📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 তৃতীয় : পণ্য অর্পণ করা

📄 তৃতীয় : পণ্য অর্পণ করা


ইবনে রুশদ আল-হাফীদ বলেন, সকল ফকীহ একমত পোষণ করেছেন, সোনা-রুপার বিক্রয় বাকীতে করা জায়েয নয়। তাই এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো, বিক্রয়চুক্তি অনুষ্ঠিত হওয়ার পরপর পণ্য ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করা। আত-তাসাওউলী (التسولي) বলেন, নির্দিষ্ট পণ্য অর্পণ করা ওয়াজিব। কারণ, অর্পণে বাধকতা হলো আল্লাহর হক। বিলম্ব করলে বিক্রয় ফাসিদ হবে।
পণ্য মাপার বা গণনার পারিশ্রমিক আসে বিক্রেতার ওপর। কারণ, পরিমাপ করা ব্যতিরেকে বিক্রয় পরিপূর্ণতা লাভ করে না। ইবনে কুদামার যুক্তি হলো, বিক্রেতার জন্য অপরিহার্য হচ্ছে, পণ্য ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করা। আর পরিমাপ ছাড়া হস্তান্তর সম্ভব নয়। মূল্য গণনা বা তার পরিমাপ করার পারিশ্রমিক আসে ক্রেতার ওপর। এমনিভাবে পণ্য স্থানান্তর করার মাশুল বর্তায় ক্রেতার ওপর।
বিক্রয়চুক্তিতে পণ্য হস্তান্তর করা বিক্রেতার ওপর অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। নগদ মূল্যে বিক্রয় করার ক্ষেত্রে মূল্য পরিশোধের পর তা বিক্রেতার ওপর আবশ্যক হয়। বাকীতে বিক্রয় করার ক্ষেত্রে পণ্য হস্তান্তরের জন্য মূল্য পরিশোধ শর্ত নয়। 'পণ্য হস্তান্তর' কথাটি কেবল তখনই প্রযোজ্য হয়, যখন পণ্যটি ক্রেতার ব্যবহারের জন্য সকল প্রতিবন্ধকতা হতে মুক্ত করে দেওয়া হয়, যেন সে তার দ্বারা পুরোপুরি উপকৃত হতে পারে। পণ্য ব্যবহারে যদি কোনো ধরনের বাধা থাকে সেক্ষেত্রে পণ্য যথাযথভাবে হস্তান্তর হয়েছে বলে ধরা হবে না। এরূপ হলে বিক্রেতাকে বাধ্য করা হবে পণ্যটি বাধামুক্ত করে দিতে।
পণ্য প্রদানে প্রতিবন্ধক কোনো কিছুতে ব্যস্ত রাখার একটি সূরত হলো: কোনো ইজারা চুক্তির অধীনে পণ্যটি অন্তর্ভুক্ত থাকা, যে ইজারা চুক্তির বিষয়টি বিক্রেতা চূড়ান্ত করেছে। ক্রেতা যদি ইজারার শেষ সময় পর্যন্ত পণ্য উসূল করার জন্যে অপেক্ষা করতে রাজী হয়, তাহলে পণ্য অর্পণ করার তাগাদা করার সুযোগ নেই। তবে ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়া এবং পণ্য অর্পণযোগ্য হওয়া পর্যন্ত ক্রেতার মূল্য পরিশোধ বিলম্বিত করার অধিকার আছে। পণ্য হস্তান্তর করা যেমনটি আবশ্যক, তার আনুষঙ্গিক জিনিস হস্তান্তর করাও তেমন ওয়াজিব।
সমজাতীয় দ্রব্য যেমন ওজনযোগ্য কিংবা গণনাযোগ্য জিনিস এবং জমি ও প্রাণীজাতীয় জিনিসের হস্তগত করার বিধান ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। ভূমি হস্তগত করার ক্ষেত্রে এতটুকু যথেষ্ট যে, তা খালি করা দেওয়া হবে এবং এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো বিক্রেতার যাবতীয় মালসামানা সরিয়ে নেওয়া হবে। এটি সর্ববাদী মত। বিক্রেতার সামানা যদি একটি কামরায় একত্রিত করা হয় তাহলে কামরাটি ছাড়া বাকী অংশ হস্তগত করা সহীহ হবে। এ কামরাটি খালি করে দেওয়ার ওপর তা হস্তগত করা মওকুফ থাকবে। বিক্রেতা যদি অনুমতি দেয় সামানাসহ ঘর হস্তগত করার, তাহলে হস্তান্তর করা সহীহ হবে। কারণ, তখন সামানা ক্রেতার কাছে আমানত হিসেবে বিবেচিত হবে।
মালেকী মাযহাবের ভাষ্য হলো, পণ্য যদি খালি জমি হয় তাহলে তা ক্রেতার হাতে তুলে দিলেই হস্তগত হওয়া বুঝায়। আর যদি তা বসবাসের ঘর হয় তাহলে তা খালি করে দিলেই হস্তগত হয়ে যায়।
ক্রেতা-বিক্রেতার কেউ যদি বিক্রিত জমির কাছে উপস্থিত না হয়, তাহলে হস্তান্তর করার ক্ষেত্রে শাফেয়ী মাযহাবের বিশুদ্ধতম অভিমত হলো, এ পরিমাণকাল অতিক্রান্ত হওয়া বিবেচ্য যে সময়ের ভিতর জমি পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব। কারণ যেখানে কষ্টের কারণে জমি পর্যন্ত দু’চুক্তিকারীর উপস্থিত হওয়া চুক্তিকালে ধর্তব্য হয় না, সেখানে দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়া বিবেচনা করায় কোনো কষ্ট নেই। অনেক হানাফী মাযহাব অনুসারী দূরবর্তী ভূমি বিক্রির ক্ষেত্রে এরূপ অভিমত পোষণ করেন। এর দ্বারা একথাই প্রকাশিত হলো যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য উভয়কে ক্ষতি হতে নিরাপদ রাখা।
স্থানান্তরযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ইমামগণের অভিমত হলো, পরিমাপ, ওজন ও গণনার যোগ্য জিনিসে হস্তগত হলো, মেপে, নির্দিষ্ট পাত্র দ্বারা পরিমাপ করে ও গণনা করে তা বুঝে নেওয়া। তবে শাফেয়ীগণের মতে এর সাথে স্থানান্তরও করতে হবে। এ সকল ব্যাখ্যা প্রযোজ্য হয় যখন পণ্য অনুমান করে বিক্রয় করা না হয়। অনুমানের মাধ্যমে বিক্রয় করলে তা হস্তগত হয় কেবল স্থানান্তর করলে। বিস্তারিত بَيْعُ الْجُزَافَ দ্রষ্টব্য।
প্রাণী ও অস্থায়ী অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে হস্তগত হওয়া সাব্যস্ত হবে সমাজের প্রচলনের ভিত্তিতে। যেমন: কাপড় ও প্রাণীর লাগাম হস্তান্তর করা, প্রাণীকে চালনা করা এবং বিক্রেতার প্রাণী হতে তাকে পৃথক করা অথবা বিক্রেতা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া।
হানাফীগণ পরিমাপযোগ্য, ওজনযোগ্য ও গণনাযোগ্য পণ্যে এবং অন্যান্য পণ্যের মাঝে কোনো পার্থক্য করেন না। তাদের মতে ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়াই সকল পণ্যের ক্ষেত্রে হস্তান্তরকরণ। এমনকি বিক্রেতার ঘর খালি করে দিলেই হস্তগত করা সহীহ হয়ে যায়। অতঃপর পণ্য নাশ হয়ে গেলে তা ক্রেতার দায়িত্বে নষ্ট হওয়া বুঝায়। কারণ তা বিক্রেতার হাতে তখন আমানত হিসাবে থাকে। ইমাম আহমদ-এর পক্ষ হতে এর অনুকূলে একটি অভিমত পাওয়া যায়।
পূর্বেই পণ্য হস্তগত করে নিলে তা নতুন হস্তগত করার স্থলাভিষিক্ত হয়। যখন তা জামিন হওয়ার সুরতে হস্তগত করা হয়। এর উদাহরণ হলো, ক্রেতা বিক্রেতার হাত হতে পণ্য ছিনিয়ে নিয়ে গেল বিক্রয় চুক্তি কার্যকর হওয়ার পূর্বেই, এর পর বিক্রয়চুক্তি কার্যকর হলে তা পুনরায় হস্তগত করার প্রয়োজন নেই। যেহেতু তার এ কজা করা তার পূর্ববর্তী কব্জা থেকে অধিক শক্তিশালী নয়, যেহেতু এ উভয় ক্ষেত্রে পণ্য ধ্বংসের ক্ষতি কজাকারীর।
তবে আমানত হিসেবে বা ধার হিসাবে যা পূর্বেই হস্তগত করা হয় পরবর্তীকালে সেই জিনিসের বিক্রয়চুক্তি সম্পাদিত হলে পূর্বের কজা এর স্থলাভিষিক্ত হবে না। কারণ পূর্বের কজা হলো দুর্বল ধরনের কজা। ইচ্ছাকৃতভাবে তা নষ্ট না করলে তা নষ্ট হওয়ার দরুন কজাকারী দায়ী হয় না।

টিকাঃ
১৫৬. বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১৭০
১৫৭. আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ১২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৪
১৫৮. আশ-শারহুস সাগীর, খ. ২, পৃ. ৭১, প্রকাশক: হালাবী; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭২; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১২৬
১৬১. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়‍্যা, ধারা: ২৬২, ২৬৯ ও ২৭৬; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫৬২
১৬০. জামিউল ফুসূলাইন, ৩২তম পরিচ্ছেদ।
১৬১. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ৪৮
১৬২. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৮৮ ও ৫১২; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ২১৬
১৬৩. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ১৭
১৬৪. আশ শারহুস সাগীর, খ. ২, পৃ. ৭১
১৬৫. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭২; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫৬৩
১৬৬. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭০; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১২৫
১৬৭. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়‍্যা, খ. ৩, পৃ. ১৬; আল-ফুরু, খ. ৪, পৃ. ১৪২; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১২৪
১৬৮. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫১২; আতাসী কৃত শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ৮৪৬

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 বিক্রয় সমাপ্তি

📄 বিক্রয় সমাপ্তি


পূর্বের আলোচনার আলোকে বলা যায়, পণ্য সম্পূর্ণরূপে নাশ বা ধ্বংস হওয়ার কোনো কোনো অবস্থায় বিক্রয়ের সমাপ্তি ঘটে। পণ্য হস্তান্তর ও গ্রহণের সকল লক্ষণের পরিসমাপ্তি ঘটলে বিক্রয়চুক্তিরও ইতি ঘটে। অনুরূপ ইকালার মাধ্যমেও বিক্রয়চুক্তির সমাপ্তি ঘটে। বিস্তারিত শিরোনাম দ্র. إقالة

টিকাঃ
১৬৯. বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১৫৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00