📄 চতুর্থত : পণ্যের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি
ক. পণ্যের উপস্থিতি:
একথা স্বীকৃত যে, পণ্য নির্দিষ্টকরণ ও নির্ধারণের সবচেয়ে শক্তিশালী পদ্ধতি হচ্ছে ইশায়া বা ইঙ্গিত করা। এ কারণে পণ্য যখন চুক্তি সম্পাদনকারী দুপক্ষের সম্মুখে উপস্থিত থাকে এবং ইঙ্গিতের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করণ পূর্ণ হয় আর ক্রেতা পণ্যটি দেখে ও চিনে, তখন ক্রয়বিক্রয় আবশ্যক হয়ে যায়। যদি তা ক্রেতার খিয়ারের সকল কারণ হতে মুক্ত হয়, দেখার কারণ ব্যতীত।
পণ্যের গুণ বর্ণনা কালেই যদি এর প্রতি ইঙ্গিত করাও যুক্ত হয়, পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, ক্রেতা যা দেখেছিল এবং তাতে তার সম্মতি প্রকাশ করেছিল, পণ্যটির গুণাগুণ এর বিপরীত। এমন হলে যতক্ষণ চুক্তি বলবৎ থাকবে ততক্ষণ, দেখার ও সম্মত হওয়ার পর চুক্তি পূর্ণ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে, শুধু গুণের দাবি করা যাবে না। এ বিষয়টি নিম্নোক্ত ফিকহী কায়দা (সূত্র) হতে প্রতিভাত হয়:
الْوَصْفُ فِي الْحَاضِرِ لَغْوٌ ، وَفِي الْغَائِبِ مُعْتَبَرُ “উপস্থিত পণ্যে গুণ বর্ণনা অনর্থক আর অনুপস্থিত পণ্যে তা ধর্তব্য।”
পণ্যের নাম ও ইঙ্গিতকৃত জিনিসের মাঝে যদি ভিন্নতা পাওয়া যায়, তাহলে উপরিউক্ত বক্তব্য কার্যকর হবে না। যেমন: এ ঘোড়াটি বিক্রি করছি বলে যদি কোনো উটনীর দিকে ইঙ্গিত করা হয়। এক্ষেত্রে নাম উচ্চারণই হবে ধর্তব্য। কারণ, নাম পণ্যের জাতিকে সীমিত করে। এখানে জাতি উচ্চারণে ভুল হয়েছে, গুণে নয়। নিয়ম হচ্ছে, জাতিতে ভুল করা অমার্জনীয়। কারণ এর দ্বারা পণ্য অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। (তাই, এ ভুলের দরুন বিক্রি বাতিল হয়ে যাবে।)
কারাফী স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেন, বিক্রয়ে যদি শ্রেণী উল্লেখ করা না হয়, তাহলে সকলের মতে তা নিষিদ্ধ। যেমন : বিক্রেতা শুধু বলল, আমি তোমার কাছে একটি কাপড় বিক্রি করলাম।
উপরিউক্ত বিশ্লেষণ কার্যকর হয়, পণ্যের গুণ বর্ণনা আবশ্যক হয় না, যখন ক্রেতা পণ্যের গুণ উপলব্ধি করতে পারে। যদি পণ্যের গুণ গোপন থাকে অথবা গুণাগুণ পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয়। যেমন গাভীর গুণ হিসাবে বলা হলো, এটি দুধাল; পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হলো, তা দুধাল নয়। গুণের অনস্তিত্ব অবশ্যই মূল্যে প্রভাব সৃষ্টি করবে, যদি চুক্তিকালে তার শর্তারোপ করা হয়। এ ক্ষেত্রে পণ্য উপস্থিত ও ইঙ্গিতকৃত হলেও বিধান এরূপই হবে। কারণ, বিক্রেতার পক্ষ হতে গুণ ও বৈশিষ্ট্য বলা এখানে ধর্তব্য। গুণ যদি অনুপস্থিত হয় তাহলে ক্রেতার এখতিয়ার থাকবে। একে গুণ অনুপস্থিতির অধিকার বলে। গুণের অনুপস্থিতির দরুন খিয়ারের উপযুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে পণ্যের উপস্থিত থাকা আর না থাকা উভয়ই সমান। বিস্তারিত শিরোনাম : خيَارِ الْوَصف
খ. পণ্যের অনুপস্থিতি
পণ্য যখন অনুপস্থিত থাকে তখন তা সুস্পষ্টভাবে গুণ বর্ণনার দ্বারা ক্রয় করা হয়। যেমনটি বায় সালামে করা হয়। অথবা ক্রয় করা হয় গুণ বর্ণনা ছাড়াই, বরং পণ্যের স্থানের দিকে ইঙ্গিত করে কিংবা এমন সম্পর্ক করে যার ফলে পণ্য অন্য বস্তু হতে পৃথক হয়ে যায়।
গুণ বর্ণনার মাধ্যমে যদি বিক্রি সম্পন্ন হয়, অতঃপর পণ্যটি যদি দেখার পর বিবরণের সাথে মিলে যায়, তাহলে ক্রয় আবশ্যক হয়ে যাবে। অন্যথায় ক্রেতার জন্য অধিকাংশ ফকীহের মতে কথা ভঙ্গের এখতিয়ার থাকবে। যাকে ফিকহী পরিভাষায় খিয়ারুল খুলফ (خيارُ الْخُلْف) বলে। হানাফীগণের মতে ক্রেতার এক্ষেত্রে (خيار السووية) খিয়ারুর রুইয়ত বা দেখার অধিকার থাকবে। অর্থাৎ দেখার পর পণ্য গ্রহণ বা বর্জনের এখতিয়ার থাকবে। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য خِيَارُ الْوَصْف ، خِيَارُ الرُّؤْيَةِ শিরোনাম।
পণ্যের নমুনা বা মডেলের ভিত্তিতে যদি ক্রয় পূর্ণ হয়ে যায় আর পণ্যটি মডেলের বিপরীত না হয়, তাহলে ক্রেতার দেখার অধিকার থাকবে না। গুণ বর্ণনার মাধ্যমে অনুপস্থিত পণ্যের বিক্রয় বৈধ বলে হানাফী, মালেকী ও হাম্বলী ফকীহ গণ অভিমত প্রদান করেন। শাফেয়ী মাযহাবের যাহিরী রিওয়ায়াতের বিপরীত মতও তাই। হানাফীগণের মতে পূর্বে গুণ বর্ণনা না করলেও তা জায়েয। শাফেয়ীগণের এক উক্তিমতে গুণ বর্ণনা আবশ্যক। কারণ সর্বাবস্থায় ক্রেতার দেখার অধিকার রয়েছে- গুণের সাথে মিল হোক আর বিপরীত হোক এবং গুণের বিবরণ দেওয়া না হলেও ক্রেতার জন্যে এটি শরীয়তের পক্ষ থেকে অধিকার, এ ব্যাপারে শর্তারোপের প্রয়োজন হয় না। হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ অনুপস্থিত দ্রব্যের বিক্রয় জায়েয মনে করেন এর গুণ বিবরণের মাধ্যমে, যেভাবে বায় সালাম বৈধ হয়। তবে তাদের মতে বাস্তবতার সাথে যদি মিল না হয় তবে তখনই কেবল দেখার অধিকার থাকবে।
মালেকী মাযহাবের ফকীহদের মতে তিনটি শর্তে অনুপস্থিত দ্রব্যের বিক্রয় জায়েয। সেগুলো হলো:
ক. পণ্য এমন নিকটবর্তী স্থানে হবে না যে, বিনাশ্রমে তা দেখা সম্ভব। এ অবস্থায় পণ্যের অনুপস্থিতিতে বিক্রয় বাস্তবতার বিপরীত। ফলে ক্ষতির আশংকা থাকায় তা নাজায়েয।
খ. পণ্য এমন দূরে হবে না যে, হস্তান্তরের পূর্বে তা বদলে ফেলা যায় অথবা হস্তান্তর করা অসম্ভবের পর্যায়ে হয়।
গ. বিক্রেতা বর্ণনা করবে সে সকল গুণাবলি যা এ পণ্যের উদ্দেশ্যের সাথে সম্পৃক্ত, বায় সালামের মাঝে যেভাবে বর্ণনা করা হয়।
শাফেয়ী মাযহাবের অধিক গ্রহণযোগ্য অভিমত হলো, অনুপস্থিত দ্রব্যের বিক্রয় জায়েয নয়। উল্লেখ্য যে, অনুপস্থিত পণ্য বলতে বোঝায়, জিনিসটি ক্রেতা ও বিক্রেতা অথবা তাদের কোনো একজন দেখেনি, যদিও তা হয়তো উপস্থিতই আছে। তারা নাজায়েয বলার কারণ, ধোঁকার বিক্রয় হতে রাসূলুল্লাহ স. নিষেধ করেছেন।
ক্যাটালগ (এমন রেজিস্টার, যেখানে পণ্যের গুণাবলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে) ধরে বিক্রি করা অথবা নমুনা দেখিয়ে বিক্রি করা, যেমন এক সা' দেখিয়ে এক স্তুপ বিক্রি করা এ শর্তে যে, এ স্তূপ ঐ দেখানো সা'-এর অনুরূপ হবে, তাহলে হানাফী ফকীহদের মতে এ বিক্রি বৈধ। এটি হাম্বলী ফকীহদের একটি মত, পূর্বে বর্ণিত কারণ সামনে রেখে যেটিকে সঠিক বলে মাওয়ারদী বলেছেন। এটিই মালেকী ফকীহদের মত। তবে হাম্বলী ফকীহদের বিশুদ্ধতম বর্ণনামতে এমন বিক্রি বৈধ নয়। শাফেয়ী ফকীহদের মতে এমন বিক্রি বৈধ ঐ ক্ষেত্রে, যখন বিক্রেতা বলে, এ ঘরে যে গম আছে আমি তোমার কাছে তা বিক্রি করলাম, আর এই দেখো এগুলো হল ঐ গমের নমুনা, তাহলে বিক্রি সহীহ হবে এবং নমুনা গমও বিক্রির অধীন হবে।
মালেকী মাযহাধমতে এ বিষয়ের মাসআলায় বিশদ বিষয়ণ রয়েছে, যদি প্রকাশিত হয় যে, নমুনা পাত্রের মাপের চেয়ে মূল পণ্যে কমবেশ রয়েছে। এ জন্য ظُهُورُ الْمَبِيعِ زَائِدًا أَوْ نَاقِصًا 'পণ্য কম যা বেশি প্রকাশিত হওয়া।'
টিকাঃ
৮৯. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা : ২০৮; মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ৬৭৮; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৪৯; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৪৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৭১; খাবায়ায যাভায়া, পৃ. ২১০; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ৩৯৬ ও ৪০১; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৯৪
৯০. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ১৩৬
৯১. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা ৩২৩-৩৩৫
৯২. হানাফীদের পূর্ববর্তী গ্রন্থাদি
৯৩. আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৫৮০-৫৮৩; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৪৬
৯৪. আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ১৬৪; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৬; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ৪০১
৯৫. শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৪৬; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ১৬৩-১৬৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৯; আল-ফুরূ', খ. ৪, পৃ. ২১; আল-ইনসাফ, খ. ৪, পৃ. ২৯৫
📄 পঞ্চমত : হস্তগত করার পূর্বে কমবেশি প্রকাশিত হওয়া
পণ্যে যখন বেশি যা কম হওয়া প্রকাশিত হবে তার বিধান হবে ভিন্ন ভিন্ন, পণ্যের বিক্রয় পরিমাণনির্ভর অথবা অনুমাননির্ভর হওয়া হিসেবে। অনুমাননির্ভর হলে তাকে বায়'উল জুযাফ (بيع الْجُرَاف) বা আল-মুজাযাফাহ (الْمُجَازَفَة) বলে। এর অপর নাম বায়'উস সুব্রাহ (بیع الصبرة) বা স্তূপ বিক্রয়। ক্যাটালগ বা নমুনা হিসাবে যে বিক্রি হয় তার কতক এ অনুমাননির্ভর বিক্রির অন্তর্ভুক্ত, যেহেতু প্রোগ্রামে যা লেখা থাকে তার বিপরীতও প্রকাশিত হয়।
ক. অনুমাননির্ভর বিক্রি (بَيْعُ الْجُزَاف)
অনুমানের ভিত্তিতে বেচাকেনা হলে, তাতে ক্রেতার বা বিক্রেতার প্রত্যাশার বিপরীত কমবেশি প্রকাশিত হলে বিক্রিতে এর প্রভাব পড়বে না। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য শিরোনাম بَيْعُ الْجُزَافِ
খ. পরিমাপযোগ্য জিনিসের ক্রয়বিক্রয় (بَيْعُ الْمُقَدَّرَاتِ)
পাত্রের মাপ, ওজন, গজ কিংবা গণনার মাধ্যমে পরিমাপযোগ্য জিনিস বিক্রি করার পর তাতে বেশি অথবা কম প্রকাশিত হলে পণ্যের ধরন দেখতে হবে, পণ্যটি অংশ অংশ করে ভাগ করলে তাতে ক্ষতি সাধিত হয় কি না। অনুরূপ যে মূল্যের ওপর বিক্রয় সম্পন্ন হয়েছে তার প্রতিও তাকাতে হবে, তা সম্পূর্ণ পণ্য হিসাবে, না-কি অংশের ভিত্তিতে বিস্তৃত।
বিভিন্ন অংশে ভাগ করলে যদি পণ্যের ক্ষতি না হয়। যেমন পণ্যটি পাত্র দ্বারা পরিমাপযোগ্য বা ওজনযোগ্য কিংবা গজের হিসেবে বিক্রয়যোগ্য হলে, যেমন থান কাপড়, এসব জিনিসে পণ্যে বেশি প্রমাণিত হলে তা বিক্রেতার জন্য বিবেচিত হবে। আর কম হলে হিসাব অনুযায়ী কম হবে। যে সকল জিনিস গণনাযোগ্য এবং কাছাকাছি আকারের সেগুলোরও এ বিধান, তখন মূল্য বিস্তারিত ভাবে বলা হয়েছে কি-না তা জানা আবশ্যক হবে না।
মূল্য যদি বিস্তারিত ভাবে নির্ণীত হয়, যেমন কেউ বলল, প্রতি হাত এক দিরহাম, এরূপ ক্ষেত্রে যা বেশি হবে তা বিক্রেতার, আর কম হলেও দায় তার। সে ক্ষেত্রে অংশ অংশ করলে তা ক্ষতিকর কি-না, তা দেখার প্রয়োজন নেই।
মূল্য যদি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত না হয়, আর পণ্য হয় এরূপ যে, অংশ অংশ করলে তাতে ক্ষতি সাধিত হয়, যেমন শাড়ি, লুঙ্গি, তাহলে বাড়তি অংশ ক্রেতার আর কম হলেও দায় তারই, এতে মূল্যের কোনো হেরফের হবে না। তবে পণ্যে কম হওয়ার ক্ষেত্রে ক্রেতার অধিকার থাকবে।
এর কারণ, যে বস্তু অংশ অংশ করা হলে ক্ষতি হয় না সে বস্তুতে পরিমাণ করা হলে প্রতিটি পরিমাণ একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর যে বস্তু অংশ অংশ করলে বস্তুটির ক্ষতি হয় সেক্ষেত্রে পরিমাণ বিবেচিত হয় একটি গুণ হিসেবে। আর বস্তুর গুণের বিপরীতে কোন মূল্য সাব্যস্ত হয় না। বরং গুণগত পরিবর্তনের কারণে চুক্তি বহাল রাখা বা না রাখার খিয়ার সাব্যস্ত হয়। বিক্রিচুক্তি হতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এ সকল বিশ্লেষণ হানাফী মাযহাবের ভিত্তিতে।
সহীহ উক্তি অনুযায়ী শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহদের মতে পরিমাপযোগ্য পণ্যে যখন বেশি বা কম হওয়া প্রকাশিত হয়, তখন বিক্রি বাতিল হয়ে যায়। এটি হাম্বলী মাযহাবের একটি অভিমত। কারণ বিক্রেতাকে বেশি হস্তান্তরে বাধ্য করা সম্ভব নয়। ক্রেতাকেও কম গ্রহণে বাধ্য করা সম্ভব নয়।
মালেকী মাযহাবের এ বিষয়ে কিছুটা বিশ্লেষণ রয়েছে। তাদের মতে পণ্যের স্বল্পতা যদি সামান্য হয় তাহলে ক্রেতার জন্য আবশ্যক হবে মূল্যের হিসাব করে যেটুকু বিদ্যমান তা গ্রহণ করা। আর যদি বিরাট হারে কম হয় তাহলে মূল্যের হিসাব করে তা গ্রহণ বা বর্জনের অধিকার থাকবে। কেউ কেউ মনে করেন, এটি পণ্যের গুণসদৃশ। তাই পণ্যের পরিমাণ যদি বেশি হয় তাহলে সেটি ক্রেতার প্রাপ্য, আর যদি কম হয় তাহলে ক্রেতার অধিকার থাকবে পূর্ণ মূল্যে গ্রহণ করার বা বিক্রি প্রত্যাহার করার।
পণ্য কম বা বেশি হওয়ার বিধান সম্পর্কিত শাফেয়ী ফকীহদের বিশুদ্ধ মতের বিপরীত মত হলো, ইশারার কারণে বিক্রি সহীহ হবে। এরপর এ বিষয়ে তারা নিজ মাযহাবের মত বিশ্লেষণ করেছেন। তা এই যে, যদি বিক্রেতা গুচ্ছ পণ্যের বিপরীতে গুচ্ছ মূল্য উল্লেখ করে, যেমন সে বলল, আমি তোমার কাছে স্তূপটি বিক্রি করছি একশ দিরহামের বিনিময়ে এ শর্তে যে, এতে একশটি অমুক পণ্য রয়েছে, তাহলে কম বা বেশি হলেও বিক্রি সহীহ হবে। আর যার ক্ষতি হবে তার অধিকার থাকবে, সে চুক্তি বহাল রাখবে বা বাতিল করবে।
তবে যদি অংশের বিপরীতে অংশ উল্লেখ করে, যেমন সে বলল, আমি তোমার কাছে স্তূপটি বিক্রি করলাম প্রত্যেক সা' এক দিরহাম, এ শর্তে যে, এতে একশ সা' রয়েছে, এরপর যদি কম বা বেশি হয় তাহলেও ফকীহ আসনাভী-র মতে বিক্রি সহীহ হবে। আর মাওয়ারদী বলেন, যদি কম হয় তাহলে বিক্রি সহীহ হবে। কিন্তু যদি বেশি হয় তাহলে তাতে পূর্ববর্ণিত মতভেদ অনুসারে বিধান হবে। তা হলো, বিশুদ্ধ বর্ণনা অনুসারে বিক্রি বাতিল হবে। অথবা বিক্রি সহীহ হবে, যেমনটা বিশুদ্ধ বর্ণনার বিপরীত মত।
ইবনে কুদামা উল্লেখ করেন, যখন বিক্রেতা বলে, আমি তোমার কাছে এ জমি অথবা এ কাপড় বিক্রি করলাম এ শর্তে যে, এখানে দশ গজ রয়েছে। অতঃপর দেখা গেল এখানে এগারো গজ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দু'টি অভিমত রয়েছে:
এক. বিক্রি বাতিল। কারণ বিক্রেতাকে বাধ্য করা সম্ভব নয় বাড়তিটুকু হস্তান্তর করতে, কারণ সে তো দশ হাত বিক্রয় করেছে। ক্রেতাকেও কিছু অংশ গ্রহণ করতে বাধ্য করা যাবে না। কারণ সে গোটা জিনিসটি ক্রয় করেছে। অংশীদার থাকাতেও তার জন্য ক্ষতি রয়েছে।
দুই. চুক্তি সহীহ, বাড়তি অংশটুকু হবে বিক্রেতার। ক্রেতার এ ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতি নেই। তাই বিক্রি শুদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই।
অতঃপর বিক্রেতার এখতিয়ার থাকবে, বাড়তিসহ হস্তান্তরের অথবা দশ গজ হস্তান্তরের। যদি সে গোটা পণ্য হস্তান্তরে সম্মত হয় তাহলে ক্রেতার বর্জন করার কোনো অধিকার নেই। কারণ বেশি দেওয়া তো ভালো। যদি সে বাড়তি অংশসহ দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে ক্রেতার অধিকার থাকবে বিক্রি প্রত্যাহার করার অথবা মূল্য দিয়ে পণ্য গ্রহণ করার বাড়তিসহ। যদি বাড়তি বাদে শুধু পণ্য গ্রহণ করতে চায় তাহলে দশ হাত গ্রহণ করবে আর বিক্রেতা এক হাতে তার অংশীদার হয়ে যাবে।
এ অবস্থায় বিক্রেতার বিক্রি প্রত্যাহার করার এখতিয়ার থাকা বা না থাকার ব্যাপারে দুধরনের অভিমত পাওয়া যায়।
এক. তার প্রত্যাহারের অধিকার থাকবে। কারণ এক হাতের মধ্যে অন্যের সাথে অংশীদার হওয়ায় তার ক্ষতি হওয়ার আশংকা থাকে।
দুই. বিক্রেতার কোনো এখতিয়ার নেই। ইবনে কুদামা এ অভিমতকে শক্তিশালী বলে অভিহিত করেছেন।
পণ্য যদি দশ হাতের স্থলে নয় হাত প্রকাশিত হয়, তাহলে এক্ষেত্রে দু'টি অভিমত রয়েছে:
এক. পূর্বে বর্ণিত কায়দার ভিত্তিতে বায় বাতিল হবে।
দুই. বায় সহীহ হবে, তবে ক্রেতার এখতিয়ার থাকবে বায় প্রত্যাহার করার অথবা মূল্যের এক-নবমাংশের দ্বারা গ্রহণ করার।
যদি কেউ ক্রয় করে এ শর্তে যে, এ স্তূপে দশ কাফীয রয়েছে। অতঃপর প্রকাশিত হলো, এতে এগার কাফীয রয়েছে। তাহলে সে বাড়তিটুকু ফেরত দেবে, এ ক্ষেত্রে গ্রহণ বা বর্জনের তার কোনো অধিকার নেই। যেহেতু এ বাড়তিটুকুতে বিক্রেতার ক্ষতি সাধিত হবে। আর যদি প্রকাশিত হয়, এতে নয় কাফীয রয়েছে, তাহলে সে পরিমাণ মূল্যে সে তা গ্রহণ করবে।
যদি স্তূপের বেচাকেনায় পাত্রের মাপের কথা উল্লেখ করা হয়, তাহলে ক্রেতা কেবল পাত্রের মাপ দ্বারাই তা গ্রহণ করবে। যদি স্তূপে বাড়তি থাকে তাহলে তা ফেরত দেবে। আর যদি কম হয় তাহলে মূল্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে। কম হলে ক্রেতার গ্রহণ বা বর্জনের এখতিয়ার থাকে কি-না? এ ব্যাপারে দু'টি অভিমত রয়েছে।
এক. তার অধিকার থাকে। দুই, তার কোনো অধিকার থাকে না।
টিকাঃ
৯৬. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা ২২৩-২২৯; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৩০; আদ-দুরারু শারহুল গুরার, খ. ২, পৃ. ১৪৭; মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ৫০৫
৯৭. নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ৪০০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৬৬; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১৪৬
৯৮. মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ৫০৫; আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২৯৯; আশ-শারহুস সগীর, খ. ২, পৃ. ১৩, প্রকাশক: হালাবী
৯৯. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৮; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৭১
১০০. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১৪৬
📄 মূল্য, মূল্যের বিধানাবলি ও অবস্থাসমূহ
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 প্রথম : মূল্যের সংজ্ঞা
ক্রেতা পণ্য লাভের নিমিত্তে পণ্যের বদলে যা ব্যয় করে তাকে আরবীতে الثَّمَنُ (ছামান) বলে। বিক্রয়চুক্তির দু'অংশের এক অংশ হলো ছামান বা মূল্য। অপর অংশ হলো পণ্য। এ দু'টিই হলো বিক্রয় চুক্তির উপাদান। এ কারণে ফকীহসমাজের অধিকাংশ মনে করেন, পণ্য হস্তগত করার পূর্বে নির্ধারিত মূল্য নাশ হয়ে গেলে বিক্রি চুক্তি সাধারণভাবে ভেঙ্গে যায়।
হানাফী ফকীহগণ মনে করেন, বেচাকেনায় ও ব্যবসায়ে মুখ্য উদ্দেশ্য হলো পণ্য। কারণ (পণ্য হচ্ছে বিভিন্ন বস্তু, আর) উপকার লাভ হয় বিভিন্ন বস্তু দিয়ে। আর মূল্য হলো সেক্ষেত্রে পরস্পর বদলের মাধ্যম। এ কারণে তারা মূল্য সহীহ হওয়ার জন্য তা মূল্যমানের অধিকারী হওয়াকে শর্ত করেন। পণ্যের বেলায় তা চুক্তি কার্যকরের শর্ত। এটি অন্য সকল ফকীহের সাথে তাদের অন্যতম পার্থক্য। মূল্য যদি মূল্যমানধারী জিনিস না হয় তাহলে তাদের মতে বিক্রি বাতিল হবে না; বরং তা ফাসিদ হবে। ফাসিদ হওয়ার কারণ দূর হয়ে গেলে তা সহীহ হয়ে যাবে। যেমন মূল্য হস্তগত করার পূর্বে তা নষ্ট হয়ে গেলে এর দরুন বায় বাতিল হয় না। বরং বিক্রেতা বিকল্প মূল্যের অধিকারী হয়। পক্ষান্তরে পণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়া বিক্রি বাতিল করে দেয়।
বেচাকেনার ক্ষেত্রে বিনিময় ও মূল্য বোঝাতে দুটি শব্দের প্রয়োগ পাওয়া যায় : ছামান (الثَّمَنُ ) আর কীমাত (القيمة ) এ দু'টি শব্দের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। কীমাত হলো, পারদর্শীগণ পণ্যের মান নির্ণয় করে যে বিনিময় মূল্য নির্ধারণ করে। পক্ষান্তরে ছামান হলো, চুক্তি সম্পাদনকারী উভয় পক্ষ পরস্পর সম্মতিতে যে মূল্য নির্ধারণ করে। তা কীমাত এর চেয়ে বেশি হতে পারে, অথবা কম কিংবা সমান হতে পারে। ফলে কীমাত হলো বস্তুর প্রকৃত মূল্য আর ছামান হলো যে মূল্যে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
পণ্যের নির্ধারিত মূল্যকে সি'র বলা হয়। তাস'ঈর (التسعير) হচ্ছে পণ্য বিক্রির দর নির্ধারণ। মূল্য নির্ধারণ কোনো সময় শাসকের পক্ষ হতে হয়। এর চেয়ে বেশি মূল্যে বা কম মূল্যে বিক্রয় নিষিদ্ধ করার অধিকার রাখেন।
টিকাঃ
১০১. জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ১, পৃ. ৩০৫; মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ১০০ এবং খ. ৩, পৃ. ৬১৬; শারহুর রাওয, খ. ২, পৃ. ৬৪; আল মাজমু, খ. ৯, পৃ. ২৬৯; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ৩; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৮৯; আল-ইফসাহ, খ. ১, পৃ. ৩৩৭
১০২. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ১৫১
১০৩. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা: ২১২, হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ১০৪
১০৪. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, ধারা : ১৫৩; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৫১ ও ১৬৬; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ২১