📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দাম নির্ধারণের বিধান

📄 দাম নির্ধারণের বিধান


ফকীহসমাজ দর নির্ধারণের আলোচনায় মতানৈক্য করেছেন। হানাফী ও মালেকী ফকীহগণ বলেন, শাসক এটি করতে পারেন। ব্যবসায়ীগণ যখন সীমাতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি করে আর মূল্য নির্ধারণ করা ছাড়া সাধারণ মুসলিমের অধিকার সংরক্ষণ সম্ভব হয় না, তখন বিচারক বিবেকবান ও বিচক্ষণ ব্যক্তিগণের পরামর্শে মূল্য নির্ধারণ করে দেবেন। এ সম্পর্কে দলিল হলো উমর রা.-এর একটি আমল। তিনি বাজারে একজন লাকড়ি সংগ্রাহকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাকে তিনি বললেন, হয়তো তুমি দাম বাড়াবে নয়তো বাড়িতে চলে যাবে। সেখানে ইচ্ছামত বিক্রয় করবে।
শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহগণ মনে করেন, দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হারাম। এভাবে ক্রয় করা মাকরূহ। মূলত বিক্রি হারাম ও বাতিল হওয়ার মাসআলা আসে যখন তা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে করা হয়। আর তা নিম্নোক্ত হাদীসের আলোকে :
إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمُسَعِّرُ الْقَابِضُ الْبَاسِطُ الرَّازِقُ ، وَإِنِّي لأَرْجُو أَنْ أَلْقَى اللَّهَ وَلَيْسَ أَحَدٌ مِنْكُمْ يُطَالِبُنِي بِمَظْلِمَةٍ فِي دَمٍ وَلَا مَالٍ
"আল্লাহই দাম নির্ধারণকারী। তিনিই সংকোচনকারী, প্রসারকারী ও রিজিকদাতা। আমি আশা করছি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করব এমনভাবে যে, তোমাদের কেউ আমার বিরুদ্ধে কোনো রক্তের বা মালের জুলুমের অভিযোগ করবে না।” বিস্তারিত শিরোনাম تسعير দ্রষ্টব্য।

টিকাঃ
১০৫. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১৫৪
১০৬. ইমাম মালিক, আল-মুয়াত্তা, বরাত জামিউল উসুল, খ. ১, পৃ. ৫৯৪; শায়খ আব্দুল কাদির বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ
১০৭. আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ১৬৪ কায়রো; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ৩১৪; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৫৯; ইবনে আবদিল বার কৃত আল-কাফী, খ. ২, পৃ. ৭৩০
১০৮. ইমাম তিরমিযী, ইমাম আবু দাউদ, বরাত জামেউল উসূল, খ. ১, পৃ. ৫৯৫; ইমাম তিরমিযী ও ইবনে হিব্বান হাদীসটিকে সহীহ বলে অভিহিত করেছেন।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দ্বিতীয় : কোন্ জিনিস মূল্য হওয়ার যোগ্য আর কোনটি নয়

📄 দ্বিতীয় : কোন্ জিনিস মূল্য হওয়ার যোগ্য আর কোনটি নয়


যে জিনিস পণ্য হওয়ার উপযুক্ত তা মূল্য হওয়ারও উপযুক্ত। ঠিক এর বিপরীত কথাটিও যথার্থ। এটি অধিকাংশ ফকীহ-এর উক্তি হতে অনুমেয়। তবে হানাফী ফকীহদের মতে, যে জিনিস মূল্য হওয়ার উপযুক্ত অনেক ক্ষেত্রে তা পণ্য হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।
মূল্য এমন জিনিস হতে পারে যা দায় হিসেবে সাব্যস্ত হয়। যেমন মুদ্রা অথবা সদৃশ বস্তু, তা মাপযোগ্য হোক আর গণনাযোগ্য হোক। অথবা মূল্যমান বস্তুও হতে পারে। যেমনটি বায় সালাম চুক্তিতে প্রদান করা হয়, যদি তাতে পুঁজিও কীমী জাতীয় কোনো বস্তু হয়। এবং যেমনটা হয় বায়'উল মুকায়াযাহ (بيع الْمُقَائِضَة) (বস্তুর বিপরীতে বস্তু) বেচাকেনায়। সোনারুপা স্বভাবজাত মূল্য। তা মুদ্রা হিসাবে ছাপাঙ্কিত হোক বা না হোক। এমনিভাবে অন্য ধাতব মুদ্রাও মূল্য হতে পারে।
হানাফী ও মালেকী মাযহাবের উলামায়ে কেরামের মতে, মূল্য হিসেবে বিশেষ মুদ্রাকে নির্দিষ্ট করলেও তা নির্দিষ্ট বলে গণ্য হয় না। (তবে এ বিধান হতে বায় সরফ ও ভাড়া নেওয়ার বিষয়কে মালেকী মাযহাবের ফকীহগণ পৃথক বলে গণ্য করেন।) ফলে কোনো ক্রেতা যদি বলে, আমি পণ্যটি এ দীনারের বিনিময়ে ক্রয় করেছি। অতঃপর তা ইশারা দিয়ে দেখিয়ে দেয়; তবুও তার এখতিয়ার থাকবে এর বদলে অন্য দীনার প্রদান করার। কারণ মুদ্রা হলো সাদৃশ্যময় জিনিস, যা দায় হিসেবে সাব্যস্ত হয়। যে জিনিস দায় হিসেবে সাব্যস্ত হয় তা যে কোনো সাদৃশ্যপূর্ণ বস্তু দ্বারাই পূরণ হয়ে যায়। নির্দিষ্ট করা হলেও তা নির্দিষ্ট হওয়া আবশ্যক নয়।
শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহদের মতে, নির্দিষ্ট করা হলে মুদ্রা নির্দিষ্ট হয়। মূল্য হিসাবে যদি কোনো কীমী জাতীয় জিনিস নির্ধারণ করা হয় তাহলে তা নির্ধারিত হয়ে যায়। কেননা কীমী বস্তু দায়িত্বে আবশ্যক হয় না। আর কোনো কীমী বস্তু আরেকটি কীমী বস্তুর স্থলবর্তী হতে পারে না। তবে যদি উভয়ের সম্মতিতে হয় তাহলে তা হতে পারে।

টিকাঃ
১০৯. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ১৬৫; আতাসী কৃত শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ১৫২ ও ২১১; খ. ২, পৃ. ১০৫ এবং মুহাসেবী কৃত খ. ১, পৃ. ১৯৩; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়‍্যা, খ. ৩, পৃ. ১২২; আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ৮৬; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৪২; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ১, পৃ. ৩০৫ এবং খ. ২, পৃ. ৫
১১০. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ২৭২; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়‍্যা, খ. ২, পৃ. ২৪৩; কারাফীকৃত আল-ফুরূক, খ. ৩, পৃ. ২৫৫; আল-মাজমু, খ. ৯, পৃ. ২৬৯; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২০৫

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 তৃতীয় : মূল্য নির্ধারণ ও পণ্য হতে তাকে পৃথককরণ

📄 তৃতীয় : মূল্য নির্ধারণ ও পণ্য হতে তাকে পৃথককরণ


পণ্য হতে মূল্যকে পৃথককরণের ব্যাপারে হানাফী আলেমগণ নিম্নোক্ত কায়দা নির্ধারণ করেছেন। মালেকী ও শাফেয়ী উলামায়ে কেরামের বক্তব্যও এর সাথে একীভূত।

ক. বিনিময়কৃত দু'টি জিনিসের একটি যদি মুদ্রা হয়, তাহলে সেটি মূল্য হিসেবে ধর্তব্য হয়। আর অপরটি যে কোনো ধরনের বস্তু হোক তা হবে পণ্য। এতে শব্দ প্রয়োগের প্রতি লক্ষ করা হবে না। ফলে কেউ যদি বলে : بعتك دينارًا بهذه السّلْعة 'আমি তোমার কাছে একটি দীনার এ পণ্যের বদলে বিক্রি করলাম।' তাহলেও দীনারটি মূল্য হিসেবে পরিগণিত হবে। যদিও ب হরফটি মূল্যের পূর্বে আসে, সে হিসাবে এখানে পণ্য শব্দটি মূল্য হওয়া বোঝায়।

খ. বিনিময়কৃত দু'টি জিনিসের একটি যদি কীমী বস্তু হয় (যা সদৃশ হয় না), আর অপরটি হয় ইঙ্গিত দ্বারা নির্দিষ্ট সদৃশ মাল, তাহলে কীমী জিনিসটি হবে পণ্য আর সদৃশ মালটি হবে মূল্য। এক্ষেত্রে শব্দ প্রয়োগের প্রতি মোটে লক্ষ্য করা হবে না। কিন্তু সদৃশ মাল যদি নির্দিষ্ট না হয়, তাহলে মূল্য হিসেবে বিবেচিত হবে যে জিনিসের সাথে 'দ্বারা' শব্দটি প্রয়োগ করা হবে। আরবীতে বলা হলে যে শব্দের সাথে (ب) অব্যয়টি যুক্ত হবে। যেমন বলল: بعتك هذه السلعة برطل من الأرز "আমি এ পণ্যটি তোমার কাছে এক রিতল চাউলের বিনিময়ে বিক্রয় করলাম"। এক রিতল চাউল হলো মূল্য, যেহেতু তার পূর্বে (ب) আনা হয়েছে। কিন্তু যদি সে বলে : بعتك رطلاً من الأرز بهذه السّلْمة 'আমি এ পণ্যের বদলে তোমার নিকট এক রিতল চাউল বিক্রি করলাম।' এতে পণ্যটি হবে মূল্য আর এটি বায় সালামে হয়ে থাকে। যেহেতু তাতে নগদ মূল্যে দায়িত্বে থাকা পণ্য বিক্রয় করা হয়।

গ. বিনিময়ের দু'টি জিনিসের উভয়টিই যদি সদৃশ মাল হয়, তাহলে মূল্য হিসেবে ঐ জিনিস বিবেচ্য হবে যার সাথে দ্বারা বা বিনিময়ে (ب) অব্যয়টি সংযুক্ত থাকবে। যেমন বলল: بعكَ أَرْزًا بقمْح 'গমের বিনিময়ে আমি তোমার কাছে চাউল বিক্রি করলাম।' এখানে গম মূল্য হিসেবে বিবেচ্য হবে।

ঘ. বিনিময়ের দু'টি জিনিসই যদি কীমী জিনিস হয়, তাহলে উভয়টি এক দিক দিয়ে পণ্য; আর অন্য বিবেচনায় মূল্য হিসেবে পরিগণিত হয়। এটি হানাফী মাযহাবের অভিমত। তবে শাফেয়ী ও হাম্বলীদের মতে যার সাথে দ্বারা (ب) শব্দটি যুক্ত হবে তা হবে দাম বা মূল্য। মালেকী ফকীহগণ বলেন: মুদ্রা পণ্য হওয়াতে কোনো বাধা নেই। এর কারণ, প্রতিটি মুদ্রা অপরটির বিনিময় হতে পারে। আল বাহজা কিতাবে আছে, প্রতিটি বিনিময় অপরটির মূল্য।
মূল্য সংক্রান্ত উল্লিখিত বিধান ছাড়াও যে বিধানগুলো রয়েছে:
ক. কে আগে হস্তান্তর করবে তা নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতা যদি বাদানুবাদে লিপ্ত হয় তাহলে ওয়াজিব হয় আগে মূল্য হস্তান্তর করা; অতঃপর পণ্য হস্তান্তর করা।
খ. ক্রেতার দায়িত্ব হলো মূল্য প্রদানের ব্যয়ভার গ্রহণ করা, আর বিক্রেতার কর্তব্য হলো পণ্য হস্তান্তরের ব্যয়ভার গ্রহণ করা।
গ. কব্জা করার পর লেনদেন জায়েয হওয়ার যে শর্ত রয়েছে তা পণ্যের সাথে নির্দিষ্ট, মূল্যের সাথে নয়। বিস্তারিত জানতে দ্র: بَيْعُ بَيْعٌ مَنْهِيُّ عَنْهُ الْمَبِيعِ قَبْلَ قَبْضِهِ
ঘ. বায় সালামে মূল্য বিলম্বে দেওয়া জায়েয নয়। এর বিপরীতে পণ্য বিলম্বে আদায় করা হচ্ছে সালাম বিক্রির স্বাভাবিক চাহিদা। এটি মোটামুটি কথা। বিস্তারিত ثَمَن শিরোনাম দ্র.।

টিকাঃ
১১১. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ১৯৫, বুলাক এবং খ. ৫, পৃ. ২৭২, প্রকাশক: হালাবী; আল-ফাতাওয়া আল হিনদিয়‍্যা, খ. ৩, পৃ. ১৩-১৫; আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭০; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২০৫
১১২. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ২২ ও ২৪৩; মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ৬০১; আল-বাহজা, খ. ২, পৃ. ৮৬; আল-মাজমূ, খ. ৯, পৃ. ২৬৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭০; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২০৫
১১৩. আস-সাভী আলাশ শারহিস সাগীর, খ. ২, পৃ. ৭১, প্রকাশক: হালাবী; আল-মাজমু, খ. ৯, পৃ. ২৭৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭০ ও ৭৩-৭৪; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১২৬, ২১৮ ও ২২০; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৯১

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 চতুর্থ : মূল্যে অস্পষ্টতা

📄 চতুর্থ : মূল্যে অস্পষ্টতা


যদি কেউ মূল্য বর্ণনায় সাধারণভাবে মুদ্রার কথা উল্লেখ করলেও তার ধরন বর্ণনা না করে, যেমন পণ্য বিক্রয়ে কেবল দীনারের কথা উল্লেখ করল। অথচ সে দেশে বিভিন্ন ধরনের দীনার প্রচলিত রয়েছে, আর প্রচলনও সমান্তরালে চলছে। তাহলে মূল্যের পরিমাণ সম্পর্কে অজ্ঞতার ফলে চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে। তবে হ্যাঁ, ঐ দেশে যদি নির্দিষ্ট কোনো দীনার ব্যাপক হারে প্রচলিত থাকে, তাহলে চুক্তি বৈধ হবে। আর চুক্তিটি অধিকতর প্রচলিত দীনারের ওপর বর্তাবে। যেমন কেউ কুয়েতে বলল, আমি তোমার কাছে এক দীনারে তা বিক্রয় করলাম, তাহলে চুক্তি বৈধ হবে আর মূল্য কুয়েতী দীনার হিসেবে সাব্যস্ত হবে। কারণ কুয়েতে সেদেশের দীনারই সর্বাধিক প্রচলিত।

টিকাঃ
১১৪. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়‍্যা, ধারা: ২৪১ ও ২৪৪; ইবনে আবদিল বার কৃত আল- কাফী, খ.২, পৃ. ৭২৬; আল-বাহজা, খ. ২, পৃ. ১১; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ১৬২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭; আল ইফসাহ, খ. ১, পৃ. ৩২৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00