ও ব্যবধান রয়েছে, এগুলোর কোনোটি কর্জ দেওয়া জায়েয নয়। কর্জ বা ঋণে দুটি দিক রয়েছে: এক. সূচনায় ঋণ হচ্ছে ধারপ্রদান, তাই তা ধার দেওয়ার কথা বলেই প্রদান করা জায়েয। দুই. শেষ পর্যায়ে ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে মূলত প্রদত্ত হচ্ছে বিনিময়। কেউ কোনো বস্তু (যেমন টাকা) ধার নেওয়ার পর তার দ্বারা উপকৃত হওয়ার পন্থা কেবল এটিই যে, তা ব্যবহার করে শেষ করে ফেলা হবে। তাহলে তার ক্ষতিপূরণ আদায় করা থাকবে তার দায়িত্বে। বিনিময় হতে হবে মূল বস্তুর সমান ও সদৃশ। তা মিছলী বস্তুতেই কেবল সম্ভব। কীমী বস্তুতে, যেমন জন্তুতে সদৃশ ও সমান পর্যায়ের কোনো প্রাণী পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে তার দায়িত্বে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান থাকলেও সে তা আদায় করতে পারবে না। তাই এ জাতীয় বস্তু ঋণ হিসাবে দেওয়াই যথার্থ হবে না।
আল-বাহরুর রায়েক-এর গ্রন্থকার এ সম্পর্কে বলেন, মিছলী দ্রব্য ব্যতীত অন্য কোনো কিছু ঋণ দেওয়া জায়েয নয়, যেহেতু অন্য কিছু দায়িত্বে ন্যস্ত করা সম্ভব হয় না। (যেহেতু সে দায়িত্ব পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না।)
যে ব্যক্তি কোনো কিছু কর্জ হিসাবে গ্রহণ করে সে তা যথানিয়মে কজা করলে তার মালিক হয়ে যায়। যদি কর্জগ্রহণ যথানিয়মে না হয়ে থাকে তাহলে তা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে নির্দিষ্ট হয়। যদি কর্জগ্রহণ যথানিয়মে হয়, তবে সেটিই ফিরিয়ে দেওয়া জরুরি নয়, বরং তা হাতে থাকলেও তার বিকল্প ফেরত দেওয়া জায়েয ও বৈধ।
উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা হয়, যদি কোনো কীমী বস্তু কর্জ হিসাবে প্রদান করা হয়, যা মূলত কর্জপ্রদান করা জায়েয নয়, তাহলে তা নিছক আরিয়াত বলে ধর্তব্য হবে এবং সেক্ষেত্রে হুবহু সে বস্তুটিই ফিরিয়ে দিতে হবে।
শাফেয়ী মাযহাবের আলেমদের এ সম্পর্কে সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, তা হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের এক মত, যেমনটা আবুল খাত্তাব বর্ণনা করেছেন, যে সকল কীমী বস্তুর বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ করা সম্ভব নয় অথবা যা খুবই দুর্লভ, সেগুলো কর্জ প্রদান জায়েয নয়। যেহেতু তার বিনিময় বা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা যথেষ্ট কষ্টকর বা তা অসম্ভবই, অথচ বিনিময় প্রদান করা হচ্ছে জরুরি ও কর্তব্য; এটিই প্রকাশ্য মত।
মালেকী মাযহাবের গৃহীত মতটি শাফেয়ী মাযহাবের দ্বিতীয় মত, যা তাদের নিকট সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতের বিপরীত, এটিই হাম্বলী মাযহাবের দ্বিতীয় মত। তা হচ্ছে, কীমী বস্তুতে কর্জ প্রদান করা জায়েয। তারা বলেন, যেহেতু এটি হুবহু ফেরত না দেওয়া গেলেও মূল্য হিসাবে তার সদৃশ বস্তু ফেরত দেওয়া জায়েয। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধার নিয়েছিলেন কমবয়সী এক উট, ফেরত দিয়েছিলেন বেশি বয়সী উট। এর দ্বারা বোঝা গেল, কীমী বস্তুতে সে ধরনের মূল্যবান বস্তু হলেই তা ফেরত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই সূচনায় এ ধরনের বস্তু ধার নেওয়া জায়েয হবে। তা ছাড়া, যদি তার সদৃশ বস্তু ফেরত না দিয়ে তার মূল্য ফেরত দিতে হয় তাহলে অবশ্যই সে বস্তুটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে। ইবনে আব্দুল বার বলেন, যে কোনো বস্তু কর্জ প্রদান এবং কর্জ চাওয়া উভয়ই জায়েয, তা যে কোনো সামগ্রী বা যে কোনো বস্তু বা যে কোনো প্রাণী হোক না কেন।

টিকাঃ
১১. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ১৭১
১২. মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১২২৪
১৩. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১১৯; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৫০; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ৩১৪
১৪. ইবনে আব্দুল বার প্রণীত আল-কাফী, খ. ২, পৃ. ৭২৮

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 অংশীদারী

📄 অংশীদারী


অংশীদারী কারবারে কীমী সম্পদ পুঁজি হিসাবে বিনিয়োগ করা জায়েয নয়। যেহেতু অন্য মূল্যধারী বস্তুর সাথে একে মিলানো সম্ভব নয়। যেহেতু এ কীমী বস্তু হচ্ছে স্বতন্ত্র সম্পদ। মিলানো যখন সম্ভব হবে না, তাতে অংশীদারী কারবার কি করে সম্ভব হবে? এমন হওয়া খুবই সম্ভব, কীমী বস্তুর কিছু বিনষ্ট হবে। তাহলে এই বিনষ্টে কীমী বস্তুর মালিক একা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাহলে আর অংশীদারী রইল কোথায়?
তা ছাড়া যদি অংশীদারী কারবার ভেঙ্গে দেওয়া হয় তাহলে কীমী বস্তুর মালিককে তার বিনিয়োগকৃত বস্তু বা তার সমতুল্য বস্তু ফিরিয়ে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কীমী বস্তুর অবর্তমানে যখন সমতুল্য বস্তু প্রদানের পালা, তখন সমতুল্য বস্তুও পাওয়া যাবে না, যেহেতু তা মিছলী নয়।
এ পর্যায়ে বলা যেতে পারে, সূচনাতেই কীমী বস্তুর মূল্য নির্ধারণ করে তা বিনিয়োগ করা হবে। কিন্তু তা জায়েয নয় এজন্যে যে, বিনিয়োগকৃত এ কীমী বস্তুতে পরবর্তী সময়ে বিক্রির পূর্বেই মূল্য বৃদ্ধি পেলে তাতে অন্য জনও অংশীদার হবে। অথচ এটি বেচাকেনার সময় তার যে মূল্য হবে অংশীদারী চুক্তিকালে তার অস্তিত্ব ছিল না, তাই তাতে কারো মালিকানাও ছিল না।
এ হচ্ছে সামগ্রিকভাবে আলেম ও ফকীহদের অভিমত। অবশ্য তাতে মালেকী মাযহাবের আলেমদের মতপার্থক্য রয়েছে। তারা বলেন, যে কোনো মূল্যযুক্ত বস্তুতে অংশীদারী জায়েয, তা কোনো প্রাণী হোক বা বস্তু সামগ্রী। এ সবই মূল্য নির্ধারণ করার পর পুঁজি বলে সাব্যস্ত হবে। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য : شركة

টিকাঃ
১৫. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৬, পৃ. ৫৯; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১১৬; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ৬; মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ৩২০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00