📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 সফকাহ-এর সাথে সম্পর্কিত বিধিবিধান

📄 সফকাহ-এর সাথে সম্পর্কিত বিধিবিধান


এক লেনদেনে দুটি বিষয় একত্র করার দুটো পন্থা রয়েছে: এক. একই চুক্তিবন্ধনে দুটো বিষয় একত্র করা, এবং দুই. ভিন্নধর্মী দুটো চুক্তিবন্ধনের মাধ্যমে দুটো বিষয় একত্র করা।
প্রথম প্রকার নিয়ে নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হচ্ছে:
যদি একই চুক্তিবন্ধনে, যাদের একত্র হওয়া নিষেধ তাদের একত্র করা হয়, তাহলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। যেমন: একই সাথে দুবোনকে বিয়ে করা একবার বিয়ে পড়ানোর মাধ্যমে অথবা একবার বিয়ে পড়ানোর দ্বারা পাঁচজনকে বিয়ে করা হলে সকলের ক্ষেত্রেই বিয়ে পড়ানো বাতিল হয়ে যাবে। যেহেতু দুবোনকে একই সাথে বিবাহবন্ধনে আনা হারাম এবং পাঁচজনকে একত্রে বিয়ে করা হারাম, তাই বিবাহ পড়ানোটাই বাতিল হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে দুবোনের একজনের বেলায় বৈধ এবং অপরজনের বেলায় অবৈধ কিংবা পাঁচজনের ক্ষেত্রে একজনের বেলায় অবৈধ এবং অন্য চারজনের বেলায় বৈধ বলার কোনো অবকাশ এখানে নেই।
পূর্বে যেরূপ বলা হলো, যদি এরূপ না হয়, বরং একই বন্ধনে এমন দুব্যক্তি বা বস্তু একত্র করা হয় যে, দুজনেরই চুক্তিবদ্ধ হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে অর্থাৎ উভয়েই চুক্তিতে আসতে পারে, তাহলে একই সাথে চুক্তি করা হলে, কেনাবেচা হলে তা সঠিক ও কার্যকর হবে। সে দুটি ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় হতে পারে, যেমন বকরী ও কাপড়, অথবা এক জাতীয় বস্তু হলেও ভিন্ন ভিন্ন দামের যেমন: দুধরনের কাপড়, তাহলে কোল্টির মূল্য কত- তা নির্দিষ্ট করে নিতে হবে। যদি এক জাতীয় এবং একই দামের হয় যেমন: দুটো বকরী একই দামের, তাহলে অংশ হিসাবে মূল্য নির্ধারণ করে নিতে হবে।
যদি একই বিক্রয়চুক্তিতে এমন দুটো বিষয় একত্র করা হয়, যে দুটোর দুটোই বিক্রয়চুক্তিতে আসার অনুপযুক্ত যেমন: মদ ও মৃতজন্তু, তাহলে এ চুক্তিই বাতিল বলে গণ্য হবে। এ মাসআলাতে কারো কোনো দ্বিমত নেই।
যদি একই বিক্রয়চুক্তিতে এমন দুটো বিষয় একত্র করা হয়, যে দুটোর একটি বিক্রয়চুক্তিতে আসার উপযোগী, তা বেচাকেনা করা জায়েয, কিন্তু অপরটি বিক্রয়চুক্তিতে আসার উপযোগী নয়, যেহেতু তা বেচাকেনা করা জায়েয নয়, তাহলে দেখতে হবে যা বিক্রি করা জায়েয নয় তার শরীয়তের দৃষ্টিতে মূল্য রয়েছে কিনা। যদি দেখা যায় সেটিরও মূল্য আছে, যেমন: কেউ নিজের বাড়ির সাথে অন্যের বাড়িও বিক্রি করছে, এক্ষেত্রে অন্যের বাড়ি তার অনুমতি ব্যতীত বিক্রি করা জায়েয নয়, তবে সে বাড়িরও মূল্য রয়েছে। এ সময় কোনো বাড়ির মূল্য কত তা নির্দিষ্ট করে বলে দিলে নিজের বাড়ি তার নির্দিষ্ট দামে বিক্রি করা জায়েয ও সঠিক হবে, অন্যের বাড়ি বিক্রি করা হবে বাতিল। এভাবে প্রত্যেকটিতে তার উপযোগী ফয়সালা প্রদান করা হবে। যেহেতু এখানে সঠিক ও ভুল দুধরনের, বৈধ ও অবৈধ দুধরনের, জায়েয ও নাজায়েয দু'ধরনের বিষয় একত্র করা হয়েছে। তাই সঠিকে সঠিকের এবং ভুলে ভুলের ফয়সালা প্রদান করা হবে। এ মাসআলায় অধিকাংশ আলেম একমত। মালেকী মাযহাবের আলেমদের এটি একটি মত। তবে তাদের পছন্দ যে মতটিতে তা হচ্ছে, এক্ষেত্রেও বৈধ ও অবৈধ উভয়টিতে বিক্রি বাতিল হয়ে যাবে।
যদি একত্রে বলা দুইটির যেটি বিক্রি করা অবৈধ, সেটির ভিন্নভাবে কোনো মূল্যই না থাকে, শরীয়ত তার কোনো মূল্য ধার্য না করে, যেমন সিরকা ও মদ বা জবাই করা ও মৃত জন্তু একত্রে বিক্রি করে, দেখা যাচ্ছে মদ ও মরা জন্তু বিক্রি করা জায়েয নেই, শরীয়ত এগুলোর জন্যে কোন মূল্য সাব্যস্ত করে নাই, তাহলে ফয়সালা কী হবে, তা নিয়ে আলেমগণ মতানৈক্য করেছেন। হানাফী মাযহাবের আলেমগণ বলেছেন: কোন্টির মূল্য কত ভিন্নভাবে তা যদি বলে দেওয়া না হয় তাহলে কোনোটিতেই বিক্রি যথার্থ হবে না। এ কথায় হানাফী সকল আলেম একমত।
যদি কোন্টির মূল্য কত তা ভিন্নভাবে বলে দেওয়া হয় তাহলেও ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মতে উভয়টিতে বিক্রি বাতিল হবে। যেহেতু দুটোর একটি শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পদ ও পণ্য নয়, তা সত্ত্বেও সে অবৈধ বস্তুসহ বিক্রি করা হচ্ছে, বিক্রয়চুক্তি হচ্ছে একবারই, তাই হালালটির সাথে হারামটিও লেনদেনে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছে, যা জায়েয নয়। এভাবে একত্র করার দরুন হারামটি যেন হালালটি বেচাকেনায় শর্ত হচ্ছে। যখন বিক্রয়চুক্তির চাহিদা মোতাবেক না হয় তখন শর্ত হয় ফাসেদ, তা বিক্রিকে করে দেয় ফাসেদ। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ রহ. বলেন: যদি প্রত্যেকটির মূল্য মোট মূল্যের কত অংশ এবং মোট মূল্য হতে কোন্টিতে কত ধরা হয়েছে তা বলে দেওয়া হয় তাহলে যেটি বৈধ সেটিতে বিক্রি জায়েয হবে। শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, একসাথে বলা হলেও এক্ষেত্রে বিক্রয়চুক্তি ভিন্ন ভিন্ন হবে। ফলে যেটি হালাল তা বিক্রি করা বৈধ এবং যেটি হারাম তা বিক্রি করা অবৈধ হবে। বিস্তারিত জানার জন্যে দ্রষ্টব্য : تَفْرِيقٌ ، بَيع আলোচনা।
যদি একইসাথে ভিন্নধর্মী দুটো চুক্তি সম্পাদন করা হয় যেমন: বিক্রি ও ভাড়া, সাধারণ বিক্রি ও সালাম বিক্রয়, বিক্রয় ও বিবাহ তাহলে উভয় চুক্তি যথাযথ ও গৃহীত হবে। যেহেতু ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রতিটি চুক্তি সম্পাদন বৈধ- তাই একত্রকরণের পরও উভয় চুক্তি বৈধ বলে গণ্য হবে। দুটি বিষয় দুধরনের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হলেও তার বিরূপ কোনো প্রভাব পড়বে না, যেরূপ কোনো বিক্রিতে শুফআহ (অগ্রে ক্রয়ের অধিকার) থাকা এবং কোনোটিতে না থাকা, এরূপ দুটো চুক্তি একত্র হওয়া কোনোটিতেই কোনো প্রভাব সৃষ্টি করে না।
ভাড়া ও বিক্রি একত্র করার উদাহরণ: কেউ অপর কাউকে বলল, আমি তোমার নিকট এ কাপড়টি বিক্রি করছি এবং এত টাকার বিনিময়ে আমার এ বাড়ি তোমার নিকট এক বছরের জন্যে ভাড়া দিচ্ছি। বিবাহ ও বিক্রি একসাথে হওয়ার উদাহরণ: কেউ অপর কাউকে বলল: 'আমি তোমার নিকট আমার এ মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছি এবং তার ঘরটা তোমার নিকট বিক্রি করে দিচ্ছি।' যদি মেয়ে তার পিতার লালনপালনে থাকে বা মেয়ে জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন অবস্থায় তার পিতাকে এ ঘর-বাড়ি বিক্রি করে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে থাকে, তাহলে একই চুক্তিতে বিবাহ ও বিক্রি করা জায়েয হবে। এক্ষেত্রে যে টাকার পরিমাণ উল্লেখ করা হবে তা বিবাহের মহর ও পণ্যের মূল্যে বণ্টন করে দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে বিবাহের মহরে মিসালের প্রতি এবং পণ্যের বাজারদরের প্রতি লক্ষ রাখা হবে।
বিস্তারিত জানার জন্যে দ্রষ্টব্য : تفرِيقٌ ، نَكَاحٌ ، صَدَاقَ আলোচনা।

টিকাঃ
৫. রওযাতুত তালিবীন, খ. ৩, পৃ. ৪২০; আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ৪২; ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ১০৩; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৫৭; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ২২
৬. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ৪২; ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ৮৯; মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৩, পৃ. ৪৫; আল-কাওয়ানীন আল-ফিকহিয়‍্যা, পৃ. ১৭২
৭. প্রাগুক্ত

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00