📄 মূল্য, মূল্যের বিধানাবলি ও অবস্থাসমূহ
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 প্রথম : মূল্যের সংজ্ঞা
ক্রেতা পণ্য লাভের নিমিত্তে পণ্যের বদলে যা ব্যয় করে তাকে আরবীতে الثَّمَنُ (ছামান) বলে। বিক্রয়চুক্তির দু'অংশের এক অংশ হলো ছামান বা মূল্য। অপর অংশ হলো পণ্য। এ দু'টিই হলো বিক্রয় চুক্তির উপাদান। এ কারণে ফকীহসমাজের অধিকাংশ মনে করেন, পণ্য হস্তগত করার পূর্বে নির্ধারিত মূল্য নাশ হয়ে গেলে বিক্রি চুক্তি সাধারণভাবে ভেঙ্গে যায়।
হানাফী ফকীহগণ মনে করেন, বেচাকেনায় ও ব্যবসায়ে মুখ্য উদ্দেশ্য হলো পণ্য। কারণ (পণ্য হচ্ছে বিভিন্ন বস্তু, আর) উপকার লাভ হয় বিভিন্ন বস্তু দিয়ে। আর মূল্য হলো সেক্ষেত্রে পরস্পর বদলের মাধ্যম। এ কারণে তারা মূল্য সহীহ হওয়ার জন্য তা মূল্যমানের অধিকারী হওয়াকে শর্ত করেন। পণ্যের বেলায় তা চুক্তি কার্যকরের শর্ত। এটি অন্য সকল ফকীহের সাথে তাদের অন্যতম পার্থক্য। মূল্য যদি মূল্যমানধারী জিনিস না হয় তাহলে তাদের মতে বিক্রি বাতিল হবে না; বরং তা ফাসিদ হবে। ফাসিদ হওয়ার কারণ দূর হয়ে গেলে তা সহীহ হয়ে যাবে। যেমন মূল্য হস্তগত করার পূর্বে তা নষ্ট হয়ে গেলে এর দরুন বায় বাতিল হয় না। বরং বিক্রেতা বিকল্প মূল্যের অধিকারী হয়। পক্ষান্তরে পণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়া বিক্রি বাতিল করে দেয়।
বেচাকেনার ক্ষেত্রে বিনিময় ও মূল্য বোঝাতে দুটি শব্দের প্রয়োগ পাওয়া যায় : ছামান (الثَّمَنُ ) আর কীমাত (القيمة ) এ দু'টি শব্দের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। কীমাত হলো, পারদর্শীগণ পণ্যের মান নির্ণয় করে যে বিনিময় মূল্য নির্ধারণ করে। পক্ষান্তরে ছামান হলো, চুক্তি সম্পাদনকারী উভয় পক্ষ পরস্পর সম্মতিতে যে মূল্য নির্ধারণ করে। তা কীমাত এর চেয়ে বেশি হতে পারে, অথবা কম কিংবা সমান হতে পারে। ফলে কীমাত হলো বস্তুর প্রকৃত মূল্য আর ছামান হলো যে মূল্যে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
পণ্যের নির্ধারিত মূল্যকে সি'র বলা হয়। তাস'ঈর (التسعير) হচ্ছে পণ্য বিক্রির দর নির্ধারণ। মূল্য নির্ধারণ কোনো সময় শাসকের পক্ষ হতে হয়। এর চেয়ে বেশি মূল্যে বা কম মূল্যে বিক্রয় নিষিদ্ধ করার অধিকার রাখেন।
টিকাঃ
১০১. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ১, পৃ. ৩০৫; মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ১০০ এবং খ. ৩, পৃ. ৬১৬; শারহুর রাওয, খ. ২, পৃ. ৬৪; আল মাজমু, খ. ৯, পৃ. ২৬৯; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ৩; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৮৯; আল-ইফসাহ, খ. ১, পৃ. ৩৩৭
১০২. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১৫১
১০৩. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ২১২, হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ১০৪
১০৪. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা : ১৫৩; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫১ ও ১৬৬; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ২১
📄 দাম নির্ধারণের বিধান
ফকীহসমাজ দর নির্ধারণের আলোচনায় মতানৈক্য করেছেন। হানাফী ও মালেকী ফকীহগণ বলেন, শাসক এটি করতে পারেন। ব্যবসায়ীগণ যখন সীমাতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি করে আর মূল্য নির্ধারণ করা ছাড়া সাধারণ মুসলিমের অধিকার সংরক্ষণ সম্ভব হয় না, তখন বিচারক বিবেকবান ও বিচক্ষণ ব্যক্তিগণের পরামর্শে মূল্য নির্ধারণ করে দেবেন। এ সম্পর্কে দলিল হলো উমর রা.-এর একটি আমল। তিনি বাজারে একজন লাকড়ি সংগ্রাহকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাকে তিনি বললেন, হয়তো তুমি দাম বাড়াবে নয়তো বাড়িতে চলে যাবে। সেখানে ইচ্ছামত বিক্রয় করবে।
শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহগণ মনে করেন, দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হারাম। এভাবে ক্রয় করা মাকরূহ। মূলত বিক্রি হারাম ও বাতিল হওয়ার মাসআলা আসে যখন তা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে করা হয়। আর তা নিম্নোক্ত হাদীসের আলোকে :
إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمُسَعِّرُ الْقَابِضُ الْبَاسِطُ الرَّازِقُ ، وَإِنِّي لأَرْجُو أَنْ أَلْقَى اللَّهَ وَلَيْسَ أَحَدٌ مِنْكُمْ يُطَالِبُنِي بِمَظْلِمَةٍ فِي دَمٍ وَلَا مَالٍ
"আল্লাহই দাম নির্ধারণকারী। তিনিই সংকোচনকারী, প্রসারকারী ও রিজিকদাতা। আমি আশা করছি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করব এমনভাবে যে, তোমাদের কেউ আমার বিরুদ্ধে কোনো রক্তের বা মালের জুলুমের অভিযোগ করবে না।” বিস্তারিত শিরোনাম تسعير দ্রষ্টব্য।
টিকাঃ
১০৫. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১৫৪
১০৬. ইমাম মালিক, আল-মুয়াত্তা, বরাত জামিউল উসুল, খ. ১, পৃ. ৫৯৪; শায়খ আব্দুল কাদির বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ
১০৭. আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ১৬৪ কায়রো; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ৩১৪; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৫৯; ইবনে আবদিল বার কৃত আল-কাফী, খ. ২, পৃ. ৭৩০
১০৮. ইমাম তিরমিযী, ইমাম আবু দাউদ, বরাত জামেউল উসূল, খ. ১, পৃ. ৫৯৫; ইমাম তিরমিযী ও ইবনে হিব্বান হাদীসটিকে সহীহ বলে অভিহিত করেছেন।
📄 দ্বিতীয় : কোন্ জিনিস মূল্য হওয়ার যোগ্য আর কোনটি নয়
যে জিনিস পণ্য হওয়ার উপযুক্ত তা মূল্য হওয়ারও উপযুক্ত। ঠিক এর বিপরীত কথাটিও যথার্থ। এটি অধিকাংশ ফকীহ-এর উক্তি হতে অনুমেয়। তবে হানাফী ফকীহদের মতে, যে জিনিস মূল্য হওয়ার উপযুক্ত অনেক ক্ষেত্রে তা পণ্য হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।
মূল্য এমন জিনিস হতে পারে যা দায় হিসেবে সাব্যস্ত হয়। যেমন মুদ্রা অথবা সদৃশ বস্তু, তা মাপযোগ্য হোক আর গণনাযোগ্য হোক। অথবা মূল্যমান বস্তুও হতে পারে। যেমনটি বায় সালাম চুক্তিতে প্রদান করা হয়, যদি তাতে পুঁজিও কীমী জাতীয় কোনো বস্তু হয়। এবং যেমনটা হয় বায়'উল মুকায়াযাহ (بيع الْمُقَائِضَة) (বস্তুর বিপরীতে বস্তু) বেচাকেনায়। সোনারুপা স্বভাবজাত মূল্য। তা মুদ্রা হিসাবে ছাপাঙ্কিত হোক বা না হোক। এমনিভাবে অন্য ধাতব মুদ্রাও মূল্য হতে পারে।
হানাফী ও মালেকী মাযহাবের উলামায়ে কেরামের মতে, মূল্য হিসেবে বিশেষ মুদ্রাকে নির্দিষ্ট করলেও তা নির্দিষ্ট বলে গণ্য হয় না। (তবে এ বিধান হতে বায় সরফ ও ভাড়া নেওয়ার বিষয়কে মালেকী মাযহাবের ফকীহগণ পৃথক বলে গণ্য করেন।) ফলে কোনো ক্রেতা যদি বলে, আমি পণ্যটি এ দীনারের বিনিময়ে ক্রয় করেছি। অতঃপর তা ইশারা দিয়ে দেখিয়ে দেয়; তবুও তার এখতিয়ার থাকবে এর বদলে অন্য দীনার প্রদান করার। কারণ মুদ্রা হলো সাদৃশ্যময় জিনিস, যা দায় হিসেবে সাব্যস্ত হয়। যে জিনিস দায় হিসেবে সাব্যস্ত হয় তা যে কোনো সাদৃশ্যপূর্ণ বস্তু দ্বারাই পূরণ হয়ে যায়। নির্দিষ্ট করা হলেও তা নির্দিষ্ট হওয়া আবশ্যক নয়।
শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহদের মতে, নির্দিষ্ট করা হলে মুদ্রা নির্দিষ্ট হয়। মূল্য হিসাবে যদি কোনো কীমী জাতীয় জিনিস নির্ধারণ করা হয় তাহলে তা নির্ধারিত হয়ে যায়। কেননা কীমী বস্তু দায়িত্বে আবশ্যক হয় না। আর কোনো কীমী বস্তু আরেকটি কীমী বস্তুর স্থলবর্তী হতে পারে না। তবে যদি উভয়ের সম্মতিতে হয় তাহলে তা হতে পারে।
টিকাঃ
১০৯. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ১৬৫; আতাসী কৃত শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ১৫২ ও ২১১; খ. ২, পৃ. ১০৫ এবং মুহাসেবী কৃত খ. ১, পৃ. ১৯৩; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ১২২; আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ৮৬; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৪২; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ১, পৃ. ৩০৫ এবং খ. ২, পৃ. ৫
১১০. হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ২৭২; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, খ. ২, পৃ. ২৪৩; কারাফীকৃত আল-ফুরূক, খ. ৩, পৃ. ২৫৫; আল-মাজমু, খ. ৯, পৃ. ২৬৯; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২০৫