📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 মাল (الْمَالُ)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ

📄 মাল (الْمَالُ)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ


মানুষ যে সকল বস্তুর মালিকানা লাভ করে সে সবই মাল (الْمَالُ)। 'মাল বা সম্পদ' শব্দের পারিভাষিক সংজ্ঞায় ফকীহগণ মতবিরোধ করেছেন:
হানাফী ফিক্‌হবিদগণ সম্পদকে বিভিন্ন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করেছেন। ইবনে আবিদীন রহ. বলেছেন: সম্পদ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যার প্রতি মন আকৃষ্ট হয় এবং অভাবের ও প্রয়োজনের মুহূর্তের জন্য তা সংগ্রহে রাখা যায়। সকল মানুষ অথবা কিছু মানুষ কোনো বস্তুকে সম্পদরূপে গ্রহণের দ্বারা তা সম্পদ সাব্যস্ত হয়।
মালেকী ফিকহবিদগণ সম্পদের নানাবিধ সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। ইমাম শাতেবী রহ. বলেন, সম্পদ হলো যার ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এবং মালিক যখন তা গ্রহণ করে তখন থেকে সে তাতে মালিকানা লাভ করে। ইবনুল আরাবী রহ. বলেন: সম্পদ হলো যার প্রতি আকুলতা জাগে এবং তা দ্বারা অভ্যাসগত ও শরীয়তগতভাবে উপকৃত হওয়া যায়। আব্দুল ওয়াহহাব বাগদাদী বলেন: সম্পদ হলো সচরাচর যা সম্পদরূপে গৃহীত হয় এবং তার বিনিময় গ্রহণ করা যায়।
শাফেয়ী মাযহাবভুক্ত ইমাম যারকাশী রহ. সম্পদের সংজ্ঞায় বলেন: যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় অর্থাৎ যা উপকারের জন্য প্রস্তুত। আল্লামা সূযুতী রহ. ইমাম শাফেয়ী রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: সম্পদ শব্দের প্রয়োগ কেবল এমন ক্ষেত্রে হবে যার বিক্রয়যোগ্য মূল্য আছে। এবং সম্পদ ধ্বংসকারী উক্ত মূল্য দ্বারা তার ক্ষতিপূরণ প্রদানে বাধ্য, যদিও তা পরিমাণে সামান্যও হয়। উপরন্তু মানুষ যা উপেক্ষা করে না। যেমন: মুদ্রা এবং অনুরূপ বস্তু।
হাম্বলী ফিক্বহবিদগণ বলেন: সম্পদ হলো যা দ্বারা সাধারণভাবে সর্বাবস্থায় উপকৃত হওয়া বৈধ অথবা যা প্রয়োজন না থাকলেও অর্জন করা বৈধ।

টিকাঃ
১. আল-মুগরিব, আল-মিসবাহ, আল-মুগনী ফিল ইম্বাই আন-গারীবিল মুহাযযাব; ইবনে বাতীশ, আল-আসমা, খ. ১, পৃ. ৪৪৭
২. রাদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৩
৩. আল-মুওয়াফাকাত, খ. ২, পৃ. ১০
৪. ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন, খ. ২, পৃ. ৬০৭
৫. কাজী আব্দুল ওয়াহহাব, আল-ইশরাফ আলা মাসায়িলিল খিলাফ, খ. ২, পৃ. ২৭১
৬. যারকাশী, আল-মানসূর ফিল কাওয়াইদ, খ. ৩, পৃ. ২২২
৭. সুয়ূতী, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩২৭
৮. শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৪২

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 যা সম্পদ হওয়ায় মতভেদ রয়েছে

📄 যা সম্পদ হওয়ায় মতভেদ রয়েছে


ফিক্বহবিদগণ মুনাফা (المنافع) ও উপকার সম্পদ হওয়া নিয়ে মতভেদ করেছেন। যেমনিভাবে ঋণ (الديون) সম্পদ হওয়া নিয়ে তাদের বিভিন্ন মত রয়েছে। যার বর্ণনা নিম্নরূপ:

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ক. মুনাফা সম্পদ হওয়া

📄 ক. মুনাফা সম্পদ হওয়া


الْمَنَافِع (মানাফি') শব্দটি مَنْفَعَةٌ (মানফা'আহ)-এর বহুবচন। ফিক্‌হবিদদের নিকট এর উদাহরণ হলো: বাড়িতে বসবাস করা, কাপড় পরিধান করা, বাহনে চড়া ইত্যাদি।
'মুনাফা' বা উপকার সম্পদ হওয়ার আলোচনায় ফিক্‌হবিদদের দুটি মত রয়েছে।
প্রথম: হানাফী ফকীহদের মত: মুনাফা স্বীয় প্রকৃতি হিসেবে মূল্যায়নযোগ্য সম্পদ নয়। যেহেতু, কোনো বস্তুকে সম্পদরূপে গ্রহণ করা হলে তা সম্পদ হওয়া সাব্যস্ত হয়। আর সম্পদরূপে গ্রহণের অর্থ বস্তুকে সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজন ও অভাবের মুহূর্তের জন্য সংগ্রহে রাখা। আর মুনাফা বিমূর্ত বা দেহহীন বস্তু হওয়ার কারণে দুই সময়ে বহাল থাকতে পারে না। যখনই তা অস্তিত্বহীনতার গণ্ডি থেকে বের হয়ে অস্তিত্বের গণ্ডিতে প্রবেশ করে তখনই তা ধ্বংস হয়ে যায়। সুতরাং তা সম্পদ হওয়ার কল্পনা করা যায় না। তবে হানাফী ফিক্বহবিদগণ মুনাফাকে সম্পদ বিবেচনা করেন যদি তাতে বিনিময়চুক্তি হয়। যেমনটি হয়ে থাকে ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে। মূলত এটি যুক্তি পরিপন্থী। আর যা যুক্তি পরিপন্থী তার সাথে অন্য বস্তুর তুলনা চলে না।
দ্বিতীয়: শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী সকল ফিক্‌হবিদের যুক্তি: সত্তাগত বিচারে মুনাফা সম্পদ। কেননা, কোন বস্তু তার সত্তার কারণে উদ্দিষ্ট হয় না। বরং তা মুনাফার কারণে উদ্দিষ্ট হয়ে থাকে। আর এ হিসেবেই বিবেচনা করা হয় মানুষের প্রথা-প্রচলন ও লেনদেন, কায়কারবারের। যেহেতু শরীয়ত ভাড়া প্রদান চুক্তিতে মুনাফাকে সম্পদের বিনিময় ধার্য করেছে, সেহেতু মুনাফাকে তা সম্পদ সাব্যস্ত করেছে। ভাড়া প্রদান চুক্তি হলো আর্থিক বিনিময় চুক্তি। এমনিভাবে শরীয়ত যখন বিবাহচুক্তি অনুমোদন করে তখন যদি মুনাফাকে সম্পদ বিবেচনা না করা হয় তাহলে মানুষের অধিকার নষ্ট করা হবে। এবং অন্যের মালিকানাধীন বস্তুর মুনাফায় সীমালঙ্ঘন করতে প্ররোচিত করা হবে। আর এতে রয়েছে এমন দুর্নীতি ও অবিচার যা শরীয়তের উদ্দেশ্য ও ন্যায়বিচারের সাথে সাংঘর্ষিক। খতীব শারবিনী বলেন: প্রকৃত পক্ষে মুনাফা সম্পদ নয়। বরং এটি এক ধরনের অবকাশ এবং সুযোগ। তার প্রমাণ হলো মুনাফা অস্তিত্বহীন, এটি হস্তগত করা যায় না।

টিকাঃ
৯ মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩৭৭
১০. আল-মাবসূত, খ. ১১, পৃ. ৭৮; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৫, পৃ. ২৩৪; কাশফুল আসরার আন উসুলিল বাযদাবী, খ. ১, পৃ. ১৭২; ইবনে নুজাইম, ফাতহুল গিফার শারহুল মানার, খ. ১, পৃ. ৫২
১১. রওজাতুত তালেবীন, খ. ৫, পৃ. ১২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২; হাশিয়াতুদ দুসুকী আলাশ শারহিল কাবীর, খ. ৩, পৃ. ৪৪২; যারকাশী, আল-মানসূর ফিল কাওয়াইদ, খ. ৩, পৃ. ১৯৭; যানজানী, তাখরিজুল ফুরু আলাল উসূল, পৃ. ২২৫; আশ-শারহুল কাবীরসহ আল-মুগনী, খ. ৬, পৃ. ৩

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 খ. ঋণ সম্পদ হওয়া

📄 খ. ঋণ সম্পদ হওয়া


ফিকের পরিভাষায় ঋণ (الديون) হলো নিজ দায়িত্বে যে কোনো অধিকার আবশ্যক হওয়া। ঋণের ক্ষেত্রটি কখনও সম্পদ হয়, যেমনিভাবে তা আমল বা ইবাদতও হতে পারে। যথা: রোযা, নামায, হজ ইত্যাদি। বিস্তারিত দেখুন: دَيْنٌ، دَيْنُ الله
ফিক্‌হবিদদের এ কথায় কোনো মতভেদ নেই যে, দায়িত্বে ওয়াজিব অধিকার যদি প্রকৃত সম্পদ না হয় তাহলে তাকে সম্পদ বিবেচনা করা হয় না। এবং তাতে সম্পদের কোনো বিধানও আরোপিত হয় না। কিন্তু যদি দায়িত্বে ওয়াজিব ঋণ সম্পদ হয় তাহলে ফিক্‌হবিদগণ এটিকে প্রকৃত সম্পদ বিবেচনার ক্ষেত্রে দুটি মত ব্যক্ত করেছেন।
একটি হলো হানাফী ফিক্‌হবিদদের মত: নিজ দায়িত্বে ওয়াজিব ঋণ প্রকৃত সম্পদ নয়। কারণ তা হলো এমন এক গুণ যা নিজ দায়িত্বে ওয়াজিব হয়। প্রকৃত অর্থে তা হস্তগত করার কল্পনাও করা যায় না। তবে ভবিষ্যতে সম্পদে পরিণত হওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে রূপক অর্থে সম্পদ বলা হয়।
দ্বিতীয় মত হলো শাফেয়ী ফিক্‌হবিদ ইমাম যারকাশী রহ.-এর। তিনি বলেন: ঋণ কি প্রকৃত অর্থে সম্পদ, না-কি দাবিযোগ্য অধিকার যা ভবিষ্যতে সম্পদ হবে? এখানে দু'টি পদ্ধতি রয়েছে, যা আল্লামা মুতাওয়াল্লী রহ. বর্ণনা করেছেন। প্রথমটি হলো: এর দ্বারা ঋণী ব্যক্তির ওপর সম্পদশালীর বিধান সাব্যস্ত হয়। সুতরাং অন্য সম্পদশালীদের ন্যায় খরচ তার দায়িত্বে আবশ্যক হবে। এবং তাদের ন্যায় কাফফারা প্রদান করতে হবে। এবং তার জন্য সদকা গ্রহণ জায়েয হবে না।
দ্বিতীয়টি হলো: সম্পদ হওয়া অস্তিত্বশীল বস্তুর গুণ। আর এখানে অস্তিত্বশীল কোনো বস্তু নেই। তিনি বলেন: এটি ইমাম শাফেয়ী রহ.-এর কথা দ্বারা উদ্ভাবন করা যায়। তিনি বলেন, যে লোক মানুষের কাছে ঋণ হিসেবে কিছু পাবে তার ওপর কি যাকাত ফরয হবে? মাযহাব হলো, ঋণ ওয়াজিব হবে। তাদের প্রাচীন মতানুসারে যাকাত ফরয হবে না।
ঋণ সম্পদ-এ কথার ওপর ভিত্তি করে অনেক শাখা মাসয়ালা উদ্ভাবিত হয়।
এক. ঋণগ্রহীতা ছাড়া অন্য লোকের নিকট ঋণ বিক্রি করা যাবে কি? যদি বলি এটি সম্পদ, তাহলে তা বিক্রি করা বৈধ; আর যদি বলি সম্পদ না, তাহলে বিক্রি বৈধ হবে না। কারণ অধিকার অন্যত্র স্থানান্তর হয় না।
দুই. ঋণ মাফ করার অর্থ কি ঋণের বোঝা দূর করা, না-কি মালিক বানিয়ে দেওয়া?
তিন. কেউ শপথ করে বললো, তার সম্পদ নেই, অথচ সম্পদশালী ব্যক্তির নিকট তার ঋণ দেওয়া আছে। তাহলে শাফেয়ী মাযহাব অনুযায়ী এ লোক শপথ ভঙ্গকারী হবে। নির্ধারিত মেয়াদের ঋণের ক্ষেত্রেও অনুরূপ বিধান কার্যকর হবে। এবং বিশুদ্ধতম মতানুসারে অসচ্ছল ব্যক্তির ক্ষেত্রেও উক্ত বিধান কার্যকর হবে।

টিকাঃ
১২. ইবনে নুজাইমম ফাতহুল গিফার, খ. ৩, পৃ. ২০
১৩. ইবনে নুজাইম, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৪৫, বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২৩৪
১৪. যারকাশী, আল-মানসূর ফিল কাওয়াইদ, খ. ২, পৃ. ১৬০-১৬১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00