📄 দ্বিতীয় : নগদ মূল্য আদায়
মূল্যের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ধারা হলো, তা নগদ হওয়া। এটি সকল ফকীহের সাধারণ অভিমত। ইবনে আবদিল বার বলেন, মূল্য সর্বদা নগদ হয়। তবে যদি ক্রেতা-বিক্রেতা কোনো মেয়াদ নির্ধারণ করেন, তাহলে তা সে পর্যন্ত প্রলম্বিত হয়। এ বিধানের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে আতাসী স্বরচিত শরহুল মাজাল্লা গ্রন্থে সিরাজ-এর সূত্রে বলেন, কেননা নগদ হওয়া-ই চুক্তির দাবি ও আবশ্যিক বিধান।
মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা-য় আছে, সাধারণ বিক্রি নগদরূপে সংঘটিত হয়। এরপর মাজাল্লা এ মূলনীতির ব্যতিক্রম সাব্যস্ত করেছে সে অবস্থাকে, যে অবস্থায় কোনো এলাকায় সাধারণ ব্যবসা বাকিতে বা কিস্তিতে হওয়ার প্রচলন রয়েছে।
অনুরূপভাবে মালেকী ফকীহগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন, বিক্রিতে খিয়ারে শর্ত থাকলে তাতে মূল্য নগদ লেনদেন জায়েয নয়। খিয়ারের সময়ে নয় এবং গোলাম বিক্রির ক্ষেত্রে তিন দিনের মধ্যেও নয়। নগদ পরিশোধের শর্ত করা হলে বিক্রি ফাসেদ হয়ে যাবে। অনুপস্থিত ব্যক্তির বিক্রির ক্ষেত্রে আবশ্যকীয়ভাবে নগদ মূল্য পরিশোধ করার শর্ত করা যাবে না। তবে স্বেচ্ছায় কেউ নগদ পরিশোধ করতে চাইলে সে সুযোগ আছে।
মূল্য কোনো সময় নগদ হয়, কোনো সময় বাকী হয়। বাকী মূল্য নির্দিষ্ট সময়ে সবটুকু আদায় করার অঙ্গীকার করা হয় অথবা কিস্তিতে আদায়ের কথা থাকে। অন্য কথায়, মূল্য হয়তো নির্দিষ্ট কোনো বস্তু অথবা দায়িত্বে ঋণ হিসেবে অপরিহার্য থাকে।
মূল্য যখন দায়িত্বে ঋণ হিসেবে থাকে তখন তা আদায়ের বিধান ভিন্ন ভিন্ন হয়, তা নগদ বা বাকী বা কিস্তি হিসেবে। বাকীতে কিংবা কিস্তিতে হলে তার মেয়াদ উভয় চুক্তি সম্পাদনকারীর অবগতিতে নির্ধারিত হতে হয়। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য শিরোনাম أجل ক্রেতা যদি আংশিক মূল্য পরিশোধ করে তাহলে পণ্য তার হাতে হস্তান্তরিত হওয়ার উপযুক্ত সে হয় না। যে পরিমাণ মূল্য পরিশোধ করেছে সে পরিমাণ পণ্য প্রাপ্তিরও হকদার সে হয় না। পণ্য একটিমাত্র জিনিস হোক আর বহু হোক। জিনিসগুলো ক্রয়ের সময় মূল্য বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হোক অথবা সবগুলো একবারে বলা দামে ক্রয় করুক- যে পর্যন্ত বিক্রয় একই চুক্তিতে হওয়া স্থির থাকে (তাতে বিভিন্নতা না আসে।) সে পর্যন্ত সে হকদার হয় না। এ সকল কথা সে পর্যন্তই কার্যকর থাকবে যে পর্যন্ত এর বিপরীতে কোনো শর্ত থাকবে না।
টিকাঃ
১৪৩. আল-কাফী, ইবনু আবদিল বার কৃত, খ. ২, পৃ. ৭২৬; আল বাহজা, শরহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ৮৮
১৪৪. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ২৫০; শারহুল মাজাল্লা, আতাসী কৃত, খ. ২, পৃ. ১৭০
১৪৫. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১০
১৪৬. শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ২৭৮
১৪৭. শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ২৭৮
📄 দুই বিনিময়ের একটিকে অর্পণের সূচনা
বিক্রেতা বা ক্রেতার মধ্য হতে কে প্রথমে পণ্য বা মূল্য অর্পণ করবে- তা নিয়ে ফকীহদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। এ বিষয়টিতে কতিপয় অবস্থা হতে পারে:
প্রথম অবস্থা: পণ্য ও মূল্য দু'টিই নির্দিষ্ট জিনিস হবে। যাকে বায়'উল মুকায়াযাহ (الْمُقَايَضَةُ) বলে। অথবা দু'টিই মূল্য জাতীয় জিনিস হবে। যাকে বায়'উস সরফ (الصرف) বলে।
হানাফীগণ মনে করেন, ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ে এক সঙ্গে অর্পণ করবে। ফলে উভয়ের নির্দিষ্ট জিনিস ও দেনার ব্যাপারে সমন্বয় সাধন হবে। মালেকীগণের মতে উভয়কে মীমাংসায় উপনীত হওয়ার জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে। মতবিরোধ যদি বিচারকের সম্মুখে হয় তাহলে তিনি এমন কাউকে দায়িত্ব দেবেন যিনি উভয়কুলে গ্রহণযোগ্য। শাফেয়ীগণের প্রধান অভিমত হলো, উভয়কে অর্পণে বাধ্য করা হবে যাতে দু'পক্ষ অর্পণের ক্ষেত্রে সমান হয়, যেহেতু নির্দিষ্ট বস্তু মূল্য হলে তা বস্তু হওয়ার দরুন পণ্যতুল্য।
হাম্বলীগণ মনে করেন, বিচারক তাদের মাঝে একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে নিয়োগ দেবেন। যিনি উভয় পক্ষ হতে হস্তগত করবেন, অতঃপর তাদের কাছে হস্তান্তর করবেন। পণ্য ও মূল্য উভয়ের সাথে উভয়ের সম্পর্ক সমান হওয়ায় বিতর্ক এড়াতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যক্তি প্রথমে পণ্য অর্পণ করবেন, কারণ সমাজে তা-ই প্রচলিত।
দ্বিতীয় অবস্থা: পণ্য ও মূল্যের মাঝে একটি নির্দিষ্ট জিনিস আর অপরটি জিম্মায় থাকা ঋণ
হানাফী ও মালেকী ফকীহদের মত এবং শাফেয়ীগণের একটি অভিমত হলো, ক্রেতাকে প্রথমে মূল্য হস্তান্তর করতে বলা হবে। সাবী বলেন, এর কারণ হলো, পণ্য বিক্রেতার হাতে থাকা তার প্রাপ্য মূল্যের বদলে বন্ধক রাখার ন্যায়। ক্রেতার নিকটে প্রথমে দাবি করা হবে এ জন্যে যে, ক্রেতার অধিকার পণ্যে নির্ধারিত; তিনি মূল্য প্রদান করলে বিক্রেতা তা হস্তগত করলে তার অধিকারও নিশ্চিত হয়ে যাবে। তাহলে দুপক্ষ এক বরাবর হবে।
শাফেয়ী মাযহাবের প্রধান অভিমত হলো, বিক্রেতাকে প্রথমে পণ্য হস্তান্তর করার জন্য বাধ্য করা হবে। এটি হাম্বলীগণেরও মাযহাব। কারণ পণ্য হস্তগত করা হলেই বিক্রয় পূর্ণতা লাভ করে; আর বিক্রেতা মূল্যের অধিকারী হওয়া বিক্রয়ে পূর্ণতা লাভের পরই সাব্যস্ত হয়। সমাজে এমনটিই চালু রয়েছে।
নগদ বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতার মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া, অনুরূপ বাকীতে বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার ক্ষেত্রে সকল ফকীহ ঐকমত্য পোষণ করেন যে, ক্রেতা যদি সচ্ছল হয় তাহলে তাকে নগদ বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মূল্য পরিশোধে বাধ্য করা হবে। সেই সাথে সাধারণভাবে অধিকাংশ ফকীহের অভিমত হলো, ক্রেতা দেউলিয়া হলে অথবা মূল্য শহর হতে সফরের দূরত্ব পরিমাণ দূরে হলে বিক্রেতার বিক্রয়চুক্তি ভঙ্গ করার অধিকার থাকবে।
হানাফী ফকীহগণ বলেন, বিক্রেতার বিক্রয়চুক্তি ভঙ্গের কোনো অধিকার নেই। এর কারণ, স্বত্ব আদায়ে তার তাগাদা করার অধিকার সংরক্ষিত। এ অবস্থায় সে ঋণদাতা হিসেবে বিবেচিত হবে; অন্যান্য ঋণদাতার মতো। হানাফীগণের মতে এ অভিমত কেবল তখনই প্রযোজ্য হবে যখন বিক্রেতা তার জন্য নগদের এখতিয়ার রাখবে না। নগদের এখতিয়ার রাখার উক্তি হলো, "যদি তুমি নির্দিষ্ট সময়ে মূল্য পরিশোধ না করো তাহলে আমাদের মাঝে কোনো বিক্রয় চুক্তি থাকবে না।"
এরূপ শর্তারোপের ফলে কিরূপ বিধান আরোপ হতে পারে, তা নিয়ে ফকীহদের মাঝে বিতর্ক রয়েছে। কেউ বলেন, এর ফলে বিক্রয়চুক্তি ভেঙ্গে যাবে। আর কেউ বলেন, বিক্রয় ফাসিদ হয়ে যাবে। হানাফীগণের মতে অগ্রগণ্য মত হলো, বিক্রয় ফাসিদ হবে, চুক্তি ভঙ্গ হবে না। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য শিরোনাম خيار النقد
শাফেয়ী ও হাম্বলীগণ এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ক্রেতা যদি নগদ মূল্যে বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মূল্য আদায়ে ব্যর্থ হয়, তা দেউলিয়া হওয়ার কারণে নয়, বরং তার সম্পদ দূরে রাখার কারণে, তবে তা আপন শহরেই অথবা কসর আরোপ হয় এমন দূরত্ব থেকে কম দূরত্বে মূল্য রাখার অজুহাতে তা হস্তান্তরে ব্যর্থ হচ্ছে। এমন অবস্থায় পণ্য গ্রহণে বিধিনিষেধ আরোপ হবে ক্রেতার উপরে। এমনকি তার সমুদয় সম্পত্তিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ হবে মূল্য পরিশোধ না করা পর্যন্ত। কারণ, আশঙ্কা থাকে সে তার সম্পত্তিতে এমন ধরনের আদান-প্রদান করতে পারে যার ফলে বিক্রেতার ক্ষতি হবে।
যদি ক্রেতার সম্পত্তি মুসাফির হওয়ার দূরত্বে বা তার অধিক দূরত্বে থাকে তাহলে সেই দূরবর্তী স্থান হতে মূল্য এনে পরিশোধ করার জন্য বিক্রেতাকে ধৈর্যধারণে বাধ্য করা যাবে না। বরং পণ্যের ওপর এবং ক্রেতার মালের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। এরকম হলে, শাফেয়ী মাযহাবের বিশুদ্ধমত হলো, বিক্রেতা বিক্রয়চুক্তি ভেঙ্গে ফেলার অধিকার রাখবে। হাম্বলীগণের এক অভিমত এরই আলোকে। এটি একটি বিশেষ ব্যবস্থা যা বিক্রেতার মূল্য হস্তগত করা পর্যন্ত পণ্য আটকে রাখার লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়েছে, যা বিক্রেতার অধিকারের বহির্ভূত।
হাম্বলীগণের আরও একটি অভিমত রয়েছে। তা হলো, ক্রেতার সম্পত্তি যদি মুসাফির হয়ে যাওয়া থেকে কম দূরত্বে থাকে, তাহলে বিক্রেতার অধিকার নেই বিক্রয়চুক্তি ভঙ্গের। কারণ, সেটিকে উপস্থিত সম্পত্তির আওতায় গণ্য করা হয়। শাফেয়ীদের অপর একটি মত হচ্ছে, বিক্রি বাতিল করা হবে না, পণ্য বিক্রি করা বহাল থাকবে এবং অন্য সকল ঋণের ন্যায় তার মূল্য পরিশোধ করা হবে।
টিকাঃ
১৪৮. আস-সাবী, আলাদ দারদীর, খ. ২, পৃ. ৭১; আতাসী কৃত, শারহুল মাজাল্লা, খ. ২, পৃ. ১৯১; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৪৯; আদ-দুরারু শারহুল গুরার, খ. ২, পৃ. ১৫২; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৪৯৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৪; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ২১৯
১৪৯. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ২১৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৫; দারদীর কৃত আশ-শারহুস সাগীর, খ. ২, পৃ. ৭১; শারহুল মাজাল্লা, খ. ২, পৃ. ১৯১; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ২৪
১৫০. প্রাগুক্ত
📄 মূল্য আদায় করতে না পারলে পণ্য ফেরত নেওয়ার শর্ত
ইতঃপূর্বে আলোচিত হয়েছে, হানাফী মাযহাবের মতে নির্দিষ্ট মেয়াদে মূল্য পরিশোধ না করলে যদি বিক্রয় ভঙ্গের শর্তারোপ করা হয়, তাহলে বিক্রেতার চুক্তি ভঙ্গ করার অধিকার থাকে। যাকে خيار النقد বলে নামকরণ করা হয়েছে। মালেকী মাযহাবের অভিমতও অনুরূপ। যেমন বিক্রেতা যদি ক্রেতাকে বলে, 'আমি তোমার কাছে এ সময়ের জন্য বিক্রয় করেছি' অথবা 'এ শর্তের ওপর যে, তুমি আমাকে এ সময়ের ভিতর মূল্য দিয়ে দেবে। এ সময়ের ভিতর তুমি মূল্য পরিশোধ না করলে আমাদের মাঝে বিক্রয় চুক্তি থাকবে না।'
আল-মুদাওয়ানা (الْمُدَونَة) গ্রন্থে বলা হয়েছে, বিক্রয় শুদ্ধ হবে, শর্ত বাতিল হয়ে যাবে। ইমাম মালেক রহ.-এর পক্ষ হতে আরও দু'টি অভিমত আছে; এক. বিক্রয় ও শর্ত দু'টিই জায়েয। দুই. বিক্রয় চুক্তি ভেঙ্গে যাবে। বিস্তারিত خيار النقد অনুচ্ছেদে দ্রষ্টব্য।
এ সকল কথা আসে যখন বাকীতে বিক্রয় করা হয়। কারণ বিক্রেতার কর্তব্য হলো, পণ্য অর্পণ করা। কিন্তু ক্রেতার কাছে মূল্য চাওয়া যাবে না নির্ধারিত সময় না আসা পর্যন্ত। অনুরূপ বিধান হলো, যখন মূল্য কিস্তিতে আদায় করার শর্তে বিক্রয় করা হয়। শাফেয়ী মতাবলম্বীগণ বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যে, বাকীতে বিক্রয় করার ক্ষেত্রে পণ্য আটকানোর কোনো অধিকার নেই বিক্রেতার। কারণ, বিক্রেতার সম্মতিক্রমেই বাকীতে বিক্রয় করা হয়েছে। এতে মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলেও পণ্য আটকানো যাবে না।
কিছু মূল্য যদি নগদ হয় আর কিছু হয় বাকী- সেক্ষেত্রে আংশিক নগদ মূল্য প্রদানে পূর্ণমূল্য নগদ প্রদানের বিধান কার্যকর হবে। ফলে সে নগদ মূল্যটুকু পরিশোধ করার পূর্বে ক্রেতা পণ্য হস্তান্তরের জন্য বিক্রেতাকে বাধ্য করতে পারবে না। সর্বাবস্থায় মেয়াদ নির্দিষ্ট করা উচিত। এমনটি যদি হয় তাহলে মেয়াদ যতই দীর্ঘ হোক, এমনকি বিশ বছরের মেয়াদ হলেও বিক্রয় জায়েয হবে। বিস্তারিত দ্র. শিরোনাম اَجَل
মালেকী ফকীহগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন, তাকাযীর ভিত্তিতে বাজারের ব্যবসায়ীদের বিক্রি করায় কোনো সমস্যা নেই। যদি তাদের সে সময় সম্পর্কে জানা থাকে। তাকাযী অর্থ : চুক্তির উভয় পক্ষের মাঝে প্রচলিত একটি সময়সীমা পর্যন্ত পাওনা পরিশোধের তাগাদা বিলম্বিত করা।
পণ্য যদি ত্রুটিপূর্ণ হয় অথবা ধরা পড়ে যে, এর স্বত্তাধিকারী অন্য কেউ, তাহলে ক্রেতার অধিকার থাকে মূল্য পরিশোধ না করার। ত্রুটির কারণে বিক্রয় ভঙ্গ করারও অধিকার তার থাকে। ইচ্ছা করলে ক্ষতিপূরণও দাবি করতে পারবে। অন্যের স্বত্ব প্রকাশের ক্ষেত্রে বিষয়টি মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত মূল্য পরিশোধে বিলম্ব করার অধিকার থাকে ক্রেতার।
নগদ পাওনা আদায় বিলম্বিত করা অথবা কাছাকাছি মেয়াদের পাওনাকে দূরবর্তী মেয়াদে রূপান্তরিত করা এবং মূল্যের সমশ্রেণীর বস্তু সমপরিমাণে বা এর চেয়ে কম পরিমাণে নেওয়া জায়েয আছে। কেননা এমন করা হলে তা হবে পূর্ণ মূল্য বিলম্বে পরিশোধ করা অথবা আংশিক মূল্য নগদ পরিশোধ করার সাথে সাথে অবশিষ্ট মূল্য বিলম্বে পরিশোধ করা। আর এমন করার প্রচলন রয়েছে। তবে বায় সালাম-এর পুঁজিকে বিলম্বে পরিশোধ করা জায়েয নেই।
মালেকী ফকীহদের মতে, সালাম বিক্রিতে মূল পুঁজি পরিশোধ করা তিন দিনের মেয়াদে বিলম্বিত করা জায়েয; যদি নগদ প্রদানের শর্তও করা হয়।
টিকাঃ
১৫১. আশ-শারহুস সাগীর, খ. ২, পৃ. ৮৪; আদ-দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ১৭৫; ফাতহুল আলী আল- মালিক, খ. ১, পৃ. ৩৫৩
১৫২. শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ২৮৩
১৫৩. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৫
১৫৪. আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ১০; আল-ফাওয়াকিহদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১২০
১৫৫. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ২৪, ৫৭ ও ৬৬; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ২, পৃ. ৩৩
📄 তৃতীয় : পণ্য অর্পণ করা
ইবনে রুশদ আল-হাফীদ বলেন, সকল ফকীহ একমত পোষণ করেছেন, সোনা-রুপার বিক্রয় বাকীতে করা জায়েয নয়। তাই এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো, বিক্রয়চুক্তি অনুষ্ঠিত হওয়ার পরপর পণ্য ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করা। আত-তাসাওউলী (التسولي) বলেন, নির্দিষ্ট পণ্য অর্পণ করা ওয়াজিব। কারণ, অর্পণে বাধকতা হলো আল্লাহর হক। বিলম্ব করলে বিক্রয় ফাসিদ হবে।
পণ্য মাপার বা গণনার পারিশ্রমিক আসে বিক্রেতার ওপর। কারণ, পরিমাপ করা ব্যতিরেকে বিক্রয় পরিপূর্ণতা লাভ করে না। ইবনে কুদামার যুক্তি হলো, বিক্রেতার জন্য অপরিহার্য হচ্ছে, পণ্য ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করা। আর পরিমাপ ছাড়া হস্তান্তর সম্ভব নয়। মূল্য গণনা বা তার পরিমাপ করার পারিশ্রমিক আসে ক্রেতার ওপর। এমনিভাবে পণ্য স্থানান্তর করার মাশুল বর্তায় ক্রেতার ওপর।
বিক্রয়চুক্তিতে পণ্য হস্তান্তর করা বিক্রেতার ওপর অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। নগদ মূল্যে বিক্রয় করার ক্ষেত্রে মূল্য পরিশোধের পর তা বিক্রেতার ওপর আবশ্যক হয়। বাকীতে বিক্রয় করার ক্ষেত্রে পণ্য হস্তান্তরের জন্য মূল্য পরিশোধ শর্ত নয়। 'পণ্য হস্তান্তর' কথাটি কেবল তখনই প্রযোজ্য হয়, যখন পণ্যটি ক্রেতার ব্যবহারের জন্য সকল প্রতিবন্ধকতা হতে মুক্ত করে দেওয়া হয়, যেন সে তার দ্বারা পুরোপুরি উপকৃত হতে পারে। পণ্য ব্যবহারে যদি কোনো ধরনের বাধা থাকে সেক্ষেত্রে পণ্য যথাযথভাবে হস্তান্তর হয়েছে বলে ধরা হবে না। এরূপ হলে বিক্রেতাকে বাধ্য করা হবে পণ্যটি বাধামুক্ত করে দিতে।
পণ্য প্রদানে প্রতিবন্ধক কোনো কিছুতে ব্যস্ত রাখার একটি সূরত হলো: কোনো ইজারা চুক্তির অধীনে পণ্যটি অন্তর্ভুক্ত থাকা, যে ইজারা চুক্তির বিষয়টি বিক্রেতা চূড়ান্ত করেছে। ক্রেতা যদি ইজারার শেষ সময় পর্যন্ত পণ্য উসূল করার জন্যে অপেক্ষা করতে রাজী হয়, তাহলে পণ্য অর্পণ করার তাগাদা করার সুযোগ নেই। তবে ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়া এবং পণ্য অর্পণযোগ্য হওয়া পর্যন্ত ক্রেতার মূল্য পরিশোধ বিলম্বিত করার অধিকার আছে। পণ্য হস্তান্তর করা যেমনটি আবশ্যক, তার আনুষঙ্গিক জিনিস হস্তান্তর করাও তেমন ওয়াজিব।
সমজাতীয় দ্রব্য যেমন ওজনযোগ্য কিংবা গণনাযোগ্য জিনিস এবং জমি ও প্রাণীজাতীয় জিনিসের হস্তগত করার বিধান ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। ভূমি হস্তগত করার ক্ষেত্রে এতটুকু যথেষ্ট যে, তা খালি করা দেওয়া হবে এবং এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো বিক্রেতার যাবতীয় মালসামানা সরিয়ে নেওয়া হবে। এটি সর্ববাদী মত। বিক্রেতার সামানা যদি একটি কামরায় একত্রিত করা হয় তাহলে কামরাটি ছাড়া বাকী অংশ হস্তগত করা সহীহ হবে। এ কামরাটি খালি করে দেওয়ার ওপর তা হস্তগত করা মওকুফ থাকবে। বিক্রেতা যদি অনুমতি দেয় সামানাসহ ঘর হস্তগত করার, তাহলে হস্তান্তর করা সহীহ হবে। কারণ, তখন সামানা ক্রেতার কাছে আমানত হিসেবে বিবেচিত হবে।
মালেকী মাযহাবের ভাষ্য হলো, পণ্য যদি খালি জমি হয় তাহলে তা ক্রেতার হাতে তুলে দিলেই হস্তগত হওয়া বুঝায়। আর যদি তা বসবাসের ঘর হয় তাহলে তা খালি করে দিলেই হস্তগত হয়ে যায়।
ক্রেতা-বিক্রেতার কেউ যদি বিক্রিত জমির কাছে উপস্থিত না হয়, তাহলে হস্তান্তর করার ক্ষেত্রে শাফেয়ী মাযহাবের বিশুদ্ধতম অভিমত হলো, এ পরিমাণকাল অতিক্রান্ত হওয়া বিবেচ্য যে সময়ের ভিতর জমি পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব। কারণ যেখানে কষ্টের কারণে জমি পর্যন্ত দু’চুক্তিকারীর উপস্থিত হওয়া চুক্তিকালে ধর্তব্য হয় না, সেখানে দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়া বিবেচনা করায় কোনো কষ্ট নেই। অনেক হানাফী মাযহাব অনুসারী দূরবর্তী ভূমি বিক্রির ক্ষেত্রে এরূপ অভিমত পোষণ করেন। এর দ্বারা একথাই প্রকাশিত হলো যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য উভয়কে ক্ষতি হতে নিরাপদ রাখা।
স্থানান্তরযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ইমামগণের অভিমত হলো, পরিমাপ, ওজন ও গণনার যোগ্য জিনিসে হস্তগত হলো, মেপে, নির্দিষ্ট পাত্র দ্বারা পরিমাপ করে ও গণনা করে তা বুঝে নেওয়া। তবে শাফেয়ীগণের মতে এর সাথে স্থানান্তরও করতে হবে। এ সকল ব্যাখ্যা প্রযোজ্য হয় যখন পণ্য অনুমান করে বিক্রয় করা না হয়। অনুমানের মাধ্যমে বিক্রয় করলে তা হস্তগত হয় কেবল স্থানান্তর করলে। বিস্তারিত بَيْعُ الْجُزَافَ দ্রষ্টব্য।
প্রাণী ও অস্থায়ী অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে হস্তগত হওয়া সাব্যস্ত হবে সমাজের প্রচলনের ভিত্তিতে। যেমন: কাপড় ও প্রাণীর লাগাম হস্তান্তর করা, প্রাণীকে চালনা করা এবং বিক্রেতার প্রাণী হতে তাকে পৃথক করা অথবা বিক্রেতা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া।
হানাফীগণ পরিমাপযোগ্য, ওজনযোগ্য ও গণনাযোগ্য পণ্যে এবং অন্যান্য পণ্যের মাঝে কোনো পার্থক্য করেন না। তাদের মতে ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়াই সকল পণ্যের ক্ষেত্রে হস্তান্তরকরণ। এমনকি বিক্রেতার ঘর খালি করে দিলেই হস্তগত করা সহীহ হয়ে যায়। অতঃপর পণ্য নাশ হয়ে গেলে তা ক্রেতার দায়িত্বে নষ্ট হওয়া বুঝায়। কারণ তা বিক্রেতার হাতে তখন আমানত হিসাবে থাকে। ইমাম আহমদ-এর পক্ষ হতে এর অনুকূলে একটি অভিমত পাওয়া যায়।
পূর্বেই পণ্য হস্তগত করে নিলে তা নতুন হস্তগত করার স্থলাভিষিক্ত হয়। যখন তা জামিন হওয়ার সুরতে হস্তগত করা হয়। এর উদাহরণ হলো, ক্রেতা বিক্রেতার হাত হতে পণ্য ছিনিয়ে নিয়ে গেল বিক্রয় চুক্তি কার্যকর হওয়ার পূর্বেই, এর পর বিক্রয়চুক্তি কার্যকর হলে তা পুনরায় হস্তগত করার প্রয়োজন নেই। যেহেতু তার এ কজা করা তার পূর্ববর্তী কব্জা থেকে অধিক শক্তিশালী নয়, যেহেতু এ উভয় ক্ষেত্রে পণ্য ধ্বংসের ক্ষতি কজাকারীর।
তবে আমানত হিসেবে বা ধার হিসাবে যা পূর্বেই হস্তগত করা হয় পরবর্তীকালে সেই জিনিসের বিক্রয়চুক্তি সম্পাদিত হলে পূর্বের কজা এর স্থলাভিষিক্ত হবে না। কারণ পূর্বের কজা হলো দুর্বল ধরনের কজা। ইচ্ছাকৃতভাবে তা নষ্ট না করলে তা নষ্ট হওয়ার দরুন কজাকারী দায়ী হয় না।
টিকাঃ
১৫৬. বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১৭০
১৫৭. আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ১২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৪
১৫৮. আশ-শারহুস সাগীর, খ. ২, পৃ. ৭১, প্রকাশক: হালাবী; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭২; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১২৬
১৬১. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ২৬২, ২৬৯ ও ২৭৬; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫৬২
১৬০. জামিউল ফুসূলাইন, ৩২তম পরিচ্ছেদ।
১৬১. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ৪৮
১৬২. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৮৮ ও ৫১২; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ২১৬
১৬৩. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ১৭
১৬৪. আশ শারহুস সাগীর, খ. ২, পৃ. ৭১
১৬৫. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭২; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫৬৩
১৬৬. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭০; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১২৫
১৬৭. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ১৬; আল-ফুরু, খ. ৪, পৃ. ১৪২; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১২৪
১৬৮. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫১২; আতাসী কৃত শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ৮৪৬