📄 ব্যবসায়ে নৈতিকতা ও শিষ্টাচার
ব্যবসায়ে নৈতিকতা ও উত্তম শিষ্টাচার হলো, লেনদেনের ক্ষেত্রে উদারতা ও কোমলতা প্রকাশ করা, সর্বোচ্চ চারিত্রিক গুণাবলি প্রকাশ করা, কোনো দাবি আদায় করতে সাধারণ জনগণের ওপর কোনো রকম সংকীর্ণতা, কষ্ট বা সঙ্কট চাপিয়ে না দেওয়া ইত্যাদি। এ সম্পর্কে প্রচুর হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যেমন: জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন,
رَحِمَ اللَّهُ رَجُلًا سَمْحًا إِذَا بَاعَ ، وَإِذَا اشْتَرَى ، وَإِذَا اقْتَضَى আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির প্রতি রহমত বর্ষণ করুন, যে বেচাকেনা করার সময় এবং পাওনা মিটানোর সময় নম্রতা অবলম্বন করে। "
অন্য হাদীসে, রাসূলুল্লাহ স. বলেন, غَفَرَ اللَّهُ لِرَجُلٍ كَانَ قَبْلَكُمْ سَهْلًا إِذَا بَاعَ ، سَهْلًا إِذَا اشْتَرَى ، سَهْلًا إِذَا اقْتَضَى "তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির একজন লোককে আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন, যে বেচাকেনার সময় এবং পাওনা মিটানোর সময় সহজতা অবলম্বন করত। "
ব্যবসায়ে নৈতিকতার আরেকটি দিক হলো, সন্দেহপূর্ণ যাবতীয় বিষয় বর্জন করা। যেমন: যে বাজারে হালাল পণ্যের সাথে হারাম পণ্যের মিশ্রণ ঘটানো হয় সে বাজারে বেচাকেনা করা অথবা এমন কারো সাথে লেনদেন করা যার অধিকাংশ পণ্যই হারাম, এরূপ সন্দেহপূর্ণ ব্যবসায় বর্জন করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে নির্দেশনা প্রদান করে রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন: الْحَلَالِ بَيِّنٌ ، وَالْحَرَامُ بَيِّنٌ ، وَبَيْنَ ذَلِكَ أُمُورٌ مُسْتَبِهَاتٌ لَا يَعْلَمُهَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ : أَمِنَ الْحَلَالِ هِيَ أَمْ مِنَ الْحَرَامِ ؟ ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدِ اسْتَبْرَأَ لدينه وعرضه . "হালালও সুস্পষ্ট, হারামও সুস্পষ্ট এবং এ দুয়ের মাঝে রয়েছে অনেক সন্দেহজনক বিষয়। তা হালাল না হারামের অন্তর্ভুক্ত সেটা অনেক লোকই জানে না। যে ব্যক্তি এই সন্দেহজনক বিষয়গুলো ত্যাগ করবে সে তার নিজ দীন (ধর্ম) এবং মান-সম্মানেরই হেফাজত করবে। "
ব্যবসায়ে সততা, সত্যবাদিতা ও আমানতদারি অবলম্বন করা। এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে,
التاجرُ الأمينُ الصَّدُوقُ مَعَ النَّبِيِّينَ وَالصَّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ .
"পরম বিশ্বস্ত ও সৎব্যবসায়ী (পরকালে) নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সাথে থাকবেন।
ব্যবসায়-পণ্য থেকে কিছু দান-সদকা করা। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন:
إِنَّ الشَّيْطَانَ وَالْإِثْمَ يَحْضُرَانِ الْبَيْعَ ، فَشُوبُوا بَيْعَكُمْ بِالصَّدَقَةِ ، فَإِنَّهَا تُطْفِئُ غَضَبَ الرَّبِّ .
"ব্যবসায়িক লেনদেনের সময় শয়তান ও গুনাহ এসে উপস্থিত হয়। অতএব তোমরা ব্যবসায়ের সাথে দান-খয়রাতও যুক্ত করো। কারণ, এ দান-খয়রাত প্রতিপালকের রাগকে প্রশমিত করে।
সকাল সকাল ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে বের হওয়া। সখর আল গামিদী বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন:
اللَّهُمَّ بَارِكْ لِأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا
“হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতের সকালসমূহে বরকত দান করুন।” বলা হয়, সখর ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ব্যক্তি। তিনি তার ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের দিনের প্রথমভাগে ব্যবসায়ে পাঠাতেন। এতে তিনি ধনী হয়েছিলেন এবং তার সম্পদও বৃদ্ধি পেয়েছিল।
টিকাঃ
১৭. সহীহ বুখারী, বরাত ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ৩০৬; আস-সালাফিয়্যা প্রকাশ
১৮. জামে তিরমিযী, সনদ হাসান, খ. ৩, পৃ. ৬০১; আল-হালাবী প্রকাশ
১৯. আল-কালয়ূবী, খ. ২, পৃ. ১৮৬
২০. সহীহ বুখারী, (ফাতহুল বারী, খ. ৪, পৃ. ২৯০; আস-সালাফিয়্যা প্রকাশনী), সহীহ মুসলিম, খ. ৩, পৃ. ১২১৯; আল-হালারী প্রকাশ
২১. এ অধ্যায়ের ৪নং সূত্র দেখুন
২২. তিরমিযী, খ. ৩, পৃ. ৫০৫; আল-হালবী প্রকাশনা, ইমাম হাকিম হাদিসটি বর্ণনা করে তা সহীহ বলেছেন, খ. ২, পৃ. ৭; দায়িরাতুল মাআরিফ আল-উছমানিয়্যা; তার এই মতের সাথে ইমাম যাহাবীও ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
২৩. তিরমিযী, খ. ৩, পৃ. ৫০৮; আল-হালাবী সংস্করণ; তিনি সখর আল গামিদী থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আল-মুনযিরী তার আত তারগীব গ্রন্থে এই হাদীসটি অনেক বর্ণনাকারী সাহাবী থেকে উল্লেখ করে বলেছেন, এই হাদীসের অনেক সনদে আপত্তি রয়েছে। তবে কিছু হাসান সনদও রয়েছে। দ্র. আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, খ. ২, পৃ. ৫২৯; আল-হালাবী সংস্করণ
২৪ তুহফাতুল আহওয়াযী, খ. ৪, পৃ. ৪০২
📄 ব্যবসায় পণ্যে যাকাত ফরয
ব্যবসার পণ্যে যাকাত প্রদান করা ফরয। যাকাতযোগ্য ব্যবসায় পণ্য বলা হয় ঐ সকল পণ্যকে, ব্যবসার উদ্দেশ্যে কোনো কিছুর বিনিময়ে যেগুলোর মালিকানা অর্জন করা হয়েছে। এই সম্পদে এক বছর পূর্ণ হলে তাতে যাকাত দিতে হবে। এটি মদীনার সাতজন ফকীহ, হাসান, জাবের ইবনে মায়মুন, তাউস, সাওরী, নাখায়ী, আওযায়ী, আবু উবায়দ এবং ইসহাক ও আসহাবুর রায়, এদের সকলের অভিমত এবং শাফেয়ী রহ.-এর নতুন মত।
মালেকী মাযহাবের ফকীহগণ সাধারণ ব্যবসায়ী ও মজুতদারের মধ্যে পার্থক্য করেন। তারা বলেন, যে ব্যবসায়ী নিজেই তার ব্যবসা পরিচালনা করে, বিদ্যমান বাস্তব মূল্যে বেচাকেনা করে, কখনো তার ব্যতিক্রমও করে, যেমন সাধারণ দোকানদার সমাজ। তারা প্রতি বছর বছরান্তে যাকাত আদায় করতে হবে। এর বিপরীতে মজুতদার পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির গরজে সে পণ্য বাজারে তুলতে অপেক্ষা করে। তার বেলায় সকল পণ্যের মূল্য ধার্য করে যাকাত প্রদান করতে হবে। যদি ক বছরেরও হয়।
অধিকাংশ ফকীহ এ ধরনের কোন পার্থক্য করেন না। তাদের দলিল: ১. সামুরা বিন জুনদুব রা. বলেন, فَإِنَّ رَسُولَ الله صلى الله عليه وسلم - كَانَ يَأْمُرُنَا أَنْ تُخْرِجَ الصَّدَقَةَ مِنَ الَّذِي نُعِدُ الْبَيْعَ "রাসূলুল্লাহ স. আমাদের নির্দেশ দিতেন আমরা ব্যবসার জন্য যা প্রস্তুত করি যেন তার যাকাত আদায় করি।" ২. অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : وَفِي الْبَرِّ صَّدَقَةَ "কাপড়েও যাকাত রয়েছে।” এ কথায় কোনো মতানৈক্য নেই, খোদ বস্তুটিতে যাকাতের বিধান আসে না, আসে তার মূল্যে। ব্যবসায় পণ্যেও নেসাব ও বছর হিসাব করতে হবে, তাতে কারো বিরোধ নেই। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য : زكاة
টিকাঃ
২৫. আল-মুগনী, খ. ৩, পৃ. ৩০; রওযাতুত তালিবীন, খ. ২, পৃ. ২৬৬; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ২, পৃ. ২০
২৬. সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব, উরওয়া ইবনুষ যুবায়ের, আল-কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ, উবায়দুল্লাহ ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু উতবা, খারিজা ইবনু যায়দ, সুলাইমান ইবনু ইয়াসার, অধিকাংশের মতে সপ্তম জন হলেন, আবূ সালামা ইবনু আব্দুর রহমান ইবনু আওফ। দেখুন, আল-মাওসূআহ, খ. ১, পৃ. ৩৬৪
২৭. আবু দাউদ, খ. ২, পৃ. ২১২
২৮. আহমদ, খ. ৫, পৃ. ১৭৯