📄 বায়-এর শ্রেণিবিন্যাস
ভিন্ন ভিন্ন অনুপাতে বায়-এর শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণিবিন্যাস হলো পণ্য (الْمَبِيعِ) ও মূল্য (الْعُمَنِ) অনুপাতে। এ শ্রেণিবিন্যাস হয়তো নির্ধারণের পদ্ধতি হিসেবে, অথবা আদায়ের পন্থা হিসাবে, শরীয়তের বিধান হিসাবে, অথবা তার প্রভাব প্রতিক্রিয়া হিসেবে হবে।
📄 প্রথমত : পণ্য অনুপাতে বায়-এর প্রকার
বিনিময়ের বিষয় অনুপাতে বায় চার প্রকার:
০১. আল-বায়'উল মুতলাক (الْبَيْعُ الْمُطْلَق)
আল-বায়'উল মুতলাক (الْبَيْعُ الْمُطْلَق)-এর সংজ্ঞা হলো, هُوَ مُبَادَلَةُ الْغَيْنِ بِالدَّيْنِ ‘মুদ্রার বদলে পণ্যের বিনিময়কে বায় মুতলাক বলে।’ এটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ প্রকার, এ ধরনের বিক্রি থাকার ফলে মানুষ তার প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মুদ্রার বিনিময়ে লেনদেন করতে সক্ষম হয়। তাই শুধু বায় বললে সাধারণত বায় মুতলাককেই বুঝানো হয়। ফলে বায়-শব্দের সাথে অতিরিক্ত কোনো শব্দ যোগ করার প্রয়োজন হয় না।
০২. বায়'উস সালাম (بيعُ السّلم)
বায়'উস সালাম (بيعُ السَّلم)-এর সংজ্ঞা হলো, هُوَ مُبَادَلَةُ الدَّيْنِ بِالْعَيْنِ ، أَوْ بَيْعُ شَيْء مُوَجِّلٍ بِثَمَنِ مُعَجِّلٍ নগদ মূল্যের বদলে দায়িত্বে থাকা বস্তুর বিনিময় অর্থাৎ নগদ মূল্য প্রদান করে বিলম্বে পণ্য গ্রহণকে বায় সালাম বলে। বিস্তারিত জানতে শিরোনাম سلم দ্র.
০৩. বায়'উস সরফ (بيعُ الصرف)
বায়'উল সরফ (بيعُ الصرف)-এর সংজ্ঞা হলো, هُوَ مُبَادَلَةُ الْأَغْمَانِ ‘এক ধরনের মুদ্রার অন্য ধরনের মুদ্রার সাথে বিনিময়।’ বিস্তারিত জানতে শিরোনাম صرف দ্র. মালেকী ফকীহদের মতে, সরফ বিক্রি হবে এমন দুই মুদ্রার মাঝে, যেগুলোর একটি অন্যটির বিপরীত। তখন গণনার মাধ্যমে লেনদেন হবে। যদি বিপরীত না হয়ে একজাতীয় মুদ্রা হয়, তাহলে এটি হবে মুরাতালা (রিতল দিয়ে ওজনকৃত বিক্রি)। সে অবস্থায় ওজনের মাধ্যমে বিক্রি হবে।
০৪. বায়'উল মুকায়াযাহ (بيعُ الْمُقَايَضَة)
বায়'উল মুকায়াযাহ (بيعُ الْمُقَائِضَة) -এর সংজ্ঞা হলো مُبَادَلَةُ الْعَيْنِ بِالْعَيْنِ ‘বস্তুকে বস্তুর বিনিময়ে বিক্রয় করা’। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন পরিভাষা: مقايضة
টিকাঃ
২৫. মাজাল্লাতুল আহকাম, ধারা: ১২৩
২৬. আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২৬৬; আদ-দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২
📄 দ্বিতীয়ত : মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি হিসেবে ‘বায়’-এর প্রকার
০১. বায়'উল মুসাওয়ামাহ্ (بَيْعُ الْمُسَاوَمَة)
বায়'উল মুসাওয়ামাহ (بَيْعُ الْمُسَاوَمَة) -এর সংজ্ঞা হলো, هُوَ الْبَيْعُ الَّذِي لَا يُظْهِرُ فِيهِ الْبَائِعُ رَأْسَ مَالِهِ 'যে বিক্রয়ে বিক্রেতা পুঁজির উল্লেখ করে না তাকে বায় মুসাওয়ামা বলে।'
০২. বায়উল মুযায়াদাহ (بَيْعُ الْمُزَائِدَة) / (নিলামে বিক্রয়)
বায়'উল মুযায়াদাহ (بَيْعُ الْمُزَائِدَة) / (নিলামে বিক্রয়): এর সংজ্ঞায় বলা হয়, بِأَنْ يَعْرِضَ الْبَائِعُ سِلْعَتَهُ فِي السُّوقِ وَيَتَزَايَدَ الْمُشْتَرُونَ فِيهَا ، فَتُبَاعَ لِمَنْ يَدْفَعُ الثَّمَنَ الْأَكْثَرَ 'বিক্রেতা পণ্য বাজারে নিয়ে যাওয়ার পর ক্রেতাগণ মূল্য বৃদ্ধি করতে থাকে, যে ব্যক্তি সর্বাধিক মূল্য প্রদান করে তার নিকট তা বিক্রয় করা হয়।'
০৩. বুয়ুউল আমানাহ (بُيُوعُ الأمانة)
আমানতের ক্রয়-বিক্রয় সমূহ
এগুলো হলো সে সকল বায় যেগুলোতে মূল্য নির্ধারিত হয়, তা পুঁজির সমানে কিংবা তার চেয়ে বেশি অথবা কম। এগুলোকে বায় আমানত বা আমানতের বিক্রি বলার কারণ হলো, এখানে পুঁজির সংবাদ দানের ক্ষেত্রে বিক্রেতাকে আমানতদার মনে করা হয়। এ বায় হলো তিন ধরনের:
ক. বায়উল মুরাবাহা (بَيْعُ الْمُرَابَحَة) : পণ্যের মূল্য পুঁজির চেয়ে অধিক নির্ধারণ করা হলে তাকে বায় মুরাবাহা বলে। বিস্তারিত জানতে শিরোনাম مرابحة দ্র.
খ. বায়উল তাওলিয়া (بَيْعُ التولية) : লাভ ক্ষতি ছাড়া যেখানে পুঁজিই মূল্য হিসাবে নির্ধারিত হয়। বিস্তারিত জানতে শিরোনাম توليه দ্র.
গ. বায়উল ওয়াদী'আহ (بَيْعُ الْوَضِيعَةِ ، أَوِ الْحَطِيطَةِ ، أَوِ النَّقِيصة) : পণ্যের মূল্য পুঁজি হতে কম নির্ধারণ করে বিক্রি করা।
বায় যদি পণ্যের কোনো অংশে হয় তাহলে একে বায় ইশরাক (الاشراك) বলে। এ প্রকারটিও পূর্বোক্ত প্রকারসমূহের বাইরে নয়। বিস্তারিত জানতে শিরোনাম إشراك و تولية দ্র.
টিকাঃ
২৭. এর বিপরীত হচ্ছে بيع المناقصه এক্ষেত্রে ক্রেতা পণ্যের মূল্য জানতে চাইলে বিক্রেতারা প্রতিযোগিতামূলভাবে একের তুলনায় অপরে কম দাম বলে। বর্তমানে টেন্ডারে তার অস্তিত্ব রয়েছে। ফিকহীগ্রন্থে এ শিরোনামে আলোচনা পাওয়া যায় না।
২৮. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৩; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৪৫৫
📄 তৃতীয়ত : মূল্যের ধরন বা আদায়ের পন্থা অনুপাতে বায়-এর প্রকার
মূল্যের ধরন অনুপাতে বায় নিম্নোক্ত প্রকারগুলোতে বিভক্ত হয়:
ক. মুনজায়ুছ ছামান (مُنْجَرَ الثَّمَن / নগদ মূল্য প্রদান): যার মাঝে মূল্য বিলম্বে আদায় করার শর্ত করা হয় না, বরং তা নগদ প্রদান করা হয়। একে বায়'উন নকদ (بَيْعَ النقد) এবং বায় বিছ-ছামানিল হাল (الْبَيْعِ بِالثَّمَنِ الْحَالِ) বলা হয়।
খ. মুআজ্জালুহ হামান (مُؤجّل الْثَّمَنِ / বিলম্বে মূল্য প্রদান): মূল্য বিলম্বে পরিশোধ করার শর্ত করা হলে তাকে মুআজ্জালুছ ছামান বলে। হামান (الثمن) সম্পর্কিত আলোচনায় বিস্তারিত দ্রষ্টব্য।
গ. মুআজ্জালুহু হামান (مُؤجّل الْمُثَمَّنِ / বিলম্বে পণ্য প্রদান): এটি হচ্ছে (بيع / السَّلَمِ) বায় সালাম, পূর্বে যার ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে।
ঘ. মুআজ্জালুল ইওয়াযায়ন (مُؤجّل الْعَوَضَيْنِ / বিলম্বে পণ্য ও মূল্য প্রদান): এটি হচ্ছে বকেয়ার বদলে বকেয়া বিক্রয়। এটি নিষিদ্ধ। বিস্তারিত শিরোনাম بيع دَيْن مَنْهِي عَنْهُ।
ইবনে রুশদ আল-হাফীদ বায়-এর শ্রেণীবিন্যাস বর্ণনায় নয় প্রকার বায়-এর তথ্য প্রদান করেছেন। তা বিনিময় পূর্ণ হওয়া, মূল্য আদায়ের ধরন, খিয়ার হওয়া এবং পণ্য ও মূল্য নগদ ও বাকীতে হওয়া অনুপাতে, যেগুলোর আলোচনা করা হয়েছে।
এখানে আরও কিছু বায়-এর শাখাজাতীয় শ্রেণী বিন্যাস রয়েছে। তা পণ্য উপস্থিত থাকা ও না থাকা সম্পর্কিত, পণ্য দেখা ও অদেখা সংক্রান্ত এবং বায়-এর চুক্তি অকাট্য হওয়া বা ইচ্ছাধীন হওয়া নিয়ে।
শরীয়তের বিধান অনুপাতে বায়-এর শ্রেণী বিন্যাস নানা ধরনের হতে পারে। একটি হলো, الْبَيْعُ الْمُنْعَقِدُ (আল-বায়'উল মুন'আকিদ), এর বিপরীত হলো البيع البطل (আল-বায়'উল বাতিল)। الْبَيْعُ الصَّحِيحُ (আল-বায়'উল সহীহ)-এর বিপরীত হলো الْبَيْعُ الْفَاسِدُ (আল-বায়'উল ফাসিদ)। الْبَيْعُ النَّافِذُ (আল-বায়'উল নাফিজ) (কার্যকরী বায়)-এর বিপরীত হলো الْبَيْعُ الْمَوْقُوفُ (আল-বায়'উল মাওকুফ)। الْبيْعُ اللازم (আল-বায় 'উল লাযিম)-এর বিপরীত হলো الْبَيْعُ غَيْرُ اللازم (আল-বায় 'উ গায়রুল লাযিম); এটাকে الْجَائز أو الْمُخيَّر (আল-জায়েয বা আল-মুখাইয়ার)ও বলা হয়।
এগুলোর বিশদ বিবরণ পারিভাষিক আলোচনায় যথাস্থানে দ্রষ্টব্য। আর নিষিদ্ধ বায়গুলোর বিশদ বিবরণ দেখার জন্যে দ্রষ্টব্য শিরোনাম: بيْعٌ مَنْهِي عَنْهُ
কিছু কিছু বায়-এর বিশেষ বিশেষ নাম আছে, যেগুলোতে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে। যেমন :بيع النَّخْش (বায় উন নাজাশ) بَيْعِ الْمُنَابَدَة (বায় 'উল মুনাবাযাহ) ইত্যাদি। এদের সংজ্ঞা নিজ নিজ পারিভাষিক আলোচনায় দেখা যেতে পারে।
আরও কিছু বায় রয়েছে যেগুলোর নামকরণে সে অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করা হয়েছে যেগুলো বিক্রির চুক্তিকালে যুক্ত হয়। এ অবস্থাসমূহ বিধানের ক্ষেত্রে প্রভাব সৃষ্টি করে। যেমন : بيع الْمُكْرَه (বায় উল মুকরাহ) بيع الْهَازِل (বায় 'উল হাফিল) بيع اللجنة (বায় 'উল তালজিআ), بيع الفصولي (বায় 'উল ফুদুলী) ও بَيْعِ الْوَقاء (বায় উল ওয়াফা)। এগুলোর বিশেষ বিশেষ সংজ্ঞা রয়েছে।
যেমন, استصناع (ইসতিসনা), (অর্ডার দিয়ে জিনিস বানানো) বিক্রির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। অর্থচ এটি কি বিক্রি না ইজারা, তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। এর বিশদ বিবরণ استصناع (ইসতিসনা) শিরোনামে দেখা যেতে পারে।
উল্লিখিত এ সকল বিক্রি নিয়ে ফকীহগণ বায় মুতলাক-এর বাইরে পৃথকভাবে বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন। তবে এগুলো বায় মুতলাক-এর পরে আলোচিত হয়ে থাকে।
যেহেতু এ সকল প্রকারই বায় (বিক্রি)-র অন্তর্ভুক্ত, তাই এগুলোর আলোচনায় বায় শব্দটির বহুবচন ব্যবহৃত হয়েছে। তবে বিক্রির আওতাধীন হলেও এগুলো বায় মুতলাক নয়, যেমনটা উপরের আলোচনায় বিবৃত হয়েছে।