📄 মিছলিয়াত (الْمِثْلِيَّاتُ)-এর সাথে সম্পর্কিত বিধিবিধান
মিছলিয়্যাত-এর সাথে সম্পর্কিত বিধিবিধান নানা প্রকার। নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হচ্ছে:
📄 প্রথমত : লেনদেন সম্পর্কিত বিধিবিধান
ফকীহগণ এ কথায় একমত, কতক লেনদেন কীমী বস্তুতে জায়েয, যেমন মিছলী বস্তুতে জায়েয। এগুলো হচ্ছে: কেনাবেচা, ভাড়া প্রদান, হেবা বা দান ইত্যাদি। লেনদেনের মূল চুক্তিবদ্ধ বস্তুটি মিছলী হওয়া শর্ত কি-না, তা নিয়ে কোনো কোনো লেনদেনে ফকীহগণ মতদ্বৈধতা করেছেন। এ ধরনের লেনদেন হচ্ছে: সালাম বিক্রি, ঋণপ্রদান, অংশীদারী ইত্যাদি। বিস্তারিত আলোচনা পর্যায়ক্রমে করা হচ্ছে:
📄 সালাম বিক্রি (বায়‘উস সালাম)
সালাম বিক্রির নিয়ম হচ্ছে, ক্রেতা প্রথমেই পণ্যের মূল্য প্রদান করবে, বিক্রেতা পরে তার পণ্য উৎপাদিত হলে বা নির্মিত হলে তা উপস্থাপন করবে। তাই ফকীহগণ এ ধরনের বেচাকেনা যথাযথ হওয়ার জন্যে শর্তারোপ করেছেন, এক্ষেত্রে পণ্য যথাসময়ে উপস্থাপনা এবং তা ক্রেতার হাতে অর্পণ করা বিক্রেতার দায়িত্বে ন্যস্ত থাকবে। এ শর্তের প্রতি লক্ষ করে আলেমগণ বলেন, এ ধরনের বিক্রিতে মিছলী বস্তু পণ্য হতে পারবে। যেমন পরিমাপ-পাত্র দিয়ে বা ওজন করে যা মাপা হয় সেসব বস্তুও বিক্রিত পণ্য হতে পারবে। এ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন: مَنْ أَسْلَفَ فِي تَمْرٍ فَلْيُسْلِفَ فِي كَيْلٍ مَعْلُومٍ وَوَزْنِ مَعْلُومٍ إِلَى أَجَلٍ مَعْلُومٍ "যে কেউ অগ্রিম মূল্যে খেজুর কিনবে তার কর্তব্য হবে নির্দিষ্ট সময়ের শর্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ-পরিমাপ নির্ধারণ করে নেওয়া।"
অধিকাংশ ফকীহ যে সকল বস্তু হাত দিয়ে বা ফিতা দিয়ে মেপে বিক্রি করা হয় অথবা গুণে গুণে বিক্রি করা হয় সেগুলো যদি একই রূপ থাকে বা কাছাকাছি মানের ও মাপের হয়, তবে এগুলোকেও তারা মিছলী বলে গণ্য করেন। তাই তারা পরিমাপযোগ্য বস্তু বা ওজন করে যা বিক্রি করা হয় সে সব মিছলী বস্তুতে যেমন সালাম বিক্রি বৈধ ও জায়েয বলেন, তেমনি মেপে বা গুণে বিক্রি করা বস্তুগুলোও তারা মিছলী গণ্য করে সেগুলোতে সালাম-বিক্রি জায়েয হওয়ার মত প্রকাশ করেছেন। যেহেতু সেগুলোতে পরিমাণ বা সংখ্যা সম্পর্কে অজ্ঞতা থাকে না।
হানাফী মাযহাবের আলেমগণ মিছলী বস্তুর তালিকা থেকে স্বর্ণ ও রৌপ্য পৃথক করে বলেন, এ দুটোতে সালাম জায়েয নয়। কাসানী সালাম বিক্রিতে বিভিন্ন শর্ত আলোচনাকালে বলেছেন, শর্তাবলির একটি হচ্ছে, নির্দিষ্ট করা হলে পণ্যটি নির্ধারিত হবে। কিন্তু দিরহাম (রৌপমুদ্রা) ও দীনার (স্বর্ণমুদ্রা)-এর ন্যায় কোনো বস্তু, নির্ধারণ করার পরও যা নির্দিষ্ট হয় না, তাতে সালাম জায়েয নয়। যেহেতু সালাম বিক্রিতে যা নির্ধারণ করা হবে তা হচ্ছে বিক্রয়ের পণ্য। পণ্য নির্দিষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয়। যদি তা নির্দিষ্ট না হয় তবে সাধারণ বিক্রি হবে ফাসেদ ও ত্রুটিপূর্ণ এবং সালামের ক্ষেত্রে হবে নাজায়েয। অথচ দিরহাম, দীনার এবং এ ধরনের সকল মুদ্রা, নির্দিষ্ট করার পরও এগুলো নির্দিষ্ট হয় না।
কীমী বস্তুতে লক্ষ করলে দেখা যায়, তাতে দুটো অবস্থা বিদ্যমান। এক. তার বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে সুনির্ধারিত করা সম্ভব, দুই. তা সম্ভব নয়। যেসব কীমী বস্তুতে বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ ও বিন্যাস করা সম্ভব সেগুলোতে সালাম পদ্ধতি বৈধ হবে এবং যেগুলোতে তা সম্ভব নয় সেগুলোতে সালাম সঠিক ও বৈধ হবে না। যেহেতু এ ধরনের বস্তুতে সালাম করা হলে প্রায়শ এমন হবে, ক্রেতার চাহিদামত বিক্রেতা পণ্য উৎপাদন বা গঠন করতে পারবে না। ফলে এ ধরনের বেচাকেনা কেবল ঝগড়ার অবকাশই সৃষ্টি করবে। অথচ ঝগড়া না হওয়াই শরীয়তগত ও সামাজিকভাবে কাম্য। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য : السَّلَمُ
টিকাঃ
৬. হাদীসটি সহীহ বুখারীতে সংকলিত হয়েছে। ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৪২৯; মুদ্রণ সালাফিয়্যা; মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১২২৭, প্রকাশক: হালাবী। সহীহ মুসলিম থেকে হাদীসটি উল্লেখ করা হয়েছে।
৭. ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ২১৯; আল-কাওয়ানীন আল-ফিকহিয়্যা, পৃ. ৭৭৪; মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ৫৩৪; রওজাতুত তালিবীন, খ. ৪, পৃ. ৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১০৮; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৭৬; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৩২
৮. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২১২
৯. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২১২
📄 ঋণ
সকল ফকীহ এ কথায় একমত, মিছলী বস্তুতে কর্জ প্রদান ও গ্রহণ বৈধ। যেহেতু ঋণগ্রহণের দাবি ও চাহিদা হচ্ছে, যা নেওয়া হবে তার সদৃশ ফেরত দিতে হবে। এটি মিছলী বস্তুতে সহজেই সম্ভব; তা পরিমাপ যোগ্য বস্তু হোক বা ওজন করার বস্তু হোক। এমনিভাবে তা গুণে গুণে বেচাকেনা করার দ্রব্য হোক বা মেপে লেনদেন করার বস্তু হোক। যদি সবগুলো প্রায় এক ধরনের হয় তাহলেই তা কর্জ দেওয়া জায়েয হবে।
মিছলী বস্তু ভিন্ন অন্য বস্তু ধার দেওয়া যাবে কি-না তা নিয়ে ফকীহগণ মতপার্থক্য প্রকাশ করেছেন। মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ এ সম্পর্কে বলেন, যা সালাম পদ্ধতিতে বেচাকেনা করা জায়েয তা ঋণ দেওয়াও জায়েয, তা প্রাণীই হোক বা অন্য কোনো সামগ্রী অথবা মিছলী বস্তু। এটি শাফেয়ী মাযহাবের অধিক প্রকাশিত মত। তারা বলেন, হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লোকের এক কমবয়সী উট ধার নিয়েছিলেন। এখানে ধার নেওয়া বস্তু কোনো মিছলী বস্তু-পরিমাপযোগ্য বা ওজনের বস্তু ছিল না। কিন্তু নবী তা ধার নেওয়ায় বোঝা গেল, এক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, দায়িত্বে যথাযথ রূপে ন্যস্ত থাকা এবং ঋণ পরিশোধের অনুভূতি জাগ্রত থাকা।
যদিও এ তিন মাযহাবের আলেমগণ ঋণ প্রদানের মাসআলায় যথেষ্ট উদার; যে সব বস্তুতে সালাম জায়েয সে সবই ধার দেওয়া জায়েয বলে মত প্রকাশ করেছেন, কিন্তু একটি ক্ষেত্রে তারা বিপরীত রায় প্রদান করেন। যদি কেউ কারো নিকট বাঁদী ধার হিসাবে চায়, সে বাঁদীর সাথে ঋণগ্রহীতার মিলন ও সহবাস বৈধ থাকে, তাহলে এক্ষেত্রে বাঁদীকে ধার দেওয়া জায়েয নয়। যেহেতু এ পরিস্থিতিতে ধার দেওয়া হবে সহবাসের জন্যে, অথচ সহবাসের জন্য ধার দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
তারা বলেন, যে বস্তুতে সালাম জায়েয নয়, সে বস্তু কর্জ হিসাবে প্রদান করাও জায়েয নয়। যেহেতু যা খুবই দুর্লভ অথবা যার বৈশিষ্ট্যাদি লক্ষ রেখে তার সদৃশ বস্তু সংগ্রহ করা কষ্টকর, তার তুল্য বস্তু ফেরত দেওয়া হয়তো অসম্ভব অথবা খুব কষ্টকর। তাই এ ধরনের বস্তু কর্জ প্রদানই যথাযথ হবে না।
হানাফী মাযহাবের ফকীহদের এ সম্পর্কে মত হচ্ছে, মিছলী বস্তু ছাড়া অন্য কোনো বস্তু কর্জ দেওয়া জায়েয নয়। তা পশু হোক, কাঠ বা জমিন হোক। এমনিভাবে যে সকল বস্তুর সকল একক বরাবর নয়, বরং সেগুলোতে তারতম্য অনেক, সেগুলো কর্জ হিসাবে দেওয়া জায়েয হবে না; যেহেতু তার সদৃশ বস্তু ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে না। অথচ ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সদৃশ বস্তু ফিরিয়ে দেওয়াই বিধান।
ইবনে আবেদীন বলেন, যে বস্তু কর্জ নেওয়া হবে তা থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব তা ব্যবহার করে নিঃশেষ করা হলেই। তাই তার সদৃশ বস্তু পরে ফিরিয়ে দেওয়া কর্তব্য হবে। তা মিছলী বস্তু ছাড়া কোনো কিছুতে সম্ভব নয়, আর তাই মিছলী বস্তুই কেবল ধার নেওয়া যথার্থ ও জায়েয।
আল-বাহরুর রায়েক গ্রন্থে বলা হয়েছে, যে বস্তু মিছলী না হওয়ায় ধার হিসাবে নেওয়া জায়েয নয়, তা যদি ঋণ নেওয়া হয়, তাহলে তা আরিয়ত বলে গণ্য হবে। আরিয়তে নেওয়া মূল বস্তুই ফেরত দেওয়া বিধান। তাই এখানেও যা ধার হিসাবে নেওয়া হবে তা-ই ফেরত দিতে হবে। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য : قَرْضٌ
টিকাঃ
১০. মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১২২৪; মুহাম্মদ ফুয়াদ আব্দুল বাকী-এর তাহকীকসহ।
১১. হাশিয়া দুসূকী ও আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ২২২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১১৮; ইবনে কুদামা, আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৫০
১২. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১৭১
১৩. প্রাগুক্ত