📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 তৃতীয় : মূল্য নির্ধারণ ও পণ্য হতে তাকে পৃথককরণ

📄 তৃতীয় : মূল্য নির্ধারণ ও পণ্য হতে তাকে পৃথককরণ


পণ্য হতে মূল্যকে পৃথককরণের ব্যাপারে হানাফী আলেমগণ নিম্নোক্ত কায়দা নির্ধারণ করেছেন। মালেকী ও শাফেয়ী উলামায়ে কেরামের বক্তব্যও এর সাথে একীভূত।

ক. বিনিময়কৃত দু'টি জিনিসের একটি যদি মুদ্রা হয়, তাহলে সেটি মূল্য হিসেবে ধর্তব্য হয়। আর অপরটি যে কোনো ধরনের বস্তু হোক তা হবে পণ্য। এতে শব্দ প্রয়োগের প্রতি লক্ষ করা হবে না। ফলে কেউ যদি বলে : بعتك دينارًا بهذه السّلْعة 'আমি তোমার কাছে একটি দীনার এ পণ্যের বদলে বিক্রি করলাম।' তাহলেও দীনারটি মূল্য হিসেবে পরিগণিত হবে। যদিও ب হরফটি মূল্যের পূর্বে আসে, সে হিসাবে এখানে পণ্য শব্দটি মূল্য হওয়া বোঝায়।

খ. বিনিময়কৃত দু'টি জিনিসের একটি যদি কীমী বস্তু হয় (যা সদৃশ হয় না), আর অপরটি হয় ইঙ্গিত দ্বারা নির্দিষ্ট সদৃশ মাল, তাহলে কীমী জিনিসটি হবে পণ্য আর সদৃশ মালটি হবে মূল্য। এক্ষেত্রে শব্দ প্রয়োগের প্রতি মোটে লক্ষ্য করা হবে না। কিন্তু সদৃশ মাল যদি নির্দিষ্ট না হয়, তাহলে মূল্য হিসেবে বিবেচিত হবে যে জিনিসের সাথে 'দ্বারা' শব্দটি প্রয়োগ করা হবে। আরবীতে বলা হলে যে শব্দের সাথে (ب) অব্যয়টি যুক্ত হবে। যেমন বলল: بعتك هذه السلعة برطل من الأرز "আমি এ পণ্যটি তোমার কাছে এক রিতল চাউলের বিনিময়ে বিক্রয় করলাম"। এক রিতল চাউল হলো মূল্য, যেহেতু তার পূর্বে (ب) আনা হয়েছে। কিন্তু যদি সে বলে : بعتك رطلاً من الأرز بهذه السّلْمة 'আমি এ পণ্যের বদলে তোমার নিকট এক রিতল চাউল বিক্রি করলাম।' এতে পণ্যটি হবে মূল্য আর এটি বায় সালামে হয়ে থাকে। যেহেতু তাতে নগদ মূল্যে দায়িত্বে থাকা পণ্য বিক্রয় করা হয়।

গ. বিনিময়ের দু'টি জিনিসের উভয়টিই যদি সদৃশ মাল হয়, তাহলে মূল্য হিসেবে ঐ জিনিস বিবেচ্য হবে যার সাথে দ্বারা বা বিনিময়ে (ب) অব্যয়টি সংযুক্ত থাকবে। যেমন বলল: بعكَ أَرْزًا بقمْح 'গমের বিনিময়ে আমি তোমার কাছে চাউল বিক্রি করলাম।' এখানে গম মূল্য হিসেবে বিবেচ্য হবে।

ঘ. বিনিময়ের দু'টি জিনিসই যদি কীমী জিনিস হয়, তাহলে উভয়টি এক দিক দিয়ে পণ্য; আর অন্য বিবেচনায় মূল্য হিসেবে পরিগণিত হয়। এটি হানাফী মাযহাবের অভিমত। তবে শাফেয়ী ও হাম্বলীদের মতে যার সাথে দ্বারা (ب) শব্দটি যুক্ত হবে তা হবে দাম বা মূল্য। মালেকী ফকীহগণ বলেন: মুদ্রা পণ্য হওয়াতে কোনো বাধা নেই। এর কারণ, প্রতিটি মুদ্রা অপরটির বিনিময় হতে পারে। আল বাহজা কিতাবে আছে, প্রতিটি বিনিময় অপরটির মূল্য।
মূল্য সংক্রান্ত উল্লিখিত বিধান ছাড়াও যে বিধানগুলো রয়েছে:
ক. কে আগে হস্তান্তর করবে তা নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতা যদি বাদানুবাদে লিপ্ত হয় তাহলে ওয়াজিব হয় আগে মূল্য হস্তান্তর করা; অতঃপর পণ্য হস্তান্তর করা।
খ. ক্রেতার দায়িত্ব হলো মূল্য প্রদানের ব্যয়ভার গ্রহণ করা, আর বিক্রেতার কর্তব্য হলো পণ্য হস্তান্তরের ব্যয়ভার গ্রহণ করা।
গ. কব্জা করার পর লেনদেন জায়েয হওয়ার যে শর্ত রয়েছে তা পণ্যের সাথে নির্দিষ্ট, মূল্যের সাথে নয়। বিস্তারিত জানতে দ্র: بَيْعُ بَيْعٌ مَنْهِيُّ عَنْهُ الْمَبِيعِ قَبْلَ قَبْضِهِ
ঘ. বায় সালামে মূল্য বিলম্বে দেওয়া জায়েয নয়। এর বিপরীতে পণ্য বিলম্বে আদায় করা হচ্ছে সালাম বিক্রির স্বাভাবিক চাহিদা। এটি মোটামুটি কথা। বিস্তারিত ثَمَن শিরোনাম দ্র.।

টিকাঃ
১১১. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ১৯৫, বুলাক এবং খ. ৫, পৃ. ২৭২, প্রকাশক: হালাবী; আল-ফাতাওয়া আল হিনদিয়‍্যা, খ. ৩, পৃ. ১৩-১৫; আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭০; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২০৫
১১২. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ২২ ও ২৪৩; মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ৬০১; আল-বাহজা, খ. ২, পৃ. ৮৬; আল-মাজমূ, খ. ৯, পৃ. ২৬৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭০; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২০৫
১১৩. আস-সাভী আলাশ শারহিস সাগীর, খ. ২, পৃ. ৭১, প্রকাশক: হালাবী; আল-মাজমু, খ. ৯, পৃ. ২৭৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭০ ও ৭৩-৭৪; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১২৬, ২১৮ ও ২২০; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৯১

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 চতুর্থ : মূল্যে অস্পষ্টতা

📄 চতুর্থ : মূল্যে অস্পষ্টতা


যদি কেউ মূল্য বর্ণনায় সাধারণভাবে মুদ্রার কথা উল্লেখ করলেও তার ধরন বর্ণনা না করে, যেমন পণ্য বিক্রয়ে কেবল দীনারের কথা উল্লেখ করল। অথচ সে দেশে বিভিন্ন ধরনের দীনার প্রচলিত রয়েছে, আর প্রচলনও সমান্তরালে চলছে। তাহলে মূল্যের পরিমাণ সম্পর্কে অজ্ঞতার ফলে চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে। তবে হ্যাঁ, ঐ দেশে যদি নির্দিষ্ট কোনো দীনার ব্যাপক হারে প্রচলিত থাকে, তাহলে চুক্তি বৈধ হবে। আর চুক্তিটি অধিকতর প্রচলিত দীনারের ওপর বর্তাবে। যেমন কেউ কুয়েতে বলল, আমি তোমার কাছে এক দীনারে তা বিক্রয় করলাম, তাহলে চুক্তি বৈধ হবে আর মূল্য কুয়েতী দীনার হিসেবে সাব্যস্ত হবে। কারণ কুয়েতে সেদেশের দীনারই সর্বাধিক প্রচলিত।

টিকাঃ
১১৪. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়‍্যা, ধারা: ২৪১ ও ২৪৪; ইবনে আবদিল বার কৃত আল- কাফী, খ.২, পৃ. ৭২৬; আল-বাহজা, খ. ২, পৃ. ১১; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ১৬২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭; আল ইফসাহ, খ. ১, পৃ. ৩২৫

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 পঞ্চম : পুঁজির প্রতি দৃষ্টি রেখে মূল্য নির্দিষ্টকরণ

📄 পঞ্চম : পুঁজির প্রতি দৃষ্টি রেখে মূল্য নির্দিষ্টকরণ


মূল্য প্রত্যক্ষ করে তার প্রতি ইঙ্গিতের মাধ্যমে মূল্য নির্দিষ্টকরণ হতে পারে। এটি পরিচয় দানে সর্বাধিক উত্তম পন্থা, পরিমাণ বর্ণনা করা হোক আর না-ই করা হোক। যেমন কেউ পণ্য বিক্রয় করল দীনারের এক থলের বিনিময়ে, আর তার প্রতি ইশারা করে দেখাল। মূল্য যদি চুক্তির মজলিসের আড়ালে থাকে, তবেই কেবল মূল্যের ধরন, গুণ ও পরিমাণ বর্ণনা করা আবশ্যক হয়।
এরপর বিক্রিমূল্য হয়তো ক্রয়ের মূল্য অর্থাৎ বিক্রেতার মূল পুঁজি নির্ভর হবে না, অথবা পুঁজি নির্ভর হবে কোন লাভ-লোকসান ছাড়া, অথবা নির্দিষ্ট লাভসহ, অথবা নির্দিষ্ট লোকসানসহ। প্রথম অবস্থায়, যে অবস্থায় বিক্রিমূল্য ক্রয়মূল্য- নির্ভর হবে না, তা হলো বায়'উল মুসাওয়ামাহ (بَيْعُ الْمُسَاوَمَة)। কেনাবেচার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে প্রচলিত পন্থা।
আর দ্বিতীয় প্রকারগুলো হল আমানতের বিক্রি। এর বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। তাওলিয়া (تَوْلِيَةُ), অর্থাৎ ক্রয়মূল্যে বিক্রি করা। আর যদি আংশিক পণ্যের মূল্যের সাথে বিক্রিমূল্যের সম্পর্ক হয় তাহলে সেটিকে বলে ইশরাক (اِشْرَاكٌ)। আর যদি ক্রয়মূল্যের চেয়ে লাভে বিক্রি করে তাহলে সেটিকে বলে মুরাবাহা (مُرَابَحَة)। আর যদি ক্রয়মূল্যের চেয়ে লোকসানে বিক্রি করে তাহলে সেটি হল ওয়াদী'আহ (وَضِيْعَةٌ)। বিস্তারিত আলোচনা সংশ্লিষ্ট শিরোনামে দ্রষ্টব্য।

টিকাঃ
১১৫. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা ২৩৯; আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১০৯; আস-সাভী আলাশ শারহিস সাগীর, খ. ২, পৃ. ৭৭, প্রকাশ: হালব

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 পণ্য ও মূল্যের মাঝে যৌথ বিধানাবলি

📄 পণ্য ও মূল্যের মাঝে যৌথ বিধানাবলি


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00