📄 প্রথমত : পণ্য নির্ধারণ
পণ্য চেনার জন্য আবশ্যক হলো, পণ্যের জাত, ধরন ও পরিমাণ সম্পর্কে ক্রেতার অবহিত হওয়া। জাত যেমন: গম। ধরন যেমন: কোন্ শহরের উৎপাদন। পরিমাণ যেমন: মাপ ও ওজন সম্পর্কে জানা। পণ্যের পরিচিতি হতে পণ্য নির্ধারণ করা হলো অতিরিক্ত বিষয়। কারণ, জাত ও পরিমাণ জানার পর তা অন্য জিনিস হতে পৃথক হয়। হয়তো এ পার্থক্যকরণ সম্পন্ন হয় ক্রয়-বিক্রয় কালে পণ্যের প্রতি ইঙ্গিত করার মাধ্যমে ক্রেতার উপস্থিতিতে। ফলে এ সময় পণ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। পণ্য নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর বিক্রেতার জন্য ক্রেতাকে অন্য পণ্য দেওয়া জায়েয নেই। তবে হ্যাঁ, ক্রেতা সন্তুষ্ট থাকলে তার সম্মতিতে অন্য পণ্য দেওয়া যেতে পারে। ইঙ্গিত হলো কোনো জিনিস নির্ধারণের ক্ষেত্রে সর্বাধিক উন্নত পন্থা।
হয়তো ক্রয়-বিক্রয়কালে পণ্য নির্ধারণ করা হয় না, বরং পণ্যের অনুপস্থিতিতে পণ্যের গুণ উল্লেখ করা হয় অথবা উপস্থিত স্তূপের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়। এ অবস্থায় হস্তান্তর করা ছাড়া পণ্য নির্ধারিত হয় না। এটি হানাফী, মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহবৃন্দের অভিমত, যা শাফেয়ী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মতের বিপরীত। শাফেয়ী মাযহাবের প্রসিদ্ধ অভিমত হলো, অদৃশ্য জিনিসের বিক্রয় সহীহ হয় না।
অনির্দিষ্ট পণ্যের অন্তর্ভুক্ত হলো, যৌথ মালিকানাধীন জিনিসের কোনো অংশ বিক্রয় করা; তা জমি হোক আর স্থানান্তরযোগ্য পণ্য হোক। যৌথ সম্পদটা বণ্টনযোগ্য হোক আর না হোক। যৌথ মালিকানাধীন পণ্য বণ্টন এবং হস্তান্তরের মাধ্যমেই কেবল নির্ধারিত হয়।
পণ্য নির্ধারণের সাথে সংশ্লিষ্ট হলো, একটিকে বহু জিনিসের মধ্য হতে বিক্রি করার মাসআলা- এ শর্তে যে, পণ্য নির্ধারণ করা ক্রেতার ইচ্ছাধীন থাকবে। অর্থাৎ তাকে এরূপ কর্তৃত্ব দিয়ে দেওয়া যে, সে অনেকগুলো হতে যেটি তার পছন্দ হয় সেটি বেছে নেবে। এ অভিমত সেই সকল ফকীহের, যারা নির্ধারণের এখতিয়ার দেওয়াকে জায়েয মনে করেন। এ ধরনের বায় জায়েয হওয়া, তার শর্তসমূহ এবং এখতিয়ারের বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য শিরোনাম خَيَارُ التَّعْيِينِ :
টিকাঃ
৫৯. শারহুল মাজাল্লা, ধারা ২০৪; মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ৪৮৬; আশ শারহুস সাগীর, খ. ২, পৃ. ৬ প্রকাশক : হালাবী; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ১৬১; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৬৩; আল-মাজমূ শারহুল মুহাযযাব, খ. ৯, পৃ. ২৭৫
৬০. শারহুল মাজাল্লা, ধারা ২০২; আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ১২১; আল- বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ২৪; আল-কালয়ুবী, খ. ২, পৃ. ১৬৩; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৪৬
৬১. শারহুল মাজাল্লা, ধারা ২০১; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৬৩-১৬৮; আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১৪৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৬
৬২. শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ২২০; আসহালুল মাদারিক, খ. ২, পৃ. ২৮১; খাবায়ায যাওয়ায়া, মাসআলা ১৮০, পৃ. ১৯৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৬; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ১৬১; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৭০
৬৩. আল-হিদায়া, খ. ৩, পৃ. ৩০; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৩৯; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২০৫
📄 দ্বিতীয়ত : পণ্য চেনা ও নির্ধারণের উপায়
বিক্রয়স্থলে যখন পণ্য থাকবে না, ফলে দেখা বা ইঙ্গিতের মাধ্যমে পণ্যের পরিচয় সম্পন্ন হবে না, এরূপ ক্ষেত্রে পণ্যের এমন কোনো বৈশিষ্ট্য আলোচনার মাধ্যমে তার পরিচয় পূর্ণতা লাভ করবে, যার দ্বারা সে অন্য জিনিস হতে আলাদা হয়ে যাবে। তাতে পরিমাণের বিবরণও থাকবে। পণ্য ভূমি হলে তার সীমানার বিবরণও আবশ্যক, স্থান ও দিক ভেদে ভূমির মূল্য ভিন্নতর হওয়ার কারণে। পণ্য যদি পরিমাপ, ওজন, হাতের মাপ বা গণনার যোগ্য জিনিস হয়, তাহলে তার পরিমাণ জানার মাধ্যমেই তার পরিচয় উদঘাটিত হয়ে যায়।
অনুমাননির্ভর বিক্রয় জায়েয আছে। তাই কোনো স্তূপের সবটুকু মোটামুটি এক মূল্যে বিক্রয় হতে পারে। এ ধরনের বিক্রি সবার মতে জায়েয। তবে মালেকী মাযহাবে অনুমাননির্ভর বিক্রির ক্ষেত্রে কিছু শর্ত রয়েছে।
অথবা তা মূল্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিক্রি হবে। যেমন বিক্রেতা বলল: প্রতি সা' এই মূল্যের বিনিময়ে। এ ধরনের বিক্রি মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব মতে জায়েয। হানাফী মাযহাবের ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মতেও জায়েয। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা বলেন, এ পদ্ধতিতে কেবল এক কাফীয বিক্রি জায়েয, আর বাকীগুলোতে বিক্রয় বাতিল বলে সাব্যস্ত হবে। কারণ, যে স্তূপের ওপর চুক্তি হয়েছে তার মোট পরিমাণ অজ্ঞাত।
শাফেয়ীগণ বলেন: যদি স্তূপের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়, যেমন বলা হয়, স্তূপে একশ সা' রয়েছে, এটি তোমার কাছে বিক্রি করলাম। প্রতি সা' এক দিরহাম মূল্যের বিনিময়ে। যদি বাস্তবে স্তূপে একশ সা' থাকে তাহলে বিক্রি জায়েয। কারণ, মোটামুটি ও বিস্তারিত বিবরণের মাঝে মিল রয়েছে। যদি স্তূপে একশ সা' না থাকে, বেশী বা কম হয়, তাহলে বিশুদ্ধ অভিমত হলো, বিক্রি সহীহ হয় না। কারণ, মোটামুটি ও বিস্তারিত বিবরণের মাঝে সমন্বয় সম্ভব নয়। দ্বিতীয় অভিমত হলো, তা-ও সহীহ হবে।
পাত্র দিয়ে মাপযোগ্য জিনিস ওজন করে বিক্রি করা জায়েয। ঠিক এর উল্টোটিও জায়েয। এটি মোটামুটি সে সকল পণ্যে যেগুলো সুদী পণ্য নয়, যেগুলোতে বেশকম করে বিক্রি হারাম নয়, যেহেতু বেশকম করে বিক্রি করতে হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে সুদী বস্তুতে। ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে পরিচিত বিশেষ পাল্লা বা পরিমাপযন্ত্রের দ্বারাও বিক্রয় জায়েয, যদিও তা জনগণের মাঝে অপরিচিত থাকে। এমন পরিমাপপাত্র যা ছোট-বড় হয় তা দ্বারা বিক্রয় জায়েয নয়। তবে মশক দ্বারা পানি বিক্রির বিধান তা হতে ভিন্নতর। সমাজে চালু থাকার কারণে কিয়াসের বিপরীতে তা জায়েয। হানাফীগণ এ কথা বলেছেন।
টিকাঃ
৬৪. শারহুল মাজাল্লা, ধারা ২২০; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ২৮; আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২৯৬; আল-বাহজা, খ. ২, পৃ. ১৯; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৬৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৮
৬৫. শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ২২০; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ২৮; মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ৫০৫; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ২, পৃ. ১০, প্রকাশক: হালাবী; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ৩৯৯; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১৪২; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৬৮
৬৬. শারহুল মাজাল্লা, ধারা ২১৮; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ২৭; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ২, পৃ. ১২; মিনাহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ৬৯৭; আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২৮০; শারহুর রাওয, খ. ২, পৃ. ১২৯; খাবায়ায যাওয়ায়া, পৃ. ২০৭; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩১৮; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৭৩
📄 তৃতীয়ত : পণ্যের অন্তর্ভুক্তি
পণ্যের অধীন বস্তুসমূহ: মূল জিনিস এবং তার উপকারিতায় বিক্রয় আরোপ হয়। বিক্রির দাবি হলো, পণ্যের বিক্রিতে তার সাথে সম্পর্কিত জিনিসও আওতাভুক্ত হবে; তা থেকে কাঙ্ক্ষিত লাভ বাস্তবায়নের নিমিত্তে। অথবা সমাজেরও প্রচলন হলো, বিক্রিকালে তার সাথে সংশ্লিষ্ট জিনিস অন্তর্ভুক্ত হবে; চুক্তিকালে অন্তর্ভুক্তির কথা উল্লেখ না করা হলেও। কারণ মূল জিনিস হতে তার সংশ্লিষ্ট জিনিস পৃথক না করলে তা এমনি এমনি পৃথক হয় না। হানাফীগণের মতে পণ্যের আওতাভুক্ত জিনিসপত্র
ক. পণ্যের নাম বললে তার সাথে তা অন্তর্ভুক্ত হয়, যা উক্ত পণ্যের অংশ বলে বিবেচিত হয়। ফলে বাড়ি বিক্রিতে তার কক্ষসমূহ অন্তর্ভুক্ত হয়। গুদাম বিক্রি করলে তার সকল ধাপ তাতে শামিল থাকে।
খ. বিক্রির উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ করলে পণ্য হতে যা বিচ্ছিন্ন হয় না। ফলে তালা বিক্রি করলে তাতে চাবিও অন্তর্ভুক্ত হয়।
গ. পণ্যের সাথে যা স্থায়ীভাবে জড়ানো থাকে এবং স্থায়ীরূপে যা নির্মিত হয় যেমন: ঘর বিক্রিতে দরজাসমূহও অন্তর্ভুক্ত হয়।
ঘ. সমাজে যে জিনিস পণ্যের অধীন বলে বিবেচিত হয়। যেমন: উট বিক্রি করলে লাগামও তার সাথে যুক্ত হয়। এক্ষেত্রে নিয়ম হলো, এসকল জিনিস সমাজে এ রূপেই বিবেচিত হয়। দেশভেদে তা ভিন্নতর হয়। কোনো এলাকায় কোনো কিছু বিক্রয়ে তার অধীন বলে যা বিবেচিত হবে চুক্তিকালে তা বিক্রিতে অন্তর্ভুক্ত হবে, যদিও তা অন্য দেশে বিক্রির অধীন বলে গণ্য হয় না। এ কারণে ইবনে আবিদীন যাখীরা গ্রন্থের সূত্রে ঘর বিক্রি সম্পর্কে বলেন, এ ক্ষেত্রে বিধান হলো, যা গৃহের ভিত্তি সম্পর্কিত নয় এবং এর সাথে মিলিতও নয়, তা গৃহ বিক্রিতে অন্তর্ভুক্ত হবে না। হ্যাঁ, যদি সমাজে প্রচলিত থাকে, বিক্রেতা ক্রেতাকে এমন জিনিস হতে বারণ করে না, তাহলে তা অন্তর্ভুক্ত হবে। যেমন চাবি কিয়াসের বিপরীত তালা বিক্রিতে অন্তর্ভুক্ত হয়, যদিও তা তালার সাথে জড়ানো থাকে না, কিন্তু সমাজের প্রচলন অনুযায়ী চাবি অন্তর্ভুক্ত হয়। অতঃপর ইবনে আবিদীন বলেন, আমাদের দামেশকের রীতি অনুযায়ী বাড়ির পানির কূপ বাড়ি বিক্রিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। মিসরের কায়রো শহরের রীতি অনুযায়ী বাড়ি বিক্রির চুক্তিতে মই অন্তর্ভুক্ত করা হতে, উত্তম হলো দামেশকের বাড়িতে পানির কূপ অন্তর্ভুক্ত করা। এর কারণ, দামেশকের রীতি হলো, কোনো বাড়িতে যদি পানি চলমান থাকার পর তা বন্ধ হয়ে যায়, তারা এ বাড়ি বর্জন করে, তা আর তারা ব্যবহার করে না। এমনি অবস্থায় যখন ক্রেতা জানতে পারবে যে, বিক্রয় চুক্তির দ্বারা সে পানি ব্যবহারের অধিকারী হবে না, সে বাড়ি ক্রয়ে আগ্রহ বোধ করবে না। হ্যাঁ, যদি পানিওয়ালা বাড়ি হতে সে বাড়িটি অনেক কম মূল্যে পায় তাহলে ভিন্ন দৃষ্টিতে ক্রয় করতে পারে।
বায় চুক্তিতে কোন্ জিনিস পণ্যের অধীন হয় আর কোন্ জিনিস অধীন হয় না? এ সম্পর্কিত কায়দা বর্ণনা করেছেন আল্লামা আল-কারাফী। কতিপয় অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সকল বিষয়ে আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো মূল জিনিসের অধীন হয়। এগুলো সমাজের রীতি অনুযায়ী পাল্টে গেলে তার বিধানও পাল্টে যাবে। তবে পরাগ সংযোগকৃত গাছের ফল যে মূল বৃক্ষের অধীন হয় তা দলিল ও কিয়াসের ভিত্তিতে। তা পরিবর্তনযোগ্য নয়। বাকীগুলোতে সময়ের বিবর্তনে প্রচলন ও রীতিনীতি পাল্টে গেলে বিধানও পাল্টে যাবে। যেমন: মুদ্রা সময় ও যুগের বিবর্তনের অধীন হয় এবং যুগের বদলে তাতে পরিবর্তন হয়। চুক্তি করলে যে সকল জিনিস স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়, আর শাব্দিক অর্থও তার দাবি করে, যুগের পরিবর্তনে তার মাঝে পরিবর্তন সাধিত হয় না। সেখানে এ কথা বলা হয় না যে, সমাজ তার দাবি করে।
ঐ সকল জিনিস পণ্যের অধীন হওয়া বলতে বোঝায়, পণ্যের যে মূল্য আছে তার সাথেই সেগুলো যুক্ত হবে। এটি নয় যে, এর জন্য মূল্যের একটি অংশ আলাদা থাকবে। কারণ কায়দা হলে أَنْ كُلِّ مَا يَدْخُلَ فِي الْمَبِيعِ تَبَعًا لَا حِصَّةَ لَهُ مِنَ الثَّمَنِ "অধীন হিসেবে পণ্যে যা অন্তর্ভুক্ত হয় মূল্যে তার কোনো অংশ থাকে না।"
পণ্যের গুণের ক্ষেত্রে এ ধরনের মত হানাফী ফকীহদের। তাই চুক্তির পর হস্তগত করার পূর্বে পণ্যের গুণ নষ্ট হয়ে গেলে ক্রেতার এর বিপরীতে মূল্য হ্রাস করার কোনো অধিকার নেই। তবে তার এখতিয়ার থাকবে গ্রহণ করার বা ভঙ্গ করার। এটাকে বলা হয় গুণ হাত ছাড়া হওয়ার এখতিয়ার। তবে হ্যাঁ, মূল পণ্যের কোনো কিছু নষ্ট হয়ে গেলে ক্রেতার অধিকার থাকে সে পরিমাণ মূল্য হ্রাস করার।
শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহদের মত, বাড়ি বিক্রিকালে যা কিছু স্থায়ীভাবে যুক্ত করে নির্মিত সেগুলো অন্তর্ভুক্ত হবে। যেমন পাকা বাড়ি, পাকা তাক ও দেয়াল-আলমারি ইত্যাদি। যেগুলো এমনভাবে সংযুক্ত নয়, হাম্বলী ফকীহদের মতে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত নয়। এটিও শাফেয়ীদের একটি মত। তাদের অন্য মতে এগুলোও অন্তর্ভুক্ত।
টিকাঃ
৬৭. শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ২১৯- ২৩০ ও ২৩৬; হাশিয়া ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৩৩ এবং ইবনে আবিদীন কৃত পুস্তিকা, নাশরুল আরফ ফী বিনাই বাযিল আহকাম আলাল 'উরফ
৬৮. আল-ফুরূক, খ. ৩, পৃ. ২৮৩; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৮০-৮৬; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৮৫; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২০৬-২০৯
৬৯ ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৩৪
৭০ আল-কারাফী কৃত আল-ফুরূক, খ. ৩, পৃ. ২৮৮; ফরক নং: ১৯৯
৭১ শারহুল মাজাল্লা, ধারা: ২৩৪
৭২ আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৮৫; আল-মাজমুউ, খ. ১১, পৃ. ২৬৮; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ২৭৫
📄 পণ্য হতে পৃথক করা
পণ্য হতে পৃথক করার বিধান দলিল ও কায়দার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। কিছু কিছু বিষয়ে ফকীহবৃন্দ একমত, আর কিছু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন। এ বিতর্ক নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হয়ে থাকে। এ সম্পর্কে দলিল হলো ইমাম তিরমিযী কর্তৃক বর্ণনাকৃত হাদীস : نَهَى عَنِ الدُّنْيَا إِلَّا أَنْ تُعْلَمَ "নবী করীম সা. পণ্য হতে পৃথক করতে নিষেধ করেছেন। তবে কতটুকু তা জানা হলে করা যেতে পারে।" কায়দা হলো: أَنَّ كُل مَا يَجُوزُ بَيْعُهُ مُنْفَرِدًا يَجُوزُ اسْتَنَاؤُهُ ، وَمَا لَا يَجُوزُ إِيمَاعُ الْبَيْعِ عَلَيْهِ بِالْفِرَادِهِ لَا يَجُوزُ اسْتَنَاؤُهُ "যে জিনিস এককভাবে বিক্রয় করা জায়েয তা পণ্য হতে পৃথক করা জায়েয। এককভাবে যে জিনিস বিক্রয় করা যায় না, তাকে পণ্য হতে পৃথক করা ও জায়েয হয় না।”
সেই সাথে কোন জিনিসটি পৃথককৃত তা জানা থাকতে হবে। কারণ, তা অজ্ঞাত থাকলে অবশিষ্ট পণ্যের ব্যাপারেও অজ্ঞতার প্রশ্ন উঠবে, ফলে বায়-ই শুদ্ধ হবে না।
প্রাণীর গর্ভস্থ ভ্রূণ পৃথক করা এবং বিক্রয় হতে তা বাদ রাখা জায়েয নয়। কারণ, স্বতন্ত্রভাবে তার বিক্রয় জায়েয নয়। এটি হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের অভিমত। তবে ইমাম আহমদ রহ.-এর পক্ষ হতে তা বৈধ হওয়ার একটি অভিমত পাওয়া যায়। ইমাম হাসান, নাখায়ী, ইসহাক ও আবু ছাওর অনুরূপ অভিমত পোষণ করেন। কারণ, ইবনে উমর রা.-এর নিকট হতে নাফে বর্ণনা করেছেন, ইবনে উমর রা. তাঁর দাসীকে বিক্রি করলেও তার গর্ভস্থ সন্তান তা থেকে পৃথক করেছিলেন। এ ছাড়া যুক্তিও রয়েছে তার বৈধতার পিছনে। কারণ, দাসীকে আজাদ করার সময় তার গর্ভস্থ বাচ্চাকে পৃথক করা জায়েয হয়। এমনিভাবে বিক্রয়কালে তার গর্ভস্থ বাচ্চাকে পৃথক করা এবং বাদ রাখা জায়েয হবে।
অনুরূপ যে কোনো অজ্ঞাত জিনিসের পৃথকীকরণ সহীহ হয় না। যেমন: পাল হতে অজ্ঞাত কোনো বকরীকে পৃথক করা। বাগানের অনির্দিষ্ট কোনো গাছ বাদ দিয়ে বাগান বিক্রি জায়েয নয়। কারণ, জানাশোনা জিনিস হতে অজানা জিনিস পৃথক করার ফলে মূল জিনিসই অজানা হয়ে যায়। পৃথককৃত জিনিস নির্দিষ্ট করার পর অবশিষ্টটুকু বিক্রয় করা হলে সে বিক্রয় এবং তার পৃথককরণ বৈধ- এটি অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের অভিমত।
ইমাম মালেক রহ. কিছু বৃক্ষ বিক্রয় হতে পৃথক করাকে জায়েয মনে করেন- যদিও তা অনির্দিষ্ট হয়ে থাকে। ক্রেতা এ সময় সে গাছগুলো নির্বাচন করবে, এ শর্তে যে, পৃথককৃত গাছের ফল মোট ফলের এক-তৃতীয়াংশ বা তার চেয়েও কম হবে, আর বাগানের সকল ফলের রঙ একই হবে। কারণ, এক্ষেত্রে ধোঁকার আশঙ্কা থাকে হালকা।
নির্দিষ্ট পরিমাণ বাদ দিয়ে ফল বিক্রয় জায়েয নয়। কারণ, রাসূলুল্লাহ সা. বিক্রয় হতে পৃথক করাকে নিষেধ করেছেন। আরও কারণ যে, নির্দিষ্ট পরিমাণ বাদ দেওয়ার পর বাকীটুকু অজ্ঞাত থেকে যায়। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব, শাফেয়ী, আওযায়ী, ইসহাক, আবু সাউর প্রমুখ ইমামগণ এ অভিমত পোষণ করেন। আবুল খাত্তাব ছাড়া অন্য হাম্বলী ফকীহগণও এরূপ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। আর হানাফীদের মধ্য হতে হাসান ও তাহাবী হতেও এর পক্ষে অভিমত রয়েছে।
এক-তৃতীয়াংশ বা তার চেয়ে কম পৃথক করা হলে ইমাম মালেকের মতেও তা জায়েয। জায়েয হওয়াই হানাফীগণের প্রসিদ্ধ অভিমত, ইবনে সীরীন, সালিম ইবনে আবদিল্লাহ ও হাম্বলী ফকীহ আবুল খাত্তাবের অভিমতও তাই। কারণ সে যা পৃথক করেছে তার পরিমাণ নির্দিষ্ট।
নির্দিষ্ট অংশ যেমন: এক-তৃতীয়াংশ বা চতুর্থাংশ পৃথক করা জায়েয। কারণ এর ফলে পৃথককৃত জিনিস এবং যা হতে পৃথক করা হয়েছে কোনোটিই অজ্ঞতার প্রতি ধাবিত হয় না। এ কারণে তা নির্দিষ্ট বৃক্ষ ক্রয়ের মতো হয়ে গেল। আবুবকর ও হাম্বলী মাযহাব অনুসারী ইবনে আবু মুসা বলেন, এটি জায়েয হবে না।
হাম্বলীগণের মতে যে প্রাণীর গোশত খাওয়া যায় তার মাথা, পা, চামড়া ও পরিত্যক্ত অঙ্গগুলো বাদ দিয়ে ঐ প্রাণী বিক্রি জায়েয। ইমাম মালেকের মতে কেবল সফরে এ ধরনের বিক্রি জায়েয। কারণ সেখানে এগুলোর কোনো মূল্য না পাওয়া যেতে পারে। আর মুকীম অবস্থায় তিনি একে মাকরূহ মনে করেন। তা ছাড়া চামড়া ও বর্জ্য বস্তু দ্বারা মুসাফিরের উপকৃত হওয়া সম্ভব নয়। জায়েয হওয়ার দলিল হলো, রাসূলুল্লাহ সা. অজ্ঞাত জিনিসের পৃথককরণকে নিষেধ করেছেন, অথচ এ জিনিসগুলো জ্ঞাত।
আরো বর্ণিত আছে: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا هَاجَرَ إِلَى الْمَدِينَةِ وَمَعَهُ أَبُو بَكْرٍ وَعَامِرُ بْنُ فُهَيْرَةَ مَرُّوا بِرَاعِي غَنَمٍ فَذَهَبَ أَبُو بَكْرٍ وَعَامِرٌ فَاشْتَرَيَا مِنْهُ شَاةً . وَشَرَطَا لَهُ سَلَبَهَا أَيْ جِلْدَهَا وَأَكَارِعَهَا وَبَطْنَهَا
রাসূলুল্লাহ স. যখন আবু বকর রা. ও আমের ইবনে ফুহায়রা রা.-কে নিয়ে মদীনার উদ্দেশে সফর করেন, তাঁরা এক বকরী-রাখালের পাশ দিয়ে যান। আবুবকর ও আমের রা. তখন ঐ রাখালের কাছ থেকে একটি বকরী কিনেন। সে সময় তারা তাকে বকরীর চামড়া, পা ও পেট ফেরত দেওয়ার শর্ত করে ছিলেন।
হানাফী ও শাফেয়ীগণের মতে তা জায়েয নয়।
বিক্রয়কালে পণ্য হতে কোনো কোনো বস্তু পৃথক করার বিষয়টি ফকীহদের কেউ কেউ যথাযথ শর্ত হিসেবে গণ্য করে একে জায়েয মনে করেছেন। আর এ ধরনের শর্ত করে বেচাকেনাকেও জায়েয বলে অভিমত দিয়েছেন। অন্যরা একে ফাসেদ শর্ত মনে করেন, ফলে তারা শর্ত আরোপকে বাতিল আর এ ধরনের শর্ত করে বেচাকেনাও বাতিল বলে রায় দেন।
এর একটি উদাহরণ হলো, কেউ ঘর বিক্রয় করেছে, কিন্তু তাতে এক মাস বসবাস করার বিষয় বিক্রি থেকে পৃথক রেখেছে। এ ধরনের বিক্রয় মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ বৈধ মনে করেন। এক্ষেত্রে তারা অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গ্রহণ করেন জাবির রা.-এর হাদীস। তিনি রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট একটি উট বিক্রি করেছিলেন, আর তাতে শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন যে, মদীনা পর্যন্ত তিনি এ উটে সওয়ার হয়ে যাবেন। তাঁর বাক্যটি ছিল হুবহু এরূপ :بِعْتُهُ وَاسْتَثْنَيْتُ حُمْلَانَهُ إِلَى أَهْلِي "আমি তাঁর (নবী করীম স.)-এর কাছে উটটি বিক্রি করলাম এবং আমার পরিজনের কাছে পৌঁছা পর্যন্ত আরোহণকে পৃথক করলাম।"
হানাফী ও শাফেয়ী ফকীহবৃন্দের অভিমত, এ ধরনের বিক্রি জায়েয নয়। এ ক্ষেত্রে শর্ত ও বায় দুটিই বাতিল বলে গণ্য হবে। কারণ, তা বায়-এর সাথে সামঞ্জস্যহীন শর্ত হিসেবে বিবেচিত।
টিকাঃ
৭৩. ইমাম তিরমিযী, আস-সুনান, খ. ৩, পৃ. ৩৭৬; তিরমিযী হাদীসটি হাসান সহীহ ও গরীব বলে উল্লেখ করেছেন।
৭৪. কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৭১
৭৫. ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, বরাত ফাতহুল বারী, খ. ৫, পৃ. ৩১৪; আস-সালাফিয়া প্রকাশনা; মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৩, পৃ. ১২২১; প্রকাশক হালাবী
৭৬. ইবনে আবিদীন, খ. ৪, পৃ. ৪০; আল-হিদায়া, খ. ৩, পৃ. ২৫; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭; আল-বাহজা শারহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ৩২; আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ২৩৮; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৩, পৃ. ৪৪৫; শারহু রাওযিত তালিব, খ. ২, পৃ. ১৫; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৭৬; হাশিয়াতুল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ৮৩; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১১৩; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৪৮