📄 অংশীদারী
অধিকাংশ ফকীহ ও আলেমের মতে, অংশীদারী কারবারে পুঁজি হবে মিছলী বস্তুর মিশ্রণ, সকল অংশীদার মিছলী বস্তু পুঁজি হিসাবে বিনিয়োগ করবে। তারা বিষয়টিতে আরো সংকোচন এনে বলেন, যে কোনো মিছলী বস্তু নয়, বরং পুঁজি হবে স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রা।
আদ-দুররুল মুখতার-এর গ্রন্থকার লিখেছেন: স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রা- যেগুলো প্রচলিত কেবল সেগুলো দ্বারা অংশীদারী ব্যবসা করা যথাযথ ও জায়েয হবে; অন্য কিছু দ্বারা নয়। স্বর্ণ ও রৌপ্যের পিণ্ড বা খণ্ড দিয়েও অংশীদারী ব্যবসা করা যেতে পারে- যদি এগুলোর প্রচলন থাকে।
এ আলোচনায় প্রমাণিত হলো, স্বর্ণ ও রৌপ্য ব্যতীত অন্য কোনো জিনিস পুঁজি হবে না- তা মিছলী হোক, পরিমাপযোগ্য বস্তু বা ওজনের বস্তু হোক, অথবা গুণে গুণে বেচাকেনার বস্তু হোক। এ সকল মিছলী বস্তু সমজাতীয় বস্তুর সাথে মিলানোর পূর্বেও তা পুঁজি বলে গণ্য হবে না, মিলানোর পরও নয়। এটিই হানাফী মাযহাবের আলেমদের মত, তাদের প্রকাশ্য অভিমত যা তাদের ফতোয়া, যা প্রথমত ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-এর একক মত ছিল।
হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ এর কাছাকাছি মত ব্যক্ত করেছেন। শাফেয়ীদেরও এটি একটি মত। তা হচ্ছে, অংশীদারী কারবারে পুঁজি হবে কেবল ছাপ আঁকা মুদ্রা। শাফেয়ীদের যে মতটি তাদের ফতোয়া তা হানাফী মাযহাবের ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর অভিমত। তা হচ্ছে, স্বর্ণ ও রৌপ্যের মুদ্রা ব্যতীত অন্য মিছলী বস্তুও অংশীদারী কারবারে পুঁজি হতে পারে। যেমন ধান, গম ইত্যাদি। এক্ষেত্রে একটি শর্ত রয়েছে। তা হলো, এক জাতীয় বস্তুই একত্র করা হবে। শারবীনী তার কারণ বর্ণনা করে বলেন, যখন সকলে একজাতীয় জিনিস পুঁজি হিসাবে একত্র করবে তাতে কোনো তারতম্যও আর থাকবে না। ফলে এটি স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রার সদৃশ বলে পরিগণিত হবে। মালেকী আলেমদের এক্ষেত্রে বিস্তারিত বক্তব্য রয়েছে, যার জন্যে দ্রষ্টব্য : شركة
টিকাঃ
১৪. হাশিয়া রুদ্দুল মুহতার ও আদ-দুররুল মুখতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪০; হাশিয়া দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৩৪৮
১৫. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৩; ইবনে কুদামা, আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৬
১৬. রদ্দুল মুহতার, খ. ৩, পৃ. ৩৪০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২১৩
📄 সম্পদ বণ্টন
হানাফী মাযহাবের আলেমগণ বলেন: সম্পদ ও সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টনের দুটি দিক রয়েছে: এক. ইফরায (إفراز) : সকল উত্তরাধিকারীর সম্পদ পৃথককরণ এবং দুই. মুবাদালাহ (مُبَادَلَ): একের অংশের সাথে অপরের অংশের বদলাবদলি। তবে মিছলী বস্তু যখন উত্তরাধিকারীদের মধ্যে যার যা অংশ তা বণ্টন করা হয়, তাতে বিনিময়ের চাইতে সম্পদ পৃথককরণই থাকে অধিক প্রকাশ্য। তাই কোনো মিছলী বস্তুতে দুজন অংশীদার থাকা অবস্থায় একজন অপরজনের অবর্তমানে তার অংশটুকু নিয়ে নিতে পারে। অপরজন শুধু অবর্তমান নয়, তার অনুমতিরও তখন প্রয়োজন হয় না, যদি সে মিছলী বস্তুটি তাদের দুই শরীকের হাতেই ন্যস্ত থাকে।
একজনের অবর্তমানে এমনকি তার অনুমতিরও অপেক্ষা না করে অপরজন মিছলী বস্তুতে থাকা তার অংশ নিয়ে নেওয়ার বৈধতার পক্ষে হানাফী মাযহাবের আলেমগণ যে কারণ দর্শান তা হলো, এটি হচ্ছে যার অংশ তার তা নিয়ে যাওয়া। যেহেতু সে তার নিজের অংশ নিয়ে যাচ্ছে, তাই এখানে অপর অংশীদারের উপস্থিতি বা অনুমতির কোনো প্রয়োজন নেই।
কীমী বস্তুতে অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত; তাতে বদলাবদলির দিকটিই অধিক প্রকাশ্য। তাই কে কোন্টি নিবে তা সকলের সম্মতি অথবা বিচারকের নির্দেশ মোতাবেক হতে হবে। তাই কোনো কীমী বস্তুতে দুজন অংশীদার থাকলে একজনের অনুপস্থিতিতে অপরজন তার অংশ নিয়ে যেতে পারবে না। সেক্ষেত্রে একজনের বিনা অনুমতিতে অপরজন তা ভাগ বণ্টনই করতে পারবে না। অন্য সকল মাযহাবের আলেম ও ফকীহ এ বিষয়টিতে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য : قسمة
টিকাঃ
১৭. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা : ১১১৬-১১১৭; আলী হায়দার, শারহুল মাজাল্লা, খ. ৩, পৃ. ১০৪-১০৬
📄 দ্বিতীয়ত : সম্পদ বিনষ্ট ও ধ্বংসকরণ
ফকীহগণ এ কথায় একমত, যদি কেউ কারো সম্পদ অন্যায়ভাবে নষ্ট করে তাহলে অবশ্যই তাকে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যা বিনষ্ট করা হয়েছে তা যদি মিছলী বস্তু হয় তাহলে সে পরিমাণ মিছলী বস্তু প্রদান করে তার ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে। যদি ধ্বংসপ্রাপ্ত বস্তুটি কীমী হয় তাহলে তার মূল্য প্রদান করতে হবে। সেক্ষেত্রে যে জায়গায় তা ধ্বংস করা হয়েছে সে স্থানে বস্তুটির যে মূল্য রয়েছে তা ধর্তব্য হবে।
যদি ওই মিছলী বস্তুটি এখন আর বাজারে পাওয়া না যায়, তাহলে এক্ষেত্রেও সকলেই একমত যে, সে বস্তুর মূল্য আদায় করতে হবে। কিন্তু মূল্য নির্ধারণের আলোচনায় ফকীহগণ নানা মত বর্ণনা করেছেন। জিনিসটি ধ্বংস করার সময় তার মূল্য যা ছিল তা ধর্তব্য হবে? যেদিন বাজারে সর্বশেষ পাওয়া গিয়েছিল সেদিনের দাম ধরা হবে? যেদিন ক্ষতিপূরণ চাওয়া হচ্ছে সেদিনের মূল্য সাব্যস্ত হবে? যেদিন ক্ষতিপূরণ আদায় করা হচ্ছে সেদিন জিনিসটির মূল্য যা তা ধর্তব্য হবে? ফকীহগণ এমনি নানা দৃষ্টিভঙ্গিতে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রদান করেছেন। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য : إتلاف
যদিও নিয়ম হচ্ছে, মিছলী বস্তুর বিনিময়ে মিছলী বস্তু প্রদান, কিন্তু কতক মিছলী বস্তুর বিনিময় প্রদান করতে হয় মূল্য দ্বারা। তাজুদ্দীন সুবকী ও জালালুদ্দীন সুয়ূতী এমনই কতগুলো অবস্থা আলোচনা করেছেন। সে অবস্থাগুলোতে অপহরণ করা ব্যতীত সম্পদ ধ্বংস করা হয়, তার বিনিময় আদায় করতে হয় মূল্য দ্বারা। যথা:
এক. মরুপ্রান্তরে থাকা পানি ধ্বংস করা। এখানে যার পানি ধ্বংস করা হয়েছে সে এবং যে তা ধ্বংস করেছে উভয়ে যদি পরে কোনো শহর এলাকায় এসে উপস্থিত হয়, এমনকি কোনো নদীর পাড়ে এলেও এ ক্ষতির পূরণ করতে হবে সে তেপান্তরে থাকাকালে সে পানিটুকুর যা মূল্য ছিল তার দ্বারা।
দুই. গ্রীষ্মকালে কারো মালিকানায় থাকা বরফ নষ্ট ও ধ্বংস করার পর ধ্বংসকারী তার বদলা দিতে চাচ্ছে শীতকালে, তাহলে তাকে সে বরফের মূল্য আদায় করতে হবে যখন ধ্বংস করেছে তখনকার মূল্য হিসাব করে।
তিন. কারো অলঙ্কার ধ্বংস করা হলে তার মূল্য পরিশোধ করতে হবে। এ সময় তৈরির খরচও তাতে হিসাব করতে হবে।
ইবনে নুজাইম তাঁর আল-বাহরুর রায়েক গ্রন্থে এমন কতক অবস্থা উল্লেখ করেছেন, যেগুলোতে মূল বস্তু মিছলী হওয়া সত্ত্বেও তার ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হয় মূল্য পরিশোধ করার মাধ্যমে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে: যদি ক্রেতা ও বিক্রেতার কথার মাঝে মতান্তর হয়, উভয়ে শপথ করে এবং লেনদেন ভেঙ্গে দেয়; এদিকে পণ্যটি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে তার মূল্য দ্বারা বিনিময় আদায় করতে হবে, বস্তুটি মিছলী হলেও সেদিকে লক্ষ করা হবে না। এটি ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর অভিমত।
অপর একটি অবস্থা: যদি কোনো ত্রুটিপূর্ণ লেনদেনের মাধ্যমে কেউ কোনো বস্তু কজা করে, তা ধ্বংস হয়ে গেলে এখন তাকে তার মূল্য পরিশোধ করতে হবে। যেহেতু এটি যে কজা করেছে তা তার দায়িত্বে এসে পড়েছে। কিন্তু লেনদেনটি ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার দরুন তা তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। এক্ষেত্রে ইমাম মুহাম্মদ রহ. বলেন, যেদিন ধ্বংস করা হয়েছে সেদিনের মূল্য আদায় করতে হবে, অন্য সকলের মতে যেদিন কজা করা হয়েছে সেদিনের মূল্য।
অপর একটি অবস্থা: কোনো মিছলী বস্তু ছিনিয়ে নেওয়ার পর তা আর এখন বাজারে না পাওয়া গেলে তার মূল্য প্রদান করতে হবে। ইমাম আবু হানিফা ও তাঁর ছাত্রদের এ অভিমত হলেও মূল্য নির্ধারণ করা হবে কোন্ দিনের মূল্য বিবেচনা করে, তা নিয়ে তাদের প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। এ কথায় সকল আলেম ও ফকীহ একমত যে, কোনো কারণে মিছলী বস্তুর অনুরূপ বস্তু ফেরত দেওয়া সম্ভব না হলেই তার মূল্য ফেরত দেওয়া কর্তব্য ও আবশ্যক হবে।
টিকাঃ
১৮. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ৪১৫
১৯. সুয়ূতী, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৮৫; ইবনে সুবকী, আল-কাওয়ায়েদ, পৃ. ৮০
২০. ইবনে নুজাইম, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৬৩
২১. প্রাগুক্ত
📄 তৃতীয়ত : হারাম শরীফে মিছলী প্রাণী মেরে ফেলা
সকল ফকীহ এ কথায় একমত, ইহরাম বাঁধা অবস্থায় হারাম শরীফে যদি কোনো ব্যক্তি শিকার প্রাণীকে মেরে ফেলে, তাহলে তার সদৃশ কোনো গৃহপালিত প্রাণী বদলা হিসাবে হারাম শরীফে কুরবানী হিসাবে পাঠাতে হবে, যেহেতু এ সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের স্পষ্ট নির্দেশ এসেছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنتُمْ حُرُمٌ وَمَن قَتَلَهُ مِنكُم مُتَعَمِّدًا فَجَزَاء مِّثْلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ "হে ঈমানদারেরা! তোমরা ইহরাম বাঁধার পর কোনো শিকার প্রাণী মেরে ফেলো না। তোমাদের কেউ যদি ইচ্ছা করে কোনো প্রাণী মেরে ফেলে তাহলে সে প্রাণীর সদৃশ গৃহপালিত জন্তু বিনিময় হিসাবে পাঠাতে হবে, হারাম এলাকাতে (কুরবানী করার জন্যে)।"
বিনিময়ে প্রদত্ত জন্তুর প্রকার, বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা ইত্যাদি নিয়ে আলেমগণ ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যদি শিকারকৃত প্রাণীটি মিছলী হয় অর্থাৎ গৃহপালিত প্রাণীর মধ্যে তার সমগড়নের কোনো প্রাণী থাকে, তবে সে শিকার জন্তুর বিনিময় প্রদানকালে ইহরাম বাঁধা ব্যক্তি নিম্নোক্ত তিনটি পন্থার কোনো একটি গ্রহণ করতে পারে : এক. গৃহপালিত সমগড়নের প্রাণী হারাম শরীফে জবাই করে তা হারাম শরীফের দরিদ্র লোকদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া। দুই. শিকারকৃত প্রাণীটির মূল্য নির্ধারণ করে সে মূল্য দিয়ে খাদ্যদ্রব্য কিনে হারাম শরীফের দরিদ্র লোকদের মাঝে তা বণ্টন করা। তিন. মূল্য নির্ধারণ হলে তা দিয়ে কতটুকু খাদ্যদ্রব্য কেনা যাবে, তা হিসাব করে প্রতি মুদ খাদ্যদ্রব্যের বিপরীতে একটি করে রোযা রাখা। যদি শিকার প্রাণীটি মিছলী না হয় অর্থাৎ গৃহপালিত প্রাণীতে তার সমগড়নের কোনো প্রাণী না থাকে, তাহলে অবশ্যই সে প্রাণীর মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। মূল্য নির্ধারণের পর তা দরিদ্র লোকদের মাঝে বিলিয়ে দিতে হবে অথবা সে হিসেবে রোযা রাখবে।
হানাফী মাযহাবের আলেমগণ হারাম শরীফের শিকার প্রাণীতে কোনো পার্থক্য না করে, গৃহপালিত প্রাণীতে তার সমগড়নের কোন প্রাণী থাকুক বা না থাকুক, সব ধরনের প্রাণীকেই কীমী বলে গণ্য করেন। তাই যে কোনো প্রাণী শিকার করা হোক তারা তার মূল্য নির্ধারণ করার মত প্রদান করেন। তারা এ সম্পর্কে বলেন, যে জায়গায় জন্তুটিকে মেরে ফেলা হয়েছে সেখানে এটির মূল্য কত তা দুজন ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি নির্ধারণ করবে। এরপর যে মেরেছে তার তিনটি কাজের যে কোনোটি করার এখতিয়ার থাকবে: এক. সে মূল্য দিয়ে কুরবানীর জন্তু কিনে তা হারাম শরীফে জবাই করে হারাম এলাকার গরীব লোকদের মাঝে বিলিয়ে দেবে। দুই. সে মূল্য দিয়ে খাদ্যদ্রব্য কিনে হারাম শরীফের গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দেবে। তিন. মূল্য দিয়ে খাদ্যদ্রব্য কেনা হলে কতটা কেনা যাবে তা হিসাব করে তাতে কতজন দরিদ্রের অংশ হবে তা সদকায়ে ফিতর হিসেবে হিসাব করবে। এরপর সে কদিন সে রোযা রাখবে।
টিকাঃ
২২. সূরা মায়েদা, আয়াত: ৯৫
২৩. আত-তাজ ওয়াল ইকলীলসহ আল-হাততাব, খ. ৩, পৃ. ১৭০; হাশিয়া কালয়ুবী, খ. ২, পৃ. ১৩৯; আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ২৮১
২৪. আদ-দুররুল মুখতার টীকাসহ, খ. ২, পৃ. ২১৩-২১৫