📄 কিয়ামিয়াত (الْقِيمِيَّاتُ)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
কিয়ামিয়্যাত (الْقِيَمِيَّات) শব্দটি কিয়ামিয়্যু (قیمی)-এর বহুবচন। বলা হয় : شَيْء قيمي “মূল্যবান বস্তু” এভাবে সম্বন্ধ করে শব্দগঠন করার কারণ, এমন কোনো শব্দ যা বস্তুর বিভিন্ন মূল্যে মূল্যবান হওয়ার অর্থ প্রকাশ করে, এটি ছাড়া আর কোনোটি নেই। কীমাহ-এর অর্থ: মূল্য যাচাই পূর্বক কোনো বস্তুর নির্ধারিত যথার্থ মূল্য।
পরিভাষায় কীয়ামী ( قیمی) হচ্ছে তা, বাজারে যার তুল্য বস্তু পাওয়া যায় না। অথবা তার তুল্য বস্তু পাওয়া গেলেও তাতে এমন পার্থক্য থাকে যার দরুন দুটিতে মূল্যের অনেক পার্থক্য হয়ে যায়। যেমন, জীবজন্তু।
টিকাঃ
১. আল-মিসবাহুল মুনীর, লিসানুল আরব, তাজুল আরূস, قوم ماده
২. দুরারুল হুককাম শরহু মাজাল্লা আল-আহকাম, খ. ১, পৃ. ১০৫, ধারা ১৪৬ ও ১৪৮; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ১১৬-১১৮; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২১৫; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ১৫৯; মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ৪১৯; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ২৩৯
📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা
الْمِلَّتُ (আল-মিছলিয়্যাত)
মিছলিয়্যাত শব্দটি মিছলী (مثل)-এর বহুবচন। এটি اثل (মিছল) থেকে গঠিত হয়েছে। মিছুল (jiji) শব্দটির অর্থ : সাদৃশ্য ও সামঞ্জস্য। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে বলা হয় : هَذَا مَثَلُهُ লَكَ هَذَا مِثْلُهُ যেমন বলা হয় : هذا شَبَهُهُ বা شَبَهُهُ এ বাক্যগুলোর অর্থ : এটি সেটির সমতুল্য।
ফকীহগণ মিছলী (ii) বলে সে সকল জিনিস বুঝিয়ে থাকেন, যেগুলোর প্রতিটি একক বা প্রতিটি অংশ অপরাপর একক বা অংশের এতটাই সদৃশ যে, এগুলোর যে কোনো একটির স্থলে অপরটি রেখে দেওয়া সম্ভব, তাতে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্যই থাকে না। যেমন: গম, ধান, কাপড়, ডিম ইত্যাদি। ডিম একটির পরিবর্তে অপর একটি; গম এক কেজির স্থলে অপর এক কেজি রাখা হলে কোনো পার্থক্য হয় না।
মাজাল্লাতে বলা হয়েছে: মিছলী (المثلي) হচ্ছে বাজারে যার সমতুল্য বস্তু পাওয়া যায়, তাতে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য ধরা পড়ে না। যেমন: পরিমাপযোগ্য বা ওজনের বস্তু, গণনাযোগ্য বস্তু যার সবগুলো একক কাছাকাছি আকারের।
আলোচনা করে প্রতিভাত হলো, القييمي (কিয়ামী) ও المثلي (মিছলী) একটি অপরটির বিপরীত।
টিকাঃ
৩. লিসানুল আরব, আল-মিসবাহুল মুনীর, مثل ماده
৪. মাজাল্লা আল-আহকামুল আদলিয়্যা, ধারা ১৪৫; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ১৭১; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ১৫০; সুয়ূতী কৃত আল-আশবাহ, পৃ. ৩৮৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৮১
📄 কিয়ামিয়াত সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত বিধিবিধান
এমন অনেক লেনদেন রয়েছে যেগুলোতে সকল ফকীহের ঐকমত্যে কীমী বস্তু হতে পারে মূল চুক্তিবদ্ধ বস্তু। নিম্নে নমুনা হিসাবে কতক লেনদেনের আলোচনা করা হচ্ছে:
এক. বিক্রয়: সকল ফকীহ এ কথায় একমত, বিক্রয়ের পণ্যটি কীমী বস্তু হতে পারে। যেমন: যে কোনো প্রাণী বা যে কোনো সামগ্রী। এগুলো বিক্রি করা কালে অবশ্যই বিক্রয় সম্পর্কিত শর্তাবলির প্রতি যথাযথ লক্ষ রাখা হবে। যেমন : বিক্রির জন্যে যে পণ্য উপস্থাপন করা হবে তা বিক্রেতার মালিকানায় থাকতে হবে, তার হাতে থাকতে হবে, ক্রেতাকে বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভবপর হতে হবে, ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের পণ্যটি সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি থাকতে হবে, তা থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব হতে হবে ইত্যাদি। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য : البيع
দুই: ভাড়া প্রদান: কীমী বস্তুর লাভটি লেনদেনের মূল বিষয় হতে পারে। এই লাভ অর্জন করার লক্ষ্যে ভাড়া নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। থাকার জন্যে ঘর এবং আরোহণ বা বোঝা বহনের জন্যে বাহন ভাড়া দেওয়া-নেওয়ার ব্যবস্থা শরীয়তে স্বীকৃত রয়েছে। এক্ষেত্রেও লক্ষ রেখে যাবতীয় শর্ত পূরণ করতে হবে। যেমন: যা ভাড়া নেওয়া হবে তা থেকে উপকারপ্রাপ্তি সম্ভব হওয়া, ঘর বা বাহন বুঝিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। এ আলোচনায়ও সকল ফকীহ ও আলেম একমত। বিস্তারিত জানার জন্যে দ্রষ্টব্য : إجَارَةُ
কতক লেনদেন নিয়ে ফকীহদের নিজেদের মাঝে বিতর্ক ও মতবিরোধ রয়েছে, কীমী বস্তুতে সে সকল লেনদেন সঠিক হবে কি-না, নিম্নে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে:
📄 সালাম বিক্রি
সালাম বিক্রি (السّلم)
সালাম-এর নিয়মে বিক্রির ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে, যে পণ্য বিক্রেতা বুঝিয়ে দেবে, ক্রেতা তার বৈশিষ্ট্যাবলি এবং তার পরিমাণ ইত্যাদি এতটা বিস্তারিতভাবে বলবে, তার বলার পর বিষয়টিতে পার্থক্য দেখা গেলেও তা হবে অল্প, অধিক পার্থক্যের কোনো অবকাশ সেখানে থাকবে না। যেমন কোন্ প্রকার ধান, কী পরিমাণ তা বিস্তারিতভাবে বলার পর কৃষক বা চাষী পণ্য যখন ক্রেতার সামনে উপস্থিত করবে, বর্ণনার সাথে বাস্তবে হয়তো কোনো পার্থক্যই হবে না, হলেও তা হবে নিতান্তই সামান্য। তাই পরিমাপযোগ্য বস্তু, ওজন করার যোগ্য বস্তু, হাত দিয়ে মেপে দেওয়ার বস্তু ইত্যাদি মিছলী বস্তুতে সালাম নিয়মে বিক্রি করা যায়, এ কথায় সকল আলেম একমত।
হানাফী মাযহাবের আলেমগণ ব্যতীত অন্য মাযহাবের আলেমদের মত হচ্ছে, কীমী বস্তুর বৈশিষ্ট্য ও পরিমাণ ইত্যাদি বলে দেওয়ার পর বস্তুটি উপস্থাপন করা হলে দেখা যাবে, যে রকমটি চাওয়া হয়েছে সেরকমই তৈরি করা হয়েছে। তাই এ সকল সামগ্রীতেও সালাম বিক্রি জায়েয। যেমন আলমারি তৈরি করা। হানাফী আলেমগণ বলেন, কতক ক্ষেত্রে জায়েয হওয়া ব্যতীত সাধারণভাবে কীমী বস্তুতে সালাম বিক্রি নাজায়েয।
কাসানী বলেন, হাত বা ফিতা দিয়ে মেপে যা বিক্রি করা হয়, যেমন: কাপড়, চাটাই, মাদুর ও পাটি ইত্যাদিতে স্বাভাবিক যুক্তি ও কিয়াস হচ্ছে এগুলোতে সালাম জায়েয হবে না। যেহেতু এগুলোতে পার্থক্য থাকে, এক কাপড় অন্য কাপড়ের সদৃশ হয় না, এক চাটাই অপর চাটাই থেকে গুণগত মানে ভিন্ন থাকার প্রেক্ষিতে দুটোর মূল্য বরাবর থাকে না। আর তাই এগুলো নষ্ট করা হলে একটির স্থলে অপর একটি দিয়ে জরিমানা আদায় করা যায় না, বরং জরিমানা হিসাবে মূল্য আদায় করতে হয়। মণি-মুক্তা কেনাবেচার ক্ষেত্রে সালাম এজন্যেই জায়েয নয়, যেহেতু একটি অপরটি থেকে ভিন্ন হয়, তাতে মূল্যেরও বেশ পার্থক্য থাকে।
কিন্তু তারপরও কাপড় ও চাটাই ইত্যাদিতে সালাম বিক্রি জায়েয বলে মতপ্রদান করা হয়েছে ইসতিহসান (সূক্ষ্ম কিয়াস ও যুক্তি) হিসাবে। ইসতিহসানের বিবরণ হচ্ছে: আল্লাহ তাআলা কুরআন শরীফে ঋণ সম্পর্কিত আয়াতে বলেছেন:
وَلَا تَسْأَمُوا أَن تَكْتُبُوهُ صَغِيرًا أَو كَبِيرًا إِلَى أَجَلِهِ
“তোমরা তা ছোট হোক বা বড় হোক লিখে রাখতে বিরক্ত বোধ করো না।”
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা ছোট ও বড় শব্দ এনেছেন যা পরিমাপযোগ্য বস্তু বা ওজনের বস্তুতে ব্যবহৃত হয় না, এ শব্দগুলো ব্যবহৃত হয় সে সব জিনিসে যেগুলো হাত বা ফিতা দিয়ে মেপে বেচাকেনা করা হয় অথবা গুণে গুণে লেনদেন করা হয়।
তা ছাড়া, কাপড়ে সালাম বিক্রি মানুষের মধ্যে বহুল প্রচলিত, যেহেতু এভাবে কাপড় কেনার চাহিদা সব সময়ই থেকেছে। ফলে ফকীহগণ এক্ষেত্রে যুক্তি বা কিয়াস বর্জন করে সকলেই এটি জায়েয হওয়ার মত প্রদান করেছেন। এভাবে বিষয়টিতে ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সেই সাথে লক্ষণীয়, ক্রেতা যখন কাপড়ের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, রঙ, ডিজাইন, কী কাপড়, কেমন কাপড় ইত্যাদি বিষয় বলে দিবে, বিক্রেতা তার চাহিদা মাফিক কাপড় তৈরিতে হয়তো মোটেই তারতম্য ঘটাবে না বা ঘটালেও তা হবে নিতান্তই সামান্য। তাই সালাম বিক্রির আলোচনায় মিছলী বস্তুর সাথে কাপড়ও অন্তর্ভুক্ত হবে। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য: سلم
অধিকাংশ ফকীহ কীমী বস্তুতেও সালাম বিক্রি জায়েয হবে কি-না তা নিয়ে মতপার্থক্য করেছেন। কীমী বস্তুটিতে যে সকল বৈশিষ্ট্য থাকা ক্রেতার পছন্দ, ক্রেতা যদি বিক্রেতাকে সেসব বৈশিষ্ট্য বলে পরিষ্কারভাবে বোঝাতে সক্ষম হয়, তাহলে তাতে সালাম জায়েয হবে। যদি বিক্রেতাকে ক্রেতা তার পছন্দ বোঝাতে সক্ষম না হয়, বৈশিষ্ট্যগুলো বর্ণনা করে দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে সে কীমী বস্তুতে সালাম জায়েয হবে না।
মালেকী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যে কোনো কীমী বস্তুতেই সালাম পদ্ধতি বৈধ ও জায়েয, যেহেতু কীমী বস্তুর বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রকাশ করে বোঝানো সম্ভব। তাই তাদের মত অনুসারে যাবতীয় প্রাণী, সব ধরনের কাপড়, বড় বড় মণি ও মুক্তা ইত্যাদিতে সালাম জায়েয। কেননা, তারা বলেন: এ সবকিছুতেই কাঙ্ক্ষিত বস্তুর যাবতীয় বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা সম্ভব। তাই কেউ যদি মুক্তাও কিনতে চায়, সে বিক্রেতাকে বলবে, মুক্তাটি কতটুকু বড় হবে, তার ওজন কত ক্যারেট হবে, কী রঙের হবে ইত্যাদি। সুতরাং এ মুক্তাও তার সালাম পদ্ধতিতে কেনা সম্ভব।
শাফেয়ী মাযহাবের আলেমগণ এ বিষয়ে বলেন, সালাম পদ্ধতি কার্যকর হবে কেবল কতক বস্তুতে। সেগুলো হচ্ছে: কাপড়, পশম, কাঠ ও পাথর। তাদের দৃষ্টিতে এ বস্তুগুলোতে কেবল বস্তুর যাবতীয় বৈশিষ্ট্য বিক্রেতাকে বোঝানো সম্ভব। বিক্রেতা ক্রেতার চাহিদা অনুধাবন করে ঠিক তার কাঙ্ক্ষিত বস্তুটিই উপস্থাপন করতে পারবে। তারা এ আলোচনার সূচনাতেই পশু ও জন্তুর বেলায় সালাম বৈধ বলে মতপ্রদান করেছেন, যেহেতু হাদীসে এর বর্ণনা রয়েছে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লোকের নিকট থেকে একটি কমবয়েসী উট কর্জ হিসাবে নিলেন। এর কিছুদিন পর যাকাতের বেশ কিছু উট এলো। নবী স. আবু রাফে রা.-কে সে লোকের কর্জ পরিশোধ হিসাবে একটি কমবয়সী উট দিয়ে দিতে বললেন। আবু রাফে রা. ফিরে এসে জানালেন, সেখানে চার দাঁতবিশিষ্ট বয়সী উট ছাড়া কমবয়সী কোনো উট নেই। নবী বললেন, তা-ই একটি দাও। যে সুন্দরভাবে পাওনা আদায় করে সে-ই মানুষের মাঝে সর্বোত্তম।
শাফেয়ী আলেমগণ বলেন, যেহেতু ঋণ পরিশোধ করা দায়িত্বে ন্যস্ত ও অর্পিত বিষয়, তাই তা অবশ্যই আদায় করতে হবে। তারা সালাম বিক্রিকে ঋণের সাথে তুলনা করে এটিকে কাপড় ও পশম ইত্যাদিতে জায়েয হওয়ার মত প্রদান করেন। কিন্তু দামী পাথর, মণিমুক্তা, এমনকি চামড়া কেনাবেচাতেও সালাম জায়েয হওয়ার মত দেন না। তারা বলেন, এগুলোতে কাঙ্ক্ষিত সকল বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। তাই এগুলোতে সালাম যথাযথ নয়।
হাম্বলী মাযহাবের আলেমদের কীমী বস্তুতে সালাম বিক্রির বৈধতার বিষয়ে পরস্পর বিপরীত দুটি মত পাওয়া যায়। ইবনে কুদামা বলেন: জন্তু-জানোয়ার কেনাবেচায় সালাম পদ্ধতি বৈধ কি-না, এ বিষয়ে আলেমদের মত পরস্পর বিপরীত। একমত হচ্ছে তা সঠিক ও জায়েয নয়। এটি সুফিয়ান সাওরী রহ.-এরও মত। সাহাবী ও তাবেয়ীদের মধ্যে উমর, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও হুযায়ফা, সাঈদ ইবনে জুবাইর, শা’বী ও জুরজানী রহ.-এরও মত ছিল এটিই। উমর রা. এ সম্পর্কে বলেছেন:
إِنَّ مِنَ الرِّبَا أَبْوَابًا لَا تَخْفَى وَإِنَّ مِنْهَا السَّلَمَ فِي السِّنِّ
“সুদের দরজা অনেক, সেগুলো গোপন নয়। সে সবেরই একটি হচ্ছে বয়সী প্রাণীতে সালাম।”
তাছাড়া, প্রাণীতে প্রাণীতে অনেক পার্থক্য থাকে যা অনুল্লেখ্যও নয় বা উপেক্ষণীয়ও নয়। যেহেতু প্রাণীর বৈশিষ্ট্যে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, তাই তাতে সালাম জায়েয নয়।
হাম্বলী মাযহাবের প্রকাশ্য মত যা তাদের মধ্যে অধিক প্রচলিত তা হচ্ছে, প্রাণীতে সালাম পদ্ধতি বৈধ। আছরামের বর্ণনায় তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইবনুল মুনযির বলেন, যাদের বর্ণনায় জানা যায়, প্রাণীতে সালাম পদ্ধতি গ্রহণে কোনো বাধা নেই তারা হচ্ছেন : আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা., সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব, হাসান বসরী, শা’বী, মুজাহিদ, ইবনে শিহাব যুহরী ও আওযায়ী রহ.।
সেই সাথে লক্ষণীয়, আবু রাফে রা. তাঁর বর্ণনায় বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির নিকট থেকে একটি কমবয়সী উট কর্জ হিসাবে নিয়েছিলেন। কর্জ ও সালাম সাদৃশ্যপূর্ণ লেনদেন, তাই ফকীহগণ একটিকে অপরটির সাথে তুলনা করে থাকেন। এ অবস্থায় নবী স. যদি একটি প্রাণীর বিপরীতে অপর একটি প্রাণী দ্বারা কর্জ পরিশোধ করতে পারেন, তাহলে বিক্রেতাও সালাম পদ্ধতিতে পশু বিক্রয় এবং ক্রেতা সে পশু ক্রয় করতে পারে।
তারা আরো একটি কিয়াস উল্লেখ করেছেন। তা হলো, কেউ যদি বিবাহকালে মহর হিসাবে একটি জন্তু প্রদানের উল্লেখ করে তবে তা তার দায়িত্বে বহাল থাকবে। এমনিভাবে সালাম পদ্ধতিতেও দায়িত্বে বহাল থাকতে পারে। কাপড় কেনাবেচা করা হলে তা যেমন বিক্রেতার দায়িত্বে বহাল থাকে।
ইবনে কুদামা বলেন, জীবজন্তু ব্যতীত অন্য যে কোনো বস্তু যা পরিমাপযোগ্য নয়, ওজনে বিক্রি করার বস্তুও নয়, যা চাষ করা হয় না, তাতে সালাম বিক্রি জায়েয কি-না, তা নিয়ে আলেমগণ বিপরীতধর্মী দুটি বক্তব্য প্রদান করেছেন। ইসহাক ইবনে ইবরাহীম বলেন: ইমাম আহমদ রহ. এ সম্পর্কে বলেছেন, যা পরিমাপযোগ্য, যা ওজন করে বেচাকেনা করা হয় বা যার পরিমাণ জানা রয়েছে, কেবল সে সবে সালাম পদ্ধতি বৈধ ও জায়েয।
আবুল খাত্তাব বলেন, ইমাম আহমদ রহ.-এর কথার শেষ অংশ ছিল ‘যার পরিমাণ জানা রয়েছে’, এর অর্থ হচ্ছে, সালাম পদ্ধতিতে যা বেচাকেনা করা হচ্ছে তার এই পরিমাণ যা উভয়ের জানা রয়েছে, যেমন শস্যের স্তূপ। ডালিম বা ডিম ইত্যাদিতে তিনি বলেন, আমার মতে সালাম জায়েয নয়। ইবনুল মুনযির ইমাম আহমদ ও ইমাম ইসহাকের মত বর্ণনা করে বলেন, ডালিম, সাফারজাল (পেয়ারা জাতীয় ফল), তরমুজ, শসা, ক্ষিরা ইত্যাদিতে সালাম পদ্ধতি কল্যাণকর নয়। যেহেতু এগুলো পরিমাপযোগ্য বস্তু নয়, ওজন করে মাপার বস্তু নয়। সেই সাথে এগুলোর কোনোটা হয় ছোট, কোনোটা হয় বড়।
এ বর্ণনা অনুসারে, যে সব বস্তু গুণে গুণে বিক্রি করা হয় সেগুলো সমআকৃতির না হলে সেগুলোতে সালাম বৈধ নয়। যেমন: শাকসবজি। একই সবজি একই গাছে নানা আকৃতির হয়ে থাকে। যেমন: কদ্দু। সবজির আঁটি দিয়েও হিসাব করা সম্ভব নয়, যেহেতু আঁটির কোনোটি ছোট আর কোনোটি বড় হতে পারে। তাই এগুলোর কোনোটিতে সালাম জায়েয নয়, যেমন মণিমুক্তার ক্ষেত্রেও কোনোটি বড় এবং কোনোটি ছোট হওয়ার প্রেক্ষিতে তাতে সালাম জায়েয নয়। এর বিপরীতে ইসমাইল ইবনে সাঈদ ও ইবনে মানসুর বলেন, সালাম পদ্ধতি জায়েয যাবতীয় ফলে, সাফারজালে, ডালিমে, কলায় এবং যাবতীয় সবজিতে। তারা বলেন, এগুলোর অধিকাংশই হয় কাছাকাছি আকারের; ছোটগুলোকে ভিন্ন এবং বড় গুলোকে ভিন্নভাবে বিন্যস্ত করা যায়। যেগুলো বিন্যস্ত করা সম্ভব না হবে সেগুলো ওজন করে লেনদেন করা হবে।
টিকাঃ
৫. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮২, ঋণ সংক্রান্ত আয়াত
৬. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২০৮
৭. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭২; হাশিয়া দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ২১৫
৮. মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১২২৪
৯. আল-মুহায্যাব, খ. ১, পৃ. ৩০৪; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১০৭-১১০
১০. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩০৭-৩০৯