📄 পরিচিতি
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 বায় (الْبَيْعُ)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
বায় (الْبَيْعُ) শব্দটি بَاعَ - يَبِيعُ -এর মাসদার বা ক্রিয়ামূল। যার অর্থ: مُبَادَلَهُ مَالِ بمال 'মালের বিনিময়ে মাল আদান প্রদান করা।' কোনো কোনো গ্রন্থে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে: مُقَابَلَهُ شَيْءٍ بِشَيْءٍ 'বস্তুর বদলে বস্তুর বিনিময়।' অন্য কথায়: دَفْعُ عِوَضِ وَأَخْذُ مَا عُوْضَ عَنْهُ 'কোন বস্তু প্রদান করে তার বদল হিসাবে অন্য কিছু গ্রহণ করা।'
বায় শব্দটি একই সাথে পরস্পর বিপরীত অর্থ প্রদান করে। তাই বায়-এর অর্থ বিক্রয় ও ক্রয় উভয়টিই হয়, যেমন শিরা (الشرَاء) -এর অর্থ ক্রয় ও বিক্রয় উভয়টি হয়। কখনো এ দুটি শব্দের একটি বলে অপরটি বোঝানো হয়। তাই বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়কে আরবী ভাষায় بائع (বায়ি') ও بَيْع (বায়িয়') বলা হয়। তবে বায়ি' শব্দ প্রয়োগ করা হলে ব্যাপক প্রচলন হিসাবে দ্রুত মন ধাবিত হয় 'বিক্রেতা' অর্থের প্রতি। ভাষাবিদ আল-হাত্তাব বলেন, কুরায়শদের ব্যবহারিক ভাষায় باع (বা'আ) শব্দের অর্থ হলো, মালিকানা হতে কোনো জিনিস বের করে দেওয়া; আর اشترى (ইশতারা) বলা হয়, জিনিসটি অধিকারভুক্ত করা। এটিই অধিক বিশুদ্ধ, বোঝার সুবিধার্থে পরিভাষায় তাই এরূপ অর্থই গ্রহণ করা হয়েছে।
বা'আ (باعَ) শব্দটিতে সাধারণত দুটি কর্ম হয়। বলা হয়: بِعْتُ فُلانًا السّلْعَةَ 'আমি অমুকের কাছে পণ্যটি বিক্রয় করেছি।' তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে باع (বা'আ) ক্রিয়াটিতে একটি মাত্র কর্মের উল্লেখ থাকে। যেমন: بعْتُ الدَّارَ 'আমি বাড়িটি বিক্রয় করলাম।' কোনো কোনো সময় তা অব্যয়যুক্ত হয়ে ব্যবহৃত হয়। যেমন: من অথবা اللام যোগ করে বলা হয় : بعْتُ مِنْ فُلان ، أَوْ لِفُلان অমুকের কাছে বিক্রয় করেছি। 'তবে عَلَى অব্যয় যোগ করে باعَ عَلَى فُلاَنَ كَذَا বলা হলে কারো অসম্মতিতে বিক্রয় করা বোঝায়।'
ফকীহবৃন্দের পরিভাষায় বায় (الْبَيْعُ)-এর দুটি সংজ্ঞা রয়েছে।
এক. ব্যাপক অর্থে, আর তা হলো, মুতলাকুল বায় (مُطْلَقُ الْبَيْع) অর্থাৎ নিছক বিক্রি চুক্তি।
দুই. সীমিত অর্থে, আর তা হলো, আল-বায়'উল মুতলাক (الْبَيْعُ الْمُطْلَق) অর্থাৎ শর্তমুক্ত সাধারণ বিক্রি।
হানাফী ফকীহগণ বায় বা বিক্রি-এর ব্যাপক অর্থ গ্রহণ করে বলেন: বায়-এর আভিধানিক অর্থের সাথে কেবল তারাযী (التراضي) অর্থাৎ 'পরস্পরসম্মতি' যুক্ত করলেই তা বায়-এর পারিভাষিক সংজ্ঞা হয়ে যায়। ইবনুল হুমাম বলেন, পরস্পর সম্মতির বিষয়টি আভিধানিক অর্থের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। তার যুক্তি হলো : بَاعَ زَيْدٌ ثَوْبُهُ 'যায়েদ তার কাপড় বিক্রয় করেছে।' কথাটি তখনই বলা হয়, যখন সে সম্মত থেকে তার কাপড়ের বিনিময় গ্রহণ করে। জোরপূর্বক গ্রহণ করা এবং অপর ব্যক্তিকে সম্মতি ছাড়া কোনো কিছু দেওয়ার ক্ষেত্রে আরবীভাষীগণও إبَاء শব্দের প্রয়োগ করেন না।
হানাফী ফিকহের ফকীহ, আদ্-দুরার-এর গ্রন্থকার বায়-এর তারাযী (التراضي) অর্থাৎ 'পরস্পরসম্মতি'-এর স্থলে ইকতিসাব (الإكتساب) অর্থাৎ উপার্জন শব্দ যুক্ত করাকে উত্তম মনে করেন। তার যুক্তি হলো, পারস্পরিক উপহার ও অনুদানের ক্ষেত্রেও পারস্পরিক সম্মতিতে মালের বদলে মাল আদান-প্রদান হয়। অতএব এগুলো সংজ্ঞা হিসাবে বায়-এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। অথচ এগুলো বায় নয়। তাই এক্ষেত্রে যা লক্ষণীয় হবে তা হচ্ছে, বায়-এর সংজ্ঞায় উপার্জন করা যুক্ত হবে। ফলে যে সকল আদান-প্রদান স্বেচ্ছাপ্রণোদিত, সেগুলো বায় হবে না।
মালেকী ফকীহদের মতে বায় (الْبَيْعُ) হলো এমন বিনিময়চুক্তি যেটিতে লাভ ও ভোগের স্বাদ গ্রহণ উদ্দিষ্ট হয় না। তাদের এ সংজ্ঞা দানের হেতু হলো, الْبَيْعُ-এর সংজ্ঞা হতে ইজারা ও বিবাহকে পৃথক করা এবং প্রতিদান শর্তায়িত দান, বায় সরফ ও সালামকে অন্তর্ভুক্ত করা।
শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহদের মতে, বায় (الْبَيْعُ) হলো, বিশেষ পদ্ধতিতে মালের বদলে মাল আদান প্রদান করা।
কালয়ূবী একটি সংজ্ঞা দিয়ে একে সর্বোত্তম সংজ্ঞা বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে বায় হলো: عَقْدُ مُعَاوَضَةٍ مَالِيَّة تُفِيدُ مِلْكَ عَيْنٍ أَوْ مَنْفَعَة عَلَى التَّأْبِيدِ لَا عَلَى وَجْهِ الْقُرْبَةِ
"মাল সংক্রান্ত এমন বিনিময় চুক্তি যার ফলে মূল জিনিস বা তার লাতের/উপকারের স্থায়ীভাবে মালিকানা লাভ হয়। এ বিনিময়ে কোনো সওয়াব অর্জন উদ্দেশ্য হয় না।"
এ সংজ্ঞার বিভিন্ন শব্দ নিয়ে আলোচনাকালে তিনি বলেন: مُعَاوِضَة (মু'আওয়াযা) অর্থাৎ বিনিময় শব্দ যোগ করার ফলে হাদিয়া জাতীয় বস্তু সংজ্ঞাবহির্ভূত হয়ে যায়। অনুরূপ بدَل (মালিয়্যাহ্) বলায় বিবাহ জাতীয় চুক্তি, مِلْكَ عَيْنِ أَوْ مَنْفَعَةِ অর্থাৎ মূল জিনিস বা তার লাভ বলায় ইজারা, অদ্রূপ عَلَى التّأييد অর্থাৎ স্থায়ীভাবে বলায়ও ইজারা, لَا عَلَى وَجْهُ الْقُرْبة অর্থাৎ সওয়াব অর্জন উদ্দেশ্য না হওয়া বলায় ঋণ সংজ্ঞার আওতা বহির্ভূত হয়ে যায়। এখানে مَنْفَعَة (মানফাআ) অর্থাৎ লাভ বলে চলাচলের অধিকার বা এ জাতীয় উপকার ক্রয় করা বুঝানো হয়েছে।
হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, বায় হলো পরস্পর মাল বিনিময়, তা বাস্তবে না থেকে জিম্মায়ও থাকতে পারে, অথবা বৈধ উপকার বিনিময় (যেমন বাড়ির ওপর দিয়ে যাতায়াত), যার মধ্যে একটি অপরটির মতো হবে, যা হবে স্থায়িত্বের ভিত্তিতে। এতে সুদ ও ঋণ আদান প্রদান অন্তর্ভুক্ত হবে না। তাদের কেউ কেউ বলেন, মালিক বানানো ও মালিক হওয়ার লক্ষ্যে পরস্পর মাল আদান-প্রদানের নাম বায়।
সীমিত অর্থের বায় মুতলাক বা শর্তহীন বিক্রির আলোচনা করেছেন হানাফী ও মালেকী মাযহাবের ফকীহগণ। তন্মধ্যে মালেকী ফকীহবৃন্দ সংজ্ঞা প্রদান করে বলেন,
عَقْدُ مُعَاوَضَةٍ عَلَى غَيْرِ مَنَافِعَ وَلَا مُتْعَةِ لَذَّةٍ ذُو مُكَايَسَةٍ ، أَحَدُ عِوَضَيْهِ غَيْرُ ذَهَبٍ وَلَا فِضَّةٍ ، مُعَيَّنٌ غَيْرُ الْعَيْنِ فِيهِ
লাভ ও স্বাদ গ্রহণের উপকারমুক্ত বিনিময়চুক্তি, যা প্রতিযোগিতাপূর্ণ; বিনিময়কৃত দুটি জিনিসের একটি সোনা বা রুপা হবে না। পণ্য হবে নির্ধারিত, তবে মূল্য সোনা-রুপা ছাড়া ভিন্ন কিছু হবে।
সুতরাং প্রতিদান শর্তায়িত দান করা এর আওতাভুক্ত হলো না, যেহেতু শব্দে আছে, প্রতিযোগিতাপূর্ণ। প্রতিযোগিতা অর্থ হলো পরস্পরে বিজয়ী হওয়ার চেষ্টা করা। আর প্রতিদান শর্তায়িত দান প্রতিযোগিতামুক্ত হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে বায়'উস সরফ (মুদ্রার ক্রয়বিক্রয়) ও মুরাতালাও এর আওতাভুক্ত রইল না, যেহেতু তারা বলেছেন, বিনিময়-এর কোনো একটি সোনা বা রুপা হতে পারবে না। আর পণ্য নির্দিষ্ট হওয়ার শর্ত আরোপের ফলে বায় সালাম এর আওতাধীন রইল না।
এরপর শাফেয়ী ফকীহগণ আলাদাভাবে বলেছেন, কখনো বায়-এর সংজ্ঞাতে শুধু বায় বা বিক্রি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, যেহেতু বিক্রি হচ্ছে চুক্তির একটি অংশ (চুক্তির অপর অংশ হচ্ছে ক্রয়)। তাই তারা বায়-এর পরিচয় দিতে বলেছেন, বিনিময়ের মাধ্যমে বিশেষভাবে কাউকে কোন বস্তুর মালিক বানানো। এর বিপরীতে তারা ক্রয়-এর সংজ্ঞা বলেছেন, বিনিময়ের মাধ্যমে বিশেষভাবে কোনো বস্তুর মালিক হওয়া।
অনুরূপভাবে হাত্তাব বিক্রির একটি সংজ্ঞা বর্ণনা করেছেন, যার আওতায় সহীহ বিক্রির সাথে ফাসেদ বিক্রিও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তিনি বলেছেন, কোনো বিনিময়সম্পন্ন বস্তুর ক্ষেত্রে বিনিময় পরিশোধ করা। এ সংজ্ঞা বর্ণনা করার কারণ, এ সংজ্ঞাকারক মনে করেন, ফাসেদ বায় মালিকানা প্রদান করে না। বরং তা মালিকানার শুবহা (সন্দেহ) প্রদান করে মাত্র। এ বলে হাত্তাব এদিকে ইশারা করেছেন যে, আরবীভাষীরা কোনো বিষয়কে সহীহ বলে কেবল সে বস্তুটি সহীহ ধারণা করার ভিত্তিতে। বাস্তবে তা সহীহ হোক বা না হোক। সুতরাং তাদের মতে (ফাসেদ বায়-এর মাধ্যমে) জাহেলী যুগের বিধান হিসেবে মালিকানা যদিও স্থানান্তরিত হয়; কিন্তু ইসলামের বিধান হিসেবে মালিকানা স্থানান্তরিত হয় না। এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয়, শরীয়তের বিধানাবলীর উদ্দেশ্যই হচ্ছে সহীহ বিষয়ের অবগতি অর্জন করা।
টিকাঃ
১. আল-মিসবাহ, আল-মুগরিব, আল-লিসান : بَيْع ماده; আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২২২
২. ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৪৫৫
৩. আদ-দুরারু শারহুল গুরার, খ. ২, পৃ. ১৪২
৪. প্রতিদান শর্তায়িত দান হচ্ছে, দাতা গ্রহীতাকে দান করবে, যেন সে এর বিনিময়ে দাতাকে দান করে।
৫. আল-হাভাব, খ. ৪, পৃ. ২৫৫
৬. শারহুর রাওয, খ. ২, পৃ. ২; আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ১৫২
৭. আল-মুগনী ও আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ২; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৪৬
৮. 'পণ্য নির্ধারিত' বলার দরুন বায় সালাম বাদ পড়ল। কেননা বায় সালামে পণ্য নির্দিষ্ট থাকে না; বরং তা দায়ে আবশ্যক থাকে। আর এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বস্তু দ্বারা উদ্দেশ্য সোনা বা রুপা, যা বায় সালামের মূল পুঁজি।
৯. ওজনে কমবেশ করে সোনার বিপরীতে সোনা এবং রুপার বিপরীতে রুপা ক্রয়বিক্রয়কে মুরাতালা বলে।
১০. আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২২৫; আল-বাহজা শরহুত তুহফা, খ. ২, পৃ. ৩
১১. আল-হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ২২৩
📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা
ক. اَلْهِبَةُ، وَالْوَصِيَّةُ (আল-হিবাতু ওয়াল ওয়াসিয়্যাতু): হিবা ও অসিয়ত
জীবিত অবস্থায় বিনিময় ছাড়া সম্পদের মালিক বানানোকে হিবা বলা হয়। আর মরণোত্তর বিনিময় ছাড়া মালিক বানানোকে অসিয়ত বলে। এ দুটোর সাথে বায় (বিক্রি)-এর পার্থক্য হচ্ছে, বিক্রিতে বিনিময় থাকা আবশ্যক, কিন্তু এগুলোতে পার্থিব কোনো বিনিময় নেই।
খ. الإجارة (আল-ইজারাহ্): ইজারা
নির্দিষ্ট বিনিময়ের বদলে নির্দিষ্ট লাভ গ্রহণের চুক্তিকে ইজারা বলা হয়। ফলে দেখা যায়, মেয়াদের সাথে অথবা কাজের সঙ্গে ইজারা সম্পৃক্ত, পক্ষান্তরে বায়-এর সাথে এ সবের কোনো সম্পর্ক নেই। ইজারায় মালিক বানানো হয় উপকারের, আর বায় (বিক্রিতে) সম্পূর্ণরূপে মূল জিনিসের মালিক বানানো হয়।
গ. الصلح (আস-সুগৃহ): সন্ধি
সন্ধি হলো বিবাদ-বিসম্বাদ দূর করার চুক্তি। ইবনে আরাফার মতে এর সংজ্ঞা হলো, বিবাদ দূর করার জন্য কিংবা বিবাদে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিনিময়ের ভিত্তিতে কোনো অধিকার বা কোনো দাবি প্রত্যাহার করা, যদি সন্ধি হয় বিনিময় গ্রহণের ভিত্তিতে, তাহলে সন্ধিটি হবে বিনিময়মূলক। এ অবস্থায় সন্ধিকে ফকীহগণ বিবেচনা করেন বায় হিসেবে। সুতরাং বায়-এ যে সকল শর্ত প্রয়োগ হয় এ সন্ধিতেও সে সকল শর্ত প্রয়োগ হবে।
ফকীহগণ বলেন, দাবি করা হয়নি এমন কোনো বস্তু গ্রহণের ভিত্তিতে যদি সমঝোতা হয়, তাহলে তা হবে সমঝোতায় যা দাবি করা হয়েছে তার পরিবর্তে গৃহীত বস্তু নেওয়ার মাধ্যমে বিক্রি; যদি তা কোনো বস্তু হয়। তখন তাতে বিক্রির সমুদয় শর্ত প্রযোজ্য হবে। আর যদি তা কোনো বস্তু না হয়ে উপকার হয়, তাহলে সন্ধিটি হবে ইজারা। অপরদিকে সন্ধি যদি হয় দাবিকৃত বিষয়ের আংশিক গ্রহণ এবং অবশিষ্ট অংশ ছাড় দেওয়ার ভিত্তিতে, তাহলে এটি হবে হিবা। এভাবে প্রতিপন্ন হলো, কোনো কোনো অবস্থাতে সমঝোতা বায় হিসেবে বিবেচিত হবে, সব ক্ষেত্রে নয়।
ঘ. القسمة (আল-কিসমাহ্): বণ্টন
হানাফী ফকীহগণের মতে কিসমত হলো নির্দিষ্ট বস্তুতে বিস্তৃত অংশের একত্রিত হওয়া। ইবনু আরাফার মতে, দুই (বা ততোধিক) মালিকের মালিকানাধীন ব্যাপক বস্তুতে মালিকানা নির্দিষ্ট করা, বিশেষ কার্যক্রম অর্থাৎ লটারি বা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে।
শাফেয়ী ও হাম্বলীগণ বলেন: এক অংশকে অপর অংশ থেকে পৃথক ও আলাদা করার নাম হলো কিসমত বা বণ্টন। কোনো কোনো ফকীহ একে বায় হিসেবে গণ্য করেন। ইবনু কুদামা বলেন, কিসমত বা বণ্টন হচ্ছে দুজনের মালিকানার বস্তুতে প্রত্যেকের অংশ আলাদা ও পৃথক করা। এটি বায় নয়। এটি শাফেয়ী রহ.-এর একটি মত। অপর মত হলো, এটি বায়। এ মতটি আবু আবদুল্লাহ ইবনু বাত্তা-এর সূত্রে বর্ণিত। এর কারণ হলো, বণ্টন করা হলে প্রত্যেকে যৌথ মালিকানাধীন বস্তুর যে অংশ পায়, তাতে তার সাথীর যে অংশ রয়েছে তা সাথীর অংশে নিজের থাকা অংশের বিনিময় হয়। আর এটিই তো মৌলিক বায়। এটি কোনো কোনো মালেকী ফকীহের মত। ইবনু আবদিল বার বলেন, বায়-এর একটি প্রকার হলো কিসমত বা বণ্টন। আল-মুদাওয়ানা গ্রন্থে এটি ইমাম মালেক রহ.-এর মত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
যদি বণ্টন হয় রদ-বদল জাতীয়, (রদ-বদলের বণ্টন হলো, যে বণ্টনে অংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যক্তির সম্পদের সাহায্য নেওয়া হয়।) তাহলে শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহদের মতে সেটি বায়। আল-মুহাযযাব গ্রন্থে রয়েছে, যদি বণ্টন হয় রদ-বদল জাতীয়, তাহলে তা বায় হবে। কেননা কেউ তার শরীকের অংশ থেকে বিনিময় হিসেবে অর্জিত হওয়া সম্পদের বিনিময়ে সে তার সম্পদ ব্যয় করেছে। ইবনু কুদামা বলেন, যদি কিসমতের ক্ষেত্রে বিনিময় রদ-বদল করা হয় তাহলে তা হবে বায়। কেননা বণ্টনকারী তার শরীকের মালিকানা থেকে যে সম্পদ তার মালিকানায় অন্তর্ভুক্ত করেছে সে সম্পদের বিনিময় হিসেবে অর্থ ব্যয় করেছে। আর অপরের অংশ নিজের মালিকানায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে সম্পদ ব্যয় করাই হলো বায়। মিছলী বস্তুর বণ্টন হলে হানাফী ফকীহদের মতে, এ অবস্থায় প্রাপ্য অংশগুলোতে পৃথক হওয়ার দিকটিই প্রবল। আর কীমী জাতীয় বস্তুর বণ্টন হলে সে ক্ষেত্রে বায়-এর বৈশিষ্ট্য প্রবল হয়ে থাকে।
টিকাঃ
১২. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৩৩৩; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ২১১; আল- কালয়ূবী, খ. ৩, পৃ. ১৫৬; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৬
১৩. আয-যায়লায়ী, খ. ২, পৃ. ১৫১; আশ-শারহুস সাগীর, খ. ৪, পৃ. ৫; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১৮৪; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৩৩২; আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৪৩৩; মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ৩৫১
১৪. আল-ইখতিয়ার, খ. ৩, পৃ. ৫; জাওয়াহিরুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১০২; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭৭; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ২৬০
১৫. আল-বাহরুর রায়েক, খ. ৮, পৃ. ১৬৭; মিনাহুল জালীল, খ. ৩, পৃ. ৬১৯; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৮, পৃ. ২৬৯; মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ৩, পৃ. ৫০৮
১৬. এ গ্রন্থের ৫ নং ভুক্তি দেখুন।
১৭. এ গ্রন্থের ৬ নং ভুক্তি দেখুন।
১৮. আল-মুগনী, খ. ৯, পৃ. ১১৪-১১১; আল-মুহাযযাব, খ. ২, পৃ. ৩০৭; আল-কাফী, ইবনু আবদিল বার কৃত, খ. ২, পৃ. ৮৭৬; মিনাহুল জালীল, খ. ৩, পৃ. ৬২৪; আল- ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, খ. ২, পৃ. ৩২৭; বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৭, পৃ. ১৭
📄 শরীয়তের বিধান
সকল ফকীহ এ কথায় একমত, বায় বা বিক্রি ও ব্যবসায় শরীয়তসিদ্ধ, এক বৈধ কাজ। তার বৈধতা কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ "আল্লাহ বায় তথা ক্রয়বিক্রয়কে হালাল করেছেন।” আরও ইরশাদ হচ্ছে: لا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ "তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কিন্তু তোমাদের পরস্পর রাজী হয়ে ব্যবসায় করা বৈধ।
রাসূলুল্লাহ স.-এর হাদীস: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُئِل : أَيُّ الْكَسْبِ أَطْيَبُ ؟ فَقَالَ : عَمَلَ الرَّجُلِ بِيَدِهِ ، وَكُل بَيْعِ مَبْرُورٍ নবী করীম স.-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন্ উপার্জন সর্বাধিক উৎকৃষ্ট? তিনি বললেন, 'মানুষের নিজ হাতের উপার্জন এবং সকল বৈধ ব্যবসা।'
সেই সাথে নবী করীম সা. নিজে বেচাকেনার কাজ করেছেন। সাহাবায়ে কেরামের অনুরূপ কাজে তিনি স্বীকৃতিও দিয়েছেন। ইজমায়ে উম্মতও বেচাকেনা বৈধ হওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিয়াসের চাহিদাও হলো বেচাকেনা বৈধ হওয়ার অনুকূলে। কারণ, একজনের হাতে যা রয়েছে তার প্রতি অন্যদের চাহিদা থাকে। সাধারণত বিনিময় ছাড়া এ সকল বস্তুর অদল-বদল হয় না। ফলে কেনাবেচার প্রতি মানুষ মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। আর তাই ব্যবসা বৈধ হলেই লক্ষ্যে পৌঁছা যায় এবং প্রয়োজন পূরণ হয়। মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য এ ধরনের বিক্রি ছাড়া গতি নেই।
বায়-এর মূল নিদের্শনা হলো এরূপই, কিন্তু বিভিন্ন সময়ে এটি অন্যান্য বিধানের আওতাভুক্ত হয়। তখন (নস) শরীয়তের স্পষ্ট নির্দেশনার মাধ্যমে নিষিদ্ধ বস্তু অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে বায় নিষিদ্ধ হয়। যেমন চুক্তির শব্দ প্রয়োগে ত্রুটি, ক্রেতা বিক্রেতার দোষ বা পণ্যের অযোগ্যতাজনিত কারণে বায় নিষিদ্ধ হতে পারে। এ জাতীয় বায় চুক্তি সম্পাদন করতে যাওয়া হারাম, যেহেতু এটি সহীহ বায় হতে পারে না, বরং হানাফী ফকীহদের দৃষ্টিতে এ জাতীয় বায় বাতিল বা ফাসিদ। অবশ্য এ বিষয়ে অন্য সকল ফকীহের সাথে তাদের প্রসিদ্ধ মতবিরোধ রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকের বিনিময় তাকে ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যক। এ সংক্রান্ত বিশদ বিবরণের জন্যে দ্রষ্টব্য: (بَيْع مَنْهِيٌّ عَنْهُ) নিষিদ্ধ বায়, যে শাখা ব্যবসাগুলো নিষিদ্ধ বায় হিসেবে পরিচিত সেগুলো এবং বায় বাতিল (الْبَيْعُ الْباطل) ও বায় ফাসিদ (الْبَيْعُ الْفَاسِدُ)-এর আলোচনা।
নিষিদ্ধ এসব বিক্রি ক্ষেত্রবিশেষে বাতিল ও ফাসিদ হিসেবে চিহ্নিত হয়। কোনো কোনো কারণে বায়-এ মাকরুহের বিধান আরোপিত হয়। এটি সে ক্ষেত্রে হয় যেখানে নিষেধাজ্ঞা দৃঢ় নয়, আর তাই সে বিক্রি ভাঙ্গা ওয়াজিব নয়। মালেকী মাযহাবের আল হাত্তাব এর একটি উদাহরণ দেন হিংস্রপ্রাণীর বিক্রয় দিয়ে, যেখানে কেবল হিংস্রপ্রাণীর চামড়া সংগ্রহ উদ্দেশ্য হয় না।
ক্ষেত্রবিশেষে বায় ওয়াজিব হয়। যেমন কেউ প্রাণ রক্ষার্থে খাদ্য বা পানীয় ক্রয়ের মুখাপেক্ষী হয়। কোনো কোনো সময় বায় মুস্তাহাব হয়। যেমন কেউ কসম করল, অমুক ব্যক্তির কাছে সে কোনো পণ্য বিক্রয় করবে। এ বিক্রয়ে যদি কোনো অনিষ্ট বা অন্যায় না হয় তাহলে মুস্তাহাব হলো তা কার্যকর করা। কারণ, কসমকারীর কসমে যদি কোনো শরয়ী নিষেধাজ্ঞা বা অনিষ্ট না থাকে তাহলে তা পালন করা মুস্তাহাব।
বায় শরীয়তসিদ্ধ হওয়ার পিছনে হেকমত হলো, আল্লাহর বান্দাগণের প্রতি কোমলতা প্রকাশ এবং তাদের জীবন জীবিকা উপার্জনে সহযোগিতা করা।
টিকাঃ
১৯. সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৭৫
২০. সূরা আন-নিসা, আয়াত ২৯
২১. আহমদ কৃত মুসনাদ, খ. ৪, পৃ. ১৪১; হায়ছামী কৃত আল-মাজমা, খ. ৪, পৃ. ৬০; হাদীসটি বর্ণনা করার পর হায়হামী বলেন, হাদীসটি আহমদ ও বাযযার নিজ নিজ গ্রন্থে এবং তাবারানী তার কাবীর ও আউসাত গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। হাদীসটিতে আল-মাসউদী নামে একজন রাবী রয়েছেন, তিনি নির্ভরযোগ্য, তবে শেষ বয়সে তিনি স্মৃতিভ্রমের শিকার হন। আহমদ সূত্রে বর্ণিত অন্য সকল রাবী ত্রুটিমুক্ত।
২২. আল-মুগনী ও আশ-শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ৩; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ১৪৫; আল- মুকাদ্দামাতু লি ইবনি রুশদিল জাদ্দ, খ. ৩, পৃ. ২১৩; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ৭৩
২৩. প্রাগুক্ত
২৪. হাশিয়াতুল আদাবী, খ. ২, পৃ. ১২৫; আল-বুখারী আল-হানাফী, মাহাসিনুল ইসলাম, পৃ. ৭৯