📄 শরীয়তের বিধান
সকল ফকীহ এ কথায় একমত, বায় বা বিক্রি ও ব্যবসায় শরীয়তসিদ্ধ, এক বৈধ কাজ। তার বৈধতা কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ "আল্লাহ বায় তথা ক্রয়বিক্রয়কে হালাল করেছেন।” আরও ইরশাদ হচ্ছে: لا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ "তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কিন্তু তোমাদের পরস্পর রাজী হয়ে ব্যবসায় করা বৈধ।
রাসূলুল্লাহ স.-এর হাদীস: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُئِل : أَيُّ الْكَسْبِ أَطْيَبُ ؟ فَقَالَ : عَمَلَ الرَّجُلِ بِيَدِهِ ، وَكُل بَيْعِ مَبْرُورٍ নবী করীম স.-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন্ উপার্জন সর্বাধিক উৎকৃষ্ট? তিনি বললেন, 'মানুষের নিজ হাতের উপার্জন এবং সকল বৈধ ব্যবসা।'
সেই সাথে নবী করীম সা. নিজে বেচাকেনার কাজ করেছেন। সাহাবায়ে কেরামের অনুরূপ কাজে তিনি স্বীকৃতিও দিয়েছেন। ইজমায়ে উম্মতও বেচাকেনা বৈধ হওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিয়াসের চাহিদাও হলো বেচাকেনা বৈধ হওয়ার অনুকূলে। কারণ, একজনের হাতে যা রয়েছে তার প্রতি অন্যদের চাহিদা থাকে। সাধারণত বিনিময় ছাড়া এ সকল বস্তুর অদল-বদল হয় না। ফলে কেনাবেচার প্রতি মানুষ মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। আর তাই ব্যবসা বৈধ হলেই লক্ষ্যে পৌঁছা যায় এবং প্রয়োজন পূরণ হয়। মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য এ ধরনের বিক্রি ছাড়া গতি নেই।
বায়-এর মূল নিদের্শনা হলো এরূপই, কিন্তু বিভিন্ন সময়ে এটি অন্যান্য বিধানের আওতাভুক্ত হয়। তখন (নস) শরীয়তের স্পষ্ট নির্দেশনার মাধ্যমে নিষিদ্ধ বস্তু অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে বায় নিষিদ্ধ হয়। যেমন চুক্তির শব্দ প্রয়োগে ত্রুটি, ক্রেতা বিক্রেতার দোষ বা পণ্যের অযোগ্যতাজনিত কারণে বায় নিষিদ্ধ হতে পারে। এ জাতীয় বায় চুক্তি সম্পাদন করতে যাওয়া হারাম, যেহেতু এটি সহীহ বায় হতে পারে না, বরং হানাফী ফকীহদের দৃষ্টিতে এ জাতীয় বায় বাতিল বা ফাসিদ। অবশ্য এ বিষয়ে অন্য সকল ফকীহের সাথে তাদের প্রসিদ্ধ মতবিরোধ রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকের বিনিময় তাকে ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যক। এ সংক্রান্ত বিশদ বিবরণের জন্যে দ্রষ্টব্য: (بَيْع مَنْهِيٌّ عَنْهُ) নিষিদ্ধ বায়, যে শাখা ব্যবসাগুলো নিষিদ্ধ বায় হিসেবে পরিচিত সেগুলো এবং বায় বাতিল (الْبَيْعُ الْباطل) ও বায় ফাসিদ (الْبَيْعُ الْفَاسِدُ)-এর আলোচনা।
নিষিদ্ধ এসব বিক্রি ক্ষেত্রবিশেষে বাতিল ও ফাসিদ হিসেবে চিহ্নিত হয়। কোনো কোনো কারণে বায়-এ মাকরুহের বিধান আরোপিত হয়। এটি সে ক্ষেত্রে হয় যেখানে নিষেধাজ্ঞা দৃঢ় নয়, আর তাই সে বিক্রি ভাঙ্গা ওয়াজিব নয়। মালেকী মাযহাবের আল হাত্তাব এর একটি উদাহরণ দেন হিংস্রপ্রাণীর বিক্রয় দিয়ে, যেখানে কেবল হিংস্রপ্রাণীর চামড়া সংগ্রহ উদ্দেশ্য হয় না।
ক্ষেত্রবিশেষে বায় ওয়াজিব হয়। যেমন কেউ প্রাণ রক্ষার্থে খাদ্য বা পানীয় ক্রয়ের মুখাপেক্ষী হয়। কোনো কোনো সময় বায় মুস্তাহাব হয়। যেমন কেউ কসম করল, অমুক ব্যক্তির কাছে সে কোনো পণ্য বিক্রয় করবে। এ বিক্রয়ে যদি কোনো অনিষ্ট বা অন্যায় না হয় তাহলে মুস্তাহাব হলো তা কার্যকর করা। কারণ, কসমকারীর কসমে যদি কোনো শরয়ী নিষেধাজ্ঞা বা অনিষ্ট না থাকে তাহলে তা পালন করা মুস্তাহাব।
বায় শরীয়তসিদ্ধ হওয়ার পিছনে হেকমত হলো, আল্লাহর বান্দাগণের প্রতি কোমলতা প্রকাশ এবং তাদের জীবন জীবিকা উপার্জনে সহযোগিতা করা।
টিকাঃ
১৯. সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৭৫
২০. সূরা আন-নিসা, আয়াত ২৯
২১. আহমদ কৃত মুসনাদ, খ. ৪, পৃ. ১৪১; হায়ছামী কৃত আল-মাজমা, খ. ৪, পৃ. ৬০; হাদীসটি বর্ণনা করার পর হায়হামী বলেন, হাদীসটি আহমদ ও বাযযার নিজ নিজ গ্রন্থে এবং তাবারানী তার কাবীর ও আউসাত গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। হাদীসটিতে আল-মাসউদী নামে একজন রাবী রয়েছেন, তিনি নির্ভরযোগ্য, তবে শেষ বয়সে তিনি স্মৃতিভ্রমের শিকার হন। আহমদ সূত্রে বর্ণিত অন্য সকল রাবী ত্রুটিমুক্ত।
২২. আল-মুগনী ও আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৪৫; আল- মুকাদ্দামাতু লি ইবনি রুশদিল জাদ্দ, খ. ৩, পৃ. ২১৩; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৭৩
২৩. প্রাগুক্ত
২৪. হাশিয়াতুল আদাবী, খ. ২, পৃ. ১২৫; আল-বুখারী আল-হানাফী, মাহাসিনুল ইসলাম, পৃ. ৭৯
📄 বায়-এর শ্রেণিবিন্যাস
ভিন্ন ভিন্ন অনুপাতে বায়-এর শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণিবিন্যাস হলো পণ্য (الْمَبِيعِ) ও মূল্য (الْعُمَنِ) অনুপাতে। এ শ্রেণিবিন্যাস হয়তো নির্ধারণের পদ্ধতি হিসেবে, অথবা আদায়ের পন্থা হিসাবে, শরীয়তের বিধান হিসাবে, অথবা তার প্রভাব প্রতিক্রিয়া হিসেবে হবে।
📄 প্রথমত : পণ্য অনুপাতে বায়-এর প্রকার
বিনিময়ের বিষয় অনুপাতে বায় চার প্রকার:
০১. আল-বায়'উল মুতলাক (الْبَيْعُ الْمُطْلَق)
আল-বায়'উল মুতলাক (الْبَيْعُ الْمُطْلَق)-এর সংজ্ঞা হলো, هُوَ مُبَادَلَةُ الْغَيْنِ بِالدَّيْنِ ‘মুদ্রার বদলে পণ্যের বিনিময়কে বায় মুতলাক বলে।’ এটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ প্রকার, এ ধরনের বিক্রি থাকার ফলে মানুষ তার প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মুদ্রার বিনিময়ে লেনদেন করতে সক্ষম হয়। তাই শুধু বায় বললে সাধারণত বায় মুতলাককেই বুঝানো হয়। ফলে বায়-শব্দের সাথে অতিরিক্ত কোনো শব্দ যোগ করার প্রয়োজন হয় না।
০২. বায়'উস সালাম (بيعُ السّلم)
বায়'উস সালাম (بيعُ السَّلم)-এর সংজ্ঞা হলো, هُوَ مُبَادَلَةُ الدَّيْنِ بِالْعَيْنِ ، أَوْ بَيْعُ شَيْء مُوَجِّلٍ بِثَمَنِ مُعَجِّلٍ নগদ মূল্যের বদলে দায়িত্বে থাকা বস্তুর বিনিময় অর্থাৎ নগদ মূল্য প্রদান করে বিলম্বে পণ্য গ্রহণকে বায় সালাম বলে। বিস্তারিত জানতে শিরোনাম سلم দ্র.
০৩. বায়'উস সরফ (بيعُ الصرف)
বায়'উল সরফ (بيعُ الصرف)-এর সংজ্ঞা হলো, هُوَ مُبَادَلَةُ الْأَغْمَانِ ‘এক ধরনের মুদ্রার অন্য ধরনের মুদ্রার সাথে বিনিময়।’ বিস্তারিত জানতে শিরোনাম صرف দ্র. মালেকী ফকীহদের মতে, সরফ বিক্রি হবে এমন দুই মুদ্রার মাঝে, যেগুলোর একটি অন্যটির বিপরীত। তখন গণনার মাধ্যমে লেনদেন হবে। যদি বিপরীত না হয়ে একজাতীয় মুদ্রা হয়, তাহলে এটি হবে মুরাতালা (রিতল দিয়ে ওজনকৃত বিক্রি)। সে অবস্থায় ওজনের মাধ্যমে বিক্রি হবে।
০৪. বায়'উল মুকায়াযাহ (بيعُ الْمُقَايَضَة)
বায়'উল মুকায়াযাহ (بيعُ الْمُقَائِضَة) -এর সংজ্ঞা হলো مُبَادَلَةُ الْعَيْنِ بِالْعَيْنِ ‘বস্তুকে বস্তুর বিনিময়ে বিক্রয় করা’। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন পরিভাষা: مقايضة
টিকাঃ
২৫. মাজাল্লাতুল আহকাম, ধারা: ১২৩
২৬. আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২৬৬; আদ-দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ২
📄 দ্বিতীয়ত : মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি হিসেবে ‘বায়’-এর প্রকার
০১. বায়'উল মুসাওয়ামাহ্ (بَيْعُ الْمُسَاوَمَة)
বায়'উল মুসাওয়ামাহ (بَيْعُ الْمُسَاوَمَة) -এর সংজ্ঞা হলো, هُوَ الْبَيْعُ الَّذِي لَا يُظْهِرُ فِيهِ الْبَائِعُ رَأْسَ مَالِهِ 'যে বিক্রয়ে বিক্রেতা পুঁজির উল্লেখ করে না তাকে বায় মুসাওয়ামা বলে।'
০২. বায়উল মুযায়াদাহ (بَيْعُ الْمُزَائِدَة) / (নিলামে বিক্রয়)
বায়'উল মুযায়াদাহ (بَيْعُ الْمُزَائِدَة) / (নিলামে বিক্রয়): এর সংজ্ঞায় বলা হয়, بِأَنْ يَعْرِضَ الْبَائِعُ سِلْعَتَهُ فِي السُّوقِ وَيَتَزَايَدَ الْمُشْتَرُونَ فِيهَا ، فَتُبَاعَ لِمَنْ يَدْفَعُ الثَّمَنَ الْأَكْثَرَ 'বিক্রেতা পণ্য বাজারে নিয়ে যাওয়ার পর ক্রেতাগণ মূল্য বৃদ্ধি করতে থাকে, যে ব্যক্তি সর্বাধিক মূল্য প্রদান করে তার নিকট তা বিক্রয় করা হয়।'
০৩. বুয়ুউল আমানাহ (بُيُوعُ الأمانة)
আমানতের ক্রয়-বিক্রয় সমূহ
এগুলো হলো সে সকল বায় যেগুলোতে মূল্য নির্ধারিত হয়, তা পুঁজির সমানে কিংবা তার চেয়ে বেশি অথবা কম। এগুলোকে বায় আমানত বা আমানতের বিক্রি বলার কারণ হলো, এখানে পুঁজির সংবাদ দানের ক্ষেত্রে বিক্রেতাকে আমানতদার মনে করা হয়। এ বায় হলো তিন ধরনের:
ক. বায়উল মুরাবাহা (بَيْعُ الْمُرَابَحَة) : পণ্যের মূল্য পুঁজির চেয়ে অধিক নির্ধারণ করা হলে তাকে বায় মুরাবাহা বলে। বিস্তারিত জানতে শিরোনাম مرابحة দ্র.
খ. বায়উল তাওলিয়া (بَيْعُ التولية) : লাভ ক্ষতি ছাড়া যেখানে পুঁজিই মূল্য হিসাবে নির্ধারিত হয়। বিস্তারিত জানতে শিরোনাম توليه দ্র.
গ. বায়উল ওয়াদী'আহ (بَيْعُ الْوَضِيعَةِ ، أَوِ الْحَطِيطَةِ ، أَوِ النَّقِيصة) : পণ্যের মূল্য পুঁজি হতে কম নির্ধারণ করে বিক্রি করা।
বায় যদি পণ্যের কোনো অংশে হয় তাহলে একে বায় ইশরাক (الاشراك) বলে। এ প্রকারটিও পূর্বোক্ত প্রকারসমূহের বাইরে নয়। বিস্তারিত জানতে শিরোনাম إشراك و تولية দ্র.
টিকাঃ
২৭. এর বিপরীত হচ্ছে بيع المناقصه এক্ষেত্রে ক্রেতা পণ্যের মূল্য জানতে চাইলে বিক্রেতারা প্রতিযোগিতামূলভাবে একের তুলনায় অপরে কম দাম বলে। বর্তমানে টেন্ডারে তার অস্তিত্ব রয়েছে। ফিকহীগ্রন্থে এ শিরোনামে আলোচনা পাওয়া যায় না।
২৮. রদ্দুল মুহতার, খ. ৪, পৃ. ৩; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৪৫৫