📄 খ. সম্পদ সমজাত অথবা মূল্যজাত হওয়ার বিবেচনায়
ফিক্হবিদগণ সম্পদকে দুই প্রকারে ভাগ করেছেন। ১. সমজাত পণ্য (مِثْلِي) ২. মূল্যজাত সম্পদ (قِيَمِي)।
সমজাত সম্পদ হলো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছাড়া বাজারে যার অনুরূপ পণ্য পাওয়া যায়। এটি হয়তো মাকীল (مَكِيلٌ) (যা পাত্র দ্বারা মাপা হয়) হবে। যেমন: গম, আটা ইত্যাদি। অথবা মাওযূন (مَوْزُونٌ) (যা পাথর দ্বারা মাপা হয়) হবে। যেমন: স্বর্ণ, রৌপ্য, লোহা ইত্যাদি। কিংবা مَدْرُوعٌ (যা গজ দ্বারা মাপা হয়) হবে। যেমন: বয়নজাত দ্রব্যসামগ্রী যেগুলোর মধ্যে কোনো তারতম্য নেই। অথবা مَعْدُودٌ (যা গণনা করা হয়) হবে। যেমন: একই মানের মুদ্রাসমূহ এবং ঐ সকল বস্তু যা সংখ্যা হিসাবে পরিমাণ করা হয় এবং এর একক গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকে না- ডিম, বাদাম ইত্যাদি।
অপরদিকে মূল্যজাত সম্পদ হলো এমন সম্পদ, বাজারে যার সমজাত পণ্য পাওয়া যায় না। অথবা মূল্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্যসহ সমজাত দ্রব্য পাওয়া যায়। মূল্যের সাথে সম্বন্ধ করে এই শ্রেণীর সম্পদকে মূল্যজাত সম্পদ বলা হয়, যার প্রতিটি একক অন্যটি থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে। মূল্যজাত সম্পদের উদাহরণ হলো সে সকল বস্তু যেগুলো জাতে বা মূল্যে বা উভয় দিক দিয়ে পরস্পর পার্থক্য ও ভিন্নতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেমন: ঘোড়া, উট, গরু, মেষ ইত্যাদি এককসমূহে পার্থক্যপূর্ণ প্রাণীসমূহ। এমনিভাবে বাড়িঘর, হস্তজাত শিল্প: অলংকারসামগ্রী, গৃহস্থালী আসবাবপত্র যেগুলোর গুণাগুণ এবং উপাদান ভিন্ন ভিন্ন এবং প্রতিটি একক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, যে বৈশিষ্ট্য অন্য এককের মধ্যে পাওয়া যায় না। ফলে তার নির্দিষ্ট একটি মূল্য বরাদ্দ হয়ে যায়।
আরেকটি প্রকার হলো এমন সমজাত বস্তু যা বাজার থেকে উঠে গেছে অথবা দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে। যেমন: প্রাচীন কোনো শিল্পজাতদ্রব্য যা বাজার থেকে উঠে গেছে। এবং তা বিশেষ মূল্যে মূল্যায়িত হয়ে মূল্যজাত বস্তুর শ্রেণীভুক্ত হয়েছে। এমনিভাবে যে সকল সমজাত বস্তুর এককগুলোকে পরে আর সমজাতরূপে বিবেচনা করা হয় না, অর্থাৎ ত্রুটির কারণে অথবা ব্যবহার করার কারণে তার মূল্য কমে যায়, তা মূল্যজাত বস্তুতে পরিণত হয়। যেমন: যন্ত্রপাতি, গাড়ি-ঘোড়া ব্যবহার করার পর গুণে ও মূল্যে পরিবর্তন আসার দরুন যা মূল্যজাত বস্তুতে পরিণত।
সমজাত বস্তু ধ্বংসের ক্ষেত্রে সমজাত বস্তু দ্বারাই ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। কারণ এটি সমমানের বিনিময়। পক্ষান্তরে মূল্যজাত বস্তুর ক্ষতিপূরণ হবে মূল্য দ্বারা। ফিকহবিদগণের সর্বসম্মত মতানুসারে সমজাতদ্রব্য দায়িত্বে ওয়াজিব ঋণ হতে পারে। আর মূল্যজাত দ্রব্যের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা আছে। এবং এটিকে দায়িত্বে ওয়াজিব ঋণ বানানোর বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে মতভেদ আছে।
টিকাঃ
২২. ধারা: ১৪৫, ১১১৯, মাজাল্লাতুল আহকাম আল-আদলিয়্যা; ধারা ৩৯৯, মুরশিদুল হায়রান, দুরারুল হুককাম, খ. ১, পৃ. ১০৫; রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১৭১, ইবনে আবিদদাম, আদাবুল কাযা, পৃ. ৬০০
২৩. মাজাল্লাতুল আহকাম আল-আদলিয়্যা, ধারা: ১৪৬; মুরশিদুল হায়রান, ধারা: ৩৯৯
২৪. আল-মিসবাহুল মুনীর, খ.২, পৃ. ৬২৯; দুরারুল হককাম, খ. ১, পৃ. ১০৫ এবং খ. ৩, পৃ. ১০৯; রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ১৭১; মাজাল্লাতুল আহকাম আল-আদলিয়্যা, ধারা: ১১১৯
📄 গ. অন্যের অধিকার সংশ্লিষ্ট হওয়ার বিবেচনায়
অন্যের অধিকার সংশ্লিষ্ট হওয়ার দিক থেকে সম্পদ দু' প্রকার: ১. যার সাথে মালিক ছাড়া অন্য লোকের অধিকার সংশ্লিষ্ট রয়েছে। ২. যার সাথে মালিক ছাড়া অন্য লোকের অধিকার সংশ্লিষ্ট নয়।
মালিক ছাড়া অন্য লোকের অধিকার সংশ্লিষ্ট সম্পদ হলো যার মূল্যসত্তা কিংবা অর্থসত্তা মালিক ছাড়া অন্যদের নির্দিষ্ট অধিকারের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেমন: বন্ধকী সম্পদ। মালিকের অধিকার নেই বন্ধকগ্রহীতার অধিকারে ব্যত্যয় সৃষ্টি করে এমন কোনো হস্তক্ষেপ করা।
পক্ষান্তরে যেই সম্পদের সাথে অন্যের অধিকার সংশ্লিষ্ট নয় সে সম্পদ একান্ত ভাবে মালিকের জন্য বরাদ্দ। অন্যের অধিকারের সংশ্লিষ্টতা এবং কারও অনুমতির ওপর নির্ভরশীলতা ছাড়াই বৈধ সকল উপায়ে পৃষ্ঠপোষকতা এবং উপকৃত হওয়ার ক্ষেত্রে উক্ত সম্পদের সাথে মালিক যে কোনো আচরণ করতে পারবে। কারণ উক্ত সম্পদের সাথে অন্যের অধিকারের সংশ্লিষ্টতা নেই।
📄 ঘ. স্থানান্তর ও পরিবর্তনের বিবেচনায়
স্থানান্তর ও পরিবর্তনের সম্ভাব্যতার দিক বিবেচনা করে ফিকহবিদগণ সম্পদকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন: ১. অস্থাবর (منقول) ; ২. স্থাবর (عقار)।
অস্থাবর সম্পদ হলো যা স্থানান্তর করা এবং অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। সুতরাং এর অন্তর্ভুক্ত হবে মুদ্রা, পণ্যদ্রব্য, প্রাণী, পরিমাপ ও পরিমাণজাত দ্রব্য ইত্যাদি। আর স্থাবর সম্পত্তি হলো যার একটি স্থিরভিত্তি আছে। যা স্থানান্তর ও সরানো সম্ভব না। যেমন জমি, ঘরবাড়ি ইত্যাদি। আবুল ফজল দামেশকী বলেন: স্থাবর সম্পত্তি দুই প্রকার। ১. ছাদযুক্ত আর তা হলো ঘরবাড়ি, হোটেল, দোকান, গোসলখানা, আটার কল, মাড়াইকল, মৃতশিল্পের কারখানা, রুটির কারখানা, ট্যানারি, আঙ্গিনা। ২. মাপযোগ্য স্থান। এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হলো বাগান, ফলের বাগান, চারণভূমি, বন, বাঁশঝাড় এবং এগুলোর সাথে সম্পৃক্ত নদীর ও ঝরনার পানির অধিকার।
ফিকহবিদগণ ভবন এবং মজবুত বৃক্ষে মতবিরোধ করেছেন। এ দু’টি বস্তু কি স্থাবর সম্পত্তিরূপে বিবেচিত হবে না অস্থাবর সম্পত্তিরূপে? শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী সকল ইমামের মত হলো, উক্ত দুই বস্তু স্থাবর সম্পত্তিভুক্ত। আর হানাফী ফিকহবিদগণ বলেন, উক্ত দুই বস্তু অস্থাবর সম্পত্তির শ্রেণীভুক্ত। তবে উক্ত বস্তুদ্বয় যদি ভূমির অধীনে থাকে তাহলে অনুগামী হিসাবে উক্ত দুই বস্তুতে স্থাবর সম্পত্তির বিধান জারি হবে।
টিকাঃ
২৫. আল-মিসবাহুল মুনীর; মুরশিদুল হায়রান, ধারা : ৩; মাজাল্লাতুল আহকাম আল- আদলিয়্যা, ধারা: ১২৮
২৬. আল-মুগরিব, তাহরিরু আলফাজিত তামবীহ পৃ. ১৯৭, মুরশিদুল হায়রান, খ. ২, মাজাল্লাতুল আহকাম আল-আদলিয়্যা, ধারা: ২৯
২৭. আবুল ফজল জাফর বিন আলী দামেশকী, আল-ইশারা ইলা মাহাসিনিত তিজারাহ, পৃ. ২৫
২৮. রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৩৬১; আল খিরাশী, খ. ৬, পৃ. ১৬৪; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭১; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৭৩; মাজাল্লাতুল আহকাম আল-আদলিয়্যা, ধারা: ১০১৯ ও ১০২০ দ্রষ্টব্য
📄 ঙ. মুদ্রা হওয়ার বিবেচনায়
ফিক্হবিদগণ মুদ্রা হওয়ার বিবেচনায় সম্পদকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। ১. মুদ্রা (نقود) ২. পণ্যদ্রব্য (عروض)
নুকূদ (نقود) শব্দটি نقد (নাব্দ)-এর বহুবচন, আর তা হলো স্বর্ণ ও রৌপ্য। এই ভিত্তিতে মাজাল্লাতুল আহকাম আল-আদলিয়্যা (ইসলামী আইন ও বিচার বিষয়ক ম্যাগাজিনের) ভাষ্য হলো স্বর্ণ এবং রৌপ্যের নাম মুদ্রা। তা মুদ্রার ছাঁচে ঢালা হোক বা না হোক। স্বর্ণ ও রৌপ্যকে দুই মুদ্রা বলা হয়। বর্তমান যুগের প্রচলিত নোটকে স্বর্ণ-রৌপ্যের বিধানে যুক্ত করা হয়।
উরূয (عروض) যা عرض (আর্য)-এর বহুবচন; তা হলো ঐ বস্তু ও সামগ্রী যা মুদ্রা নয়। আল-মুগনীর গ্রন্থকার বলেন, পণ্য দ্রব্য হলো উদ্ভিদ, প্রাণী, অস্থাবর সম্পদ এবং অন্য সকল সম্পদ।
যদি ব্যবসা করার জন্য মুদ্রা গ্রহণ করা হয় তাহলে কোনো কোনো হাম্বলী ফিকহবিদ মুদ্রাকে পণ্যের আওতাভুক্ত করেন এ কথার ওপর ভিত্তি করে, পণ্য বলা হয় যা ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে লাভের উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছে, তা মুদ্রা হয় হোক। বাহুতী রহ. বলেন: পণ্যকে عرض (প্রদর্শনীয়) বলে নামকরণ করা হয়েছে। কারণ, তা ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শিত হয়। এটি হচ্ছে কর্মবাচ্যকে ক্রিয়ামূলের নামে নামকরণ। যেমনিভাবে জ্ঞানার্জন (ক্রিয়ামূল) বলার দ্বারা জ্ঞাত (কর্মবাচ্য) বিষয় বোঝানো হয়। অথবা এই কারণে যে, তা (অর্থাৎ দ্রব্য ও পণ্য) আবির্ভূত হয়ে বিলীন ও ধ্বংস হয়ে যায়।
টিকাঃ
২৯. মাজাল্লাতুল আহকাম আল-আদলিয়্যা, ধারা: ১৩০
৩০. রুদ্দুল মুহতার, খ. ২, পৃ. ৩০; শরহু আবিল হাসান মালেকী আলার রিসালা, খ. ১, পৃ. ৪২৪
৩১. আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৪২৪
৩২. শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ১, পৃ. ৪০৭