📄 ষষ্ঠ : পণ্য বা নির্দিষ্ট মূল্য হস্তান্তরের পূর্বে সম্পূর্ণরূপে বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া
বিক্রি অপরিহার্য হওয়ার প্রকাশ্য লক্ষণসমূহের একটি হলো, বিক্রেতার ওপর আবশ্যক হবে পণ্য ক্রেতার কাছে অর্পণ করা। হস্তান্তর করা ছাড়া বিক্রেতার দায় মুক্তির কোনো পন্থা নেই। পণ্য ধ্বংস হয়ে গেলে বিক্রেতাকে এ দায় গ্রহণ করতে হবে। তার ওপর এ দায় বর্তাবে, কারও কর্মে তা নাশ হোক, আর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে নাশ হোক।
এ বিধান মূল্যের ওপরও প্রযোজ্য হবে, যদি তা কোনো নির্দিষ্ট জিনিস হয়। কারণ নির্দিষ্ট জিনিস মূল্য হলে বিক্রির চুক্তির সময় সেটিও পণ্যের ন্যায় মুখ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু যদি মূল্যটি নির্দিষ্ট বস্তু না হয়ে তা কেবল ক্রেতার জিম্মায় আবশ্যক হয়, সেক্ষেত্রে বিক্রেতার বিকল্প গ্রহণ করার সুযোগ সম্ভাবনা থাকে।
নাশ হওয়া সম্পূর্ণরূপে হতে পারে, আংশিকও হতে পারে। পণ্য যদি হস্তান্তর করার পূর্বে প্রাকৃতিক কারণে সম্পূর্ণটি নাশ হয়ে যায়, তাহলে তা বিক্রেতার জিম্মায় নাশ হয়েছে বলে বিবেচিত হয়। এ সম্পর্কে হাদীস বর্ণিত হয়েছে: نَهَى عَنْ رِبْحٍ مَا لَمْ يُضْمَن “রাসূলুল্লাহ সা. কোনো বস্তুর দায়গ্রহণের পূর্বে তার লাভ গ্রহণ করা থেকে নিষেধ করেছেন।" উক্ত বর্ণনা হতে প্রমাণিত হয়, এ অবস্থায় বিক্রয় ভেঙ্গে যায় আর মূল্য রহিত হয়। কারণ, এর ফলে বিক্রয় কার্যকর করা অসম্ভব হয়। এটি হানাফীগণের অভিমত। অনুরূপ বিক্রেতার কোনো কর্মের ফলে যদি পণ্য নষ্ট হয় তাহলেও তাদের একই অভিমত।
শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহদের পক্ষ হতে এ সম্পর্কে দুটি অভিমত পাওয়া যায়।
এক. প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে তেমনই বিক্রয় ভঙ্গ হয় যেরূপ বিক্রেতার নষ্ট করার কারণে ভঙ্গ হয়।
দুই. বিক্রয় ভঙ্গ করে মূল্য ফেরত গ্রহণ এবং বিক্রয় কার্যকর রেখে পণ্যের বাজারদর গ্রহণ, এ দুটোর যে কোনো একটি ক্রেতা বেছে নিতে পারবে।
বিক্রয় বাতিল হওয়ার উপকারিতা হলো, ক্রেতা যদি মূল্য পরিশোধ না করে তাহলে তার দায়িত্ব থেকে তা রহিত হয়ে যাবে। আর যদি পরিশোধ করে ফেলে তাহলে তা ফিরিয়ে আনতে পারবে। আর যদি ভঙ্গ না হয় তাহলে ক্রেতার মূল্য প্রদান আবশ্যক হবে, আর বিক্রেতার ওপর পণ্যের বাজারদর আবশ্যক হবে, তা যা-ই সাব্যস্ত হয় না কেন।
হাম্বলীগণ বিক্রেতার কর্মের ফলে পণ্য নষ্ট হওয়াকে তৃতীয় কারো কর্মের ফলে নষ্ট হওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। এর বিস্তারিত আলোচনা আসছে। ক্রেতার কর্মের ফলে যদি পণ্য নষ্ট হয় তাহলে বিক্রয় অটুট থাকবে। ক্রেতার ওপর মূল্য পরিশোধ আবশ্যক হবে। ক্রেতা কর্তৃক পণ্য নষ্ট করা তার হস্তগত করা হিসেবে বিবেচিত হয়, এটি সর্ববাদী অভিমত।
তৃতীয় কোনো পক্ষের কর্মের ফলে যদি পণ্য নষ্ট হয় (হাম্বলীগণের মতে বিক্রেতা কর্তৃক বিনষ্ট করারও একই বিধান) তাহলে ক্রেতার এখতিয়ার থাকে বিক্রয়চুক্তি ভঙ্গের। কারণ, এর ফলে পণ্য হস্তান্তর অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন মূল্য পরিশোধের দায় তার ওপর থেকে রহিত হয়ে যায়। (আর বিক্রেতার অধিকার হয়ে যায় যে বিনষ্ট করেছে তাকে দায়ী করার)। চাইলে ক্রেতা বিক্রয় চুক্তি অটুট রাখতে পারে। তাহলে ঐ ব্যক্তিকে দায়ী করে তার নিকট থেকে প্রাপ্য আদায় করবে। এ ক্ষেত্রে তার কর্তব্য হলো বিক্রেতার মূল্য পরিশোধ করা। ঐ ব্যক্তি যদি মিছলী বা সদৃশ পণ্য নষ্ট করে, তাহলে সে রকম জিনিস তার নিকট থেকে আদায় করবে। আর যদি কীমী জিনিস নষ্ট করে তাহলে বিনষ্টকারী তার মূল্য আদায় করবে। হানাফী ও হাম্বলীগণ এরূপ অভিমত পোষণ করেন। শাফেয়ীগণের প্রসিদ্ধ অভিমত এর অনুকূলে। শাফেয়ীগণের প্রসিদ্ধ মাযহাবের বিপরীত এক অভিমত হলো, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিক্রয় নষ্ট হবে, যেমন পণ্য ধ্বংস হলে বিক্রি ভেঙ্গে যাবে।
পণ্যের আংশিক যদি নষ্ট হয় তাহলে তা কার কারণে নষ্ট হয়েছে- সে অনুপাতে তার বিধান ভিন্নতর হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক কারণে যদি আংশিক পণ্য নষ্ট হয়, আর এর ফলে পণ্যের পরিমাণ কমে যায় তাহলে যে পরিমাণ নষ্ট হয়েছে সে পরিমাণের মূল্য রহিত হবে। এ ক্ষেত্রে ক্রেতার এখতিয়ার থাকে পরিমাণ মত মূল্য দিয়ে বাকীটুকু গ্রহণ করার অথবা বিক্রিচুক্তিতে বিভিন্নতা সৃষ্টি হওয়ায় বিক্রয় চুক্তি ভঙ্গ করার। এটি হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহবৃন্দের অভিমত। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে حَيَارُ تَفَرُّقِ الصَّفْقَة .
অতঃপর হানাফীগণ বলেন, পণ্যের আংশিক ত্রুটিটা যদি পরিমাণে না হয়ে পণ্যের গুণে দেখা দেয়, আর এ ধরনের গুণ উল্লেখ না করলেও পণ্যে অনুবর্তী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাহলে এজন্যে মূল্য হতে কোনো কিছুই কর্তন করা হবে না। বরং ক্রেতার এখতিয়ার থাকবে বিক্রয় ভঙ্গ করার বা অব্যাহত রাখার। কারণ গুণাবলি মূল্যের সামান্য অংশেরও বিপরীতে হয় না। হ্যাঁ, যদি ক্ষতি বাড়াবাড়ি পর্যায়ের হয় অথবা মূল্য নির্ণয়ে এগুলোর কথা উল্লেখ করা হয় কিংবা পণ্যের গুণকে এর অংশ হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় বা তা অনুবর্তী বলে জুড়ে দেওয়া হয় তাহলে ভিন্ন কথা।
বিক্রেতার কর্মের ফলে যদি আংশিক পণ্য নাশ হয় তাহলে সাধারণভাবে এর বিপরীতে মূল্যে কর্তন হবে। তৎসঙ্গে বিক্রয়চুক্তি গ্রহণ ও বর্জনের এখতিয়ারও ক্রেতার থাকবে। কারণ এর ফলে বিক্রয় চুক্তিতে ছেদ পড়ে গেছে এবং বিভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে।
আংশিক পণ্য যদি তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কর্মের ফলে নষ্ট হয়, তাহলে ক্রেতার এখতিয়ার থাকে বিক্রয় ভঙ্গ করার ও অব্যাহত রাখার। অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে যে পরিমাণ নষ্ট হয়েছে তা ঐ ব্যক্তির নিকট হতে আদায় করার অধিকার রাখবে ক্রেতা। আর যদি ক্রেতার দোষে পণ্য নষ্ট হয় তাহলে তার দায়দায়িত্ব ক্রেতাকেই গ্রহণ করতে হবে। এটি তার কজা হিসেবে ধরে নেওয়া হবে।
মালেকীগণ মনে করেন, পণ্য বিক্রেতার কারণে অথবা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কারণে নষ্ট হলে বিকল্প পণ্যদান ওয়াজিব হয় বিক্রেতার ওপর অথবা ঐ তৃতীয় ব্যক্তির ওপর। এক্ষেত্রে ক্রেতার কোনো এখতিয়ার নেই, পণ্য সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হোক আর আংশিক নষ্ট হোক।
প্রাকৃতিক কারণে পণ্য নষ্ট হোক আর ত্রুটিযুক্ত হোক- তা ক্রেতার দায় হিসেবে গণ্য হবে, বিক্রয় যদি বৈধ ও আবশ্যক হয়। কারণ চুক্তির ফলে দায় পরিবর্তন হয়ে যায়, যদিও ক্রেতা পণ্য হস্তগত না করে। তবে মালেকী মাযহাবের উলামায়ে কেরাম ছয়টি বিষয়কে ভিন্নতর মনে করেন। সেগুলো হলো:
ক. যেখানে পণ্য পূর্ণরূপে ক্রেতাকে বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থাকে। তা পাত্র দ্বারা মাপযোগ্য জিনিস হোক আর ওজনযোগ্য হোক কিংবা গণনাযোগ্য জিনিস হোক। ক্রেতার পাত্রে তা ঢেলে দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিক্রেতা দায়বদ্ধ থাকে। ঢেলে দেওয়ার পূর্বে নষ্ট হয়ে গেলে তার দায় বিক্রেতাকে বহন করতে হবে।
খ. মূল্য আদায় করার জন্য যদি পণ্য বিক্রেতার কাছে আবদ্ধ থাকে।
গ. অদেখা পণ্য যদি গুণ বর্ণনার মাধ্যমে বিক্রয় হয় অথবা পূর্ব দেখার ভিত্তিতে বিক্রয় হয়। এ অবস্থায় ক্রেতা তা হস্তগত করা ছাড়া সেটি পূর্ণরূপে তার দায়বদ্ধতায় দাখিল হয় না।
ঘ. ফাসিদ বিক্রয়ের পণ্য।
ঙ. ব্যবহারের উপযুক্ত হওয়ার পর ফলজাতীয় পণ্য। তা ক্রেতার দায়বদ্ধতায় আসে ধরা ও ক্ষতির আশঙ্কা হতে মুক্ত হওয়ার পরই।
চ. গোলাম বিক্রয় করার ক্ষেত্রে যতক্ষণ না বিক্রয়ের পর তিন দিন অতিক্রান্ত হয়। তবে মালেকীগণ আংশিক নষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন, যখন পণ্য অর্ধেকেরও কম বাকী থাকে অথবা তা একক জিনিস হয়। এ অবস্থায় ক্রেতার গ্রহণ ও বর্জনের এখতিয়ার থাকে। নষ্ট হওয়া দ্রব্য যদি অর্ধেক হয় বা তার বেশি অথবা পণ্য একাধিক হয়, তাহলে অবশিষ্ট পণ্যে মোট পণ্যের অংশ হিসাব করে সে অংশ পরিমাণ মূল্য দিয়ে ক্রেতাকে গ্রহণ করতে হবে।
টিকাঃ
১২৯. শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৮৯ ও ২০৫; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ১, পৃ. ৩০৬; মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ১০০
১৩০. সুনানে আবি দাউদ, সুনানে নাসাঈ, সুনানে তিরমিযী, মুসনাদে আহমদ। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে সহীহ বলে অভিহিত করেছেন। তিরমিযী, খ. ৩, পৃ. ৫৩৫; হালাবী প্রকাশনা, মুসনাদে আহমদ, খ. ১০, পৃ. ১৬০; জামিউল উসূল, খ. ১, পৃ. ৪৫৭
১৩১. শারহুল মাজাল্লা, ধারা ২৯৩; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৮৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৬৫; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ২১০
১৩২. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৫৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৬৫; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৮৮
১৩০. শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ২৩৪; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৩৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৬৭; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৮৮
১৩৪. শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ২৯৩; হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ৪৬
১৩৫. প্রাগুক্ত, জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৫৩
১৩৬. আশ-শারহুস সাগীর, খ. ২, পৃ. ৭০, প্রকাশক: হালাবী; আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৩০
১৩৭. আশ-শারহুস সাগীর, খ. ২, পৃ. ৭১; আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১৩০
১৩৮. আশ-শারহুস সাগীর, খ. ২, পৃ. ৭২ এবং তাতে হাশিয়াতুস সাভী
📄 বিক্রয় সম্পন্ন হওয়ার ফলাফল
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 প্রথম : মালিকানা স্থানান্তর
সঠিক বিক্রয় চুক্তি সম্পন্ন হলে ক্রেতা পণ্যের মালিক হয়ে যায় আর বিক্রেতা মূল্যের মালিক হয়। এ ক্ষেত্রে পরস্পর হস্তগত করার ওপর মালিকানা মওকুফ থাকে না। যদিও হস্তগত করার প্রভাব রয়েছে জরিমানার ক্ষেত্রে। ফাসিদ বায়- এর ক্ষেত্রে হানাফীগণের অভিমত হলো, হস্তগত করা ছাড়া ক্রেতা পণ্যের মালিক হবে না। বিস্তারিত দ্র. الْبَيْعُ الْفَاسِدُ অধ্যায়।
পণ্য ও মূল্যের মালিকানা বদলে নিম্নোক্ত বিধানাবলি কার্যকর হবে:
ক. পণ্যে যা বৃদ্ধি পাবে জন্ম বা উৎপাদন ইত্যাদির মাধ্যমে, তার মালিক হবে ক্রেতা- যদিও সে পণ্য হস্তগত না করে। মূল্য বাকি থাকলেও পণ্যের মালিকানা ক্রেতার প্রতি স্থানান্তরিত হতে কোনো বাধা নেই।
খ. পণ্যে ক্রেতার কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হয়, আর মূল্যে বিক্রেতার নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার কার্যকর হয়। যেমন বিক্রেতা মূল্য গ্রহণের দায়িত্ব কাউকে দিতে পারে। তবে হস্তগত করার পূর্বে ক্রেতার তাতে হস্তক্ষেপ করা ফাসিদ অথবা বাতিল হিসেবে গণ্য হয়। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য শিরোনাম بَيْعُ مَا لَمْ يُقْبَضَ
গ. বিক্রেতা মূল্য হস্তগত করলেও ক্রেতা পণ্য হস্তগত করেনি- এ অবস্থায় বিক্রেতা দেউলিয়া হয়ে মারা গেলে অন্য সকল পাওনাদারের তুলনায় পণ্যে ক্রেতার অধিকার অগ্রগণ্য হবে। এ পণ্যটি মৃতের ত্যাজ্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে না, বরং তার হাতে এটি আমানত বলে গণ্য হবে।
ঘ. বাকিতে বিক্রয় করা অবস্থায় ঐ মূল্য পরিশোধ করা পর্যন্ত অথবা অন্য কোনো নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত পণ্যে বিক্রেতার মালিকানা সংরক্ষিত থাকার শর্তারোপ করা জায়েয নয়।
এ সব বিধান, পণ্য বা মূল্য দায়িত্বে সাব্যস্ত হলে এগুলোর মালিকানা স্থানান্তর হতে বাধা নেই, যদি এগুলো সত্তাগত বস্তু না হয়ে দায়িত্বে থাকা ঋণ/পাওনা হয়। কেননা দায়িত্বে থাকার পরও বিভিন্ন পাওনার মালিকানা লাভ করা যায়, যদিও পাওনা অনির্দিষ্ট থাকে। যেহেতু পাওনা নির্দিষ্ট করা মূল মালিকানার অতিরিক্ত বিষয়। কখনো কখনো নির্ধারণ মালিকানা লাভের সাথে যুক্ত হয়। আবার কখনো পাওনা পরিশোধ করা পর্যন্ত নির্ধারণের বিষয়টি বিলম্বিত হয়। যেমন কেউ জ্ঞাত পরিমাপের নির্ধারিত পরিমাণে চাল কিনে, এ অবস্থায় হাতে অর্পণ করা ছাড়া তার পাওনা নির্ধারিত হয় না। অনুরূপভাবে মূল্যও নির্ধারিত হয় না, যখন তা দায়িত্বে আবশ্যক হয়।
টিকাঃ
১৩৯. শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ৩৬৯
১৪০. শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ৩৭১
১৪১. শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ২৯৭
১৪২, শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ২০১
📄 দ্বিতীয় : নগদ মূল্য আদায়
মূল্যের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ধারা হলো, তা নগদ হওয়া। এটি সকল ফকীহের সাধারণ অভিমত। ইবনে আবদিল বার বলেন, মূল্য সর্বদা নগদ হয়। তবে যদি ক্রেতা-বিক্রেতা কোনো মেয়াদ নির্ধারণ করেন, তাহলে তা সে পর্যন্ত প্রলম্বিত হয়। এ বিধানের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে আতাসী স্বরচিত শরহুল মাজাল্লা গ্রন্থে সিরাজ-এর সূত্রে বলেন, কেননা নগদ হওয়া-ই চুক্তির দাবি ও আবশ্যিক বিধান।
মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা-য় আছে, সাধারণ বিক্রি নগদরূপে সংঘটিত হয়। এরপর মাজাল্লা এ মূলনীতির ব্যতিক্রম সাব্যস্ত করেছে সে অবস্থাকে, যে অবস্থায় কোনো এলাকায় সাধারণ ব্যবসা বাকিতে বা কিস্তিতে হওয়ার প্রচলন রয়েছে।
অনুরূপভাবে মালেকী ফকীহগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন, বিক্রিতে খিয়ারে শর্ত থাকলে তাতে মূল্য নগদ লেনদেন জায়েয নয়। খিয়ারের সময়ে নয় এবং গোলাম বিক্রির ক্ষেত্রে তিন দিনের মধ্যেও নয়। নগদ পরিশোধের শর্ত করা হলে বিক্রি ফাসেদ হয়ে যাবে। অনুপস্থিত ব্যক্তির বিক্রির ক্ষেত্রে আবশ্যকীয়ভাবে নগদ মূল্য পরিশোধ করার শর্ত করা যাবে না। তবে স্বেচ্ছায় কেউ নগদ পরিশোধ করতে চাইলে সে সুযোগ আছে।
মূল্য কোনো সময় নগদ হয়, কোনো সময় বাকী হয়। বাকী মূল্য নির্দিষ্ট সময়ে সবটুকু আদায় করার অঙ্গীকার করা হয় অথবা কিস্তিতে আদায়ের কথা থাকে। অন্য কথায়, মূল্য হয়তো নির্দিষ্ট কোনো বস্তু অথবা দায়িত্বে ঋণ হিসেবে অপরিহার্য থাকে।
মূল্য যখন দায়িত্বে ঋণ হিসেবে থাকে তখন তা আদায়ের বিধান ভিন্ন ভিন্ন হয়, তা নগদ বা বাকী বা কিস্তি হিসেবে। বাকীতে কিংবা কিস্তিতে হলে তার মেয়াদ উভয় চুক্তি সম্পাদনকারীর অবগতিতে নির্ধারিত হতে হয়। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য শিরোনাম أجل ক্রেতা যদি আংশিক মূল্য পরিশোধ করে তাহলে পণ্য তার হাতে হস্তান্তরিত হওয়ার উপযুক্ত সে হয় না। যে পরিমাণ মূল্য পরিশোধ করেছে সে পরিমাণ পণ্য প্রাপ্তিরও হকদার সে হয় না। পণ্য একটিমাত্র জিনিস হোক আর বহু হোক। জিনিসগুলো ক্রয়ের সময় মূল্য বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হোক অথবা সবগুলো একবারে বলা দামে ক্রয় করুক- যে পর্যন্ত বিক্রয় একই চুক্তিতে হওয়া স্থির থাকে (তাতে বিভিন্নতা না আসে।) সে পর্যন্ত সে হকদার হয় না। এ সকল কথা সে পর্যন্তই কার্যকর থাকবে যে পর্যন্ত এর বিপরীতে কোনো শর্ত থাকবে না।
টিকাঃ
১৪৩. আল-কাফী, ইবনু আবদিল বার কৃত, খ. ২, পৃ. ৭২৬; আল বাহজা, শরহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ৮৮
১৪৪. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ২৫০; শারহুল মাজাল্লা, আতাসী কৃত, খ. ২, পৃ. ১৭০
১৪৫. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১০
১৪৬. শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ২৭৮
১৪৭. শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ২৭৮