📄 গ. অন্যের অধিকার সংশ্লিষ্ট হওয়ার বিবেচনায়
অন্যের অধিকার সংশ্লিষ্ট হওয়ার দিক থেকে সম্পদ দু' প্রকার: ১. যার সাথে মালিক ছাড়া অন্য লোকের অধিকার সংশ্লিষ্ট রয়েছে। ২. যার সাথে মালিক ছাড়া অন্য লোকের অধিকার সংশ্লিষ্ট নয়।
মালিক ছাড়া অন্য লোকের অধিকার সংশ্লিষ্ট সম্পদ হলো যার মূল্যসত্তা কিংবা অর্থসত্তা মালিক ছাড়া অন্যদের নির্দিষ্ট অধিকারের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেমন: বন্ধকী সম্পদ। মালিকের অধিকার নেই বন্ধকগ্রহীতার অধিকারে ব্যত্যয় সৃষ্টি করে এমন কোনো হস্তক্ষেপ করা।
পক্ষান্তরে যেই সম্পদের সাথে অন্যের অধিকার সংশ্লিষ্ট নয় সে সম্পদ একান্ত ভাবে মালিকের জন্য বরাদ্দ। অন্যের অধিকারের সংশ্লিষ্টতা এবং কারও অনুমতির ওপর নির্ভরশীলতা ছাড়াই বৈধ সকল উপায়ে পৃষ্ঠপোষকতা এবং উপকৃত হওয়ার ক্ষেত্রে উক্ত সম্পদের সাথে মালিক যে কোনো আচরণ করতে পারবে। কারণ উক্ত সম্পদের সাথে অন্যের অধিকারের সংশ্লিষ্টতা নেই।
📄 ঘ. স্থানান্তর ও পরিবর্তনের বিবেচনায়
স্থানান্তর ও পরিবর্তনের সম্ভাব্যতার দিক বিবেচনা করে ফিকহবিদগণ সম্পদকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন: ১. অস্থাবর (منقول) ; ২. স্থাবর (عقار)।
অস্থাবর সম্পদ হলো যা স্থানান্তর করা এবং অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। সুতরাং এর অন্তর্ভুক্ত হবে মুদ্রা, পণ্যদ্রব্য, প্রাণী, পরিমাপ ও পরিমাণজাত দ্রব্য ইত্যাদি। আর স্থাবর সম্পত্তি হলো যার একটি স্থিরভিত্তি আছে। যা স্থানান্তর ও সরানো সম্ভব না। যেমন জমি, ঘরবাড়ি ইত্যাদি। আবুল ফজল দামেশকী বলেন: স্থাবর সম্পত্তি দুই প্রকার। ১. ছাদযুক্ত আর তা হলো ঘরবাড়ি, হোটেল, দোকান, গোসলখানা, আটার কল, মাড়াইকল, মৃতশিল্পের কারখানা, রুটির কারখানা, ট্যানারি, আঙ্গিনা। ২. মাপযোগ্য স্থান। এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হলো বাগান, ফলের বাগান, চারণভূমি, বন, বাঁশঝাড় এবং এগুলোর সাথে সম্পৃক্ত নদীর ও ঝরনার পানির অধিকার।
ফিকহবিদগণ ভবন এবং মজবুত বৃক্ষে মতবিরোধ করেছেন। এ দু’টি বস্তু কি স্থাবর সম্পত্তিরূপে বিবেচিত হবে না অস্থাবর সম্পত্তিরূপে? শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী সকল ইমামের মত হলো, উক্ত দুই বস্তু স্থাবর সম্পত্তিভুক্ত। আর হানাফী ফিকহবিদগণ বলেন, উক্ত দুই বস্তু অস্থাবর সম্পত্তির শ্রেণীভুক্ত। তবে উক্ত বস্তুদ্বয় যদি ভূমির অধীনে থাকে তাহলে অনুগামী হিসাবে উক্ত দুই বস্তুতে স্থাবর সম্পত্তির বিধান জারি হবে।
টিকাঃ
২৫. আল-মিসবাহুল মুনীর; মুরশিদুল হায়রান, ধারা : ৩; মাজাল্লাতুল আহকাম আল- আদলিয়্যা, ধারা: ১২৮
২৬. আল-মুগরিব, তাহরিরু আলফাজিত তামবীহ পৃ. ১৯৭, মুরশিদুল হায়রান, খ. ২, মাজাল্লাতুল আহকাম আল-আদলিয়্যা, ধারা: ২৯
২৭. আবুল ফজল জাফর বিন আলী দামেশকী, আল-ইশারা ইলা মাহাসিনিত তিজারাহ, পৃ. ২৫
২৮. রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৩৬১; আল খিরাশী, খ. ৬, পৃ. ১৬৪; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭১; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৭৩; মাজাল্লাতুল আহকাম আল-আদলিয়্যা, ধারা: ১০১৯ ও ১০২০ দ্রষ্টব্য
📄 ঙ. মুদ্রা হওয়ার বিবেচনায়
ফিক্হবিদগণ মুদ্রা হওয়ার বিবেচনায় সম্পদকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। ১. মুদ্রা (نقود) ২. পণ্যদ্রব্য (عروض)
নুকূদ (نقود) শব্দটি نقد (নাব্দ)-এর বহুবচন, আর তা হলো স্বর্ণ ও রৌপ্য। এই ভিত্তিতে মাজাল্লাতুল আহকাম আল-আদলিয়্যা (ইসলামী আইন ও বিচার বিষয়ক ম্যাগাজিনের) ভাষ্য হলো স্বর্ণ এবং রৌপ্যের নাম মুদ্রা। তা মুদ্রার ছাঁচে ঢালা হোক বা না হোক। স্বর্ণ ও রৌপ্যকে দুই মুদ্রা বলা হয়। বর্তমান যুগের প্রচলিত নোটকে স্বর্ণ-রৌপ্যের বিধানে যুক্ত করা হয়।
উরূয (عروض) যা عرض (আর্য)-এর বহুবচন; তা হলো ঐ বস্তু ও সামগ্রী যা মুদ্রা নয়। আল-মুগনীর গ্রন্থকার বলেন, পণ্য দ্রব্য হলো উদ্ভিদ, প্রাণী, অস্থাবর সম্পদ এবং অন্য সকল সম্পদ।
যদি ব্যবসা করার জন্য মুদ্রা গ্রহণ করা হয় তাহলে কোনো কোনো হাম্বলী ফিকহবিদ মুদ্রাকে পণ্যের আওতাভুক্ত করেন এ কথার ওপর ভিত্তি করে, পণ্য বলা হয় যা ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে লাভের উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছে, তা মুদ্রা হয় হোক। বাহুতী রহ. বলেন: পণ্যকে عرض (প্রদর্শনীয়) বলে নামকরণ করা হয়েছে। কারণ, তা ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শিত হয়। এটি হচ্ছে কর্মবাচ্যকে ক্রিয়ামূলের নামে নামকরণ। যেমনিভাবে জ্ঞানার্জন (ক্রিয়ামূল) বলার দ্বারা জ্ঞাত (কর্মবাচ্য) বিষয় বোঝানো হয়। অথবা এই কারণে যে, তা (অর্থাৎ দ্রব্য ও পণ্য) আবির্ভূত হয়ে বিলীন ও ধ্বংস হয়ে যায়।
টিকাঃ
২৯. মাজাল্লাতুল আহকাম আল-আদলিয়্যা, ধারা: ১৩০
৩০. রুদ্দুল মুহতার, খ. ২, পৃ. ৩০; শরহু আবিল হাসান মালেকী আলার রিসালা, খ. ১, পৃ. ৪২৪
৩১. আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৪২৪
৩২. শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ১, পৃ. ৪০৭
📄 চ. সম্পদ মালিকের নিকট ফিরে আসার দিক বিবেচনায়
ফিকহবিদগণ মালিকের হাতছাড়া হওয়ার পর পুনরায় তার নিকট ফিরে আসার (অর্থাৎ হস্তগত হওয়ার) সম্ভাবনার দিক থেকে সম্পদকে দুই প্রকারে বিভক্ত করেছেন।
১. (ফিরে পাওয়ার) সম্ভাবনাহীন সম্পদ (ضمار /যিমার); ২. (ফিরে পাওয়ার) সম্ভাবনাময় সম্পদ (مرجو/মারয়)। সম্ভাবনাহীন সম্পদ হলো যার মালিক উক্ত সম্পদ হাতছাড়া হওয়ার কারণে এবং তা ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে আশাহত হওয়ার কারণে তাতে বৃদ্ধি ও উন্নয়ন করতে পারে না। ضمار (অর্থাৎ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনাহীন) শব্দটির মূল হলো الإضمار যার শাব্দিক অর্থ আড়াল করা, গোপন করা। এই ভিত্তিতে হানাফী ফিকহবিদ মুহীত নামক গ্রন্থের লেখক সম্ভাবনাহীন সম্পদের সংজ্ঞা দেন: যা মূল মালিকানায় থাকে তবে তা এমনভাবে হাতছাড়া হয় যে, সাধারণত তা ফিরে পাওয়ার আশা করা যায় না।
ইমাম ইবনুল জাওযীর সহচরগণ বলেন, যিমার (ضمار/সম্ভাবনাহীন)-এর ব্যাখ্যা হলো এমন সম্পদ যার অস্তিত্ব আছে, তবে তা লাভ করার পথ রুদ্ধ। এর উদাহরণ, ছিনিয়ে নেওয়া সম্পদ; যদি মালিকের নিকট ছিনতাইকারীর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না থাকে, নিখোঁজ সম্পদ; যেমন: হারানো উট, পলাতক দাস। মালিকের তার ওপর কোনো সামর্থ্য না থাকার দরুন তা ধ্বংসপ্রাপ্ত বস্তুতুল্য, এমনিভাবে সমুদ্রের ভিতর পড়ে যাওয়া সম্পদ। কারণ, তা না থাকার সমতুল্য এবং অরণ্য-মরুতে প্রোথিত সম্পদ- যদি মালিক পুঁতে রাখার স্থান ভুলে যায়, (ঋণ গ্রহীতা কর্তৃক) অস্বীকার করা ঋণ- যদি ঋণী ব্যক্তি প্রকাশ্যে তা অস্বীকার করে আর ঋণদাতার নিকট তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না থাকে।
আর সম্ভাবনাময় সম্পদ হলো এমন সম্পদ, মালিক যা ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। কেননা, যার হাতে তা রয়েছে সে মালিকের মালিকানা স্বীকার করে এবং মালিক (সম্পদের) দাবি করলে অথবা ফেরত দেওয়ার নির্ধারিত সময় শেষ হলে ফেরত দিতে অস্বীকার করে না। সম্ভাবনাময় সম্পদের আরেক শ্রেণী হলো এমন ঋণ যা আওতার মধ্যে রয়েছে এবং ঋণ প্রদানকারী যা উসুল হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। কেননা ঋণের বস্তুটি বিদ্যমান, ঋণী ঋণ স্বীকারও করছে এবং সে তা ফেরত দিতে সক্ষম অথবা তা অস্বীকার করলেও মালিকের নিকট তার বিরুদ্ধে প্রমাণ আছে। আর এটিকে এভাবে الرَّجَاءُ (আশা করা) হতে مَرْجُو (মারযু বা সম্ভাবনাময়) বলে নামকরণ করা হয়েছে, যার শাব্দিক অর্থ এমন ধারণা যার দ্বারা আনন্দ লাভ করা সম্ভব হয়।
যাকাতের অধ্যায়ে এই বিভাজনের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনাহীন সম্পদে যাকাত এবং তৎসংক্রান্ত বিধান নিয়ে ফিক্হবিদগণ মতভেদ করেছেন। (ضمار অধ্যায় দেখুন)
টিকাঃ
৩৩. আয-যারকানী আলাল মুআত্তা, খ. ২, পৃ. ১০৬
৩৪. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ২, পৃ. ১৭৪
৩৫. ইছারুল ইনসাফ ফি আছারিল খিলাফ, পৃ. ৬০
৩৬. হিদায়াসহ ফাতহুল কাদীর, খ. ২, পৃ. ১২২; মাজমাউল আনহুর, খ. ১, পৃ. ১৯৪; রদ্দুল মুহতার, খ. ২, পৃ. ৯; আল-বিনায়া আলাল হিদায়া, খ. ৩, পৃ. ২৫; আল-বাহরুর রায়েক, খ. ২, পৃ. ২২৩; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ১, পৃ. ১৭৪; খিরাশী, খ. ২, পৃ. ১৮০; মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ২, পৃ. ২৯৭; ইবনে আব্দুল বার, আল-কাফী, পৃ. ৯৪; মুগনিল মুহতাজ, খ. ১, পৃ. ৪০৯; তুহফাতুল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ৩৩২; আল-মুবদি, খ. ২, পৃ. ২৯৫
৩৭. আল-কামুসুল মুহীত, আসাসুল বালাগা, পৃ. ২৯১; আবু ওবাইদ, আল-আমওয়াল, পৃ. ৪৬৬